ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৭, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩ সফর ১৪৪২

জাতীয়

জন্মদিনের কেক না কেটে লাশ হলো কাব্য, বাকরুদ্ধ বাবা-মা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৩৪৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১২, ২০২০
জন্মদিনের কেক না কেটে লাশ হলো কাব্য, বাকরুদ্ধ বাবা-মা

যশোর: যশোরে শহরের মিশনপাড়া এলাকার কলেজ ছাত্র কাব্য দাসের ২৫তম জন্মদিন ছিল মঙ্গলবার (১১ আগস্ট)।

জন্মদিন প্রতিবারই ঘটা করে উদযাপন করলেও এবার করোনার কারণে পারিবারিকভাবেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলো মা কবিতা দাস।

ছেলে কাব্য দাসের পছন্দমতো খাবারও রান্না করা হয়েছিলো। কিন্তু জন্মদিন উদযাপন করা হলো না কাব্য দাসের। কাভার্ডভ্যানের চাকায় পিষ্ট হলো তার প্রাণ।

মঙ্গলবার বিকেলে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছার বেনেয়ালি গ্রামের গির্জার সামনে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই যুবক নিহত হয়। তাদের মধ্যে একজন কাব্য দাস। একই ঘটনায় প্রাণ যায় তার আরেক বন্ধু কাজী মুশফিক মাহবুব প্রিয়’র।  

যে বাড়ি সন্তান কাব্যকে ঘিরে আনন্দ আয়োজনে ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে এখন বিষাদের ছায়া, সন্তান হারানোর হাহাকার। পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন বাবা-মা।  

দুর্ঘটনায় নিহত কাব্য দাস যশোর শহরের মিশনপাড়া এলাকার সংস্কৃতি জন ও যশোরের পরিচিত মুখ উদীচীর সহ-সভাপতি দিলিপ দাসের বড় ছেলে ও ঢাকা কর্মাস কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। আর কাজী মুশফিক মাহবুব প্রিয় শহরের সার্কিট হাউজ পাড়ার মাহবুবুর হকের ছেলে। কাজী মুশফিক মাহামুদ প্রিয় মাগুরা সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র।  

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র মতে, মঙ্গলবার বিকেলে যশোর থেকে মোটরসাইকেলে বেনাপোলে যাচ্ছিলেন মুশফিক ও কাব্য। বেলা ৩টার দিকে তারা ঝিকরগাছার বেনেয়ালি গির্জার সামনে পৌঁছলে বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া কাভার্টভ্যান ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখে।  
নিহত কাব্যের ছোট ভাই কল্প দাস বাংলানিউজকে বলেন, করোনার কারণে কলেজ বন্ধ হওয়ায় বড়ভাই কাব্য ঢাকা থেকে বাড়ি আসেন। বাড়ি আসার পরেই মাসখানেক আগে মোটরসাইকেল কেনার বায়না ধরেন। তাকে মোটরসাইকেল কিনে দেয় পরিবার। মঙ্গলবার কাব্য’র জন্মদিন ছিলো। পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে এবার জন্মদিন পালন করার সকল প্রস্তুতি নিয়েছিলেন মা। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলেই কেককাটাসহ নানা আয়োজনে জন্মদিন পালন করতো সবাই। কিন্তু বন্ধুদের বায়নায় বেনাপোলে ঘুরতে যাচ্ছিল কাব্য। আর সেটিই কাল হলো তার। ঝিকরগাছায় দ্রুতগতির একটি ঘাতক কাভার্ডভ্যান কাব্যসহ তার আরেক বন্ধুকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় তারা।  

মঙ্গলবার শহরের কাব্যের বাড়ি মিশনপাড়া এলাকার বাড়িতে যেয়ে দেখা যায়, জন্মদিনের সাজগোজও করা হয় কাব্যের রুমে। গতবারের চেয়ে এবারের জন্মদিনের অনুষ্ঠান জৌলুসময় করতে না পারলেও বাড়িতে খাবার রান্নার পাশাপাশি বড় কেক আনা হয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলের মৃত্যুতে মা-বাবাসহ স্বজন প্রতিবেশীদের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে গেছে। অনেকেই প্রিয় স্বজন হারানোর সংবাদ শুনে পাগলপ্রায় মা-বাবা কে স্বান্তনা দিতে ছুটে এসেছেন। কাব্যের মায়ের চারপাশে স্বজনদের আহাজারি। এসময় পাগল প্রায় সন্তান হারানো মা বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘ফিরে আর বাবা, ফিরে আয়, বারবার বলেছি গাড়ি আস্তে চালাবি। কথা শুনে না সে। তোমরা আমার সোনারে ফিরিয়ে এনে দাও। ’

কাব্যের বাবা দিলিপ দাস বাংলানিউজকে বলেন, ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করার বড় স্বপ্ন ছিলো তার। ক্যান্টনম্যান্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর তাকে উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকার কর্মাস কলেজে ভর্তি করা হয়েছিলো। সেখানে থাকতো সে। তবে করোনার কারণে সে বাড়িতেই অবস্থান করছিলো। মঙ্গলবার তার জন্মদিন ছিলো। সকল প্রস্তুতি রাখা হয়েছিলো। তার পছন্দের বিভিন্ন খাবার রান্না করেছিলো মা কবিতা দাস। প্রিয় খাবারগুলোও খাওয়া হলো না কাব্যের। কান্না জড়িত কণ্ঠে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার বারবার আকুতি করছিলেন 
এ দিকে দুর্ঘটনায় আরেকজন নিহত কাজী মুশফিক মাহবুব প্রিয়’র বাড়িতেও শোকের ছায়া নেমে এসছে। পরিবারের ছোট ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা মাহবুবুর হক।  

ঝিকরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক জানান, ঘাতক কাভার্ডভ্যানটি ও চালকদের আটক করা যায়নি। তবে আটকের জন্য পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও বলেন, মরদেহ দুটির সুরতহাল রিপোর্ট সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে না বলে জানানো হয়েছে।  

বাংলাদেশ সময়: ০৩৪৮ ঘণ্টা, আগস্ট ১২, ২০২০
ইউজি/ইউবি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa