বিক্ষিপ্ত ঘটনায় পালিত বিএনপির হরতাল

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

দেশব্যাপী বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে সোমবার পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, ককটেল বিস্ফোরণ আর জলকামান দাগার ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে।

ঢাকা:  দেশব্যাপী বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতালে সোমবার পুলিশের সঙ্গে হরতাল সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ, গ্রেপ্তার, ককটেল বিস্ফোরণ আর জলকামান দাগার ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে।

টেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও নগরীর টার্মিনালগুলো থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছাড়েনি। টাউন সার্ভিসের সংখ্যাও ছিলো কম। সাধারণ মানুষকেও ঘর ছেড়ে তেমন একটা বের হতে দেখা যায়নি। আইনজীবীর অভাবে সকালেই মূলতবি হয়ে যায় সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ। হরতাল সমর্থকরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গণে। হরতালের সুযোগে ধোয়া-মোছার কাজ চালানো হয় সোনারগাঁওয়ের মতো অভিজাত হোটেলে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এমএ কাইউমের নেতৃত্বে গঠিত মনিটরিং টিম হরতাল পর্যবেক্ষণ করে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে বসে।

বিএনপির পক্ষ থেকে এ হরতালকে জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সফল বলে দাবি করে রাজপথে সরকারের হরতাল বিরোধী মহড়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে নিরপরাধ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছে তারা।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। আর যাদের আটক করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে  ইট-পাটকেল নিক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে পুলিশ।  

তবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র ডাকা হরতাল রেলের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। শহরতলী ও আন্তঃনগর গন্তব্যের ট্রেনগুলো পূর্ব নির্ধারিত সময়েই ঢাকা থেকে ছেড়ে গেছে। এছাড়া রাজধানীর বাইরে থেকে আসা ট্রেনগুলোও নির্ধারিত সময়ে ঢাকায় ঢুকছে। তবে যাত্রীর সংখ্যা অন্যান্য দিনের তুলনায় ছিলো কম।

কমলাপুর রেলস্টেশনের তথ্যানুসন্ধান কেন্দ্রের ইন-চার্জ মোঃ ফয়েজ বাংলানিউজকে জানান, রেল চলাচলে কোনো বিঘœ নেই। প্রতিটি গাড়ি পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলাচল  করেছে। যাত্রীসংখ্যা কিছুটা কম, তবে তা অস্বাভাবিক নয়।

সোমবার সকালে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো হলো- তুরাগ এক্সপ্রেস, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার, ধুমকেতু এক্সপ্রেস, পারাবত, সুন্দরবন প্রভাতি, কর্ণফুলী, মহানগর প্রভাতি, এগার সিন্ধুর ও উপকুল এক্সপ্রেস। ঢাকায় আসা ট্রেন হচ্ছে উপবন, ধুমকেতু, তুর্ণা এক্সপ্রেস, অগ্নিবীনা, সুন্দরবন।

এছাড়া কমলাপুর প্লাটফর্মে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও ট্রেন চলাচল ও টিকিট বিক্রি নিত্যদিনের মতো চলছে। ঢাকা-নারায়নগঞ্জ রুটের ট্রেন বান্না এক্সপ্রেস পূর্ব নির্ধারিত ১১টা ২০ মিনিটে ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে দেখা গেল। টিকেট কাউন্টার থেকে জানা গেল, সকালে থেকে কোনো ট্রেনই সময়সূচি থেকে বিচ্যূত হয়নি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বাভাবিক ছিলো বিমান চলাচলও।


গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে সাভার-পাটুরিয়া-সাটুরিয়া রোডে দু-একটি বাস চলাচল করলেও বরিশাল, ফরিদপুর, মেহেরপুর, যশোরসহ উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি।

যাত্রীর উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তবে কিছু সংখ্যক যাত্রীকে দূরপাল্লার বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য সকাল থেকেই র‌্যাব-৪ এর দু’টি টহল দল এবং পুলিশ ছিলো।

এদিকে সকাল সাড়ে দশটার দিকে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. সালামের নেতৃত্বে একটি হরতাল বিরোধী মিছিল বের করা হয়।

এদিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশেল লাঠিচার্জে ২০/২৫ জন নেতা-কর্মী আহত হন। এদের মধ্যে ১৮ জনকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া কয়েক দফায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১১ জনকে।

দুপুর ১২টা নাগাদ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ।

অবরোধ দশা থেকে বেরিয়ে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, রেহেনা আকতার রানু, নিলোফার চৌধুরী মনি, শাম্মী আকতার, হারুন অর রশীদ ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুককসহ অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী রাস্তায় এসে অবস্থান নেন।  

এদিকে সকাল ৬টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এর আগে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বের হতেই দেয়নি পুলিশ। কার্যালয়ের প্রবেশপথে দফায় দফায় ধাক্কাধাক্কি হয় হরতাল সমর্থক ও পুলিশের মধ্যে। কিছুক্ষণ পরপরই মিছিল-পিকেটিঙের জন্য রাস্তায় বের হওয়ার চেষ্টা করে অবরুদ্ধ নেতা-কর্মীরা। প্রতিবারই ধাওয়া দিয়ে তাদের ভেতরে পাঠায় পুলিশ।

দফায় দফায় ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে পুলিশ সংরক্ষিত আসনের সাংসদ শাম্মী আক্তারকে লাঞ্ছিত করে বলে অভিযোগ তোলে বিএনপি।

তবে বিএনপির এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে পুলিশের পক্ষে গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘মহিলা এমপিকে লাঞ্ছিত করার প্রশ্নই আসে না। এখানে সাংবাদিকরা সকাল থেকেই অবস্থান করছেন। তারা সবই দেখছেন।’
 
মনিরুজ্জামান আরো বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য আছে বিএনপি নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুর ও  অগ্নিসংযোগ করতে পারে। এজন্য আমরা তাদের রাস্তায় নামতে দিচ্ছি না।’

বস্তুত সোমবার ভোর থেকেই রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয় ঘিরে রাখে কয়েকশ’ পুলিশ। অবরুদ্ধ নেতা-কর্মীরা সরকার বিরোধী নানা স্লোগান দেন কার্যালয়ের ভেতর থেকেই।

সকাল সাড়ে ৬টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে হরতালের সমর্থনে মিছিল করে বিএনপি। এতে অংশ নেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ছাড়াও শতাধিক নেতাকর্মী। কিছুক্ষণ পর মিছিলটি আবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ফিরে যায়। এরপর বিএনপি নেতা-কর্মীদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আর বের হতে দেয়নি পুলিশ।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ, রিজভী আহমেদ, হাবিবুন-নবী খান সোহেলের নেতৃত্বে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে আরও একটি মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া দেয়। ধাওয়া খেয়ে নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ের ভেতর ঢুকে পড়ে।

সকাল পৌনে ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে পিকেটিংয়ের সময় সাংসদ শাম্মী আক্তারকে আটকের চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু নেতা-কর্মীরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। এসময় মৃদু লাঠিচার্জে ২/৩ জন সামান্য আহত হয়।  
 
সকাল ১১টার দিকে মহিলা দল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কিতে  ২/৩ জন নারী কর্মী রাস্তায় পড়ে যায়। এ সময় ইডেন কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক নিশিতাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে মহিলা পুলিশ।

সকাল সাড়ে ১১টায় বিএনপির ৫ সাংসদ আসিফা আশরাফি পাপিয়া, নিলোফার চৌধুরী মনি, রেহেনা আকতার রানু, শাম্মি আকতার ও হারুন অর রশীদের নেতৃত্বে ৫০ জনের একটি দল পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে। তারা হরতালের পক্ষে শ্লোগান দিয়ে বিজয় নগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ মিছিলের ওপর হামলা চালায়। বেধড়ক লাঠিপেটা করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দুই কর্মীকে মারতে মারতে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেয় পুলিশ।

দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় অবরুদ্ধ নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করতে থাকে।

এ পরিস্তিতিতে সকাল ১১টার দিকে পল্টন থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে মোতায়েন করা হয়।

এ সময় মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকেন স্থায়ী কমিটি সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, অর্থ সম্পাদক আবদুস সালাম, সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি, আসাদুল করিম শাহীন, সংরক্ষিত আসনের এমপি শাম্মী আকতার, নিলোফার চৌধুরী মনি, রেহানা আকতার রানু, আসিফা আশরাফি পাপিয়া, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সাবেক এমপি বিলকিস জাহান শিরিন, যুবদলের জাহাঙ্গীর আলম, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রফিক সিকদার, বেলাল মাহমুদ, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রহমান গনি, কৃষক দলের শাহজাহান স¤্রাট, ছাত্রদলের ইডেন কলেজের আহবায়ক সেলিনা সুলতানা নিশিতা প্রমুখ।

দুপুরে কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে নারী সাংসদদের নেতৃত্বে রাস্তায় অবস্থান নেয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। এক পর্যায়ে পুলিশ ধাওয়া দিলে কিছু কর্মী পাশের গলিতে পালিয়ে যায়। কিছু ঢুকে পড়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এ পর্যায়ে পুলিশ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে লাঠিচার্জ করে। আর রাস্তায় অবস্থান নেওয়া নারী সাংসদদের ওপর জলকামান দাগা হয়।

পুলিশের লাঠিচার্জে প্রায় ২০/২৫ জন কর্মী আহত হয়। এদের মধ্যে মিজান, মাহবুবুল ইসলাম, সোহেল, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদ খান, কামাল, খোকন, শরিফ, হারুণ মোল্লা, বিল্লাল হোসেন, আনিসুর রহমান, ইসমাইল হোসেন  প্রমুখের নাম জানা গেছে।

আহত ১৮ জনকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এছাড়া কয়েক দফায়  ১১ কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- কামাল উদ্দিন আহমেদ, সাইফুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর, রফিক, উত্তম, শফিক, বাবুল হোসেন, সাগর, অধ্যাপক আব্দুস সালাম, অধ্যাপক আমিনুল ও ডা. কামাল উদ্দিন।

এদিকে সকাল ১০টায় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে শাহজাহানপুর এলাকায় মিছিল করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এসময় নেতাকমীরা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। সেখান থেকে দুজন কর্মীকে আটক করা হয়।

মহাখালী ওয়ারলেস গেট মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এ সময় দুই ছাত্রসহ নয়জনকে আটক করা হয়। আহত হন সাবেক সাংসদ কামরুন নাহার পুতুল।

আটককৃতরা হলেন-ফরিদ, সুমন, মো. সেলিম, মো. খায়ের, সঞ্জু, দীন ইসলাম, আক্তার প্রমুখ। এদের মধ্যে সঞ্জু নিজেকে রিকশাচালক, দীন ইসলাম  স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আক্তার  চাকুরীজীবী বলে দাবি করেন।

এছাড়াও স্থানীয় বাসিন্দা কলেজ ছাত্র শোভন ও মুন্নার পরিবার জানিয়েছে, হরতালের সময় পুলিশের লাঠিচার্জ শুরু হলে তারা বাসার নিচে নেমে ঘটনা দেখতে যায়। এ সময় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।

সোমবার হরতালের সমর্থনে সকাল থেকেই বিএনপি’র সিনিয়র নেতা ওসমান ফারুক, আলতাফ হোসেন চৌধুরি, সেলিনা রহমান এবং জেবা রহমান দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে এ এলাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন।

বেলা পৌনে বারোটায় পুলিশ ধাওয়া করে তাদের ওয়ারলেস গেট সংলগ্ন বিভিন্ন গলির মধ্যে ঢুকিয়ে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অভিযোগে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কোন নিরীহ লোককে পুলিশ গ্রেফতার করছেনা জানিয়ে গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যাপারে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামালউদ্দিন বলেন, ‘যারা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেছে তাদেরকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

এদিকে আইনজীবীরা না থাকায় আপিল বিভাগ মুলতবি হয়ে যায় সকালেই। হরতালের সমর্থনে বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বেলা ১১টায় সুপ্রীমকোর্টের ১ নম্বর গেটের ভেতরে অবস্থান নেন। সেখানে তারা হরতালের সমথর্নে বক্তব্য রাখেন। এতে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সাবেক ডেপুটি এটর্নি জেনারেল গোলাম মো. চৌধুরী আলাল, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
 
দুপুরের দিকে একটি মিছিল সুপ্রীমকোর্ট প্রদণি করে। পরে ফোরামের সদস্যরা সুপ্রীমকোর্টের সামনে অবস্থান নিয়ে আরো বক্তব্য রাখেন।

বাংলানিউজের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোর্শেদ আলম জানান, দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণীর (নর্থসাউথ রোড) সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে তানজিল পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় হরতাল সমর্থকরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা যাত্রী সেজে বাসটি থামিয়ে ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে দেয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।

দণি শাহজাহানপুর এলাকার একটি বাড়ির ছাদ থেকে হরতাল চলাকালে দুটো ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কেউ আহত হননি।

ককটেল দুটোর মধ্যে একটি বিস্ফোরিত হয়। অন্যটি বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই উদ্ধার করে র‌্যাব সদস্যরা। পরে সেটি পানিতে রেখে নিষ্ক্রিয় করা হয়।

ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা স্বীকার করেন র‌্যাব-৩ এর কমান্ডিং অফিসার রফিকুল ইসলাম। এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ককটেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছি। আরেকটি বিস্ফোরিত হওয়ার আওয়াজ শুনেছি। প্রথমে মনে করেছিলাম গাড়ীর টায়ার ফুটেছে। পরে ধোঁয়া দেখে দৌড়ে যাই।’

কারা ছুঁড়ল এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঠিক বলতে পারছি না। তবে যারা ছুঁড়েছে তারা খুবই দক্ষ। কোন অঘটন ঘটানোর জন্য কৌশলে কাজটি করে দ্রুত পালিয়ে যায়।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ন’টার দিকে দণি শাহজাহানপুর এলাকার একটি বাড়ির ছাদ থেকে সন্ত্রাসীরা রাস্তায় ককটেল দুটি নিক্ষেপ করে। এ সময় বাড়ীর কিছু দূরেই র‌্যাব-৩ এর সদস্যরা কর্তব্যপালনের জন্য জড়ো হয়ে অবস্থান করছিলেন। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এলাকার লোকজনের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। র‌্যাব সদস্যরা বাড়ীটির সামনে একঘণ্টা অবস্থান নিয়ে পরে চলে যান।

হরতালের সুযোগে আসন্ন বিশ্বকাপের জন্য সৌন্দর্য বর্ধনের পরিকল্পনার আওতায় ধোয়া-মোছা চলেছে হোটেল সোনারগাঁওয়ে। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ধুয়ে মুছে সাফ করে ফেলেছে হোটেলের সামনের রাস্তা আর ফুটপাত। পালিশ করে চকচকে করে তুলেছে ডিভাইডারের স্টিলের তৈরি বেড়া।

নতুন রঙ করে বসানো হয়েছে দিক নির্দেশক।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এটা তাদের রুটিন ধোয়া মোছা অভিযান। প্রতি সপ্তায়ই এগুলো ধোয়ামোছার কাজ করা হয়, তবে তা রাতের বেলা। কারণ দিনের বেলা এ কাজগুলো করার তেমন সুযোগ থাকে না। হরতাল সে সুযোগ করে দিয়েছে।

বেলা ১২টার পর থেকে ধানমণ্ডি এলাকার ফুটপাতে দোকান-পাট বসতে শুরু করে। খুলতে শুরু করে  বেশ কয়েকটি মার্কেটও।

সকাল থেকে নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড়ে পুলিশের সঙ্গেই হরতালের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের একটি বড় সমাবেশ। যা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফিরে যায় ক্যাম্পাসে। এ এলাকায় সকাল থেকেই হরতালের সমর্থনে কোনো মিছিল বা পিকেটিংয়ের ঘটনা ঘটেনি।
তবে হরতালের বিরুদ্ধে বেলা ১০টার দিকে মহানগর ছাত্রলীগ (উত্তর) এক মিছিল স্লোগান দিতে দিতে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দিকে চলে যায়। তাদের সঙ্গে স্লোগানে যোগ দিলেও নীলক্ষেত মোড়েই অবস্থান নেয় সকাল থেকে অবস্থান নেওয়া অন্য একটি দল।

ঢাকা কলেজের গেটে সকাল থেকেই হরতালের বিপক্ষে পুলিশের সঙ্গে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের ঢাকা কলেজ শাখা। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে তারা একে একে ক্যাম্পাসে ফিরতে শুরু করে। অভিযোগ উঠেছে, এদেরই এক মোটরসাইকেল বহর আচমকা হামলা চালিয়েছে ধানমণ্ডি ১ নম্বর সড়কে অবস্থিত সাবেক মৎস ও বিমান প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির ঢাকা জেলা সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আব্দুল মান্নানের ২৩/এ বাড়িতে।

তবে ছাত্রলীগ দাবি করেছে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে মান্নান নিজের বাড়িতে হামলার নাটক সাজিয়েছেন।

এ ঘটনা সম্পর্কে ধানমণ্ডি থানার ওসি শাহ্ আলম বাংলানিউজকে বলেন, ‘আচমকা কয়েকটি মোটরসাইকেলে অজ্ঞাতপরিচয় সন্ত্রাসীরা মান্নান সাহেবের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় দায়িত্বরত পুলিশ হামলাকারীদের ধাওয়া করলে তারা পলিয়ে যায়।’

পুলিশ এ সময় আব্দুল মান্নানের বাড়ি থেকে ধানমণ্ডি থানা শ্রমিকদলের সভাপতি বাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক শাহিনকে আটক করে।

ওসি শাহ্ আলম বলেন, ‘মান্নান সাহেব তার বাড়ি থেকে মিছিল বের করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।’

এ সময় আব্দুল মান্নানের বাসায় অবস্থান করছিলেন তার মেয়ে ব্যারিস্টার মেহেনাজ মান্নান এবং জামাতা ও বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম ও সাংসদ আবুল খায়ের ভুঁইয়া।

আব্দুল মান্নান বাংলানিউজকে বলেন, ‘প্রথমে পুলিশ এসে আমার বাসা থেকে আমার দুই স্থানীয় নেতাকে আটক করে নিয়ে যায়।’

এরপরই আচমকা ২০/৩০টা মোটরসাইকেলে করে আনুমানিক ৫০/৬০ জন ছাত্রলীগকর্মী সমানে ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে।

এ ঘটনায় আব্দুল মান্নান এবং তার স্ত্রী ও এক নাতি ও নাতনি আহত হন।

প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা হামলার পর ঢাকা কলেজের দিকে চলে গেলেও পুলিশ তাদের আটক করেনি।

এছাড়া হরতালের সময় বিভিন্ন কোম্পানির যাত্রিবাহী বাস ও রিকশা চলাচল করতে দেখা গেছে। তবে সংখ্যায় ছিল কম। কিন্তু বেলা ১২টার পর যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

সকালে রাজধানীর মহাখালী আন্ত:জেলা বাস টার্মিনাল থেকে দূর পাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।

বেলা সাড়ে ১১টায় টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, পরিবহন শ্রমিকরা টার্মিনাল স্পেসে নিজ নিজ কোম্পানির পরিবহন ধোয়া-মোছার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। টিকেট কউন্টারগুলো বন্ধ। কাউন্টার ম্যানেজার ও টিকেট মাস্টাররা আসেননি টার্মিনালে।

ঢাকা ময়মনসিংহ রুটের শামিম এন্টারপ্রাইজের লাইন সুভারভাইজার শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, তাদের এসি হিনো চেয়ার কোচ শামিম এন্টারপ্রাইজ রোববার বিকেল থেকেই বন্ধ রাখা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘৫ হাজার টাকা কামাই করার জন্য ৫০ লাখ টাকার বাস রাস্তায় নামিয়ে ঝুঁকি নিতে চাই না।’

তবে পরিস্থিতি ভালো হলে বিকেল ৫টার পর শামিম এন্টারপ্রাইজের বাসগুলো দূরপাল্লার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে বলে তিনি জানান।

তবে ঢাকা থেকে দূরপাল্লার উদ্দেশ্য ছেড়ে না গেলেও রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট ছোট ও মাঝারি মাপের বাস চলতে দেখা গেছে। বেলা ১১টার দিকে ফার্মগেট এলাকায় অন্যদিনের মতোই যানজট চোখে পড়েছে। ট্রাফিক পুলিশকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে এ সময়।

এছাড়া কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, নাবিস্কো, তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়, মগবাজার, মালিবাগ, কাকরাইল এলাকাতেও বাস, সিএনজি, অটোরিকশা ভিড় দেখা  গেছে।  

শুধু দেখা যায়নি হরতাল সমর্থকদের কোনো পিকেটিং। বেলা ১২টা পর্যন্ত এসব এলাকায় হরতাল বিরোধীদেরও দেখা মেলেনি।

ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কিছুদিন আগে হরতালের মধ্যেও স্বাভাবিক সংখ্যক বাস চালানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও  সোমবারের হরতালে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম দেখা গেছে।

এর কারণ হিসেবে অবশ্য পরিবহন খাতের নেতারা দাবি করেছেন, অধিকাংশই রং করানোর কাজে বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া বাকি গাড়িগুলো রাস্তায় চলাচল করছে।

ঢাকা পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, অন্যদিনের তুলনায় আজ (সোমবার) গাড়ি একটু কম চলছে, তবে রাস্তার যাত্রীর তুলনায় তা যথেষ্ট।

খন্দকার এনায়েতের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সোমবার ঢাকায় তিন সহস্রাধিক লোকাল বাস চলছে। সেই সঙ্গে ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, মাওয়া-শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়েছে।

এদিকে গাজীপুরে র‌্যাব ও পুলিশের ব্যাপক টহল ও প্রহরার মাঝে রিক্সা, টেম্পুসহ কিছু ছোট যানবাহন চললেও দূর পাল্লার কোনও যানবাহন রাস্তায় দেখা যায়নি।

কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

জেলা শহরে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা পিকেটিং করতে গেলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বাধার মুখে নেতা-কর্মীরা বিএনপি জেলা কার্যালয়ে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সেখানে ঘিরে রেখেছে বলে জানান বিএনপি নেতা ডা. মাজহারুল আলম।

তবে জয়দেবপুর থানা ওসি কামরুজ্জামান জেলা বিএনপি কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের অবরোধ করে রাখার কথা অস্বীকার করেন।

 এদিকে বিরোধী দলের ডাকা হরতাল চলাকালে সাভারে হরতালের বিপে বিােভ মিছিল করে আওয়ামী লীগ। যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডেও অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ জং মুরাদের নেতৃত্বে মিছিল করেন মহাজোটের নেতাকর্মীরা।

মিছিলটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদণি শেষে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের রানা প্লাজার সামনে গিয়ে শেষ হয়।

হরতাল প্রতিহত করতে মহাজোটের নেতাকর্মীদের মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় সমাবেশে।

এতে বক্তব্য রাখেন সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী হায়দার, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল গনি, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম প্রমূখ।

বাংলাদেশ সময়: ১৮০১ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১১

Nagad
ছোটপর্দায় আজকের খেলা
করোনা সম্পর্কিত নতুন রোগ বাংলাদেশেও
বরিশাল বিভাগে করোনা শনাক্ত ৩৯৪৪ জনের, মৃত্যু ৮২
শিরোপার সুবাস পাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ
করোনায় বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালকের মৃত্যু


করোনা: চট্টগ্রামে নতুন আক্রান্ত ১৯২ জন
সংকটে প্রকাশনা শিল্প, করোনায় ক্ষতি ৪শ’ কোটি
লালমনিরহাটে চাষ হচ্ছে ড্রাগন ফল
এরশাদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের ইন্তেকাল
দেবে গেছে ২০০% বাড়তি ব্যয়ে নির্মিত রেলপথের কুশন ব্যালাস্ট