ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ ফাল্গুন ১৪২৭, ০২ মার্চ ২০২১, ১৮ রজব ১৪৪২

জাতীয়

গ্রিন সিটি যেন স্বপ্নের শহর

টিপু সুলতান, উপজেলা করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১৫৮ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৯, ২০২১
গ্রিন সিটি যেন স্বপ্নের শহর

পাবনা (ঈশ্বরদী): পাকিস্তানি আমলের ভবনগুলো ছিল বিষধর সাপের অভয়ারণ্য। ঝোপ-জঙ্গলে ঢাকা একতলা বাসাগুলো দেখলেই গা ছমছম করতো।

দিনের বেলায়ও সবাই সেখানে ঢুকতে ভয় পেতো। ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া রোডের উপজেলার দিয়ার সাহাপুর পুরনো সড়কের পাশে সপ্তাহে দু’দিন বসতো গ্রামের হাট।  

কোনোদিনই কেউ কল্পনা করেনি এখানে এমন শহর গড়ে উঠবে; গড়ে উঠবে গ্রিন সিটির মতো দৃষ্টিনন্দন বহুতল আধুনিক ভবন। গ্রিন সিটির কারণে বদলে গেছে ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি ইউনিয়নের চিত্র। পাকশির এক সময়ের অজপাড়া গাঁ রূপপুরে হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। যার জন্য আলোকিত হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ।

অন্যদিকে, গ্রিন সিটির কারণে শুধু রূপপুরই নয়, বরং গোটা জেলাই বদলে যাচ্ছে। অজোপাড়া গাঁ পরিণত হচ্ছে ঝলমলে শহরে।

রূপপুর মোড়ে বসে চলমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প-গ্রিন সিটি নির্মাণের মহাকর্মযজ্ঞ নিয়ে পাবনা জেলা পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম বাবু মণ্ডল এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলেন।

জানা যায়, ১৯৬১ সালে পদ্মার তীরে ঈশ্বরদীর রূপপুরে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ৪৭ বছর পরও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ প্রকল্পে গতি আসে। চুক্তি হয় রাশিয়ার সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিস্থাপন করেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশন।  

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড ব্যয়ের এ প্রকল্পে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঢালাই কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকার আশা করছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব হবে। পরের বছর চালু হবে সমান ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, রূপপুর প্রকল্প এলাকায় এক হাজার ৬২ একর জমির ওপর চলছে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। রুশ সহায়তায় এ প্রকল্পে দুই ইউনিট মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার (এক লাখ এক হাজার ২০০ কোটি টাকা)। আট হাজারের মতো জনবল এখন এ প্রকল্পে কাজ করছে, যার মধ্যে ১৮০০ জন রাশিয়ানসহ বিদেশি জনবল রয়েছে তিন হাজারের বেশি।  

বিদ্যুৎকেন্দ্রের রাশিয়ান কর্মকর্তাদের বসবাসের আবাসন প্রকল্প গ্রিন সিটির কাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। ৩৬ দশমিক ১১ একর জমিতে গ্রিন সিটি নির্মাণ কাজও পুরোদমে চলছে। বাস্তবায়নে রয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী আবাসনের জন্য মোট ২১টি বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এগুলোর মধ্যে ২০তলা বিশিষ্ট ১২টি, ১৬তলা বিশিষ্ট সাতটি এবং ১৫তলা বিশিষ্ট দু’টি ভবন রয়েছে।

১৫তলার দু’টি ভবনে ১৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট থাকছে। ১২৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ১৬টি এবং ৮৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের ২০তলা বিশিষ্ট তিনটি ভবন রয়েছে। ডরমেটরি কাম মাল্টিপারপাস কমার্শিয়াল ২০তলা একটি ভবন নির্মাণের টেন্ডার এরই মধ্যে হয়ে গেছে। ফায়ার স্টেশন নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও সোয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টও গ্রিনসিটিতে থাকছে।

এছাড়া গ্রিনসিটিতে একটি দোতালা মসজিদ ভবন, ছয়তলা বিশিষ্ট স্কুল ভবন, দ্বিতল সাব-স্টেশন, জেনারেটর, পাম্প হাউজ ভবন, খেলার মাঠ, গেস্ট হাউজ এবং ফোয়ারা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পে কর্মরত দেশি ও বিদেশিরা এ গ্রিন সিটিতে বসবাস করবেন। এ পর্যন্ত দশটি আবাসিক ভবনের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে। রূপপুরের আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ শেষ হওয়া ২০তলা বিশিষ্ট ছয়টি এবং ১৬তলা বিশিষ্ট চারটি দৃষ্টিনন্দন ভবন।

বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত তিন হাজারেরও বেশি রাশিয়ানসহ বিদেশিরা বসবাসও শুরু করেছেন। এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ভবনের কাজ চলমান রয়েছে। আলাদাভাবে একটি পাওয়ার সাব স্টেশন নির্মাণ হয়েছে। কোয়ার্টারগুলোতে আধুনিকমানের সব সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।


মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিন আবাসিক ভবনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, সব ইউনিটেই আসবাবপত্র সরবরাহ হয়েছে। এসি, ইন্টারনেট সংযোগ, টেলিফোন, রান্নার গ্যাস সরবরাহ এমনকি বাথরুমে গিজারের ব্যবস্থাও সব ফ্ল্যাটেই রাখা হয়েছে।

আধুনিকতার সব কিছুই আবাসিক কোয়ার্টারে বিদ্যমান। পাবনা গণপূর্ত বিভাগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যান্য জনবলকে দিনরাত সার্বক্ষণিক কাজ করে সবার আন্তরিক চেষ্টা, নিষ্ঠা, শ্রম ও একাগ্রতায় মাত্র ১৩ মাসে তিনটি ২০তলা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করেছে।  

এতে সরকারের সব দপ্তর, মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর তদারকি ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনটি ২০তলা ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার চাহিদা ছিল ভবনগুলোতে সব ধরনের আসবাবপত্র দিয়ে সজ্জিত করে রাশিয়ানদের বসবাসের উপযোগী করা। সেই চাহিদার ভিত্তিতে প্রতিটি ভবনের ১১০টি ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। প্রতিটি ফ্ল্যাটে বেড, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার, সোফা সেট, আলমিরা, টেলিভিশন, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, ম্যাট্রেস, রুম কার্টেন, টিভি ট্রলি, কমফোর্টার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালপত্র সরবরাহ করার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) মাধ্যমে ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ই-জিপিতে দরপত্র দাখিল কার্যক্রম উন্মুক্ত থাকায় যে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাতে অংশ নিতে পারে।  

উত্তরবঙ্গের শ্রমিক নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রশীদুল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, দূরদর্শী সাহস আসলে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও তত্ত্বাবধানে দেশের প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের সার্বিক চেষ্টায় রূপপুরে মাত্র ১৩ মাসে সব সুবিধাসহ বাংলাদেশিদের দ্বারা গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্বমানের গ্রিন সিটি।

পাকশি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, রাতদিন ২৪ ঘণ্টা তিন শিফটে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দ্রুততম সময়ে রূপপুরের গ্রিন সিটির নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।  

পাকশি ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল প্রকল্পের সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী রয়েছেন। এখানকার জনগণের সঙ্গে সমন্বয়ের একটা অভাব রয়েছে। কথা অনুযায়ী চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সব কাজে এখানকার জনগণের গুরুত্ব থাকবে, সে প্রত্যাশা করি।  

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান রূপপুর প্রকল্পকে দ্বিতীয় প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ আখ্যা দিয়ে বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে রাশিয়ান সরকারের (জিসিসি) যে চুক্তিপত্র রয়েছে, তাতে নির্ধারিত সময়ে রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের আবাসন ব্যবস্থা সম্পন্ন করতে না পারলে বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতো প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা জরিমানার হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. শওকত আকবর বাংলানিউজকে বলেন, ১৩ মাসের মধ্যে তিনটি ২০তলা ভবন নির্মাণ করে প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা নজির স্থাপন করেছে। এ কাজের জন্য অবশ্যই তারা প্রশংসার দাবিদার।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখেছিলেন, সোনার বাংলাদেশ গড়ার। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর ২০২১ রূপকল্পের ঘোষণা দিয়েছিল। এ ঘোষণা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্ত আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আজ দৃশ্যমান। আজ স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ নিয়েছে। সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়ে একদিন বাস্তবে রূপ নেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও। এ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও করা যাবে।  

বাংলাদেশ সময়: ২১৫২ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৯, ২০২১
এসআই

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa