পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৫)

বাবর আলী | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

পথের ধারের সৌন্দর্যরা। ছবি: বাংলানিউজ

walton

বাবর আলী। পেশায় একজন ডাক্তার। নেশা ভ্রমণ। তবে শুধু ভ্রমণ করেন না, ভ্রমণ মানে তার কাছে সচেতনতা বৃদ্ধিও। ভালোবাসেন ট্রেকিং, মানুষের সেবা করতে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের এই ডাক্তার হেঁটে ভ্রমণ করেছেন দেশের ৬৪ জেলা। সেটা আবার ৬৪ দিনে। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? সেটা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন বাংলানিউজের ট্রাভেলার্স নোটবুকে। ৬৪ দিনে থাকবে ৬৪ দিনের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।

দিন ৩৫

আশুলিয়া বাজার (ঢাকা)-মানিকগঞ্জ = ৪১.৩৬ কিমি

শবনম এই কাকডাকা ভোরে উঠেই রুটি বানিয়ে সেগুলো খাইয়ে তারপরে ছাড়লো। বের হতেই মুজিব ভাইয়ের ফোন। পৌনে সাতটায় আশুলিয়া বাজার আসার কথা থাকলেও উনি সাড়ে ছয়টাতেই চলে এসেছেন। খুবই সময় সচেতন এই মানুষটা। আশুলিয়া বাজারে অপেক্ষা করছিলেন আরও দুজন। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের আজিম রানা ভাই আর জনি ভাই। বড় রাস্তা ধরে কিছুক্ষণ হেঁটেই টংগাবাড়ী।

খানিক পরে হাতের বাম পাশে লোকালয়ের ভেতরের রাস্তা ধরলাম। এই রাস্তা গিয়ে মিশেছে কাঠগড়া বাস স্টপে। মাস্ক পড়া গার্মেন্টসকর্মীরা এই সকালে বেরিয়ে পড়েছে জীবিকার তাগিদে। জায়গায় জায়গায় প্রচুর কাদা। এই শুষ্ক মৌসুমে এত কাদার উৎস আঁচ করাটা সম্ভব হলো না। দূর্গাপুর হয়ে কাঠগড়া থেকে উঠে পড়লাম মূল সড়কে।

কাদায় ভরা পথ। ছবি: বাংলানিউজ

গুগল ম্যাপে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, খানিকটা এগোনোর পর থেকে দিনের বাকি রাস্তাটুকু মহাসড়ক ধরেই। কুটুরিয়া হয়ে চলে এলাম সাভার সেনানিবাস। ম্যাপ জানান দিচ্ছে, একটা ছোট শর্টকাট রাস্তা আছে সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে। সে রাস্তার আশা ত্যাগ করে বিশ মাইল হয়ে এবার হাইওয়েতে। একটু সামনেই সাভার গলফ ক্লাব। গলফ ক্লাবের গোছানো পরিবেশ দেখতে আমার সবসময়ই ভালো লাগে। চট্টগ্রামের ভাটিয়ারি গলফ ক্লাবে যাওয়ার সুযোগ মিললেও এখানে সে আশা নেই। বাইরে থেকে যে খুব ভালো দেখা যায়, তাও কিন্তু না। স্মৃতিসৌধের কাছে এসে এই পদযাত্রায় প্রথমবারের মতো ওভারব্রিজ পার হলাম। ওখান থেকে যুক্ত হলেন খোকন দা। উনি কদিন আগেও আমার সঙ্গে হেঁটেছেন দিন তিনেক। সাভারের ওপর দিয়ে যাবার সময় সাভার নিবাসী এই ভদ্রলোক সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। তার উপর আজ আবার উনার জন্মদিন।

স্মৃতিসৌধের মূল ফটক বন্ধ থাকলেও ঢুকে পড়লাম পাশের ফটক হয়ে। সবুজে ঘেরা লাল ইটের সিঁড়ি পেরিয়ে স্মৃতিসৌধের একদম কাছে পৌঁছে গেলাম। নির্মাণ কাজ চলছে আসন্ন বিজয় দিবসকে সামনে রেখে। মির্জানগর, নয়ারহাট পেরিয়ে পেলাম কালো পানির ধলেশ্বরী। একটা নদী কী পরিমাণে দূষিত হতে পারে তার উজ্জ্বল প্রামাণ এটি। শিল্পবর্জ্য সব গিয়ে মিশছে এই নদীতে। সবাই এই ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হলেও কিছু করতে আগ্রহী নয়।

কালো পানির ধলেশ্বরী। ছবি: বাংলানিউজ

কালো পানির ধলেশ্বরী অতিক্রম করেই সাভার উপজেলা শেষ। ওপাড়ে ধামরাই পৌরসভা। প্রচুর ফার্মাসিটিক্যালস কোম্পানির কারখানা চোখে পড়ছে।

নানা কিছু নিয়ে প্রভূত গল্প হচ্ছে পথ চলতে চলতে। জলে-পাহাড়ে দুদিকেই সমান আগ্রহী মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রের অভাব নেই। আজিম ভাই আর জনি ভাইয়ের সঙ্গেও বিস্তর কথা হচ্ছে নানা ইস্যুতে। রাস্তায় সেলফি পরিবহনের বাস চলছে প্রচুর। ঢাকার টেকনিক্যাল মোড় থেকে পাটুরিয়া ফেরীঘাট পর্যন্ত চলে এই বাস। সেলফি পরিবহনের সঙ্গে সেলফি তোলার বৃথা চেষ্টায় না গিয়ে ঢুলিভিটার রাস্তা ধরলাম।

কড়ই গাছে ছাওয়া দারুণ এক রাস্তা ধরে জয়পুরা বাজার। ঢুলিভিটার পরে জয়পুরা বাজার, ডাউটিয়া হয়ে কালামপুর। এখান থেকেই একে একে বিদায় নিলেন আজিম ভাই, জনি ভাই আর খোকন দা। খোকনদাকে আরেক দফা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সাভার অভিমুখে পাঠিয়ে দিলাম।

যাত্রাপথের সঙ্গীরা। ছবি: বাংলানিউজ

কালামপুর থেকে তিনজন বিদায় নিলেও সঙ্গী হলো আরও একজন। আশরাফুল নামক ছেলেটা পড়ে বুয়েটের নেভাল আর্কিটেকচারে। একে একে শ্রীরামপুর, বেলীশ্বর পার হলাম। মহাসড়ক হলেও সড়কে গাছ আছে প্রচুর। বেশ লাগছে হাঁটতে। বাথুলির কাছাকাছি রাস্তায় সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক দেখে আশরাফুল জানালো ও এই জিনিসের ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছে। এই পুরো পদযাত্রায় এসব ছোট ছোট জিনিসই সম্ভবত প্রাপ্তি।

সেই কবে ধামরাইয়ে ঢুকেছি, ধামরাই আর শেষ হয় না। মুজিব ভাইয়ের পৈতৃক বাড়ি মানিকগঞ্জে। তাই উনাকেই বারবার জিজ্ঞেস করছি মানিকগঞ্জ জেলাতে ঢুকবো কবে নাগাদ। একেবারে নতুন জুতা পড়ায় মানিয়ে নিতে একটু বেগ পেতে হলেও উনি সেসবকে খুব একটা গ্রাহ্যই করেন না।

বারবাড়ীয়ার কাছে অবশেষে শেষ হলো ধামরাই তথা ঢাকা জেলার সীমানা। সেতুটা পার হতেই আমাদের অবস্থান মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়। চোখে পড়লো বাংলাদেশ স্কাউটসের আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। নয়াডিঙ্গি হয়ে গোলড়ার দিকে যেতেই অনেক কারখানা।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ছবি: বাংলানিউজ

১৮ বছরের কম বয়সীদের চাকরি দেওয়া হয় না- এমন সাইনবোর্ড ঝুলছে বেশিরভাগ কারখানাতেই। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটটি অবস্থিত জাগীরে। কিছুদূর গিয়েই আবার ধলেশ্বরী নদী। এ জায়গায় নদী একেবারেই মরা। কচুরিপানায় ভর্তি নিশ্চল এক ডোবা মনে হচ্ছে নদীকে।

খানিক এগিয়েই পেলাম একটা বড় কড়ই গাছকে কেন্দ্র করে সাত-আটটা টারপুলিনের তৈরি ঘর। ঘরহীন ভাসমানদের আশ্রয়স্থল এ জায়গা। আর তার ঠিক মাঝখানে একটা কমন রান্নাঘর। সেই রান্নাঘরে এই শেষ বিকেলে বানানো হচ্ছে শীতকালীন পিঠা।

উঁচুটিয়া হয়ে মানিকগঞ্জ বাস স্ট্যান্ডের কাছে শেষ করলাম আজকের হাঁটা। সিটি সেন্টারের কাছে দাঁড়াতেই চলে এলেন তৌফিক ভাই আর তার বন্ধুরা। তৌফিক ভাই সম্পর্কে খোকন দা’র কাজিন। উনার মাধ্যমেই পরিচয়। উনারা বরণ করে নিলেন ফুল দিয়ে।

শহরের একেবারে কেন্দ্রে শহীদ রফিক সড়কের শেষ মাথায় মুজিব ভাইয়ের ফ্ল্যাটে চলে আসলাম এর পরেই। এই ফ্ল্যাটে কেউ থাকে না। মুজিব ভাইয়ের পরিবারের কেউ আসলে মাঝে-মধ্যে খোলা হয়। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেতে গেলাম মুজিব ভাইয়ের আত্মীয়ের বাসায়। মুজিব ভাইয়ের সে ভাবি আবার চট্টগ্রামের বাসিন্দা। অনেকদিন পর চাঁটগাইয়া বলার সুযোগ পেয়ে বেশ কিছুক্ষণ অন্যদের দর্শক বানিয়ে আমরা বাক্য চালাচালি করলাম। ভাবির বোনের বাসাও পাশেই। চাঁটগাইয়া মানুষ আসার খবর উনাকে দিতেই চলে এলেন উনিও।

চলবে…

আরও পড়ুন...​

পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৪)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩৩)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩২)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩১)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৩০)​
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৯)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৮)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৭)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৬)​
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৫)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৪)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২৩)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২২)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২১)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-২০)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৯)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৮)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৭)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৬)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৫)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৪)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১৩)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১২)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১১)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-১০)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৯)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৮)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৭)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৬)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৫)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (পর্ব-৪)
পায়ে পায়ে ৬৪ দিনে ৬৪ জেলা (দিনাজপুর-৩)
পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা (ঠাকুরগাঁও-২)

পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা (পঞ্চগড়-১)

বাংলাদেশ সময়: ১৫৫০ ঘণ্টা, মার্চ ০১, ২০২০
এইচএডি/

নিয়ম না মানলে করোনা প্রতিরোধ কঠিন হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
মাস্ক জীবাণুমুক্ত করতে রেডিয়েশন ব্যবহার করছে রাশিয়া
করোনায় আক্রান্ত বার্সার ভাইস প্রেসিডেন্ট
করোনায় স্পেনে ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৮০৯
বাড়ছে টোকিও অলিম্পিকে পুরুষ ফুটবলে বয়সসীমা


করোনা সংকটে মৎস্যচাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস
করোনা: শবে বরাতে নিজ বাসায় নামাজ আদায়ের আহ্বান
সাদুল্যাপুরে আরও একজনের শরীরে করোনা শনাক্ত, ১৫ বাড়ি লকডাউন
ঢাকার মালয়েশিয়া হাইকমিশন খুলবে ১২ এপ্রিল
ডিসির হটলাইনে ফোন করলেই মিলছে খাদ্য