ঢাকা, সোমবার, ৫ মাঘ ১৪২৭, ১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জাতীয়

বিশ্ব অভিবাসী দিবসে আয়ারল্যান্ড প্রবাসীদের দাবি

সাজেদুল চৌধুরী রুবেল, আয়ারল্যান্ড থেকে | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০১১১ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৯, ২০১১
বিশ্ব অভিবাসী দিবসে আয়ারল্যান্ড প্রবাসীদের দাবি

বিজয়ের আনন্দের আমেজ কাটতে না কাটতেই সামনে এলো বিশ্ব অভিবাসী দিবস। ১৮ ডিসেম্বর- বিশ্ব অভিবাসী দিবস।

১৯৯০ সালের এ দিনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বের সব অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে একটি সনদ অনুমোদন করা হয়। সেই সঙ্গে দিনটিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। সেইসময় থেকে আমাদের দেশে সিভিল সোসাইটি দিবসটি পালন করলেও সরকারি উদ্যোগে ২০০০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার এবার বেশ ঘটা করেই দিবসটি উদযাপন করতে যাচ্ছে।

সরকারকে এজন্য ধন্যবাদ জানানোর আগে লাল গোলাপ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই সেইসব অভিবাসী ভাইবোনদের যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ঐকান্তিক নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজের দেশের অর্থনীতির সাফল্যের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছেন।

একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রবাসীকল্যাণ সচিবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে,  ‘১৯৭৩-৭৪ সালে এই খাতে বছরে ১০ থেকে ১৫ কোটি রেমিটেন্স আসত। আর এখন সেখানে প্রতিবছর প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রেমিটেন্স আসছে। আর্থিক বিবেচনায় এই খাত থেকে বৈদেশিক সাহায্যের ১০ গুণ, বৈদেশিক বিনিয়োগের ১৩ গুণ বেশি অর্থ উপার্জন হচ্ছে। জিডিপি’তে এ খাতের অবদান ১৩ ভাগ। বাস্তবে এটা ২০ ভাগেরও বেশি। কর্মসংস্থানের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় খাত। ’ শুধু তাই নয় সরকারি হিসেব অনুযায়ী ৭৮ লাখ লোক প্রবাসে অভিবাসী হিসেবে আছেন বলা হলেও মূলত এর বাস্তব পরিসংখ্যান কোটির নিচে নয়।

প্রবাসজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে যেটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি তা হল আমাদের বাংলাদেশি ভাইদের কর্ম ক্ষমতা, দক্ষতা, কাজে অনীহা প্রকাশে অনিচ্ছা, সুনিপুণ কৌশল ও বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি গুণাবলী অন্য যে কোনও জাতির কর্মীদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। আমার এখনো মনে পড়ে, ২০০০ সালের দিকে আমি সিঙ্গাপুর অবস্থানকালে আমার কোম্পানির মালিক এক অন্তরঙ্গ পরিবেশে আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের বাঙালিদের আমি পছন্দ করি কারণ তোমরা সিঙ্গাপুরে কর্মরত অন্য যে কোনও জাতির লোকদের তুলনায় অনেক বেশি স্মার্ট। ’ সত্যি তাই। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে বাঙালি অভিবাসীদের বদনাম যে নেই তা হলফ করে বলা যাবে না সত্যি।   কিন্তু বিদেশি কর্মবাজারে সাধারণ শ্রমিকদের সুনামকে মোটেও অস্বীকার করার জো নেই। স্বীয় সুনাম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে হাজার লক্ষ কোটি বৈদেশিক মুদ্রা যা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ও দেশের উন্নয়নের কাজে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

প্রবাসীদের অবদানের কথা মনে করে সরকার বেশ ঘটা করে দিবসটি পালন করতে যাচ্ছেন। সংবাদে প্রকাশ, প্রবাসী কর্মীদের জন্য এককেন্দ্রিক সেবা চালু করার উদ্দেশ্যে সরকার যে ২০ তলা বিশিষ্ট প্রবাসীকল্যাণ ভবন নির্মাণ করেছেন তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন। এ ভবনে থাকবে মন্ত্রণালয়ের দুটো অণুবিভাগ, ইমিগ্রেশন সার্ভিস, পাসপোর্ট সার্ভিস, প্রবাসীদের  জন্য ব্রিফিং সেন্টার সহ বিদেশে যেতে আগ্রহীদের সব ধরনের সেবামূলক কাজের ব্যবস্থা।

অভিবাসী-দরদী বর্তমান সরকারের এ প্রশংসনীয় উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এর কার্যক্রম যেন কেবল উদ্বোধন বা কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে না যায়। কিংবা ভবনটি যেন ধূর্ত অসাধু কর্মকর্তাদের অপকর্মের সোনার খনি হয়ে না দাঁড়ায়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যারা আছেন তারা যেন ব্যাপারটা দায়সারাভাবে নিয়ে বেমালুম ভুলে না যান।

অভিবাসীদের বিশেষ করে বাঙালি প্রবাসীদের অনেক দুঃখ আছে। দেশের অফিস আদালতে কাজকর্ম করতে গিয়ে সঠিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়া, দেশে ফেরা বা বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন অফিসার বা কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে  অহেতুক ঝামেলা পোহানো, চুরি-ডাকাতিসহ স্থানীয় সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে হুমকি-ধমকি এমনকি প্রাণনাশ ইত্যাদি বিষয়গুলো দূর করতে সরকার আরও বেশি যত্নবান হলে প্রবাসীদের কল্যাণের সাথে সাথে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার (ক্রেডিবিলিটির) পাল্লাটাও ভারি হবে।

প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে উল্লেখ করতেই হয়, কয়েক মাস আগে সিলেটের জগন্নাথপুরের বাসিন্দা  ব্রিটেনপ্রবাসী এক ভদ্রলোক শেষ জীবনটা নিজ দেশে কাটানোর জন্য গেলে স্থানীয় এমপি’র সহায়তায় সন্ত্রাসীরা তাকে খুন করে। এ নিয়ে বাংলানিউজের ‘মুক্তমত’ কলামে আমি লিখেছিলাম। আমার এক বন্ধু দেশে পৌঁছার আগেই তার বাড়িতে টাকা দাবি করে উড়ো চিঠি আসতে থাকে। ইলিয়াস ভুঞা নামের এক বন্ধু ঢাকার এক পল্লীতে প্লট রেখে কিস্তিতে দাম পরিশোধ করার পর বিভিন্নভাবে হয়ারানির মুখে পড়ে দেশের আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। জানি এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু এসবই প্রকৃত বাস্তব যা দেশের প্রতি অভিবাসীদের নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়তা করে। আশা করি, সরকার এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ভেবে তুচ্ছ মনে না করে বরং এসবের প্রতিরোধে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন।

আজকের এ দিনে একটু ভিন্নভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। আমি যেহেতু আয়ারল্যান্ডপ্রবাসী তাই এ দেশে বসবাসরত বাঙালি অভিবাসীদের কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে সরকারের শরণাপন্ন হতে চাই।

বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে ছাত্র, কর্মজীবী বা অন্যান্য বৈধ অবৈধ পেশাদারী সহ প্রায় ৫/৭ হাজারের মতো বাঙালি অভিবাসী বসবাস করছেন। সময়ের দাবিতে এখানে গড়ে উঠেছে বাঙালি কমিউনিটি, আত্ম প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জার্মানি সফরে গেলে আয়ারল্যান্ড থেকে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে দলটির সাধারণ সম্পাদক মোনায়েম খন্দকার রানা নেত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে অভিবাসীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। ২০০৯ সালে ব্রিটেনে বাংলাদেশ হাই কমিশনার ড. আবু সাইদ আয়ারল্যান্ডের লিমরিক সিটিতে এলে স্থানীয় প্রতিনিধিরা তার কাছে একটি দাবি-ই তুলে ধরেছিলেন। তা হল আয়ারল্যান্ডে একটি বাংলাদেশ দূতাবাস স্থাপন করা। বিভিন্ন প্রতিকূলতার কথা বললেও তিনি আমাদের নিরাশ করেননি। কিন্তু আজো অব্দি আমরা এ ব্যাপারে বাস্তব কোনও পদক্ষেপ দেখতে পাইনি।

সরকারের কাছে কমিউনিটি বা রাজনৈতিক নেতারাসহ আয়ারল্যান্ডপ্রবাসী সকল বাঙালির একটি-ই দাবি। আর তা হলো যে কোনও মূল্যে এদেশে একটি দূতাবাস গড়ে তোলা। দূতাবাসের অভাবে এখানে বসবাসরত বাঙালিদের বার্থ সার্টিফিকেটসহ পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যাদি নিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। শুধু তাই নয়, একটি দেশ বা জাতির স্বকীয়তা ফুটিয়ে তোলার জন্যও দূতাবাসের ভূমিকা অপরিসীম।

২০০৭-এ মঈন উদ্দীন-ফখরুদ্দীন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে কারাগারে প্রেরণ করলে আয়ারল্যান্ড থেকে বাঙালি প্রতিনিধি হিসেবে এই আমি সর্ব প্রথম এ অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে জনকণ্ঠ, সংবাদ, প্রথমআলো, ইনকিলাবসহ আরও কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে বিবৃতি প্রদান করি। আজকের এ বিশ্ব অভিবাসী দিবসে তাই প্রিয় নেত্রীর কাছে ছোট্ট মিনতি, তিনি যেন আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাঙালি অভিবাসীদের এ প্রাণের দাবিকে একটু দরদ দিয়ে উপলব্ধি করুন।

লেখক : আয়ারল্যান্ড প্রবাসী
[email protected]

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa