php glass

ঐতিহ্যের নিদর্শন ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ

মো: জাহিদ হাসান জিহাদ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ। ছবি: বাংলানিউজ

walton

কুষ্টিয়া: যুগে যুগে অসংখ্য ধর্মপ্রচারক, ওলি-আওলিয়া ও দরবেশ বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলার মাটিতে এসেছেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ইসলাম প্রচার ও জনগণের দুর্দশা-নির্যাতন দূর করা। ঠিক তেমন লক্ষে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়ার ঝাউদিয়া এলাকায় এসেছিলেন জমিদার শাহ্ সুফি সৈয়দ আহম্মেদ আলী (আদারী মিয়া চৌধুরী)।

ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে ও আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগির মানসে তিনি ঝাউদিয়ায় একটি মসজিদ স্থাপন করেন, যেটি ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ নামে পরিচিত। কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলার মধ্যবর্তী স্থানে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে অবস্থিত ইতিহাসের সাক্ষী অনিন্দ্য সুন্দর এ মসজিদ।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ। ছবি: বাংলানিউজ

মসজিদটি বেশ প্রাচীন ও নথিপত্রে তেমন কোন তথ্য না থাকায় মসজিদটি সম্পর্কে নানা গুজব ছড়িয়েছে। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ‘এক রাতে জ্বিনেরা এই মসজিদটি তৈরি করেছে’। আবার কারো কারো দাবি ‘রাতের আধারে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে এসেছে মসজিদটি।’

তবে এটি মানুষেরই তৈরি, মাটি ফুড়ে বের হয়নি বলে জানান এলাকার কিছু বয়জ্যেষ্ঠ মুসল্লিদের।  

মূল মসজিদে রয়েছে তিনটি সুদর্শন গম্বুজ, তিনটি দরজা, তিনটি নামাজে দাঁড়ানোর কাতার। পুরো মসজিদের ভেতরের দেওয়ালে সুন্দর পুরাকৃর্তি। মসজিদটির রয়েছে সুন্দর বারান্দা ও বিশাল আকৃতির প্রধান গেট। এছাড়াও প্রধান গেট থেকে একটু দূরেই রয়েছে দুইটি গম্বুজ। মাটির তৈরি ট্যালি, চুন ও সুরকি দিয়ে ৫২ ইঞ্চি গাঁথুনিতে নির্মাণ করা হয় এ শাহী মসজিদ। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটির উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুইটি চুন ও সুরকির তৈরি সুন্দর ফুলেল জানালা রয়েছে।

 মূল মসজিদে রয়েছে তিনটি সুদর্শন গম্বুজ। ছবি: বাংলানিউজ

মসজিদটির আরো একটি বিশেষত্ব হলো, এর পুরো দেওয়ালে যে আলপনা আঁকা, তার কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। প্রতিটি আলপনা নতুন ডিজাইনে। টালি, চুন, সুরকি দিয়ে পুরু গাঁথুনি হওয়ায় মসজিদটি গরমের দিনে ঠাণ্ডা ও শীতের দিনে কিছুটা গরম থাকে। মসজিদের ভেতরে সিলিংফ্যান দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে তাপমাত্রা অতিরিক্ত হলে কয়েকটা ম্ট্যান্ডফ্যান দিয়ে কিছুটা বাতাস দেওয়া হয়। 

ঐতিহাসিক ঝাউদিয়া শাহী মসজিদের ভেতরের তিনটি গম্বুজের নিচে ৩ কাতারে ১০০ জনের মতো মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। অন্যরা দাঁড়ান মসজিদের বারান্দায়।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, এ মসজিদটি আওরঙ্গজেবের আমলে এ নির্মিত হয়েছিল। কারণ মুঘল আমলে নির্মিত অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে এ মসজিদের নির্মাণশৈলীতে অনেক সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। মুঘল স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ নির্মিত।

তিনি আরো বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এ মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন। রমজান মাস বাদে অন্যান্য মাসের শুক্রবারগুলোতে প্রায় ৪-৫ হাজার মানুষ আসেন এ মসজিদে। 

 দেওয়ালের আলপনা কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। ছবি: বাংলানিউজ

স্থানীয় আরেকজন মুসল্লি সেলিম উদ্দিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, মসজিদের বাইরের সৌন্দর্য রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিছুটা ম্লান হলেও ভেতরে চোখধাঁধানো নকশার তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ১৯৬৯ সালে মসজিদটিকে নথিভুক্ত করেন। সবশেষ ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে একবার মসজিদটির সংস্কার করা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে আসেন ও অনেকেই মানত করেন এখানে।

মসজিদটি প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবই লোক মুখে শোনা, দাদা-চাচারা যা বলে গেছেন, আমরা সেটাই জানি। শাহ্ সফি সৈয়দ আহম্মেদ আলী (আদারী মিয়া চৌধুরী) ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দিনের অধিকাংশ সময় মসজিদেই ইবাদত-বন্দেগি করে কাটাতেন। তিনি প্রত্যেকদিন নামাজ আদায় করে এসে বসতেন  মসজিদের পাশে এক ঘরে। সেখানে তিনি সবাইকে ধর্মের কথা শোনাতেন। জমিদার শাহ সুফি আহম্মদ চৌধুরী নিজেই ইমামতি করতেন। এলাকার জনগণকে তিনি কোরআন শিক্ষা দিতেন। ধার্মিক আদারী মিয়া চৌধুরী ছিলেন অবিবাহিত। মসজিদ থেকে একটু দূরেই রয়েছে তার মাজার। 

মসজিদের ভেতরে সুন্দর পুরাকৃর্তি। ছবি: বাংলানিউজ

তিনি আরো বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের সঙ্গে চুক্তিনামা অনুযায়ী  মসজিদের মুতাওয়াল্লি (তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে থাকবেন হাসান আলী চৌধুরী অথবা তারই বংশধর। সে সুবাধে তার বংশধররা মসজিদটি পরিচালনা করছেন। বর্তমানে মওলানা মো. মোকারম হোসেন এ মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে মোকারম হোসেনের পিতা আব্দুস শুকুর, তার আগে মোকারম হোসেনের মামা মানজারুল আলম এবং তার আগে মোকারম হোসেনের নানা মওলানা মওলা বকস দায়িত্ব পালন করেন।

ঐতিহ্যবাহী ঝাউদিয়া শাহী মসজিদটি বাংলাদেশের মসজিদ-ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধি করেছে। এটি মুঘল আমলের ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। এ মসজিদটি বাংলা অঞ্চলের সমৃদ্ধ মুসলিম ঐতিহ্য বহন করে। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দর্শনে প্রতিদিনই শত শত ভ্রমণপিপাসুদের আগমন ঘটে ঝাউদিয়া গ্রামে।

যেভাবে যাবেন
কুষ্টিয়া আসলে যে কেউ খুব সহজেই আসতে পারেন এ মসজিদে। দেখে যেতে পারেন মুঘল শাসনামলের এই ইসলামের নিদর্শন। কুষ্টিয়া চৌড়হাস মোড় থেকে সোজা বাসে অথবা সিএনজি যোগে ঝাউদিয়া বাজার পর্যন্ত যাওয়া যায়। তারপর ঝাউদিয়া বাজারের কালিতলা মোড় থেকে ঝাউদিয়া-মাছপাড়া রোডে পাখিভ্যান অথবা অটোতে করে ১০ মিনিটে পৌঁছানো যায় ঝাউদিয়ার শাহী মসজিদ।

রমজানবিষয়ক যেকোনো লেখা আপনিও দিতে পারেন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন: [email protected]

বাংলাদেশ সময়: ১২৪০ ঘণ্টা, মে ২৪, ২০১৯
এমএমইউ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: রমজান
অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে হত্যার দায়ে স্বামীর ফাঁসি
২১ নভেম্বর শুরু বাপা ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো
বাড়িতে মজুদ ৭ হাজার কেজি লবণ, আটক ৪ 
চালের দাম বেড়েছে মাগুরায়
প্রথম দুই সেশন স্পিনারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: ভেট্টরি


যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিটি কলেজে আবেদনের শেষ সময় ২১ নভেম্বর
ধর্ষণ মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
খাসিয়াদের ভূমি সুরক্ষা দিতে হবে: খুশি কবীর
রাজধানী সুপার মার্কেটে ভয়াবহ আগুন, নিয়ন্ত্রণে ২২ ইউনিট
রাজাপুরে অজ্ঞাতপরিচয় নারীর মরদেহ উদ্ধার