php glass

মিরসরাই ট্রাজেডি এবং আমাদের দায়

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

‘কথা কও না বাপ! কথা কও; আর ঘুমাইয়া থাকিও না।‘ বুকের মানিককে হারিয়ে মা মূর্ছা গেছেন, বাবার বুক চাপড়ানোর আর্তনাদ, ভাই-বোনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে মিরসরাইর আকাশ-বাতাস।

‘কথা কও না বাপ! কথা কও; আর ঘুমাইয়া থাকিও না।‘ বুকের মানিককে হারিয়ে মা মূর্ছা গেছেন, বাবার বুক চাপড়ানোর আর্তনাদ, ভাই-বোনের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে মিরসরাইর আকাশ-বাতাস। সকালে যে সন্তান হাসিমুখে বাড়ি থেকে খেলা দেখতে বের হয়েছে বুকভরা আনন্দ নিয়ে, সেই বুক দুপুরে ফিরে এলো রক্তের বন্যা বয়ে।

অনেক আশা-ভরসা করে ছোট সন্তান সাইফুলকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন বাবা-মা। আশা ছিল অন্তত তাদের মৃত্যুর পরে জানাজা ওই সন্তানটি পড়াবে। আজ সেই সাইফুল নিজেই লাশ হয়ে বাড়ি ফিরলো। তাদের জানাজা কে পড়াবে? উঠানের মাঝখানে সাদা কাপড়ের কাফন জড়িয়ে যেন ঘুমিয়ে আছে সাইফুল (১৫)। সন্তানের মুখ দেখলে সব কষ্ট ভুলে যান মা। মায়ের সামনে সন্তানের লাশ পাহাড়ের চেয়ে ভারি। পাশে বাবা কামরুল আহাজারি করে চলেছেন, ‘কথা কও না বাপ... কথা কও না বাপ, ও বা...প’। বোন আইরিন সুলতানা বুঝতে পারেনি ছোট ভাইয়ের বিদায় যে শেষ বিদায় হবে। ওরা আর ফিরে আসবে না, ওরা আর বন্ধুদের সাথে খেলা করবে না। বাবা শাসন করে তাড়ালে সন্তান আর মায়ের আঁচলে লুকাবে না।

একরাশ আনন্দ বুকে নিয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার আবু তোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আবু তোরাব উচ্চবিদ্যালয় ও আবু তোরাব কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মিরসরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে গিয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ফজিলাতুন্নেসা মুজিব স্মৃতি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলা উপভোগ করতে। খেলা শেষে ফিরছিলও একরাশ আনন্দ নিয়ে। কিন্তু ওরা জানত না এ ফেরাই তাদের শেষ ফেরা; এই আনন্দই জীবনের শেষ ছুটির ঘণ্টা। এ আনন্দ যে তাদের মৃত্যুর ঘণ্টা বাজিয়ে দিবে তা কেউই বুঝতে পারেনি।

১১ জুলাই সোমবার  দুপুরে স্মরণকালের এই ভয়াবহ হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে উপজেলার আবু তোরাব-বড়তাকিয়া সড়কের পশ্চিম সৈদালী এলাকায়। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের বহনকারী মিনি ট্রাকটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মৃত্যু হয় অর্ধশতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীর। এ লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৫৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৪০ জনের মৃত্যু হয় ঘটনাস্থলেই। বাকিরা হাসপাতালে যাওয়ার পথে এবং হাসপাতালে গিয়ে মারা যায়। আহত হয়েছে আরো ৩০-৪০ জন, যাদের অনেকেই এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।

আমরা যা লিখি বা বলি তা মনে হয় কখনোই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কানে যায় না। যদি যেত তাহলে হয়তো এমন বুকফাটা কান্না, লাশের মিছিল এবং স¦জনদের আহাজারি আমাদের দেখতে হতো না। কিন্তু কে শোনে কার কান্না বা ব্যথা। আসলে যার স¦জন চলে যায় সে-ই কেবল হারানোর যন্ত্রণা যে কত কষ্টের বুঝতে পারে। সত্যি কথা বলতে আমরা যে স্তরেরই হই না কেন, দায়িত্বের কাছে কারোরই দায়বদ্ধতা নেই বলেই এত দুর্ঘটনা। আমাদের সব ক্ষেত্রে দায়িত্বে গাফিলতির ভাব থেকেই যাচ্ছে। সরকার আসে সরকার যায়, ওই রাজনীতিবিদের পরিবর্তন হলেও, পরিবর্তন হচ্ছে না আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স¦ভাবের।

এ লেখাটি যখন লিখছি তখন নিজেকে ওই শিশুদের মাঝে বিলিয়ে দিতে মনে চাচ্ছিল। যারা মারা গেছে তারা আমাদের কোনো আত্মীয় কিংবা পরিচিতজন নয়, কিন্তু এ দুর্ঘটনা কেবলই চোখে পানি নিয়ে আসছে। ট্রাক ড্রাইভার যদি তার নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতো তাহলে হয়তো এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতো না। জানা যায়, দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে দ্রুত গতিতে ট্রাকটি চালায় ড্রাইভার। ‘ওই ঘটনার সময় ট্রাক ড্রাইভার মফিজুল আলম মোবাইল ফোনে কথা বলছিল’ (সূত্র : দৈনিক ডেসটিনি,  ১২ জুলাই ২০১১)। ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পার্শ্ববর্তী খাদে পড়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে শত শত লোকের ঢল নামে। একসঙ্গে এত স্কুলছাত্রের লাশ দেখে সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলে নিহতদের বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদ আর গগনবিদারী আহাজারিতে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।  মিরসরাই থানা প্রাঙ্গণে এক স্কুলছাত্রের লাশ দেখে তার বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।

যাদের আত্মীয় মারা গেছে তারাই কেবল এ যন্ত্রণা বুঝতে পারবে। একের পর এক লাশ। একে একে ঘটনাস্থল থেকে ৪০টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মিরসরাইয়ের তিনটি ইউনিয়নে লাশ আর লাশ। চারদিকে কবর আর শ্মশানে মানুষের মিছিল। ওখানে কবর আর শ্মশান যেন একাকার হয়ে গেছে। একদিকে লাশ দাফনের জন্য কবর খোঁড়াখুঁড়ি, অন্যদিকে শ্মশানে লাশ দাহ করার প্রস্তুতি। এ যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। এতো মৃত্যুর ভার কীভাবে সইবেই মিরসরাইয়ের ৩ ইউনিয়নবাসী।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে বহু বছর ধরে আন্দোলন করে আসছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা-সংগঠন। কিন্ত সংশ্লিষ্ট মহল কিংবা সরকার আজও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সরকারের এখনই সময় নিরাপদ সড়ক তৈরিতে সার্ভে, ফিটনেসবিহীন সড়কযান ও অনভিজ্ঞ চালক দিয়ে গাড়ি চালনা বন্ধ এবং সঠিক নীতিমালা প্রণনয়ন করা।

আমরা এমন দুর্ঘটনা আর দেখতে চাই না। দেখতে চাই না পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া রাজিবের মতো অবুঝ শিশুর জীবন অকালে ঝরে যাক। চাই নিরাপদ সড়ক। চাই স¦চ্ছ একটি নীতিমালা। বাংলাদেশে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন একটি নিয়মতান্ত্রিক আইন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে জরিমানা শুধু নয়, ঘটনাস্থলেই বিচার বাস্তবায়ন হবে। এতে কিছুটা হলেও সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। বাস্তবসম্মত আইন প্রণয়ন, আইনের সঠিক বাস্তবায়ন এবং সচেতনতাই আনতে পারে মুক্তি।  

সরকারের পাশাপাশি আমাদেরও সচেতন হতে হবে, হতে হবে দায়িত্ববান মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ই-মেইল : [email protected]

বাংলাদেশ সময় ১৮৩৬ ঘণ্টা, জুলাই ১৩, ২০১১

ksrm
গ্রিনল্যান্ড কিনতে না পেরে ডেনমার্ক সফর বাতিল ট্রাম্পের
গাজীপু‌রে পিস্তল-গু‌লিসহ অস্ত্র ব্যবসায়ী আটক
কন্ডিশনিং ক্যাম্পে যোগ দিলেন নতুন দুই কোচ
পদ্মাসেতুর জটিলতা শুরুর এগারো পিলারের কাজ শেষ হতে ৮ মাস
মাঠে ফিরতে মরিয়া সাইফউদ্দিন


শরৎকালেই হাঁটুজল তিস্তায়!
ধীরে চলছে রাবি, শিগগির জাবির তফসিল
নির্বাচিত হওয়ার পাঁচ মাসে কী করেছে ডাকসু?
আটপাড়ায় প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ
কলমাকান্দা ৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা