লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ভারতের হিলি সীমান্ত থেকে একটু সামনেই ত্রিমোহনী। এখানেই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচুর শরণার্থী-ছবি: কাশেম হারুন

সেদিন ছিল লক্ষ্মীপূজার রাত। সন্ধ্যায় হিন্দু ধর্ম্বালম্বী মানুষেরা পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়।

দক্ষিণ দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ: সেদিন ছিল লক্ষ্মীপূজার রাত। সন্ধ্যায় হিন্দু ধর্ম্বালম্বী মানুষেরা পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই ব্যাপক গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। ভারতীয় আর্মি আর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে  পাকসেনাদের তুমুল সংঘর্ষের কারণে সেদিন হিলি, ত্রিমোহনী এলাকার মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। গোলাগুলির মধ্যে পড়ে অনেক নিরীহ সাধারণ মানুষ আহত হন।

এটা ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষাংশের কথা। কার্তিক বা অগ্রহায়ণ মাস হতে পারে। কিন্তু সেটা ছিল লক্ষ্মীপূজারই রাত। ওপারে দিনাজপুরের হিলিতে মুহাড়াপাড়া আর বাসুদেবপুরে ছিল পাকসেনাদের শক্তিশালী ঘাঁটি। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাকসেনাদের এই ডিফেন্স ভাঙ্গতে অনেক শক্তি ক্ষয় করে ভারতীয় আর্মি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ওটা পাকসেনাদের দুর্ভেদ্য দূর্গের মতই ছিল।
বালুরঘাট বাস টামিনাল। ডাঙ্গি বর্ডার থেকে এই বাস টামিনালে মর্টার ছুড়তো পাক সেনারা-ছবি: কাশেম হারুনলক্ষ্মীপূজার রাতে তাই হঠাৎ সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। ভারতীয় আর্মি যেমন মর্টার শেল ছোড়ে, তেমনি পাক আর্মিও। অগত্যা স্থানীয়দের সরিয়ে নিয়ে ত্রিমোহনীর একদিকে আশ্রয় নিতে বলা হয়। তখন থেকে তারাও শরণার্থী হয়ে পড়েন।
 
রাজকুমার সাহার বাড়ি হিলিতে। তাদেরও সরিয়ে এনে ত্রিমোহনীতে আশ্রয় নিতে বলা হয়। থাকার জন্য তাঁবু টানানোর ব্যবস্থা করা হয়। ভাগ্যের পরিহাসে নিজ এলাকাতেই তারা হয়ে যান শরণার্থী। ভারত সরকার তাদের জন্যও চাল-ডালসহ আনুষঙ্গিক দ্রব্য-সামগ্রীর ব্যবস্থা করে।
বালুরঘাটের তিওর এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানেও গড়ে উঠা শরণার্থী শিবিরে প্রচুর পরিমান শরনার্থী ছিল-ছবি: কাশেম হারুনহিলিতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর (বিএসএফ) বর্তমান ক্যাম্প থেকে একটু পূর্বেই সীমান্ত। সেখান দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি ও মানুষ পারপার হয়। ওখানে যে রেল লাইনটি নো-ম্যানস ল্যান্ডের ভেতর দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে গেছে, সেটা তখনও ছিল। এই রেল লাইনের পূর্ব পাশেই ছিল পাকসেনাদের বাংকার। তার পেছনে ছিল মুহাড়াপাড়া-বাসুদেবপুর ক্যাম্প।
 
পাকসেনাদের বাংকার ও ক্যাম্প লক্ষ্য করে ভারতীয় আর্মি মর্টার শেল ছোড়ে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা না নিয়েই তারা মুখোমুখি আক্রমণ চালায়। প্রায় টানা তিনদিনব্যাপী ব্যাপক যুদ্ধ হয়। সে সময় অনেক ভারতীয় সৈন্য মারা যান। ওটা ছিল ভারতীয় আর্মির একটি ভুল সমরকৌশল। পাকসেনারা যে ধরনের বাংকার করে ক্যাম্প করেছিল, সেটা মুখোমুখি আক্রমণ করে গুঁড়িয়ে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ ছিল না। তাই ভারতের সে আক্রমণ সফল হয়নি।
যুধিষ্ঠির বর্মন।কামারপাড়া শরণাথী শিবিরে রেশন বিতরণের কাজ করতেন-ছবি: কাশেম হারুনদক্ষিণ দিনাজপুরের শুধু হিলি বর্ডারেই নয়, ডাঙ্গি বর্ডার, চক্রাম বর্ডার ও শিবরাম বর্ডারের ওপার থেকেও পাকসেনারা শেল ছোড়ে। এ বর্ডারের খুব কাছেই বালুরঘাট বাস টার্মিনাল। তখন এটার নাম ছিল ফুটানিগঞ্জ বাজার। এখানেই মিষ্টির দোকান ছিল নিরঞ্জন অধিকারীর। নভেম্বরের দিকে সেদিন রাতে আর্মিরা এসে তড়িঘড়ি করে সব বাতি নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। সবাই যে-যার দোকানের বাতি নিভিয়ে দেবে, এমন সময় স্ট্যান্ডের পাশেই বটগাছের ওখানে মর্টার শেল পড়ে। এতে মারা যান ৫ জন। এদের মধ্যে কারো হাত, কারো পা উড়ে যায়।
 
মুক্তিযুদ্ধের সময় বালুঘাট, হোসেনপুর মঙ্গলপুর, তিওড়, ত্রিমোহনী, কামারপাড়া প্রভৃতি এলাকায় অসংখ্য শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছিল।
 
যুধিষ্ঠির বর্মণের বাড়ি কামারপাড়ায়। ’৭১ সালে বাধামারী ‍উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। কামারপাড়াতে ছিল শরণার্থী শিবির। তিনি সেখানে রেশন বিতরণের কাজ করতেন। যত স্কুল-কলেজ ছিল, সবক’টিতেই সে সময় শরণার্থী শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল সে সময়। এতো মানুষ ছিল যে, সরকারি সহায়তায় কুলিয়ে ওঠা যেতো না। তখন অবর্ণনীয় কষ্ট করেছে শরণাথীর্রা। স্থানীয়রাও তাদের সাধ্যমতো অনেক সহায়তা করেছেন। তাদের দুঃখকষ্ট মনে পড়লে এখনো যুধষ্ঠির বর্মণের খারাপ লাগে। অপুষ্টিতে অনেক মানুষ মারা গেছেন। প্রতিদিন ৮-১০জন করে এক শিবিরেই মারা গেছেন।
নিরঞ্জন অধিকারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বালুরঘাট বাস টামিনালে মিষ্টির দোকান ছিল-ছবি: কাশেম হারুনশুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিভিন্ন দলের স্থানীয় নেতারাও শরণার্থীদের সহায়তায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন তখন। কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা মহারাজ বোস, বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক(আরএসপি)দলের নেতা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাস্টার মুকুল বোস, সুধীর তলাপাত্রসহ অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের অনেক সহায়তা করেছেন।
 
নেতারা স্থানীয়দের সংগঠিত করে শরণার্থীদের সহায়তা দেবার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতেন। এছাড়া খাবারের সংকট পড়লে তারা নিজেরাই টাকা উঠিয়ে বাজার করে দিতেন। এছাড়া শিবিরে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে কোনো চুরি হচ্ছে কিনা, ঠিক মত দেওয়া হচ্ছে কি না, এসব বিষয়ও দেখভাল করতেন।
 
এদিকে ভারতীয় আর্মির সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন বর্ডার থেকে পাকবাহিনীকে পিছু হটাতে পারলেও হিলি থেকে যায় সুরক্ষিত। ফলে আরো বেশি করে সৈন্য মোতায়েন করে চূড়ান্ত আক্রমণের পরিকল্পনা করে ভারতীয় আর্মি।
৫ ডিসেম্বর হিলি বন্দর দিয়ে ঢুকতে থাকে ভারতীয় ট্যাংকবহর। ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত তুমুল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলে। তবে প্রচণ্ড ভারতীয় বিমান হামলার মুখে তারা শেষ পর্যন্ত আর টিকতে পারেনি। অবশেষে ৯ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর জীবিত কিছু সদস্য প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুহাড়াপাড়া-বাসুদেবপুর ক্যাম্প মিত্রবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রংপুরের দিকে এগুতে থাকে।
 
যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
হিলির রাজকুমার সাহা, ত্রিমোহণী শিবিরের ত্রাণ বিতরণকারী যুধিষ্ঠির বর্মণ, ব্যবসায়ী নিরঞ্জন অধিকারী ও আশিস সাহা।
সহযোগিতায়:
বাংলাদেশ সময়: ০৭২২ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

জলপাইয়ের বিচি গলায় আটকে শিশুর মৃত্যু 
বিশ্বে বছরে দেড় মিলিয়ন অপরিণত শিশু জন্মায়
নির্বাচনের পরে আন্দোলনে নামবে পরিবহন শ্রমিকরা
কন্যা জন্ম দেয়ায় স্ত্রীকে তালাক, ৯ দিনের শিশুকে বিক্রি 
৫৬ হাজার বর্গমাইলের খণ্ডচিত্রে মঞ্চায়িত ‘কনডেমড সেল’
বাংলা একাডেমির ৪ পুরস্কার ঘোষণা 
স্কাইপি বন্ধ করে সরকার ঘৃণ্য নজির দেখালো: রিজভী
শীতে সতেজ থাকতে ‘সুগন্ধী ইয়োগা-চা’
জোটে সমঝোতার পর আ’লীগের প্রার্থী তালিকা 
লিও তলস্তয়ের মৃত্যু
ইতিহাসের এই দিনে

লিও তলস্তয়ের মৃত্যু