php glass

বাংলাদেশি ম্যাগি নুডলস কীভাবে নিরাপদ হইল?

3477 | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton
ভারতীয় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিইসি) ২০০৩ সালে ১১টি কোকাকোলা ও পেপসি ব্র্যান্ড নিয়ে একটি গবেষণা করে দেখিয়েছে ওইসব পানীয়তে কীটনাশকের পরিমাণ অনেকগুণ বেশি।

ভারতীয় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিইসি) ২০০৩ সালে ১১টি কোকাকোলা ও পেপসি ব্র্যান্ড নিয়ে একটি গবেষণা করে দেখিয়েছে ওইসব পানীয়তে কীটনাশকের পরিমাণ অনেকগুণ বেশি। ২০০৬ সনে আবারো তারা ভারতের ১২টি রাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় কোকাকোলা ও পেপসিতে ৫ ধরনের কীটনাশকের উপস্থিতি পায়। ৪ আগস্ট ২০০৬ তারিখে ভারতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে তুমুল তর্ক শুরু হয়। প্রমাণিত হয় ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড (বিআইএস) এর নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় পেপসিকোলায় এর পরিমাণ ৩০ গুণ বেশি এবং কোকাকোলায় এর পরিমাণ বেশি২৫ গুণ। ভারতের অনেক রাজ্যে কোক-পেপসি নিষিদ্ধ হয়। কেবলমাত্র কোকোকোলা বা পেপসিকো নয়, নেসলের পিওরলাইফ, পেপসিকোর অ্যাকোয়াফিনা, পার্লের বিসলারি পানিতেও পাওয়া গেছে বিষ। নেসলের পিওরলাইফ নামের বোতলবন্দি পানিই শুধু নয়, সম্প্রতি বহুল বিক্রিত ‘ম্যাগি নুডলসে’ ভয়াবহ মাত্রার সিসা, লবণ ও ফ্যাট পাওয়াতে ভারতে নিষিদ্ধ হয়েছে এই নুডলস।

ভারতের উত্তরপ্রদেশের ফুড সেফটি অ্যান্ড ড্রাগ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ফএসডিএ) ২০১৫ সনের মার্চে নেসলের ম্যাগি নুডলসে উচ্চমাত্রার সিসা ও মনো-সোডিয়াম গ্লুটামেট (এমএসজি) পায়। পাশাপাশি সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিইসি)-এর গবেষণাতেও ম্যইগ নুডলসে উচ্চ মাত্রার লবণ ও ট্রান্স-ফ্যাট পাওয়া যায়। নুডলস, চিপস, বার্গার ও কোমল পানীয় মূলত: শহরের উঠতি প্রজন্ম যেসব খাবারে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে এমন খবারগুলি নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা করে সিইসি। গবেষণায় তারা নেসলের ম্যাগি নুডলস, টপ রামেন নুডলস, ম্যাকডোনাল্ডসের খাবার, কেএফসি’র ফ্রাইড চিকেন ও হলদিরামের আলুভূজিয়া এরকম ১৬টি বহুজাতিক খাদ্য কোম্পানি ও দোকানের বহুল বিক্রিত খাবারকে বেছে নেয়।

সিইসি’র গবেষণায় এসব জাংক ফুডের ভেতর ভয়াবহ মাত্রার লবণ, ট্রান্স-ফ্যাট ও চিনি পাওয়া গেছে। খাদ্যে উচ্চমাত্রার ট্রান্স-ফ্যাট, লবণ ও চিনির ব্যবহার আশংকাজনকহারে মুটিয়ে যাওয়া, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। সিইসি’র গবেষণায় ৮০ গ্রাম ওজনের ম্যাগি নুডলসের মধ্যে ৩.৫ গ্রাম লবণ দেখা গেছে, যা দৈনিক মোট লবনমাত্রার ৬০ ভাগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সুষম খাদ্য তালিকার ক্ষেত্রে এক ভাগ শক্তি ট্রান্স-ফ্যাট থেকে গৃহীত হয়। একজন পূর্ণবয়স্ক নারী দৈনিক ২.১ গ্রাম, পুরুষ ২.৬ গ্রাম ও ১০ থেকে ১২ বছরের শিশুরা ২.৩ গ্রাম ট্রান্স-ফ্যাট গ্রহণ করতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের খাবার ট্রান্স-ফ্যাট মুক্ত বলে মিথ্যা ঘোষণা দিলেও সিইসি গবেষণায় উচ্চমাত্রার ট্রান্স-ফ্যাট খুঁজে পেয়েছে। ২০১৫ সনের ২০ মে ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্য ম্যাগি নুডলস প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে অন্যান্য রাজ্যও এ ঘোষণা দেয় এবং ভারতে নিষিদ্ধ হয় ম্যাগি নুডলস। ম্যাগি নুডলসের উৎপাদক নেসলে কোম্পানিও ভারতে তাদের ৫ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য ধ্বংসের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়।

ভারতে ম্যাগি নুডলসে বিপদজনক উপাদান খুঁজে পেলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে নিশ্চুপ রয়েছে। সকল গণমাধ্যম এক্ষেত্রে সমানভাবে তর্কটিকে জনগণের সামনে হাজির করছে না। দীর্ঘ নিশ্চুপতার পর রহস্যময়ভাবে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই)’ বাংলাদেশের ম্যাগি নুডলসে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ও সিসা না পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিএসটিআই দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ম্যাগি নুডলসে ২ পিপিএম মাত্রার সীসা পেয়েছে, যা সহনীয় (সূত্র: একটি অনলাইন)। অপরদিকে বিএসটিআই সূত্র বলছে, সাধারণ নুডলসে সিসা পরীক্ষার প্যারামিটার থাকলেও ইনস্ট্যান্ট নুডলসের ক্ষেত্রে নেই (সূত্র: বণিক বার্তা, ১৬/৬/২০১৫)। প্রশ্ন হলো পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া কীভাবে বিএসটিআই ম্যাগি নুডলসকে নিরাপদ বলে আখ্যায়িত করছে? বিএসটিআই কি নেসলে কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত কোনো প্রতিষ্ঠান? এভাবে বারবার বিএসটিআই’র অবস্থা ও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোনো কোম্পানির পণ্যকে যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের কেলেংকারি নজির রয়েছে।

ম্যাগি নুডলস নিয়ে লাগাতার বিচারহীন মিথ্যাচার চলছে। ভারতে কোক-পেপসি নিষিদ্ধ হওয়ার সময়ে আমরা দেখেছি গণমাধ্যমে কোক-পেপসির পক্ষে সাফাই গাইতে জাঁদরেল তারকাদের ব্যবহার করেছিল কোম্পানিগুলো। ম্যাগি নুডলসও বাংলাদেশে তাই করছে। দৈনিক পত্রিকায় নেসলে ম্যাগি নুডলসের বিশাল বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। নেসলে তাদের বিজ্ঞাপনে জানাচ্ছে, বিএসটিআই তাদের নিয়মিত বাজার নজরদারির অংশ হিসেবে বাজার থেকে ম্যাগি নুডলস এর নমুনা সংগ্রহ করেছিল এবং ম্যাগি নুডলস খাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। ম্যাগি নুডলস যে খাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এ তথ্যটি কিন্তু নেসলের কাছে নেই, নেসলে এ তথ্যটি দেয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম-সূত্র ব্যবহার করেছে। নেসলের মতো এতো বিশাল এক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যার একটি পণ্য নিয়ে তর্ক উঠেছে, সেই পণ্যের মান যাচাইয়ের প্রতিবেদনটি তাদের কাছে নেই। নেসলে এবং বিএসটিআইয়ের উচিত আজকেই জনসমক্ষে ম্যাগি নুডলস মানযাচাই ও গবেষণাগারের সকল প্রতিবেদন জনসমক্ষে হাজির করা। কারণ একটি কোম্পানি খাদ্য নিয়ে এমন অন্যায় করে বিচারহীন থাকতে পারে না। ম্যাগি নুডলস নিয়ে তর্ক ওঠার পর রাজশাহী সদর ও গোদাগাড়ী, নওগাঁর মান্দা, চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, নেত্রকোনা সদর ও কলমাকান্দা, ময়মনসিংহ সদর এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি দ্রুত জরিপ চালাই। বিভিন্ন বয়সী ও পেশার ১৮৮ জন নারী পুরুষের সঙ্গে কথা বলি। ম্যাগি নুডলস একটি বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্য হওয়ায় এবং এটি তুলনামূলকভাবে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় অধিকাংশ অভিভাবক শঙ্কায় পড়ে এখন ম্যাগি নুডলস ব্যবহার করছেন না। উল্লিখিত এলাকাসমূহের দোকানে উপস্থিত থেকে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, ২০১৫ এর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কয়েক মাসে ম্যাগি নুডলস বিক্রির পরিমাণ অনেক কমেছে। পাশাপাশি ‘গুড ফুড, গুড লাইফ’ সাদা-নিলের নেসলের বিলবোর্ড ছড়িয়ে গেছে অনেক দোকানে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এলাকাগুলো থেকে নেসলে তার ম্যাগি নুডলসকে সরিয়ে তুলনামূলকভাবে মফস্বল শহর ও গ্রামের প্রান্তিক বাজারগুলোতে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করছে। সম্ভবত নেসলে টের পেয়েছে জাংকফুডগ্রাসী ‘ফিগার-সচেতন’শহরের ভোক্তা আর খুব একটা ম্যাগি নুডলস গিলবে না। তাই নেসলে প্রতিদিন তাদের বিক্রয় কৌশল পাল্টাতে বাধ্য হচ্ছে। তিনটির দামে চারটি নুডলস বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। নি:সন্দেহে ম্যাগী নুডলসের এই বিতর্ককে গায়েব করে নেসলে আবারো আরো কোনো নতুন খাদ্যপণ্য হাজির করবে। কিন্তু নেসলে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যে ম্যাগি নুডলস উৎপাদন করেছে তা বিক্রি করাই হয়তো এখন তাদের মূল নিশানা।

বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতায় ১৫৫টি পণ্যতালিকা আছে। এই তালিকায় ৬৪টি কৃষিজ ও খাদ্যপণ্য রয়েছে, নুডলস এই তালিকার ৫৯ নং পণ্য এবং এর স্ট্যান্ডার্ড নাম্বার-বিডিএস ১১০৬:২০১১। বাংলাদেশের দোকানগুলোতে ‘মশলা-ম্যাগি’ নুডলসটি বেশি দেখা যায়। প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে এটি নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেডের পণ্য এবং গাজীপুরের রাজন্দ্রপুরে নেসলের কারখানায় উৎপাদিত। বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০০ গ্রাম ম্যাগি নুডলসে রয়েছে ফ্যাট ১৬.৮ গ্রাম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ৬.৫ গ্রাম, সুগার ০.৮ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ৬২ গ্রাম, ফাইবার ৩.৫ গ্রাম, প্রোটিন ৯.৮ গ্রাম, সোডিয়াম ১২৪০ মিলিগ্রাম, আয়রন ৪.৫ মিগ্রা, ভিটামিন এ ৪১০ মাইক্রোগ্রাম, আয়োডিন ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক ৫ গ্রাম লবণ নির্দিষ্ট করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পাশাপাশি ভারতের জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠান লবণের দৈনিক মাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ গ্রাম। জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ২০১৪ সনে একটি গবেষণার দেখতে পায় বাংলাদেশের পূর্ণবয়স্ক মানুষ দৈনিক ১০.৩ গ্রাম লবণ গ্রহণ করে। আন্তজার্তিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র ২০১৪ সালে কক্সবাজারে একটি গবেষণায় দেখিয়েছে দৈনিক ৬.৯ গ্রাম লবণ গ্রহণ করে।

পাহাড় কী সমতল, বাঙালি কী আদিবাসী খাদ্যের নানা বৈচিত্র্য ও পুষ্টিমাত্রা আছে। কিন্তু তার মানে এই নয়, খাদ্যদ্রব্যে লাগাতার নানা বিষাক্ত উপাদান মিশাতে হবে। খাদ্যদ্রব্যে মাত্রার অধিক যেকোনো উপাদান মিশানোই হলো বিষক্রিয়া। বিরাজমান নৈতিকতা কি প্রাতিষ্ঠানিক আইন সকল অর্থেই এটি অন্যায়। কারণ খাদ্য মানুষের মৌলিক শর্ত ও অধিকার। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ অনুযায়ী খাদ্যে ভেজালের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা।

২০০৯ সনের ৬ এপ্রিল ২০০৯ সনের ২৬ নং আইন হিসেবে চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয় ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক আইন ২০০৯। আশা করি দ্রুত নেসলের ম্যাগি নুডলসসহ বাজারে বিক্রি হওয়া সকল নুডলসকেই রাষ্ট্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই ও পরীক্ষা করবে এবং জনস্বার্থে নুডলস সম্পর্কে জনমতে তৈরি হওয়া শংকা দূর করবে। আইনের লংঘন হলে নেসলেসহ সকল বহুজাতিক কোম্পানির দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে। ম্যাগি নুডলসের ক্ষেত্রে পরীক্ষা ও যাচাই ছাড়াই বিএসটিআই যদি কোনো ধরনের অন্যায় পন্থা অবলম্বন করে তবে তাকে এবং এরকম সকল এজেন্সিকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। ম্যাগি নুডলস নিয়ে সকল বহুজাতিক মিথ্যাচার ও জনশংকা দূর করে ন্যায়পরায়ণ দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহবান জানাই রাষ্ট্রকে। আজই, এখনি।

লেখক : গবেষক ও লেখক

বাংলাদেশ সময়: ১৮৩১ ঘণ্টা, জুন ১৭, ২০১৫

খাঁটি পোশাকের জন্য ১০০ নম্বরে! 
ক্রাইস্টচার্চে হতাহতদের পরিবারের ২০০ জনকে হজ করাবে সৌদি
জামালগঞ্জে বজ্রপাতে বাবা-ছেলের মৃত্যু
ক্রিকেট কোনো খেলা নয়
কেউ যাবে সাগরে, কেউ আনে মাছ


গণপরিবহনে নৈরাজ্য, চলছে সিটিংয়ের নামে প্রতারণা
ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
কুড়িগ্রামে চরম দুর্ভোগে পানিবন্দি সাড়ে ৭ লাখ মানুষ
আইসিসির হল অব ফেমে শচীন
সবুজে মিশে থাকে সুমিষ্ট ‘সোনা-কপালি হরবোলা’