লাইলাতুল কদর: অফুরন্ত প্রতিদান লাভের রজনী

মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমান আশরাফী, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

মসজিদ। ছবি: বাংলানিউজ

walton

দিন-রাত, মাস সবই আল্লাহর। তার পরও কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে। আরবি মাস সমূহের মধ্যে রমজান মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। এ মাসটি তিনটি মহান বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় এর সম্মান সর্বোচ্চ।

প্রথমত, এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করা। দ্বিতীয়, এ পবিত্র মাসে কুরআন মাজিদ নাজিল হওয়া। তৃতীয়ত, এ মাসের বিশেষ একটি রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রজনী হিসেবে ঘোষিত হওয়া।

এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ইসলামী জীবন বিধানের পরিপূর্ণতা আসে। রমজান বা সিয়াম, কুরআন ও লাইলাতুল কদর একই সূত্রে গাঁথা। নিম্নে ‘লাইলাতুল কদর’ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হলো-

‘লাইলাতুল কদরের’ অর্থ: ‘লাইল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাত, ‘কদর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিমাপ, পরিমাণ, নির্ধারণ ও ভাগ্য নিরূপণ। ‘কদর’ থেকেই ‘তাকদির’ শব্দ। অবশ্য কদর শব্দের অন্য অর্থ সম্মান, গৌরব, মর্যাদা ও মহিমা। সুতরাং ‘লাইলাতুল কদর’ মহিমান্বিত রজনী, সম্মানিত রাত্রি, ভাগ্য নিরূপণ, বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ রজনী অর্থে সাধারণত ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি একে (কুরআনকে) এক পবিত্র রাতে নাযিল করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী, এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। (দুখান: ৩-৫)

লাইলাতুল কদরের উৎপত্তি: ইবনে জারির (রহ.)  এর বর্ণনায় আছে, মহানবী (সা.) একবার ইসরাইল গোত্রের জনৈক ইবাদতকারী সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, তিনি একা ধারে এক হাজার মাস ধরে সমস্ত রাত্রি ইবাদতে মশগুল থাকতেন এবং সকাল হলেই জেহাদে বের হয়ে যেতেন। মুসলমানগণ একথা শুনে বিস্মিত হন। মহানবী (সা.) তাঁর উম্মাতের জন্য শুধু এক রাত্রির ইবাদতকেই সে ইবাদতকারীর এক হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করেছেন। (তাফসিরে মাজহারী)

কদরের রাত কোনটি: পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনায় রয়েছে ‘লাইলাতুল কদর’ রমজান মাসেই। তবে কবে? এ নিয়ে আলেমদের একাধিক মতামত পরিলক্ষিত হয়। (ক) তাফসীরে মাজহারির বর্ণনা মতে, এ রাত রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের মধ্যে আসে। কিন্তু এরও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। সহী হাদিসের দৃষ্টিতে এই ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে ‘লাইলাতুল কদর’ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদরকে’ রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো। (বুখারী শরিফ) আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের রমজানের শেষ ১০ অধিক পরিমাণে ইবাদত করার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই মূলত ‘লাইলাতুল কদরকে’ প্রচ্ছন্ন রেখেছেন। তারপরও অধিক সম্ভাব্য রাত হিসেবে ২৭তম রাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। (খ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) গণিত সূত্র দিয়ে এর অধিক সম্ভাব্যতা প্রমাণ করেছেন। যেমন- সূরা কদর-এ ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি তিনবার উল্লেখ আছে। আরবি বর্ণমালা অনুযায়ী ‘লাইলাতুল কদর’ লিখতে ৯টি অক্ষরের প্রয়োজন হয়। তিনকে ৯ এর সাথে গুণ করলে ফল ২৭ হয়। উপরোক্ত হিসেবে ‘লাইলাতুল কদর’ রমজানের ২৭ তারিখ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। (তাফসিরে রুহুল বয়ান)

লাইলাতুল কদর অনির্দিষ্ট রাখার তাৎপর্য:  মহান আল্লাহর প্রতিটি কাজের ভেতর রয়েছে অসংখ্য নিয়ামত ও রহস্য। তদরূপ কদরের পবিত্র রজনীকে অনির্দিষ্ট রাখার অনেক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। যেমন-

(ক) প্রতিটি বেজোড় রাতে অধিক পরিমাণে ইবাদত করে বান্দা যাতে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে ধন্য হয়।

