সিঙ্গাপুরের চিঠি: কেমন আছে সিঙ্গাপুরের আদিবাসীরা?

রোকেয়া লিটা | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সিঙ্গাপুর

walton

সিঙ্গাপুরে আমি প্রায় এক বছর ধরে বাস করছি। প্রতিবেশী হিসেবে পেয়েছি চাইনিজ, মালয় এবং ইন্ডিয়ানদের। সবাই প্রায় এক সাথেই বাস করছি আমরা। দেখছি, একই ব্লকে বা একই কনডোমিনিয়ামে মিলেমিশে বসবাস করছে চাইনিজ, মালয়, ইন্ডিয়ানরা। কখনও কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখিনি। তাদের ভাষা ও ধর্ম আলাদা আলাদা হলেও মর্যাদার দিক দিয়ে একজনকে আরেকজনের চেয়ে আলাদা মনে হয়নি । সবসময় মনে হয়েছে,  সবাই এরা সিঙ্গাপোরিয়ান, একটাই জাতি।

php glass

সিঙ্গাপুরের আইন-কানুন, জীবন ব্যবস্থা নিয়ে তো বেশ কিছুদিন ধরেই লিখছি। এদের প্রায় সব কিছুই অনুসরণীয়। আমার বর  ধ্রুবতো আমার চেয়েও বেশি সময় ধরে সিঙ্গাপুরে বাস করছে। ওর অভিজ্ঞতা আমার চেয়েও বেশি। কদিন আগে ধ্রুবকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, সিঙ্গাপুরে কোনো আদিবাসী (ইনডিজেনাস) নেই?” সে উত্তরে বলল, “নেই বোধ হয়”। আমি খুব কৌতুহল অনুভব করলাম। সঙ্গে সঙ্গে গুগল করে দেখলাম, সিঙ্গাপুরে আদৌ কোনো আদিবাসী আছে কি না!

গুগল করে আমি যে ফলাফলটি পেলাম, সেটি ছিল আমার জন্য রীতিমত বিস্ময়কর। নাম না জানা বা অচেনা কোনো নৃগোষ্ঠী নয়। মালয়রাই সিঙ্গাপুরের আদিবাসী। তারা কয়েক হাজার বছর ধরে এখানে বসবাস করছে।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন, মালয়রা সিঙ্গাপুরে আদিবাসী জেনে কেন আমি এতোটা অবাক হলাম। আমি অবাক হলাম, কারণ বাংলাদেশেও কিছু নৃগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দেয়, তাদের দাবি দাওয়ার কথা বলে। বাংলাদেশে এদের দাবি-দাওয়া দেখে মনে হয়েছে, আদিবাসী হওয়া মানে তাদের একটা নিজস্ব অঞ্চল থাকবে, তাদেরকে স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে, তাদের এলাকায় যারা আদিবাসী নয়, তাদেরকে সরকার বাস করার সুযোগ দিতে পারবে না, তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা থাকবে যা দেশের সাধারণ আইন-কানুনের চেয়ে আলাদা ইত্যাদি ইত্যাদি।

বস্তুতপক্ষে, সিঙ্গাপোরিয়ান মালয়দের মধ্যে এই ধরনের কোনো দাবি-দাওয়া আছে বলে আমি শুনিনি। তারা অন্যান্য সিঙ্গাপোরিয়ানদের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে। সিঙ্গাপুরের সব নাগরিকের জন্য দেশের যে আইনকানুন, মালয়রাও তাই অনুসরণ করছে। বরং, সিঙ্গাপুরের গৃহায়ণ এবং উন্নয়ন বোর্ড ১৯৮৯ সালে জাতিগত সংমিশ্রণ পলিসি চালু করেছিল যাতে,সিঙ্গাপোরিয়দের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্লাটগুলোতে কোনো জাতিই এককভাবে কোনো গন্ডি তৈরি করতে না পারে। চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, মালয় সবাই মিলে পাশাপাশি বসবাস করবে। আর তা নিশ্চিত করার জন্য সংখ্যালঘুদের জন্য কোটা রাখা হয়। অর্থাৎ সিঙ্গাপুরে চাইনিজরা সংখ্যায় বেশি বলে, কোনো একটা এলাকায় শুধু চাইনিজরাই থাকবে তা হবে না, সেখানে যেন মালয়রা অথবা ইন্ডিয়ানরাও থাকতে পারে, তাই তাদের জন্য কোটা রয়েছে।

এতে করে কোনো,সম্প্রদায়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বা অসন্তষ্ট হয়নি। বরং ২০১৩ সালে  সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজ এবং ওয়ানপিপল.এসজি নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় উঠে আসে যে, অংশগ্রহণকারী ২০০০ এর বেশি চাইনিজ সিঙ্গাপোরিয়ানের মধ্যে ৯০ ভাগই বলেছে তারা ইন্ডিয়ান এবং মালয়দেরকে প্রতিবেশী বা সহকর্মী হিসেবে পেয়ে স্বাচ্ছন্দে রয়েছে। অংশগ্রহণকারী চাইনিজদের ৮৫ ভাগই মালয় বা ইন্ডিয়ানদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
সিঙ্গাপোরিয়ানদের প্রায় ৭৫ ভাগই চাইনিজ। মালয়রা প্রায় ১৪ ভাগ। এভাবে চাইনিজদের সাথে সহাবস্থানের ফলে, মালয়দের যে কোনো ক্ষতি হয়েছে তা কিন্তু নয়। বরং,সিঙ্গাপুরে মালয়দের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। তারা সিঙ্গাপুরের আদিবাসী। এদেশের সরকার সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর। রাজনৈতিক দলগুলোতেও তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য আইন রয়েছে।

এছাড়া অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আধুনিক জীবনযাপনেও এগিয়ে রয়েছে মালয়রা। প্রায় ৯০ ভাগ মালয়ের সিঙ্গাপুরে বসবাসের জন্য নিজের বাসা রয়েছে। মালয়দের মধ্যে যেমন শিক্ষিতের হার বেড়েছে, তেমনি তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার, এক্সিকিউটিভ, টেকনিশিয়ান সব ধরনের কাজই করছে।
এবার ফিরে তাকাই বাংলাদেশের দিকে। আমি সিঙ্গাপোরিয়ানদের আদর্শ ভাবি, কিন্তু বাংলাদেশে যারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করে, তারা এই আদর্শের উল্টো দিকে হাঁটছে। তারা স্বায়ত্তশাসন চায়, তারা একেবারে নিজেদের একটা গন্ডি চায়, যেখানে অন্য কোনো সম্প্রদায় গিয়ে বসবাস করতে পারবে না। এমন সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে দেশে সম্প্রীতি গড়ে তোলা কী আদৌ সম্ভব?

যতই দিন যাচ্ছে, পাহাড়ের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। দুদিন পরপর পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধ দেখা দিচ্ছে। আজ  এক বাঙালিকে হত্যা করা হলে,কাল আরেক পাহাড়ি খুন হচ্ছে। আজ  বাঙালিদের ফসল কেটে নিয়ে গেলে,পাহাড়িদের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এইভাবে আর কতদিন?

এসব দেখে প্রায়ই মনে হয়, বাংলাদেশেও একটা জাতিগত সংমিশ্রণ পলিসি থাকা জরুরি। বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সিঙ্গাপুরকে মডেল হিসেবে দেখতে পারে। ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীগুলোর গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে থাকায় সাম্প্রদায়িক সংঘাত আরও বেশি বাড়ছে। এরা নিজেরা নিজেরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে থাকায় খুব সহজেই যেমন আন্দোলন বা সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য সংঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি এদের ওপর হামলা করাও সহজ। হামলাকারীরা জানে ওই গ্রামে সবাই হিন্দু বা সবাই বৌদ্ধ বা সবাই পাহাড়ি, কাজেই হামলাকারীরা তখন ঢালাওভাবে পুরো গ্রামে আগুন লাগিয়ে দিয়ে সহজেই জ্বালিয়ে দিতে পারছে। যদি পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে যেসব নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা অন্য নৃগোষ্ঠীগুলোর চেয়ে অনেক বেশি, তাদেরকে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়, তবে সাম্প্রদায়িক সংঘাত কমতে বাধ্য। এতে করে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও অক্ষুন্ন থাকবে।

একসময় পাহাড়িদের আন্দোলন ঠেকানোর জন্য সরকার পাহাড়ে ভূমিহীন বাঙালিদের নিয়ে গিয়ে পুনর্বাসন করেছিল। অভিযোগ আছে, তাতে অনেক পাহাড়ি গৃহহীন হয়েছিল। সেইসব পাহাড়িদের দেশের অন্যন্য অঞ্চলে পুনর্বাসিত করা হোক, যেন বাঙালিদের সাথে তারা সহাবস্থান করতে পারে। এতদিন, যারা পাহাড়ে বসবাসরত অভিবাসী বাঙালিদের ঘৃণার চোখে দেখেছে, তারাও বুঝতে পারবে নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি জায়গায় গিয়ে বসবাস করা কতটা কঠিন। কতটা বাধ্য হয়ে বাঙালিরা পাহাড়ে গিয়ে বসবাস করা শুরু করেছিল তা বোঝা সহজ হবে তাহলে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানে পাহাড়িরা চাকরি করছে, তাদেরকে পাহাড় ব্যাতীত দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বদলি করা যেতে পারে যেন বাঙালিদের সাথে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তারা। বাঙালিরাও তাতে দেশের সর্বত্র অন্যান্য নৃগোষ্ঠীগুলোর অস্তিত্ব টের পেতে শুরু করবে এবং তাদের মূল্যায়ন করবে। তেমনি সাঁওতাল, হিন্দুসহ অন্যান্য ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে কোনঠাসা হয়ে আছে, তারও উপকৃত হবে। ফলে, কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠরা চাইলেই কারো ওপর হামলা করার সাহস পাবে না।

অনেকেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, ভারত বা আমেরিকার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। কিন্তু বাংলাদেশ তো ওইসব দেশের মতো আয়তনে এত বড় নয় যে, পুরো একটা অঞ্চল কেবল তাদের অধীনে দিয়ে দেয়া সহজ হবে। তারচে বড় কথা, যতই দিন যাচ্ছে গ্লোবাল সিটিজেনশিপের ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশে দেশে মানবাধিকার কর্মীরা সীমানা বিহীন একটি বিশ্বের স্বপ্ন দেখছে। সেখানে একটি দেশের ভেতরেই আরেকটি অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন কতটা যৌক্তিক?

তবে,দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিদেরও অনেক বেশি সহানুভূতিশীল হতে হবে। সিঙ্গাপুরে প্রতি বছর আনুষ্ঠানিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দিবস পালন করা হয়। সরকারি স্কুলে স্কুলে এই দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে যার যার সংস্কৃতি তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা। অর্থাৎ একজন শিশুর মাথায় খুব অল্প বয়সেই অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি সম্প্রীতি লালন করা হয়, যা বাংলাদেশের জন্য ভীষণ জরুরি।

রোকেয়া লিটা: লেখক, সাংবাদিক: rokeya.lita@gmail.com

বাংলাদেশ সময়: ০৬০৫ ঘণ্টা, জুন ৯, ২০১৭
জেডএম/

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: সিঙ্গাপুর
কেজি স্কুলেই সব কিছু শিখে যায় চীনা শিশুরা!
শ্রীলঙ্কায় মৃতের সংখ্যা কমে ২৫৩
প্রিয় নুসরাত | মুহম্মদ জাফর ইকবাল
৩ নেতাকে শো’কজ-অব্যাহতি, বগুড়া বিএনপি অফিসে তালা
কলকাতার শেষ চার কঠিন করে দিলো রাজস্থান


চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়
মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন মাত্রার প্রতিবেদন চান হাইকোর্ট
সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব সংসদে নাকচ
শুক্রবার বাংলাদেশে আসছে পাকিস্তানের যুবারা
নিষেধাজ্ঞা না মেনে ইলিশ ধরায় ১৩ জেলের কারাদণ্ড