আজাদীর এমএ মালেক বাহাত্তরেও তরুণ সম্পাদক

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

স্বাধীনতা আর স্বাধিকার আন্দোলন নিয়ে অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ‘দৈনিক আজাদী’ বের করেছিলেন পূর্ব বাংলার প্রথম মুসলিম ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক।

চট্টগ্রাম: স্বাধীনতা আর স্বাধিকার আন্দোলন নিয়ে অগ্নিগর্ভ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ‘দৈনিক আজাদী’ বের করেছিলেন পূর্ব বাংলার প্রথম মুসলিম ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক।

কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের দু’বছরের মাথায় ১৯৬২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মারা যান আব্দুল খালেক। এসময় পত্রিকাটির প্রকাশনা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হলেও নেপথ্যে থেকে শক্ত হাতে হাল ধরেন তার একমাত্র ছেলে এম এ মালেক। ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেকের অবর্তমানে তার জামাতা অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সম্পাদনায় এবং এম এ মালেকের কঠোর শ্রম আর সুপরিকল্পিত নীতিনির্ধারণে শুরু হয় আজাদী’র সাহসী পথচলা।

৬৬’র শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফার আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচন, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ -সব ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল আব্দুল খালেকের পত্রিকা আজাদী। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভোরে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যে পত্রিকাটি বের হয় তার নাম দৈনিক আজাদী। এভাবে পত্রিকাটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে নিজের নামটি যুক্ত করে হয়ে গেছে ইতিহাসের কালসাক্ষী।

কিন্তু পত্রিকাটির অর্ধশতকেরও বেশি সময়ের নিরবচ্ছিন্ন পথচলা শুধু নিরঙ্কুশ সাফল্যের মোড়কে গাঁথা ছিল না। প্রতিনিয়ত প্রতিকুলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে এটিকে সফলতার পথে নিয়ে যাবার জন্য যার অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন এম এ মালেক। তিনি দৈনিক আজাদীর বর্তমান সম্পাদক। ইতিহাসের সাক্ষী সফল আজাদীর সফল কারিগর তিনি।

২৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের সর্বজনশ্রদ্ধেয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব চিরসবুজ এম এ মালেকের ৭২তম জন্মদিন। তবে জন্মদিন নিয়ে কোন আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বাসী নন তিনি।

এরপরও বাংলানিউজের পক্ষ থেকে এম এ মালেকের মুখোমুখী হলে তিনি আজাদীর দীর্ঘসময়ের পথচলা, সাফল্যগাথাসহ নানা বিষয় অকপটে তুলে ধরেন।

হকারের মত পত্রিকা বিলি করেছিলেন আজাদী সম্পাদক     

১৯৪০ সালের ২৯ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এম এ মালেক। ঘাটফরহাদবেগ প্রাইমারি স্কুল দিয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু। এরপর এমই স্কুলে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে। কিন্তু বাবা মারা যাবার পর তার পড়ালেখা খুব বেশি একটা এগোয়নি।

বাবার মৃত্যুর পরই একমাত্র ছেলে হিসেবে হাল ধরেছেন দৈনিক আজাদী’র। পত্রিকা ছাপা হওয়ার পর ভাঁজ করে সাইকেল চালিয়ে সেগুলো বিক্রি করেছেন, আত্মীয়স্বজনদের বাসায় দিয়ে এসেছেন। অনেকটা পত্রিকার হকারের মতোই। নিজের এই কষ্টের কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই এম এ মালেকের।

তিনি বলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে হকারদের কাছে নিজেই পত্রিকা সরবরাহ করেছি। এখনও আমি এ কাজের জন্য প্রস্তুত। এতে আমার সম্মানহানি হবে বলে আমি মনে করি না।’

৪০ বছর লোকসান দিয়েছে আজাদী

প্রকাশের পর থেকে টানা ৪০ বছর ধরে লোকসান দিয়েছে দৈনিক আজাদী। এরপরও পত্রিকা প্রকাশনা থেকে সরে আসেননি এম এ মালেক।

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা চট্টগ্রামকে সেবা দিতে পত্রিকা প্রকাশ করেন। লোকসান দেয়ার পরও আমি পত্রিকা বন্ধ করিনি। এ কারণেই করিনি যে, মানুষ বলবে বাবা পত্রিকা প্রকাশ করেছে, আর ছেলে বন্ধ করে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি বাড়ি -জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে, ঋণ নিয়ে পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছিলাম। নানা সংকট সত্ত্বেও প্রতিমাসের সাত তারিখ সংবাদকর্মী ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করেছি। তবে গত দশ বছর ধরে লাভ করছে দৈনিক আজাদী।’

আজাদীর সংবাদকর্মীদের বড় সোর্স ‘সম্পাদক’

দৈনিক আজাদীতে যেসব সংবাদকর্মী বিভিন্ন বিটে কাজ করেন তাদের সবচেয়ে বড় ‘সোর্স’ হলেন তাদেরই সম্পাদক এম এ মালেক। অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনার খবর, নেপথ্যের খুঁটিনাটি বিভিন্ন তথ্য অনেক মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিক পাওয়ার আগেই পেয়ে যান এম এ মালেক। সেইসূত্রে সে খবর পৌঁছে যায় আজাদীর সংবাদকর্মীদের কাছেও।

এম এ মালেক বলেন, ‘আমাদের কাগজে অনেক বড় বড় ও জনগুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ছাপা হয়। যার অধিকাংশরই আইডিয়া আমার। কারণ, আমি সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করি। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় বের হয়ে আসে চমকপ্রদ অনেক সংবাদের ধারণা।’

নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের নিয়ে এম এ মালেকের অনেক আশাবাদ।

তিনি বলেন, ‘অনেকে ভালো করছে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছে। ভালো সাংবাদিকতার জন্য মুভমেন্ট দরকার। ভালো যোগাযোগ নেটওয়ার্ক থাকা উচিত। ঘটনাস্থলে না গিয়ে টেলিফোনে সংবাদ নেওয়ার প্রবণতা আছে কারো কারো মধ্যে। এটা উচিৎ নয়।’  

ছকে বাঁধা এম এ মালেকের জীবন

চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যতম ব্যবসা সফল পত্রিকা দৈনিক আজাদীর সফল সম্পাদক এম এ মালেক জীবনযাপন অন্য অনেকের মত সাধারণ হলেও তার সবকিছুই ছকেবাঁধা নিয়মের মধ্যে।

ঘুম থেকে ওঠেন ভোর ৬টায়। ৮টায় নাস্তা সারেন। দশটায় পুরনো অফিস কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসে যান। এখানে হিসাব দেখে এক ঘণ্টা পর আসেন দৈনিক আজাদীতে। সেখানে থাকেন দুই ঘণ্টা। বাসায় ফিরে দুপুরের খাবার খান। বিকেল পাঁচটার আগে আর কোথাও বের হন না। সাড়ে পাঁচটায় নিজের পুরনো অফিসে গিয়ে সাতটায় ফিরে আসেন। রাতের খাবার খেয়ে সাড়ে আটটায় দৈনিক আজাদী’তে আসেন। থাকেন সাড়ে দশটা পর্যন্ত। এরপর চলে যান চিটাগাং ক্লাবে। এক ঘণ্টা পর আবার ফিরে আসেন আজাদী অফিসে। রাত বারটায় ফেরেন বাসায়। এই হলো এম এ মালেকের প্রতিদিনের রুটিন।

তার দীর্ঘ সাফল্যের পেছনে স্ত্রী কামরুন্নাহার মালেকের অবদান আছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। এম এ মালেকের দু’ছেলে ওয়াহিদ মালেক ও শিহাব মালেক। দু’মেয়ে ফাহমিদা মালেক ও সানজিদা মালেক। সবাই স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
 
দৈনিক আজাদী এম এ মালেকের স্বপ্ন, তার ধ্যান-জ্ঞান। বাবার স্মৃতি ধরে রাখা, নিজের বেড়ে ওঠার সুখ-দুঃখের কাহিনীও আজাদীকে ঘিরেই। নিজের জীবদ্দশায় আজাদীর ৫০ বছর পূর্তি করতে পারাটাই তার কাছে সবচেয়ে মধুর স্মৃতি, বড় পাওয়া ও বড় অর্জন বলে মনে করেন সফল সম্পাদক এম এ মালেক।

বাংলাদেশ সময়: ২১৫১ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৮, ২০১১

Nagad
চীনের সঙ্গে ৯০০ কোটি রুপির ব্যবসা বাতিল হিরোর
সিলেটে বিনামূল্যে বাসায় পৌঁছাবে অক্সিজেন সেবা
সাংবাদিক নাজমুল হকের জন্ম
ইতিহাসের এই দিনে

সাংবাদিক নাজমুল হকের জন্ম

স্বর্ণের মাস্ক পরছেন ভারতীয়!
জাপানে বন্যা-ভূমিধস, ১৫ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা


ভুতুড়ে বিল: ডিপিডিসির ৫ প্রকৌশলী বরখাস্ত, ৩৬ জনকে শোকজ
ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া লিংকেজ তৈরি করা খুবই জরুরি: উপমন্ত্রী
সীমান্তে ২৮টি ভারতীয় গরু জব্দ
লাল-সবুজ পতাকা অস্তিত্বে, তাই শিবনারায়নের পাশে দাঁড়িয়েছি
রাজশাহীতে হারিয়ে যাওয়া সেই শিশুটি বাবাকে ফিরে পেয়েছে