php glass

বাংলা সাহিত্যে রোজা-রমজান

মুফতি বুরহান উদ্দিন, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: সংগৃহীত

walton

পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি। তার অন্যতম হচ্ছে রমজান মাসের রোজা। রমজান ও রোজাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলও সৃষ্টি হয়েছে।

রমজানের চাঁদ দেখা, রোজার নিয়তে ভোর রাতে সেহরি খাওয়া, সূর্যাস্তের পর পরই ইফতার করা, তারাবি, এতেকাফ, লাইলাতুল কদর, সদকাতুল ফিতর, ঈদুল ফিতর ইত্যাদি বাংলাদেশের জনমনে পরিচ্ছন্নতার সুরভি মেখে দেয়।

এ কথা স্বীকার্য যে, বাংলা ভাষার উৎকর্ষ ও বিকাশের এবং বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার মৌলিক পাঠ সূচিত হয় বাংলার সুলতানগণের পৃষ্ঠপোষকতায়। মুসলিম কবিগণ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কেও রচনা করেছেন কমবেশি। পরবর্তীতে রমজান ও রোজা বিষয়ে বেশ কিছু কাব্য ও গদ্য রচিত হয়, যার গতিধারা প্রতি বছরই নতুন নতুন অনুভব মেখে এখনো চলছে।

ইসলামি ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের কবি ফররুখ আহমদ তার শবে-কদর কবিতায় বলেছেন-
‘এখনো সে পুণ্য রাত্রি নামে পৃথিবীতে, কিন্তু প্রাণ
এক অন্ধকার ছেড়ে অন্য এক আঁধারে হারায়,
ঊর্ধ্বের ইঙ্গিত আসে লক্ষ মুখে, অজস্র ধারায়;
নর্দমার কীট শুধু পাপ-পঙ্কে খোঁজে পরিত্রাণ। 
.... আত্মার প্রশান্তি গ্রাস করে ছায়া উদ্ভ্রান্ত মতের;
সে আজ দেখাতে রাহা এ সংশয়ে, ... শবে কদরের
( কত অপলক দৃষ্টি জাগে আজও যে পথ-সন্ধানে);
জুলমাতের এলাকায় বলে দাও নিঃসঙ্গ খিজির।।’

রমজানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য 
রমজান সব ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়। সবাইকে কল্যাণকামী ও সহমর্মী করে তুলে। রমজান মুসলমানের ইবাদতের ভরা বসন্ত। মুমিন হৃদয়কে আলোড়িত ও আন্দোলিত করে রমজান। এর আবির ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। রমজান ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে দেয় নতুনমাত্রা। নতুনভাবে রাঙিয়ে নেয় ঈমানের রঙে- তারই হৃদয় ছোঁয়া বর্ণনা দেখি আমরা পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের তারাবি কবিতার ছত্রে ছত্রে-

‘নামাজ পড়িতে যাইব মোল্লাবাড়িতে আজ,
মেনাজদ্দীন, কলিমদ্দীন, আয় তোরা করি সাজ।
চালের বাতায় গোঁজা ছিল সেই পুরাতন জুতা জোড়া,
ধুলাবালু আর রোদ লেগে তাহা হইয়াছে পাঁচ মোড়া।
তাহারি মধ্যে অবাধ্য এই চরণ দুখানি ঠেলে,
চল দেখি ভাই খলিলদ্দীন, লুন্ঠন-বাতি জ্বেলে।
ঢৈলারে ডাক, লস্কর কোথা, কিনুরে খবর দাও।
মোল্লাবাড়িতে একত্র হব মিলি আজ সার গাঁও।’

কবি শাহাদাৎ হোসেন  রমজানকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছেনঃ
‘তোমারে সালাম করি নিখিলের হে চির কল্যাণ -- 
জান্নাতের পুণ্য অবদান !’

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম 'কেন জাগায়লি তোরা' কবিতায় রমজানকে উপস্থাপন করেছেন বিপ্লবী অনুরণনে--

“মাহে রমজান এসেছে যখন, আসিবে ‘শবে কদর’,
 নামিবে তাহার রহমত এই ধূলির ধরার পর।
 এই উপবাসী আত্মা, এই যে উপবাসী জনগণ,
 চিরকাল রোজা রাখিবে না-- আসে শুভ 'এফতার' ক্ষণ।”

মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ ‘ইসলামের মহাব্রত রোজা’ শীর্ষক প্রবন্ধে রোজার উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন এভাবে- ‘...রোজার উদ্দেশ্য শুধু অনাহারে থাকা নয়। পরন্তু দৈহিক ও মানসিক উভয়বিধ সংযম এবং সেই সংযমজনিত নিবৃত্তি ও প্রশান্তির স্নিগ্ধ পরিবেশে আল্লাহর দিকে মনের একাগ্রতা সাধনই ইসলামের নির্দেশিত রোজার মূল লক্ষ্য।’   

রোজার মাহাত্ম্য তুলে ধরে 'সিয়ামের তাৎপর্য' শীর্ষক এক প্রবন্ধে জাতীয় অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ লিখেছেন-
‘কাম প্রবৃত্তির অসংযত সন্তোষ বিধানের ফলে মানুষ পশুত্বের চরম স্তরে নেমে যায়‌। ক্রোধ মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য সামাজিক জীবনে বিশৃংখলতার সৃষ্টি করে। এ জন্যে এগুলোর দাহনের জন্যে এ দুনিয়ায় আল্লাহ সিয়ামের প্রবর্তন করেছেন। যাতে এ দাহনের ফলে মানুষ এ বিশ্বে তার প্রকৃত স্থান নির্দিষ্ট করতে পারে, সে যাতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা Vice-gerent হিসেবে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে‌।’

রমজান তাকওয়া অর্জনের মাস। রমজান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস। রোজাদারকে সার্থকতা অর্জন করতে হলে কি কি করা উচিত সে সম্পর্কে ডক্টর আইয়ুব আলী বলেন- ‘সিয়ামের উদ্দেশ্যাবলী সার্থক করতে হলে সিয়াম পালনকারীকে প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও রিপুসমূহকে অন্যায় থেকে বিরত রাখতে হবে এবং ন্যায়ের অনুশীলন করতে হবে। সারাদিন হালাল দ্রব্য গ্রহণে বিরত থেকে ইফতারির সময় যদি অন্যায় ও অবৈধভাবে উপার্জিত খাদ্যাদির দ্বারা ইফতার করা হয়, তবে সওয়াবের পরিবর্তে আরও গুনাহর কাজ করা হল তা সাধারণ জ্ঞানেও বোঝা যায়।’

কবি আজিজুর রহমান তার 'রোযা' কবিতায় রোজার গুরুত্বারোপ করে বলেছেন- 
‘রোজা রেখে করো অনুভব 
ক্ষুধার কেমন তাপ 
দেহমনের সেই সাধনায় 
পুড়িয়ে নে তোর পাপ।’...

কবি সাবির আহমদ চৌধুরী বলেন - 
‘একটি বছর পরে আবার 
কুল মুসলিম বিশ্ব ধরায়
 সিয়ামের মাস এলো রমজান 
আব হায়াতের শান্তি সুধায়।
 আত্ম অহং চিত্তদহন
বিনয় নম্র সংযমী মন।
কুল রোজাদার সব কে-খোদা
 খাস রহমতের শিরনী বিলায়।’

অন্য কবিতায় বলেছেন-
‘মাগফেরাতের সওদা নিয়ে 
এলো মাহে রমজান 
সকল মাসের শ্রেষ্ঠ এ মাস 
তৌহিদী ফরমান।’

ফজল-এ-খোদা রমজান নিয়ে বেশ অনেক কবিতা রচনা করেছেন। এক কবিতায় লিখেছেন- 
‘আল্লাহ তোমার হাজার শোকর
 দিলে মাহে রমজান-
অধম নাদান বান্দার তরে
তুমি যে মেহেরবান।
রমজানের এই রহমতী মাস
মিটায় প্রাণের বেহেশতী আশ
খোদা আমরা তোমার দাসানুদাস
চাই যে শান্তি সত্য জ্ঞান।’

তিনি সেহরি নিয়েও বলেছেন- 
‘জাগো জাগো রোজাদাররা জাগো 
জাগো রে এবার
 লও সেরে লও থাকতে সময়
 সেহরি তোমার।’

সৈয়দ এমদাদ আলী লাইলাতুল কদর নামে দীর্ঘ কবিতায় বলেছেন- 
‘বর্ষে বর্ষে আসে সে রজনী 
ল'য়ে তার স্মৃতির সম্ভার,
বহাইতে মোসলেম অন্তরে 
অনাবিল পুণ্যের পাথার।’

রমজান সর্বাধিক বরকতময় মাস। বহু ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের এক মহা সমাবেশ ঘটেছে এই মাসে। এই মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, এই মাসে দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। এই মাসে মাগফেরাত লাভের অফুরন্ত সুযোগ আসে। এই সুযোগ লাভ থেকে আমরা যেন নিজেদেরকে বঞ্চিত না করি। আমাদের সবার জীবনে মাহে রমজান মোবারক হোক।

লেখক: ফতওয়া-গবেষক ও টেলিভিশনে ইসলামবিষয়ক ভাষ্যকার

রমজানবিষয়ক যেকোনো লেখা আপনিও দিতে পারেন। লেখা পাঠাতে মেইল করুন: [email protected]

বাংলাদেশ সময়: ১৪০৪ ঘন্টা, মে ২২, ২০১৯
এমএমইউ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: রমজান
কুড়িগ্রাম পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল-সম্পাদক কাজিউল
জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন ৭ ডিসেম্বর
নির্মাণখাত পরিদর্শন করবে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর
মাদারীপুরে হত্যা মামলায় ২ জনের যাবজ্জীবন
অন্তঃস্বত্তা স্ত্রীকে হত্যার দায়ে স্বামীর ফাঁসি


২১ নভেম্বর শুরু বাপা ফুডপ্রো ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো
বাড়িতে মজুদ ৭ হাজার কেজি লবণ, আটক ৪ 
চালের দাম বেড়েছে মাগুরায়
প্রথম দুই সেশন স্পিনারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ: ভেট্টরি
যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিটি কলেজে আবেদনের শেষ সময় ২১ নভেম্বর