মসজিদে মুসল্লিদের শূন্যতা কাঁদায়

হাফেজ মাওলানা শায়খ আসজাদ আহমদ, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

হাফেজ মাওলানা শায়খ আসজাদ আহমদ।

walton

১২ মাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ মহিমান্বিত একটি মাস পবিত্র রমজান। পবিত্র আল-কোরআনসহ আসমানি সব গ্রন্থ এই মাসে নাযিল হয়েছে। এ মাসে আমরা পালন করি রোজার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল।

রোজার মাধ্যমে আমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে সক্ষম হই। তাক্বওয়া আরবি শব্দ। এর অর্থ খোদা ভীতি বা গুনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা। এই পবিত্র রমজান মাসের উছিলায় আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাক্বওয়া অর্জনের তৌফিক দিন।

রমজান মাস ও রোজা সম্পর্কে অনেক হাদিস আছে। রাসুলে পাক (স.)বিভিন্ন হাদিসের মাধ্যমে রোজার গুরুত্বের কথা আলোচনা করেছেন। এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (স.) বলেন, যে ব্যক্তি ইমানের আশায়, সওয়াবের জন্য পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখবে, আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের সকল সগিরা গুনাহ (ছোট ছোট গুনাহ) মাফ করে দেবেন।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান, যে কারণে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ছোট ছোট গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন।

ঠিক তেমনইভাবে তারাবির কথাও আসছে। আমরা যদি তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ি এর দ্বারাও আল্লাহ তায়ালা আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। এজন্য আসুন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দিনের বেলা রোজা, রাতের বেলা তারাবি-তাহাজ্জুদের নামাজসহ যাবতীয় আমল বেশি বেশি করে আদায়ের চেষ্টা করি। পাশাপাশি দান খয়রাত বেশি বেশি করে করার চেষ্টা করি।

হাদিসের ভাষ্য অনুসারে এ মাসের একটি ফরজ অন্যমাসের ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব দেন আল্লাহ তায়ালা। আমরা বেশি বেশি নফল আমলের দিকেও মনোনিবেশ ও মানুষকে বেশি বেশি দান খয়রাতের চেষ্টা করবো। 

বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতি করোনা ভাইরাসের কারণে দরিদ্র লোকজন খুবই কষ্টের মধ্যে আছে। এ জন্য আমাদের এমনিতেই মানবিক দায়িত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানো। আর রমজান মাসে যদি আমরা তাদের পাশে দাঁড়াই, দান খয়রাত করি, এর দ্বারা রমজানের উছিলায় আমরা সওয়াব বেশি পাবো।

এই পরিস্থিতির কারণে যেহেতু মসজিদে আসতে পারছি না, অবশ্যই বাসা-বাড়িতে পুরুষ-নারী, ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত ও তারাবির নামাজ আদায়ের চেষ্টা করবো।

খতমে তারাবি, নয়তো সুরা তারাবি পড়বো। জামায়াতে পড়লে অলসতা থাকবে না। একা একা পড়লে অনেক সময় নামাজ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো আলেম বা ইমামের প্রয়োজন নেই। যিনি জামাত সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন, তিনি নামাজ পড়াবেন। ইমামের পেছনে প্রাপ্ত বয়স্ক, এরপর অপ্রাপ্ত বয়স্ক তারপর নারীদের কাতার হবে। তবে যে সমস্ত মা-বোনদের সঙ্গে পর্দা রক্ষা করা ফরজ। তাহলে কাপড় টানিয়ে পর্দা রক্ষা করে জামাতে নামাজ পড়তে হবে। নয়তো সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে। কোনো অবস্থায় যেন পর্দা লঙ্ঘন না হয়।

অনেকে বলেন মসজিদ বন্ধ। মসজিদ খুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। মসজিদ তো খোলা আছে। নিয়মতান্ত্রিক জামাত হচ্ছে। কেবল পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে সমাগম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যে পরামর্শগুলো দেওয়া হয়েছে সুরক্ষার জন্য। সেগুলো মেনে আসা যেতে পারে। অসুবিধা হওয়ার কথা না, হবেও না।

অবশ্য মসজিদে মুসল্লিদের শূন্যতা আমাদের কাঁদায়। আক্ষেপ করি। আগে শত শত মুসল্লি নিয়ে নামাজ আদায় করতাম, এখন পারছি না। যারা মসজিদে নামাজ আদায় করতেন, তাদেরও কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে ঘরে নামাজ আদায় করলেও আল্লাহ তায়ালা সমপরিমাণ সওয়াব দেবেন। তারপরও আমরা মসজিদের মাইকে এলাকাবাসীকে সান্তনা দিচ্ছি-পরিস্থিতি ভালো হলে মসজিদে এসে নামাজ আদায় করবেন, ইনশাহআল্লাহ। নিজেদেরও আমরা প্রবোধ (সান্তনা) দিচ্ছি।  

রোজা অবশ্যই আমাদের সংযমী হতে শিক্ষা দেয়। এই রোজায় যেহেতু করোনা ভাইরাসের প্রভাবে অনেক মানুষ অভাবগ্রস্ত, তাই আগে হয়তো ১০টি আইটেম দিয়ে ইফতার করতেন অনেকে এখন সেটা কমিয়ে গচ্ছিত টাকা প্রতিবেশীদের দিলে দান খয়রাতের সওয়াবা পাবেন।

মেয়ের বাড়ি ইফতার পাঠানোর বাধ্যবাধকতা ইসলাম অনুমোদিত বিষয় নয়। হ্যাঁ, কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় দিতে চান, দিতে পারেন। কিন্তু আমাদের সমাজে রেওয়াজ হয়ে গেছে, না দিলে বদনাম হবে। সমাজে মুখ দেখানো যাবে না। তাই অনেকে বিপদগ্রস্ত থেকেও লোক লজ্জার ভয়ে ইফতারি দিয়ে থাকেন। এটা কোনোভাবেই ইসলাম সমর্থিত নয়।

তবে কিছু মানুষ আছেন, যাদের সমাজের প্রতি ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা ইফতারি দিয়ে থাকেন। স্বাভাবিকভাবে দিলে এটা ইসলাম অ্যালাও করে। তবে যারা সামাজিক প্রথা হিসেবে আদায় করেন, সে ব্যাপারে কথা থাকে, এটা ঠিক না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন করোনা ভাইরাস থেকে আমাদের মুক্তি দেন। যারা আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের রোগ মুক্তি দেন। আর যারা সুস্থ আছি, তাদের যেন আল্লাহ তায়ালা সুস্থ রাখেন। এছাড়া মহামারিতে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, আমরা দোয়া করি- আল্লাহ তায়ালা যেন তাদের শহীদ মর্যাদা দান করেন।

মহামারির বিষয়ে রাসুলে পাক্ (স.) বিজ্ঞান সম্মত পরামর্শ দিয়ে গেছেন। বলেছেন, যখনই কোনো এলাকায় মহামারি দেখা দেবে, সে এলাকা থেকে যেন লোকজন বের না হয়। যেটা আমরা ১৪০০ বছর পর পাচ্ছি। করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা আমাদের যে পরামর্শ দিচ্ছেন, রাসুলে পাক (স.) এর পরামর্শের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। সাবান দিয়ে হাত ধৌত করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা সেটাও ইসলামেও বলা আছে।

করোনায় মারা যাওয়াদের দাফনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে জানাজা আদায় করা সম্ভব। মুর্দার গোসলের বিষয়ে যদি চিকিৎসকের পরামর্শ থাকে কাছে না যাওয়ার, তাহলে অপারগতার কারণে তাইয়ুম করানোর ব্যবস্থা তো আছেই। সেটা করানো যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন। আমিন।

লেখক: হযরত শাহজালাল (র.) দরগাহ মসজিদের ইমাম ও খতিব।

আরও পড়ুন>> শর্তসাপেক্ষে ৭ মে থেকে মসজিদে জামাতের অনুমতি

বাংলাদেশ সময়: ১৫২৫ ঘণ্টা, মে ০৬, ২০২০
এনইউ/এইচএডি/

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: করোনা ভাইরাস
ধর্মপাশায় বজ্রপাতে জেলের মৃত্যু
কানাডায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে ট্রুডো
যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যোগদান অনলাইনে
‘করোনা রোধে নারায়ণগঞ্জের সিস্টেমটা সারাদেশে প্রয়োগ হবে’
বর্ণ-বৈষম্য দূরীকরণে ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবেন জর্ডান


ফেনীতে করোনা আক্রান্ত বাড়লেও তোয়াক্কা নেই স্বাস্থ্যবিধির
করোনা উপসর্গে মৃত্যু: পরিবার পিছুহটায় দাফন করলো প্রশাসন
বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল বিশ্ব
ভার্চ্যুয়াল আদালতে সারাদেশে সাড়ে ২৭ হাজার আসামির জামিন
ভোলার মেঘনায় মিলছে না ইলিশ, কষ্টে দিন কাটছে জেলেদের