হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও-শাকিল আহমেদ

এপ্রিল থেকেই বারবার চেষ্টা করেও বাংলাহিলিতে পাকবাহিনীর দুর্গ ভেদ করে সামনে এগুতে ব্যর্থ হয় মুক্তিবাহিনী। ভারতীয় আর্মি শুরু থেকেই তাদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা-বারুদ দিয়ে সহায়তা করে। এর আগে তারা সাধারণ বাঙালিদের গেরিলা প্রশিক্ষণও দেয়।

বাংলাহিলি, দিনাজপুর: এপ্রিল থেকেই বারবার চেষ্টা করেও বাংলাহিলিতে পাকবাহিনীর দুর্গ ভেদ করে সামনে এগুতে ব্যর্থ হয় মুক্তিবাহিনী। ভারতীয় আর্মি শুরু থেকেই তাদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা-বারুদ দিয়ে সহায়তা করে। এর আগে তারা সাধারণ বাঙালিদের গেরিলা প্রশিক্ষণও দেয়।

হিলি বাজারের উত্তরেই ছিল পাকবাহিনীর দুটো বড় ক্যাম্প। একটা মুহাড়াপাড়ায়, আরেকটি বাসুদেবপুরে। এদুটি ক্যাম্পের দুই কিলোমিটার জুড়ে ছিল তাদের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। কিছুদূর পরপরই ছিল বাংকার। এর কোনোটি ছিল ইংরেজি ডব্লিউ আকৃতির, কোনোটা জেড আবার কোনটা ভি আকৃতির। দুই ক্যাম্পের মধ্যবর্তী স্থানে ও ক্যাম্প থেকে বাংকার পর্যন্ত মাটি কেটে গড়া হয়েছিল ট্রেঞ্চ বা পরিখা। এই ট্রেঞ্চের ভেতরে দিয়েই পাকবাহিনীর সদস্যরা অনায়াসে চলাচল করতে পারতো। বাইরে থেকে চলাচলের বিষয়টি বোঝা যেত না। বাংকারগুলো এবং ক্যাম্প দুটো ছিল এতো শক্তিশালী যে, বোমাতেও কিছু হতো না।
বাংলা হিলির যুদ্ধক্ষেত্র মুহাড়াপাড়ার ‘সম্মুখ সমর’বাংকারের ঠিক সামনে হিলির নো ম্যানস ল্যান্ড দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে বিভেদ রেখা টেনে দিয়েছে রেল লাইন। যার পশ্চিমে ভারত। আর পূর্বে বাংলাহিলি।

রেল লাইনের এপারে বাংকারে অবস্থান নিয়ে মুক্তিবাহিনীর ওপর গুলি চালাত পাকবাহিনী। ফলে তারা ছিল সুবিধাজনক অবস্থানে। যে কারণে বারবার আক্রমণ করেও কোনো সুবিধা করতে পারেনি মুক্তিবাহিনী। কেননা, তারা কখনো রেল লাইন পেরুতেই পারতেন না। এ অবস্থা চলতে থাকায় আর সময় নেওয়া যায় না ভেবে নভেম্বরের দিকে ভারতীয় আর্মি সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। সে মোতাবেক পরিকল্পনাও করেন তারা।
হিলিতে নো-ম্যানস ল্যান্ডের ভেতর দিয়ে গেছে বাংলাদেশের রেল লাইন। রেল লাইনের ওপার থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালাতে আসতেন কুমাড়াপাড়ার পাকবাহিনীর ক্যাম্পে। কিন্তু রেল লাইনের এপারে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল পাকসেনাদের শক্তশালী বাংকার। পাকসেনাদের এ ঘাঁটি তছনছ করতেই প্রাণ গেছে তিন শতাধিক ভারতীয় সেনার।
রায়গঞ্জ থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ তখন কোরমাইল ক্যাম্পেই অবস্থান করছেন। যেটা ছিল মুহাড়াপাড়া পাকবাহিনী ক্যাম্পের ঠিক ওপারে ভারতের ভেতর। যেহেতু তার বাড়ি মুহাড়াপাড়াতেই, তাই তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় শিমুল গাছের উপরে বসানো অবজারবেশন পোস্টে (ওপি)। যেখান থেকে দূরবীনে শত্রুর গতিবিধি দেখে তথ্য দেবেন তিনি। যার ভিত্তিতে ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনী মর্টারে ফায়ার দেবে। আজাদদের নেতৃত্ব দিতেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন অশোক খের।

নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর দিনে ওপিতে দায়িত্ব পালন করেন আজাদ। আর রাতে বিষাপাড়ার আব্দুল রাজ্জাকের মাধ্যমে পাকবাহিনীর অবস্থানের বিষয়ে খবর নেন। রাজ্জাক মুহাড়াপাড়া ক্যাম্পে পাকবাহিনীর বাংকার খোঁড়া, খাবার সরবরাহসহ অন্যান্য কাজ করতেন। সম্মুখযুদ্ধের পরিকল্পনার অংশ অনুযায়ী চর হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধারাই পাকিস্তানিদের ক্যাম্পে পাঠিয়েছিলেন।
হিলি বর্ডার। এখানেও ছিল পাক সেনাদের কয়েকটি বড় বড় বাংকার।
পাকবাহিনীর নজরদারি বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আজাদের সঙ্গে রাজ্জাকের প্রতিরাতে দেখা করা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সাতদিন পর একরাতে রাজ্জাক খবর দেন পাকবাহিনী তাদের ক্যাম্পকে অধিক শক্তিশালী করে দুর্গ বানিয়ে ফেলেছে। ক্যাম্পের চারপাশে মাইল জুড়ে বসানো হয়েছে অ্যান্টি পারসোনাল মাইন ও অ্যান্টি ট্যাংক মাইন। এছাড়া বাড়ানো হয় বাংকার ও ট্রেঞ্চের সংখ্যাও।

এ খবর পেয়ে দ্রুত তা ভারতীয় আর্মিকে জানান আজাদ। কিন্তু তারা সেটা আমলে না নিয়ে সম্মুখযুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। ২১ নভেম্বর ব্যাপকভাবে আর্টিলারি বাহিনী মর্টারে ফায়ার দেয়। কিন্তু তাতেও রিইনফোর্সড কংক্রিটের বাংকারের কোনো ক্ষতি হয় না। অবশেষে ২২ নভেম্বর তারা মুক্তিবাহিনীকে ছাড়াই চলে আসে বাংলাহিলি বাজারের উত্তরে। ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত দিন-রাত মুহাড়াপাড়ায় তুমুল গোলাগুলি চলে। কয়েক হাজার ভারতীয় সেনা এসেও মুহাড়াপাড়া ক্যাম্প দখল করতে ব্যর্থ হয়। তাদের সাড়ে তিনশ সেনা গুলি, মর্টার শেল ও মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন। এছাড়া আহত হন প্রায় দেড় হাজারের মত সেনা।

এদিকে হিলিতে দুর্গ গড়ে তুলে দিনাজপুরের ভেতরে ভাদুরিয়া, নবাবগঞ্জ, ছাতনী আর ঘোড়াঘাটে পাকবাহিনী চালাতে থাকে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।

সমর কৌশল অনুযায়ী, ১১ জনের ডিফেন্স ভাঙ্গতে ৩৩ জন আর ৩৩ জনের ডিফেন্স ভাঙ্গতে ৯৯ জন সেনা নিয়োজিত করতে হয়। কিন্তু পাকবাহিনীর মেজর আকরাম ও মেজর পিটারের নেতৃত্বে থাকা দুটি মাত্র কোম্পানিকে হটাতে দুই হাজার সৈন্যও পেরে ওঠে না। যা সমর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এতে টনক নড়ে যায় ভারতীয় আর্মির। তবে ভেতরে ভেতরে তারা মুক্তিবাহিনীকেও সন্দেহ করতে থাকে যে, এদের ভেতরেই নিশ্চয় বিশ্বাসঘাতক রয়েছে। তাই রাতারাতি রায়গঞ্জ ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন একটি দলকে এখানে আনা হয়। আর কোরমাইল ক্যাম্পে যারা ছিলেন, তাদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ। ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর অবজারবেশন পোস্টে (ওপি) কাজ করতেন।
পরবর্তী সময়ে তারা বুঝতে পারে আক্রমণের কৌশলগত ভুল ছিল। যেহেতু খবর ছিল পাক আর্মি কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছে, তাই উচিত ছিল চারপাশ থেকে আক্রমণ করার। পরে সেভাবেই চলতে থাকে আক্রমণ। এক সময় পাকি দুর্গের চারপাশ থেকে আক্রমণ করতে করতে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়।

মিত্রবাহিনী নভেম্বরের শেষের দিকে মুহাড়াপাড়া-বাসুদেবপুর ক্যাম্পের সঙ্গে পাকবাহিনীর অন্য ক্যাম্পের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে রেশন, রসদ ও গোলা-বারুদের সঙ্কটে পড়ে পাকিস্তানিরা। এরই মধ্যে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে। ৫ ডিসেম্বর হিলি বন্দর দিয়ে ঢুকতে থাকে ভারতীয় ট্যাংক বহর। ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত তুমুল আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ চলে। তবে ভারতীদের তীব্র বিমান হামলার মুখে পাকিস্তানিরা শেষ পর্যন্ত আর টিকতে পারেনি। অবশেষে ৯ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর জীবিত কিছু সদস্য প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুহাড়াপাড়া-বাসুদেবপুর ক্যাম্প মিত্রবাহিনী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রংপুরের দিকে এগোতে থাকে।
হিলিতেও যুদ্ধের আগে থেকেই সাধারণ বাঙালিদের সঙ্গে বিহারীদের ব্যাপক বিরোধ ছিল। বিহারী আর ইপিআর এর পাকিস্তানি সদস্যরা  মিলে নানা ধরনের অত্যাচার-নির্যাতন চালাতো তাদের ওপর। যে কারণে এ অঞ্চলের বেশিভাগই সক্ষম বাঙালিই যুদ্ধে যোগদান করেন। এক্ষেত্রে ২৫ মার্চের পরপর সীমান্ত পেরিয়ে তারা পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জের তরঙ্গপুর গ্রামে ট্রেনিং করেন। তবে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য অনেকেই জলপাইগুড়ির মুজিব ক্যাম্প, মেঘালয়ের তেলডালা ও রংনাবার্গেও প্রশিক্ষণ নেন।
মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম মন্ডল
মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর ছিল দুটো ভাগ। একটি এফএফ বা গণবাহিনী বা অনিয়মিত বাহিনী; যেখানে ছিল বাঙালি ছাত্র-জনতা-কৃষক-শিক্ষক। আরেকটি ছিল এমএফ বা নিয়মিত বাহিনী; যেখানে বিভিন্ন ফোর্সের সদস্যরা অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।

এই মুক্তিবাহিনীর বাইরেও বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) এর হয়ে অনেকে যুদ্ধ করেছেন। এই বাহিনীটি গড়ে উঠেছিল ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ও সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে।

যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে, এই ধারণা থেকে তা চালিয়ে নিতেই এই বাহিনী গড়ে তোলা হয়। প্রথমদিকে এতে প্রশিক্ষণ নেন একেবাবে শিক্ষিত, মেধাবী তরুণরা। এদের ট্রেনিং দেওয়া হতো ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে। প্রশিক্ষণ নিয়ে এই বাহিনী স্বতন্ত্রভাবে (মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সঙ্গে সমন্বিত নয়) দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করতেন। ট্রেনিং নিয়ে এসে তারা আবার দেশের ভেতরেই অন্যদের ট্রেনিং দিতেন। এদের প্রক্রিয়াটি ছিল, দেরাদুন থেকে একজন ট্রেনিং নিয়ে এসে ৫ জনকে ট্রেনিং দিতেন। সেই ৫জন আবার ২৫ জনকে ট্রেনিং দিতেন। এভাবেই খুব অল্প সময়েই বিএলএফ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই বাহিনী মুজিববাহিনী নামেও পরিচিত।
মুক্তিযোদ্ধা লিয়াকত আলী
এছাড়া মিত্রবাহিনীও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। যা ভারতের আর্মি ও প্যারামিলিশিয়া এবং বিএসএফ (ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী) এর সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।

অন্যদিকে জেড (জিয়াউর রহমান) ফোর্স, কে (খালেদ মোশারফ) ফোর্স, আর এস (শফিউল্লাহ) ফোর্স নামের তিনটি বিশেষ ব্রিগেড গঠন করা হয়। এদের অধীনে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা যুদ্ধ করেন।

যারা বর্ণনা দিয়েছেন:
হাকিমপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার মো. লিয়াকত আলী, মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম মণ্ডল, মো. আবুল কালাম আজাদ ও বিএলএফ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামান মণ্ডল।


সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন:
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২০১৬
ইইউডি/জেএম

ক্যাচ মিসেই জিম্বাবুয়ের হার
আক্ষেপ করে মাহাথির বললেন, পদত্যাগ করে ফেলতে পারি
চালকের ভুলে পাম্পে আগুন!
কৃত্রিম চাঁদ বানাবে চীন!  
মায়ের কোল থেকে শিশু কেড়ে নিলো পিকআপ
কবি জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণ
ছেলেকে সেঞ্চুরি উৎসর্গ করলেন ইমরুল
বান্দরবানে বাস-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে নিহত ২
দর্শক সাড়ায় উচ্ছ্বসিত বাপ্পি
বাংলাদেশ দলকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন