ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক যে শাহি মসজিদ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

মসজিদ।

walton

চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক, সাড়ে তিনশ' বছরের পুরোনো মসজিদটিতে এখনো নামাজ হচ্ছে। একসময় 'কাবায়ে সানি’, ‘জামে সঙ্গীন’ নামে পরিচিত এ মসজিদকে ব্যবহার করা হয়েছে গোলাবারুদের গুদাম ও দুর্গ হিসেবে।

আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ শিলালিপিতে ফার্সিতে লেখা রয়েছে ‘১০৭৮ হিজরিতে’ এটি নির্মিত হয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে আসেন নামাজ আদায় করতে।

প্রতিবছর জুমাতুল বিদায় সবচেয়ে বেশি মুসল্লির সমাগম হয়। মূল মসজিদ, সম্প্রসারিত মসজিদ, ত্রিপলের ছাউনি, খোলা মাঠ ছাড়িয়ে মুসল্লিরা আন্দরিকল্লার সড়কে জায়নামাজ, কাগজ বিছিয়ে জামাতে শরিক হতে দেখা যায়। শবে কদর ও শবে বরাতের রাতে এবং শুক্রবারের জুমা ও দুই ঈদের নামাজেও উপচে পড়া ভিড় থাকে। রমজানে এখানে ধনী-গরিব এক কাতারে বসে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার মানুষ ইফতার করতেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির ব্যবস্থাপনায়। এবার করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত আকারে জামাত হচ্ছে।

মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ আনওয়ারুল হক আজহারী বাংলানিউজকে বলেন, ২ জন ইমাম, ২ জন হাফেজ ও খাদেমদের নিয়ে তারাবির জামাত হচ্ছে। প্রতিবছর  ধনী-গরিবদের এককাতারে যে ইফতার আয়োজন, জোহরের পর থেকে তফসির মাহফিল হতো তা স্থগিত রয়েছে।মসজিদ।সরেজমিন দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি গঠনগত দিক থেকে এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। দোতলার ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, লোহালক্কড়গুলো বেরিয়ে আসছে। তাই বেশ কয়েক বছর ধরে দোতলায় মুসল্লিদের ওঠা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিন গম্বুজের মূল মসজিদটি আকারে খুবই ছোট। আড়াই গজ পুরুত্বের বিশাল পাথরের দেয়ালে তৈরি। ১৬ মিটার লম্বা, ৬ দশমিক ৯ মিটার প্রস্থ। ছোট্ট মসজিদটিতে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য পশ্চিম পাশে চারটি জানালা, পূর্ব পাশে তিনটি দরজা, উত্তর ও দক্ষিণ পাশে একটি করে দরজা রয়েছে। তিনটি মেহরাব রয়েছে।

আশির দশকে মসজিদের চার কোণায় চারটি সুউচ্চ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণার মিনারটি স্থানে স্থানে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। মূল মসজিদের ছাদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তিনটি গম্বুজ। একটি বড় গম্বুজ। দুই পাশে দুইটি ছোট গম্বুজ। অনেক বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। চুনকাম বা রক্ষণাবেক্ষণের ছাপ নেই। পূর্ব পাশের ছাদের কিনারে ১৮টি ছোট গম্বুজ বসানো হয়েছে স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য।

একজন মুসল্লি জানান, টানা বৃষ্টি হলে গম্বুজ চুঁইয়ে পানি পড়ে। কয়েক বছর ধরে শোনা যাচ্ছে এ মসজিদ নতুনভাবে গড়ে তোলা হবে। কিন্তু ফাইল চালাচালিতে সময়ক্ষেপণই হচ্ছে।

২ দশমিক ৪৩ একর জায়গার ওপর আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ কমপ্লেক্স। এ মসজিদের সম্পত্তির ওপর লাইব্রেরি, কাগজ, আতর-টুপি, ট্রাভেল এজেন্ট, দর্জির দোকান, ছাপাখানা মিলে ২৩৫টি ভাড়াটিয়া হিসেবে রয়েছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, পর্তুগিজ ও আরাকানি মগদের লুণ্ঠন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে মোগল সম্রাট আবুল মুজাফফর মুহিউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব আলমগীরের বিজয় ফলক হিসেবে আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা হয় ১৬৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। মসজিদের গায়ে লেখা ফার্সিতে লেখা হয় ‘ধার্মিক শাসক বিশ্বাসের আলো জ্বালিয়েছেন, খলিলের মতোই এ পবিত্র মসজিদ নির্মাণ করেছেন, যেন মানুষ আলোকিত পথে পরিচালিত হয়।’ ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াসিন খাঁন নামে চট্টগ্রামের আরেক ফৌজদার এ মসজিদের অনুদান বন্ধ করে দেন। এর অদূরে প্রতিষ্ঠা করেন আরেকটি মসজিদ। এরপর ক্রমে শাহি মসজিদ প্রাধান্য হারাতে থাকে।

মসজিদের দোতলার ছাদে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ডানে এ মসজিদ সংক্রান্ত সরকারি গেজেটের প্রচ্ছদ।

১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে মীর কাসিম আলী চট্টগ্রাম, মেদেনীপুর ও বর্ধমান জেলা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে নবাবী লাভ করেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬১ সালের ৩ জানুয়ারি নওয়াব রেজা খানের কাছ থেকে চট্টগ্রামের দায়িত্বভার বুঝে নেয়। তখন এ মসজিদও কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা মসজিদের কয়েকটি স্তম্ভ, গম্বুজ ধ্বংস করে, মূল্যবান কারুকার্যের ক্ষতি সাধণ করে, মূল নকশার আংশিক পরিবর্তন করে মসজিদটি গোলাবারুদের গুদাম হিসেবে ব্যবহার করেন। হিজরি ১২৭১ সাল পর্যন্ত এ মসজিদে নামাজ ও সব এবাদত বন্ধ ছিল। ১৮৫৪ সালে মুসল্লিরা ৯৪ বছর পর পুনরায় আজান দিয়ে মসজিদে নামাজ আদায় শুরু করেন। ১৮৫৭ সালে মসজিদের সম্পত্তি খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খান ওয়াকফ এস্টেটভুক্ত হয়। হিজরি ১২৭২ সালে ‘ইমারতে সানি’ বা ‘পুনঃনির্মাণ’ খোদাই করে মসজিদের গায়ে লাগানো হয়। ১৯৬২ সালে হাইকোর্টের রায়ে শাহি জামে মসজিদ ওয়াকফ এস্টেট পৃথক আলাদা করা হয়। ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে এ মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে দেওয়া হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এ মসজিদে একজন খতিব, তিনজন পেশ ইমাম, দুইজন মুয়াজ্জিন, সাতজন খাদেম রয়েছেন।

সূত্র জানায়, মূল মসজিদটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করে বাকি অংশ ভেঙে পাঁচ তলা মসজিদ ও একটি বহুতলা ভবন নির্মিত হবে। সেখানে থাকবে সেমিনার হল, পাঠাগার, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যালয়, খতিব-ইমাম-স্টাফদের কোয়াটার ইত্যাদি। খুব সম্ভব বিদেশ থেকে  অনুদানও এসেছে।

বাংলাদেশ সময়:  ১২০৬ ঘণ্টা, মে ০২, ২০২০
এআর/টিসি

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: ইসলাম রমজান
রায়সাহেব বাজারে গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কেমিক্যালে
ধর্মপাশায় বজ্রপাতে জেলের মৃত্যু
কানাডায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে ট্রুডো
যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের যোগদান অনলাইনে
‘করোনা রোধে নারায়ণগঞ্জের সিস্টেমটা সারাদেশে প্রয়োগ হবে’


বর্ণ-বৈষম্য দূরীকরণে ১০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেবেন জর্ডান
ফেনীতে করোনা আক্রান্ত বাড়লেও তোয়াক্কা নেই স্বাস্থ্যবিধির
করোনা উপসর্গে মৃত্যু: পরিবার পিছুহটায় দাফন করলো প্রশাসন
বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল বিশ্ব
ভার্চ্যুয়াল আদালতে সারাদেশে সাড়ে ২৭ হাজার আসামির জামিন