ময়মনসিংহে শহীদ ফিরোজ-জাহাঙ্গীর স্মৃতিস্তম্ভে শেওলা-ধুলোবালির আস্তর

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

২৮ নভেম্বর, সোমবার ময়মনসিংহের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। ১৯৯০ সালের এই দিনে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের বুলেটে শহীদ হন ছাত্র আন্দোলনের ২ বীর সেনানী শেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলম।

ময়মনসিংহ: ২৮ নভেম্বর, সোমবার ময়মনসিংহের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন।

১৯৯০ সালের এই দিনে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের বুলেটে শহীদ হন ছাত্র আন্দোলনের ২ বীর সেনানী শেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলম।

এরপর দেখতে দেখতে ২১টি বছর কেটে গেলেও ‘স্বৈরচারী নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’-এর জন্য জীবন দেওয়া এই ২ শহীদের হত্যার বিচার শুরু হয়নি।

এ ২ শহীদের স্মৃতি চির জাগরুক করে রাখতে শহরের প্রধান সড়কের গাঙ্গিনারপাড় মোড়ে মহকালী স্কুলের পশ্চিম দিকের দেয়াল ঘেঁষে অল্প জায়গায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও শুধুমাত্র অর্থের অভাবে এখনো সম্পন্ন হয়নি এ স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ!

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, বর্তমান প্রজন্মের অফুরন্ত প্রেরণার উৎস লোহার শেকলে ঘেরা এ স্মৃতিস্তম্ভ নিদারুণ অযতœ আর অবহেলার পড়ে আছে। যত্ম নেওয়ারও কেউ নেই যেন!

বেদনার বোধ জাগানিয়া এই ২ বীর সেনানী শেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলমের এ স্মৃতিস্তম্ভের মতোই দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসের জাতীয় বীরের পরিবারেরও এখন আর কেউই খোঁজ নেয় না। অথচ সোমবার ২৮ নভেম্বর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ঠিকই ফুলে ফুলে ভরিয়ে দেবেন এ মলিন স্মৃতিস্তম্ভের বেদি!

কী আবেগী জাতি বাঙালি! অতীত হলেই সব ভুলে যায়- সে দিনের আন্দোলনের এক সঙ্গী বাংলানিউজকে এভাবে তার মনের কষ্ট প্রকাশ করে এ কথাগুলো বলেন।

কী ঘটেছিল সেদিন ?

তখন স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে! ছাত্র-জনতা নেমে আসে রাজপথে। তেমনি একটি দিন ১৯৯০ এর ২৮ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে ময়মনসিংহ শহরের গাঙ্গিনারপাড় মোড়ে ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণ সমাবেশে মিলিত হয়। এ সময়ই পুলিশ সরাসরি গুলি চালায় সমাবেশ-মিছিলে। এতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন বিপ্লবী ছাত্র সংঘ ময়মনসিংহ জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ছাত্রনেতা শেখ মো. ফিরোজ এবং জাসদ ছাত্রলীগ ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম।

নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে মামলা

এর পর শেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলমেরশেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে ওই সময়ের জাসদ নেতা ও বর্তমান জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নুরুল আমীন কালাম পরের বছর ১৯৯১ সালের ২৫ নভেম্বর ময়মনসিংহের আদালতে একটি মামলা করেন।

মামলায় কোতোয়ালি থানার সেই সময়ের ওসি গোলাম সাব্বির, উপপরিদর্শক নুরুল আমিন, হাবিলদার শওকত, নায়েক অপু সারোয়ার, কনস্টেবল ওয়াজউদ্দিন এবং কনস্টেবল শাহজালালকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে আসামি করা হয়।

মামলা দায়েরের পর শুরু হয় অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত। প্রাথমিক তদন্তে  অভিযোগ প্রমাণিত হয়। যেহেতু আসামিরা সবাই পুলিশ কর্মচারী, সেহেতু মামলা আমলে নেওয়ার জন্য সরকারি মঞ্জুরির প্রয়োজন পড়ে। সরকারি মঞ্জুরি আদেশের জন্য সংশ্লিষ্ট ময়মনসিংহের ৩নং আমলি আদালত থেকে ১৯৯৩ সালের ১৫ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

দীর্ঘদিনেও সরকারি মঞ্জুরি না আসায় ২০০১ সালের ২৭ নভেম্বর ময়মনসিংহের ৩নং আমলি আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট এক আদেশে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানান। আদালতের এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০২ সালের ২৫ মে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স থেকে এক চিঠি আসে ৩নং আমলি আদালতে।

এ চিঠিতে ময়মনসিংহ সদর এ সার্কেলের তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের তৈরি করা ও ১৯৯৪ সালের ২৩ জুলাই স্বাক্ষরিত পুলিশ প্রতিবেদনটি যুক্ত করে আদালতে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ চিঠিতে পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স থেকে বলা হয় যে, এ মোকদ্দমাটিতে সরকারি মঞ্জুরি আদেশের প্রয়োজন নেই।

বাদী ও সাক্ষীর বক্তব্য  
চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী, তৎকালীন ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বাংলানিউজকে বলেন, ‘২৮ নভেম্বর ঘটনার দিনই তৎকালীন ওসি ৩ থেকে ৪ হাজার অজ্ঞাত লোককে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৫৯)।

এ মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) প্রসাদচন্দ্র মণ্ডল ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ চূড়ান্ত রিপোর্ট  দেন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পুলিশের দায়ের করা মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্টে উল্লেখ করে নুরুল আমিন কালামের দায়ের করা মামলাটিতে মঞ্জুরির প্রয়োজন নেই বলে জানানো হয়।’

এ হত্যা মামলার বাদী তৎকালীন জাসদ নেতা প্রকৌশলী নুরুল আমিন কালাম বলেন, ‘১৯৯০ পরবর্তী সরকারগুলো ময়মনসিংহের ২ ছাত্রনেতা হত্যায় জড়িতদের বিচারে আন্তরিক হয়নি। সে কারনে এখনো শুরু হয়নি ২ শহীদের হত্যার বিচার।’

লোহার শেকলে ঘেরা স্মৃতিস্তম্ভ- অনাদর আর অবহেলায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সৈনিক শেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলম এ দু’জাতীয় বীরের স্মরণে দীর্ঘ ২১ বছর পরেও অর্থের অভাবে স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। গেল বছর এ স্মৃতিস্তম্ভটি ‘ঠাহর’ (!) করতে দেওয়া হয়েছে একটি সাইনবোর্ড। লোহার শেকলে ঘেরা তালাবদ্ধ এ স্মৃতিস্তম্ভের রক্ষণাবেক্ষণও কেউ করে না। স্মৃতিস্তম্ভের ইটগুলোর পরতে পরতে জমেছে শেওলা আর ধুলোবালির আস্তর। সামনেই চা-পান-বিড়ির দোকান। সম্মানের বদলে সেখানে হেলান দিয়ে অনেকেই চা পান আর সিগারেট টানায় ব্যস্ত থাকেন।

শেখ মো. ফিরোজ ও মো. জাহাঙ্গীর আলম এই ২ শহীদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে রোববার দুপুরে শুধুমাত্র চা-পান দোকানি নুরু মিয়াকে মরিচা পড়া লোহার শেকলে ঘষা-মাজা করতে দেখা গেল!

কেমন আছে শহীদ পরিবার?

‘এ মাসটা এলেই হৃদয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ সৃষ্টি হয়। খুঁজে বেড়াই আমার বুকের মানিক জাহাঙ্গীরের অস্তিত্ব। আমার পৃথিবীটা নিরব, নিথর হয়ে আসে। কোথাও নেই আমার হীরামানিক। স্বৈরাচার এরশাদের ভাড়াটে পুলিশ নিভিয়ে দিয়েছে আমার জাহাঙ্গীরের জীবন প্রদীপ।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমার ছেলে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিলেও ২১ বছর পরেও দেশে গণতন্ত্র সু-প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে কষ্ট লাগে যখন দু’নেত্রী ওই স্বৈরশাসককে সাথে নিয়েই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেন। সত্যিই, কত বিচিত্র এ পৃথিবী আর আমাদের রাজনীতি। স্বার্থের কাছে যেখানে নীতিবোধই নতজানু।’

বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ১৯৯০ সালের ২৮ নভেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের গুলিতে নিহত শহীদ জাহাঙ্গীর আলমের মা নূরজাহান বেগম (৬০)।

রোববার সন্ধ্যায় শহরের ৭০নং আকুয়া লিচু বাগান রোডের বাসায় বাংলানিউজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এমন কথা জানান তিনি।

এখনো ছেলের ছবি বুকে নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদেন এ শহীদ জননী। নিজের মুখেই জানান, ‘মাত্র ১৮ বছর বয়সে ছেলে জাহাঙ্গীরকে হারানোর পর ১৯৯২ সালে পুত্রশোকে মারা যান আমার স্বামী নুরুল ইসলাম।’

ক্ষোভের সঙ্গে এ শহীদ জননী বলেন, ‘মাত্র ১৮ বছর বয়সেই জাহাঙ্গীরকে স্বৈরাচারী এরশাদ আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। এরপর দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। কিন্তু ২১ বছর পরেও আমার সন্তানের হত্যার বিচার পেলাম না। কোনো সরকারই আমার সন্তানের হত্যার বিচার করবে না। তাই আল্লাহ’র ওপর বিচারের ভার ছেড়ে দিয়েছি!’

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করা শহীদ আরেক ছাত্র নেতা শেখ মো. ফিরোজের ময়মনসিংহ শহরের ৭৭ বি/১ হাজীবাড়ী এলাকার একটি জরাজীর্ণ টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকেন তার স্ত্রী রোকেয়া ফিরোজ। একমাত্র ছেলে শেখ মো. ফয়সাল পড়াশুনা করছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সে দিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এ অকাল বিধবা। তিনি বলেন, ‘ফয়সালের তখন মাত্র  দেড় বছর বয়স। ছেলেটা অসুস্থ ছিল। এমন অবস্থাতেই ছেলেকে রেখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বাড়ি থেকে বের হয় ফিরোজ। ও কথা দিয়েছিল, ছেলের জন্য ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওর আর ফেরা হয়নি। ফিরেছে ওর নিথর দেহ!’

রোকেয়া ফিরোজ জানান, ‘স্বামীকে হারানোর পর বেগম জিয়া শহরের ট্রাঙ্কপট্টি এলাকায় ৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন আর শেখ হাসিনা এক লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। সেই জমিতে করা বাসা থেকে মাসে যে ৫ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যায়, সেই টাকা দিয়েই কোনোমতে চলে আমার সংসার।’

ক্ষোভ নিয়ে শহীদ পত্নী বলেন, ‘২১টি বছর কেটে গেল। কত গণতান্ত্রিক সরকার এলো আর গেল। কিন্তু আমার স্বামীর হত্যার বিচার আজও পেলাম না। আল্লাহই ওদের বিচার করবেন!’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য আপোসহীন ছিলেন আমার স্বামী। ছিলেন দৃঢ় চিত্তের অধিকারী অদম্য এক সাহসী তরুণ! তার কাছে সবার ঊর্ধ্বে ছিল দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ।’

আবেগ মিশিয়ে এ নারী বলেন, ‘আমার ছেলেটার নির্বিঘ্নে পড়াশুনার জন্য সরকারের সহযোগিতা দরকার। সরকার যদি ওর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিতো, তাহলে ও হয়ত মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতো।’

বাংলাদেশ সময়: ০৪০০ ঘণ্টা, নভেম্বর ২৮, ২০১১

Nagad
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম
এন্টিবডি কিট থেকে পাটকল ll মুহম্মদ জাফর ইকবাল
যাত্রাবাড়ীতে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-সুরমা-কুশিয়ারার পানি দ্রুত বাড়ার শঙ্কা
ফেসবুকে বন্ধুত্বে প্রতারণা: ১৬ নাইজেরিয়ান কারাগারে


সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে আমির হোসেন আমুর শোক
সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে তাপস-আতিকের শোক
সাহারার মৃত্যুতে বিরোধীদলীয় নেতা-জাপা চেয়ারম্যানের শোক
করোনায় রিজেন্ট হাসপাতাল মালিকের বাবার মৃত্যু
সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে ওবায়দুল কাদেরের শোক