(খ) পাপীরা এ রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে এবং সঠিক পথে আসার অনুপ্রেরণা পাবে।

(গ) নির্দিষ্ট হলে কেউ দুর্ভাগ্যবশত এ রাত হারিয়ে ফেললে সে অত্যন্ত মনকষ্টে নিপতিত হতে পারে।

(ঘ) যত রাতই ‘লাইলাতুল কদর’ মনে করে ইবাদত করবে প্রত্যেক রাতের জন্য পৃথক পৃথক সওয়াব পাবে।

(ঙ) বছরের বাকি রাতগুলোতে সুযোগ পেলেই যাতে ইবাদতে কাটানো যায় তার একটি প্রশিক্ষণ নিতে পারে।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও ফজিলত: আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘আমি তা (আল-কুরআন) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে। তুমি কি জান মহিমান্বিত রজনী কি? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ এবং জিবরাইল (আ.) অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজে তাদের রবের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনীতে বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল-কদর, আয়াত : ১-৫)

এই সূরার বর্ণনা অনুযায়ী শব-ই কদর বা ‘লাইলাতুল কদর’ এর তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে: (ক) এ রাতে কোরআন নাজিল করা হয়। (খ) এ রাত হাজার মাস অর্থাৎ (৮৩ বছর ৪ মাস) অপেক্ষা শ্রেয় এবং (গ) এ রাতে হযরত জিব্রাইল (আ.) ফেরেশতাদলসহ শান্তির পয়গাম নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন।

লাইলাতুল কদরের দোয়া ও করণীয়: এই সম্মানিত ও মহিমান্বিত বরকতময় রজনী পাওয়ার জন্য প্রত্যেক মুসলমানেরই চেষ্টা থাকা উচিত। আর এর জন্য উত্তম পন্থা হলো রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করা। এছাড়াও নিম্নে বর্ণিত কাজগুলো করা আবশ্যক।

১. নিজে রাত জেগে ইবাদত করা এবং পরিবারের সদস্য ও অধীনস্থদের ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করা।

২. তারাবির সালাত আদায়ের পর রাতে তাহাজ্জুদ ও সালাতুত তাসবিহ আদায় করা।

৩. সিজদার মধ্যে তাসবিহ পাঠ শেষে দোয়া করা। কেননা সিজদারত অবস্থায় মানুষ তাঁর রবের নিকটে চলে যায়। ফলে তখন দোয়া কবুল হয়।

৪. নিজের কৃত পাপের জন্য বেশি বেশি তওবা করা। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো পাপ না হয় তার জন্য দৃঢ় সংকল্প করা।

৫. অধিক পরিমানে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা। উত্তম হবে কোরআনের অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ অধ্যায়ন করা।

৬. সাধ্য অনুযায়ী জিকির ও তসবীহ্ তাহলিল আদায় করা।

৭. কবুল হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে নিজ, পরিবার, পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, জীবিত, মৃতব্যক্তিদের জন্য সর্বোপরি দেশ, জাতি ও বিশ্ববাসীর শান্তি-সমৃদ্ধি কামনা করে মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা কর।

...। লেখক: মুফাসসিরে কোরআন ও প্রভাষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, মাতৃভাষা ডিগ্রী কলেজ। শরণখোলা, বাগেরহাট।

বাংলাদেশ সময়: ১৭২৫ ঘণ্টা, মে ২০, ২০২০
এইচএডি/

করোনা উপসর্গে মৃত্যু: পরিবার পিছুহটায় দাফন করলো প্রশাসন
বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল বিশ্ব
ভার্চ্যুয়াল আদালতে সারাদেশে সাড়ে ২৭ হাজার আসামির জামিন
ভোলার মেঘনায় মিলছে না ইলিশ, কষ্টে দিন কাটছে জেলেদের
ছোটপর্দায় আজকের খেলা


কাশিমপুর কারাগারে হাজতির মৃত্যু
করোনা প্রমাণ করলো, পুলিশ জনগণের বন্ধু
গাজীপুরে কমেছে বায়ু দূষণ, বেড়েছে ফল-শাক-সবজির ফলন
‘পোলাডারে লইয়া বাঁচতে চাই’
উপকূলের জীবন-জীবিকা

‘পোলাডারে লইয়া বাঁচতে চাই’

বরিশালে ৮ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা