ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে জেগে উঠুক মানুষ

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

যে কোনো মানুষের মৃত্যুই তার আপনজনের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি করে। স্বজন কাঁদে, সজ্জনরা কাঁদে। ক্ষতি হয় একটি পরিবারের কিংবা সমাজের। কিন্তু মৃত্যুশোক কাটিয়ে ওঠে সবাই। কারণ জীবন থেমে থাকে না।

যে কোনো মানুষের মৃত্যুই তার আপনজনের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি করে। স্বজন কাঁদে, সজ্জনরা কাঁদে। ক্ষতি হয় একটি পরিবারের কিংবা সমাজের। কিন্তু মৃত্যুশোক কাটিয়ে ওঠে সবাই। কারণ জীবন থেমে থাকে না।

গণমানুষের নেতা আব্দুর রাজ্জাক সমাহিত হয়েছেন। তার এ মৃত্যুতে কেঁদেছেন তার পত্নী, দু’সন্তান, ঘনিষ্ঠ স্বজন আর হাজারো রাজনৈতিক সতীর্থ কিংবা সামাজিক বান্ধব। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের মতো আমজনতাকে দেখিয়েছে অন্য কিছু। তার মৃত্যু-পরবর্তী আমরা দেখেছি রাজনীতির ভোল পাল্টানো। কিভাবে পাল্টে গেছে সব। নিমিষে মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা, চকিতে লন্ডন হাইকমিশনের পাশে থাকার চিত্র, লন্ডন আওয়ামী লীগারদের ক্যামেরায় আসার হুড়োহুড়ি। কি আশ্চর্য আমাদের পাল্টে যাওয়া!

এমনিতে কিন্তু পাল্টে যায় না একটি দল কিংবা একটি দলের গোটা কাঠামো। তখনই বদলে যায় কিংবা বদলাতে হয়, যখন দেখা যায় মানুষ পাল্টে যাচ্ছে অর্থাৎ আমজনতার ধারণায় একটা ধাক্কা খাচ্ছে। তখন তারা হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে একটি দলের কিংবা একজন নেতা কিংবা নেত্রীর অপেক্ষা করতে হয়েছে আব্দুর রাজ্জাকের মৃত্যু পর্যন্ত। এ দলটির কুপমুণ্ডকতার এ বার্তাটি অবশ্য সবার জানা। অতএব সাধু সাবধান ! দল করতে হলে বটগাছের ছায়া লাগবে, অন্তত দলটির নেতার-কর্মীদের তা ঠিকই উপলব্ধিতে আছে। তা শুধু একটিমাত্র দলেই নয়। বিরোধী দলেও ক্ষমতা পেতে এক এগারোর পর থেকে লন্ডন তোয়াফ কিংবা হিযরত করতে হয় বিরোধী দলের নেতাদের, সরকারি দলেও লন্ডন তোয়াফের ব্যাপার আছে। তাইতো ম‍ুমূর্ষ রাজ্জাকের শয্যাপাশে সাংগঠনিক ছায়া পড়েনি তার লন্ডনি সংগঠনের। এই প্রবাসী বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা খুব ভালোই চিনি। কিভাবে এরা কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করে নেতার ইচ্ছায়। কিন্তু রাজ্জাক নেতা হয়েও লন্ডনি নেতাদের নাগাল পাননি মৃত্যুর আগে। অথচ তিনি দলছুটও নন, নন অবাঞ্চিত কোনো সংগঠক।

একটানা আটবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য তিনি। লন্ডনে বসে যারা কলকাঠি নাড়ে, তাদের মানুষ জানে এবং অভিবাসী বাংলাদেশি রাজনীতি সচেতন মানুষও চেনে। আমেরিকায় বসে যারা ডিজিটাল স্বপ্ন দেখান তাদেরও চেনে সবাই।

 বাংলাদেশের প্রধান দলটির একজন নির্বাসিত নেতা ছিলেন জনাব রাজ্জাক। ওই দলটির আগাগোড়াই একজন বড় নেতা ছিলেন তিনি। ছাত্রাবস্থা থেকে শুরু করে আমৃত্যু তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী-অটল। কিন্তু এক-এগারো তার জীবনে একটা ধাক্কা দেয়। চেনামুখ কিছু আওয়ামী লীগারের মতো, এমনকি বিএনপির কিছু নেতা-সমর্থকের মতো রাজ্জাকসহ কিছু পরিবর্তনকামী মানুষ ছিটকে পড়েন। হারিয়ে যান গোটা দেশের, এমনকি তার দলের নীতি-নির্ধারনী প্যানেল থেকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংস্কার চাওয়া ছিলো নেতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারার শামিল। তাইতো রাজনীতির মোটামোটি খোঁজ-খবর নেওয়া মানুষগুলোও জানে কিভাবে ছিটকে পড়তে হয়েছে রাজ্জাক কিংবা সতীর্থদের। কিভাবে ছিটকে পড়তে হয়েছিলো মান্নান ভূঁইয়াদের। অথচ সংস্কারতো একটা প্রক্রিয়া। শুধু নেতা কিংবা নেত্রীর বদল নয়, প্রচলিত রাজনীতিকে অন্তত একটু ঘষা-মাজা করে দল এবং দেশকে ক্রমশ বদলে দেয়াইতো সংস্কারের মধ্যে পড়ে।

এক-এগারোর পর হারিয়ে যাওয়া কিছু নেতা সম্পর্কে অনেকের মতো আমিও জানি। স্বনামধন্য ছাত্রনেতা ছিলেন অনেকেই। সংস্কার চাওয়ার অপরাধে এরা সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীও হতে পারেননি। সাংগঠনিক পদ পর্যন্ত হারিয়েছেন। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর থেকে শুরু করে আখতারুজ্জামান, মাহমুদুর রহমান মান্নাদের কে-না চেনে। কিন্তু এরপরও রনিরা নমিনেশন পায়। অথচ এরাই টকশো কিংবা সভায়-সমাবেশে নেতা কিংবা পার্টির বারোটা বাজায়। কিন্তু তারপরও এরাই নমিনেশন বাগিয়ে নেয়। সারাজীবন জান-পাত করা মানুষগুলো মূল্যায়ন হারায়। সাবেক মন্ত্রী রাজ্জাক মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। পার্টি ওদের সম্মান দেওয়ার জন্যে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে। আমরা অস্বীকার করি না, রাজ্জাক সে রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেনও। আমরা দেখেছি হাজার হাজার (কোন কোন পত্রিকা লিখেছে লাখো) মানুষের ঢল নেমেছে ঢাকায় তার জানাজায়। তার এলাকাতেও পেয়েছেন তিনি জননেতার সম্মান। আমি আওয়ামী রাজনীতির মানুষ না, তবুও কিছু কিছু মানুষকে এখনও বিশ্বাস করি মনে-প্রাণে এরা যেন জনগণ নিয়ে ভাবেন। তারা ভাবেন, তাদের পরিবারও এই রাজনীতির ধ্যান-জ্ঞান করে, ভাবে সুস্থ রাজনীতি নিয়ে। সেজন্যেই একটা কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। সাধুবাদ জানাতে চাই আব্দুর রাজ্জাকের পরিবারকে। তার ছেলে লন্ডনেও বলেছেন, তারা তাদের নেত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ, সরকারের সহযোগিতাকে  শ্রদ্ধার সাথে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে তার পরিবার। অথচ গণমাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে অবহেলার কথা উচ্চারিত হয়েছে বার বার, দিবালোকের মতো সব সত্যই বেরিয়ে এসেছে। তবুও একমাত্র আব্দুর রাজ্জাকের মতো নিবেদিত প্রাণ বঙ্গবন্ধু সৈনিকেরই পুত্রের সেই উচ্চারণ তার পিতার মতো। দলের প্রতি আনুগত্য এ যেন তাদের পারিবারিক ট্র্যডিশন। এ বিশ্বাস আর অবিচল আস্থার কথাটি কি আমলে নেবে সরকার কিংবা আওয়ামী লীগের কঠিন মনের মানুষগুলো। একজন দলীয় লোক তার দল কিংবা নেতাকে সমীহ করবে, এ কথাটা যেমন রাজনীতির এক প্রধান কথা, ঠিক তেমনি দল আর দেশের প্রয়োজনে কিছু সত্য বলার অধিকারও তাদের রাখতে হয়। পৃথিবীর দেশে দেশে দলের মাঝে বাক-বিতন্ডার শেষ নেই। দলের নেতা-কর্মীর নিজস্ব মত-পথই দলীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করে। ধরেই নিতে পারি আমরা ব্রিটেনের দলীয় নেতা নির্বাচনের ব্যাপারটা। গ্রুপ আলোচনা-সমালোচনা-মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারণা সবকিছু সাথে নিয়েই একসময় দলীয় কর্মীরাই তাদের নেতা নির্বাচন করে এবং এই নেতারাই দেশ আর জাতির হয়ে সংস্কার সাধনে হাত দেয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশে নেতার আনুগত্যের বাইরে গেলে শূন্যেই ঘুরপাক খেতে হয়। হাঁটতে হয় উদ্দেশ্যহীন।

তবুও জনাব রাজ্জাকের মৃত্যু যেন একটা তীক্ষ্ম আশার রশ্মি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে দিয়ে গেলো। কিছু নেতার লোকদেখানো কান্নার পাশাপাশি আমরা দেখেছি-জেনেছি অসংখ্য মানুষ কেঁদেছে তার নেতার মৃত্যুতে। এই কান্নায় আকুতি আছে, এই কান্নায় ক্ষোভ আছে, এই হাহাকারে মানুষের সহমর্মিতা আছে। এই কান্না আর লাখো মানুষের জানাজায় উপস্থিতি জানিয়ে দিয়ে গেলো বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বাংলাদেশে ছড়ানো এখনও অনেক নেতা আছেন, যাদের জন্যে মানুষ কাঁদে-কাঁদবে। নরসিংদীর মেয়র লোকমানের জন্যে ২০ মাইল লম্বা মানববন্ধন হয়েছে। দলের প্রতি নয়, এটাতো নেতার প্রতিই মানুষের এক নির্মোহ ভালোবাসা। আমরা বিশ্বাস করতে চাই দলগুলো তা থেকে শিক্ষা নেবে।

গত তিন বছরে কিছু মন্ত্রী ছাড়া অসংখ্য এমপিকে নিয়ে আছে জনগণের ক্ষোভ। দু‘একজন মন্ত্রীতো (উদাহরণ আমাদের সৈয়দ আবুল) বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে দুর্নীতির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নিজের নেতাকে হত্যার অভিযোগ কিংবা দায় নিয়ে কোনো মন্ত্রী (টেলিমন্ত্রী) আছেন জনগণের অভিযোগের কাঠগড়ায়। এই যখন অবস্থা, খুব স্বাভাবিকভাবেই সরকারের মন্ত্রী-এমপি নিয়ে প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক নয়। তাইতো আমরা এখন বিশ্বাস করতে পারি ওবায়দুল কাদের আর সুরঞ্জিত সেনদের পথ ধরে সংস্কারবাদীদের ঠিকই আসতে হবে। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকতে হবে, হয়তো আরও একবার। কারণ জনগণ বিচার চায় যুদ্ধাপরাধীদের। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন দেখতে চায় এই বাংলাদেশে। আমরা দেখতে চাই স্বাধীনতা বিরোধী-ফ্যাসিস্ট মৌলবাদী গোষ্ঠীর রাজনীতি থেকে নির্বাসন। হয়ত এগুলোর শতভাগ না পারলেও কিছুটা হলেও করতে পারে আজকের ক্ষমতাশীন দল। সে জন্যেই পরীবর্তনকামী মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। শুধু মৃত্যুর মিছিলে নয়, জননেতাদের সাথে লাখো জনতার মিছিলে সেই সম্ভাবনাটাই যেন জানান দিলো আব্দুর রাজ্জাকের শবযাত্রায়। তার শেষযাত্রার লাখো মানুষ দেখে সাহসী হোক জনগণ, ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে জেগে উঠুক তারুণ্য।

লেখক যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক ও কলাম লেখক

ই-মেইল: [email protected]

বাংলাদেশ সময়: ১০৫৭ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৭, ২০১১

Nagad
নালিতাবাড়ী-ঝিনাইগাতীতে ২৫ গ্রাম প্লাবিত
বিপিও উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান পলকের
বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিমালা সংস্কারের পরামর্শ
ভুয়া চিকিৎসকসহ ৩ জনকে কারাদণ্ড, হাসপাতাল সিলগালা
পশ্চিমবঙ্গে একদিনে করোনা আক্রান্ত ১,৫৬০ জন


নভোএয়ারে ভ্রমণ করলে ফ্রি কাপল টিকিট
‘টাউট’ শহীদুলের আইন পেশা, আছে মানবাধিকার সংগঠন!
সব বিভাগে ভারী বর্ষণের শঙ্কা, বন্যার অবনতি
অর্ধেক দামে মিলবে কৃষি যন্ত্রপাতি, একনেকে প্রকল্প
খুলনায় নতুন করোনা রোগী শনাক্ত ৭৩, মোট ৩১০৮