বহুদলীয় গণতন্ত্রঃ পুনঃপ্রবর্তনের মুখ ও মুখোশ

আহমেদ শরীফ শুভ | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: প্রতীকী

বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক হচ্ছে। সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য এই বিতর্ককে নতুনভাবে উস্কে দিয়েছে। প্রত্যাশিত ভাবেই রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অধিকাংশই নিজেদের দলীয় ও আদর্শগত অবস্থান থেকেই তাদের মতামত দিচ্ছেন। তবে ইতিহাসকে সম্যক অনুধাবনের তাগিদেই এই বিতর্কটির গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের ক্ষমতা দখল ও তার পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের পর বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের কৃতিত্ব জিয়াউর রহমানকে তার সমর্থকসহ অনেকেই দিয়ে থাকেন। সাদা চোখে দেখলে তা অনেকাংশেই সঠিক মনে হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা ছিল কি? মূলতঃ তার নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই সেই সময়ে বহুদলীয় রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প ছিল না।

বহুদলীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তকমা ব্যতীত জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তার নিজের রাজনৈতিক দল গঠন করা ছাড়া তিনি রাজনীতিতে আসতেন কীভাবে আর কীভাবেইবা‍ একটি রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট গঠন করতেন? রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় এই দু’টি অত্যাবশ্যকীয় পূর্বশর্ত পালন করতে হলে বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে কি? এর পেছনে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য যতনা ছিল, নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়া আর পাকাপোক্ত করার চেষ্টা তার চেয়ে বেশী বৈ কম ছিল না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে না গেলে তো তিনি তার রাজনৈতিক দলের গোড়াপত্তনই করতে পারতেন না।

জিয়ার সমর্থকরা বলে থাকেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল এবং তার অনিবার্য ধারাবাহিকতায়ই তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ঘটনাটি সর্বাংশে সত্যি হলে তো জিয়াকে রাজনৈতিক দল গঠনে ও নেতৃত্বে বসানোর জন্য ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তি ও তাদের প্রতিনিধি রাজাকার শাহ আজিজ, মওলানা মান্নান, আবদুল আলীম আর সাকা চৌধুরীদের উপর নির্ভর করতে হতো না। এই সব স্বাধীনতা বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের জন্যও বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার বিকল্প ছিল না।

কেবল মুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতৃস্থানীয় রাজাকারকেই পুনর্বাসন নয়, তিনি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অবদমিত করতে পাকিস্তানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, উন্মেষ ঘটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু সরকার দেশে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছেন। আর তা করেছেন বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের নামে। কেবল বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়াই উদ্দেশ্য হলে তিনি ধর্মভিত্তিক মৌলবাদি রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞাটি অব্যাহত রাখতেন। বাকশাল পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে গেলেই বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতো। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুমতি দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করাও তার বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ বলেও অনেকে মনে করেন। বহুদলীয় রাজনীতিতে ফিরে না গেলে সে সময়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বৈধতা পাওয়ার কোন অবকাশ ছিল না।

বাকশাল গঠন করে বঙ্গবন্ধু দেশে বহুদলীয় রাজনীতি স্থগিত করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত যথাযথ ও সময়োপযোগী ছিল কিনা তা ভিন্ন বিতর্কের বিষয়। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত তার পক্ষে বিপক্ষে বিতর্কের শেষ নেই। সে সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়াও ন্যাপ এবং সিপিবি বাকশালে একীভূত হয়েছিল। তা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য অনেক ব্যক্তি, সংগঠন ও গোষ্ঠীও বাকশালে একাত্ম হয়ে এর সদস্য পদ নিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান নিজেও ছিলেন তাদের অন্যতম। তার সমর্থকরা বলে থাকেন, জিয়া চাপের মুখে বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন। যদি তা সত্যি হয় তবে তা কাপুরষতা কিংবা নৈতিক অসততার প্রকাশ বা উভয়ের সমন্বয় মাত্র। যদি বাকশালে যোগ দেয়া নিয়ে তার উপর চাপই থাকতো, আর তিনি তার সাথে একমত প্রকাশ না করতেন তবে তিনি তো তার চিন্তার প্রতি সৎ থেকে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে পারতেন।

সরকারের সাথে নীতিগত কারণে দ্বিমত পোষণ করে এর আগে কর্নেল তাহের পদত্যাগ করেছিলেন, আনুগত্যের মুখোশ পরেন নি। বঙ্গবন্ধু তো তাকে চাপ দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে থাকতে বাধ্য করেন নি! এমনকি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনও বাকশাল গঠনের প্রতিবাদে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তার তো জীবন বিপন্ন হয়নি। বঙ্গবন্ধু তো তাকে চাপ প্রয়োগ করেন নি। জিয়াউর রহমান যদি পদত্যাগ না করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপের মুখে বাকশালে যোগ দিয়ে থাকেন তবে তা তার কাপুরুষতারই বহিঃপ্রকাশ। আর যদি নিজে বাকশালের আদর্শে বিশ্বাস না করেও স্বেচ্ছায়ই তাতে যোগ দিয়ে থাকেন তবে তা তার নৈতিক অসততা ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রথমেই বলেছি, সাদা চোখে তাকালে মনে হবে, জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে গেলে একথা স্পষ্ট হবে যে, তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পরাস্ত করতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিকাশে তার প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার সোপান হিসেবেই তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেছিলেন।

বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল মুখোশ, তার আড়ালে ছিল ক্ষমতা লিপ্সা ও সাম্প্রদায়িকতার মুখ।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। অনেকেই বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বহুদলীয় রাজনীতিকে এক করে ফেলেন। দু’টি কিন্তু পুরোপুরি সমার্থক নয়। বহুদলীয় রাজনীতিতেও গণতন্ত্রহীনতা থাকতে পারে, স্বৈরশাসন থাকতে পারে। জিয়া এবং এরশাদের স্বৈরশাসন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তখন তো বহুদলীয় রাজনীতি ছিল, কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র ছিল কি? সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থানের হুমকির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের বাইরেও অনেকেই বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সবাইও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, বহুদলীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকাশমান? সেই অর্থে জিয়াউর রহমান উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেছেন বলা গেলেও বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছেন এ কথা বলা যাবে না।

বাংলাদেশ সময়:  ১৯৩০ ঘণ্টা, নভেম্বর ৯, ২০১৭
জেডএম/

আস্থা রাখুন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ফখরুল
মীর মশাররফ-হুমায়ূন আহমেদের জন্ম
ট্যাক্স কার্ড ও সম্মাননা পেলো ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ
ব্যাটিংয়ের আগেই স্কোর বোর্ডে যোগ হলো ১০ রান!
ফারসি সাহিত্য সমাদৃত তার সৌন্দর্য এবং মানবতায়
চট্টগ্রামে দ্বিতীয় দিনে কমিশনের ফরম নিলেন ২৪ প্রার্থী
নবান্ন উৎসব কমিটির সভাপতি কামরুন মালেক
বরিশালে স্টিমারের ধাক্কায় বালুবাহী বাল্কহেড ডুবি
রাজৈরে বিএনপির ৭ নেতার আওয়ামী লীগে যোগদান
প্রাণ রায়ের কুকুর খেতে গিয়ে ধরা ২ চীনা নাগরিক