ঢাকা, বুধবার, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭, ১২ আগস্ট ২০২০, ২১ জিলহজ ১৪৪১

জাতীয়

কমিউনিটি ক্লিনিকে বাড়ছে রোগী, সংক্রমণ ঝুঁকি নিয়েই সেবাদান 

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯০৯ ঘণ্টা, জুন ৯, ২০২০
কমিউনিটি ক্লিনিকে বাড়ছে রোগী, সংক্রমণ ঝুঁকি নিয়েই সেবাদান 

বাগেরহাট: করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীরা। অন্যান্য সময়ের থেকে ক্লিনিকে রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ায় খুশি স্থানীয়রা। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছে অনেকে।

বাগেরহাট জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ২০৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাট সদরে ৩২, কচুয়ায় ১২, মোরেলগঞ্জে ৫১, শরণখোলায় ১৯, মোংলায় ১৩, রামপালে ২৪, ফকিরহাটে ১৬, চিতলমারিতে ১৯ এবং মোল্লাহাটে ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে।

এসব ক্লিনিকগুলো বেশিরভাগই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। প্রতি ক্লিনিকে নিরাপত্তা সামগ্রী পিপিই মাস্ক, স্যানিটাইজার, হ্যান্ড গ্লাভস দিয়েছে স্বাস্থ্যবিভাগ। রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশমতে সপ্তাহে ৫দিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন।

এছাড়া একজন স্বাস্থ্য  সহকারী ও মাঠ পর্যায়ে কাজের জন্য নিযুক্ত ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিসটেন্ট সপ্তাহে ৩ দিন করে ক্লিনিকগুলোতে সেবা দিচ্ছেন। করোনা পরিস্থিতি শুরুর প্রথম দিকে রোগী কমলেও মে-জুন মাসে প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগী সংখ্যা বেড়েছে। তবে কিছু কিছু ক্লিনিকের ভঙ্গুর অবকাঠামো, হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অযোগ্যতায় সেবাবঞ্চিত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।

বাগেরহাট সদর উপজেলার মুক্ষাইট কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মিজানুর রহমান বলেন, করোনা সংক্রমণের আশঙ্কার মধ্যেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৃণমূল জনসাধারণকে নিয়মিত সেবা প্রদান করছি। প্রায়ই কিছু রোগী আসেন যাদের সমস্যার সঙ্গে করোনা সংক্রমণের উপসর্গের অনেকটা মিল থাকে। ফলে করোনা আক্রান্ত রোগী হলেও তা নির্ধারণ করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়। ক্লিনিকে আগত রোগীদের কাছ থেকে তাদের শারীরিক সমস্যার তথ্য জেনে সিএমইডি এজেন্ট অ্যাপস ব্যবহার করে করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে কিনা তা নির্ধারণ করি। তাদের সচেতনতামূলক পরামর্শ দিয়ে থাকি। সুরক্ষা সামগ্রী ব্যাবহারের মাধ্যমে যতটা সম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আগের থেকে রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

শরণখোলা উপজেলার চৌমোহনা কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার তুষার মুন্সি বলেন, করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ মৌসুমি জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, পেটব্যথা, মাথাব্যথা, বমি ও পাতলা পায়খানা এ ধরণের সমস্যা নিয়ে রোগীরা আসেন আমাদের কাছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি তাদের সেবা দেওয়ার। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও আমাদের ক্লিনিকে রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রোগীদের লাইন।  ছবি: বাংলানিউজচৌমোহনা কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা খাদিজা আক্তার, বিলিয়া আক্তার, তাসলিমা বেগম বলেন, করোনার কারণে হাসপাতালে যেতে পারি না। ঠাণ্ডা গরমের জন্য জ্বর মাথাব্যথা নিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে আসছি। এখানে ডাক্তার দেখালাম। প্রেসার ও ওজন মেপে ওষুধ দিল, চলে আসলাম। গ্রামের অনেকেই এখানে আসেন।

আনছার পহোলান, কবির পহোলান, সুলতান মুন্সিসহ কয়েকজন বলেন, করোনার জন্য কোথাও যেতে পারিনা। কিন্তু স্বাভাবিক রোগ তো আর আমাদের মুক্তি দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে আসি। এখানের ডাক্তারা আগের থেকে ভাল সেবা দিচ্ছে এখন। বর্তমানে বিনামূল্যে ওষুধও দেয় কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে। এ ধারা অব্যাহত রাখার দাবি জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএইচসিপি বলেন, ক্লিনিকের ভবনের অবস্থা ভঙ্গুর, বিদ্যুৎ থাকলেও পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, টিউবওয়েল মেরামত করলেও তা নষ্ট হয়ে যায়, গ্লুকোমিটারটি নষ্ট। এছাড়াও আমাদের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। ফলে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারিনা।

ক্লিনিকের সেবা সম্পর্কে স্থানীয় শীলা রানী সাহা (৪২), সূমিত্রা সাহা (৪০), তৃষ্ণা সাহা (১৩), জোবেদা বেগম (৭০), শিউলি সাহা (৩০), আমেনাসহ (৮০) আরও অনেকে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক না থাকলে স্বাস্থ্যসেবা পেতে তাদের অনেক দূরে যেতে হত, যাতে সময় ও অর্থ ব্যয় হত এবং দুর্ভোগও বাড়তো। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে জ্বর, সর্দি, কাশি, আমাশয়, কাটা, পোড়া, গ্যাস্টিক, এলার্জি, ওজন মাপা, প্রেসার মাপা, ইত্যাদি সমস্যার সেবা পেয়ে থাকি।  

বাগেরহাট সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রদীপ কুমার বকসী বলেন, উপজেলার ৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপিকে করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও উপজেলা পরিষদ থেকে প্রাপ্ত পিপিই, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া হয়েছে। শরীর থেকে স্যাম্পল গ্রহণের উপর একদিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে সিএইচসিপিদের। করোনা ভাইরাসের এই সংকটময় মুহূর্তে সদর উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলি নিরবচ্ছিন্নভাবে তৃণমূল মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। সিএইচসিপিদের অগ্রণীয় সাহসী ভূমিকার জন্য তা সম্ভব হচ্ছে।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, করোনাকালে কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্মীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনার আগের মাসে যেখানে দেড় লাখ রোগী সেবা নিতো, সেখানে করোনা আতঙ্কে এক লাখে নেমে আসে। আমাদের সচেতনতার ও বিভিন্ন পদক্ষেপে কমিউনিটি ক্লিনিকমুখী রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে প্রতিমাসে ১০ থেকে ১২ হাজার রোগী আসে এখানে চিকিৎসা নিতে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সিএইচসিপিদের সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। আমরাও কমিউনিটি ক্লিনিকের সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছি।

বাংলাদেশ সময়: ০৯০৫ ঘণ্টা, জুন ০৯, ২০২০
আরএ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa