তিস্তাই যদি না হাসে! কী লাভ দিস্তাভরা চুক্তিতে?

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

এবার মনমোহনের সফরে বাংলাদেশের মূল অপেক্ষা ছিল তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির! চুক্তি হলেই যে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুত পানি পায় তা-ও না। গঙ্গাচুক্তির অভিজ্ঞতায় তা আছে। এরপরও আমরা তিস্তার পানি ভাগাভাগির একটা চুক্তি চেয়েছি। এ চুক্তির যেটি চূড়ান্ত হয়েছিল তাতেও বাংলাদেশের যে খুব বেশি লাভ হতো তাও নয়। এরপরও আশা করা হয়েছিল একটা চুক্তি অন্তত হোক। সেখানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে হাঁটা যাবে।

এবার মনমোহনের সফরে বাংলাদেশের মূল অপেক্ষা ছিল তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির! চুক্তি হলেই যে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুত পানি পায় তা-ও না। গঙ্গাচুক্তির অভিজ্ঞতায় তা আছে। এরপরও আমরা তিস্তার পানি ভাগাভাগির একটা চুক্তি চেয়েছি। এ চুক্তির যেটি চূড়ান্ত হয়েছিল তাতেও বাংলাদেশের যে খুব বেশি লাভ হতো তাও নয়। এরপরও আশা করা হয়েছিল একটা চুক্তি অন্তত হোক। সেখানে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে হাঁটা যাবে।

কিন্তু তিস্তা নিয়ে এর মাঝে যত খবর বেরিয়েছে এর পুরোটাই নেতিবাচক। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বেঁকে বসাতে নাকি চুক্তিটি হচ্ছে না! দিল্লিতে এ ব্যাপারে মিডিয়া ব্রিফিংও করেছেন ভারতের সঙশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় সচিব। মমতার পশ্চিমবঙ্গ-বিজয়ে সহজ-সরল বাঙ্গালিরা এদেশে দাঁড়িয়েও আনন্দে নেচেছেন। প্রটোকল ভেঙ্গে তাকে অভিনন্দন পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা! এর সবই আমাদের আন্তরিকতার প্রমাণ। ভালো যারে বাসি তারে পুরোটাই বাসি। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের বাঙালিদের বৈশিষ্ট্য। চায়ের কাপের সঙ্গে পিরিচে ২ টা বিস্কুট রেখে বলি না, ‘পুরোটা খাবেন কিন্তু দাদা। নইলে কিন্তু রাগ করব’!
 
কিন্তু পানিবঞ্চিত এই ভাটির দেশের মানুষের বড় আশার তিস্তা ইস্যুতে নিজের অবস্থান এবং ঢাকা সফর বাতিলের মাধ্যমে মমতা যে বার্তাটি জানিয়ে রাখলেন, আমরা যত আহলাদ দেখাই না কেন, বাঙালি হলেও তিনি আসলে ভারতীয়। আর বাংলাদেশের বিষয়ে সে রাজ্যের সাবেক বামফ্রন্ট সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি আর তার দৃষ্টিভঙ্গি এক না। আওয়ামী লীগের আগের আমলে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর আন্তরিক চেষ্টায় গঙ্গা চুক্তি হয়েছিল। পূর্ব পুরুষের বাংলাদেশকে আসলেই ভালোবাসতেন জ্যোতি বসু। প্রয়াত বসু আর মমতা যে এক না তা যেন বাংলাদেশের নেতৃত্ব ভবিষ্যতে মনে রাখেন।
 
আবার মনমোহনের বিশাল প্রত্যাশার সফরকে কেন্দ্র করে আশায় পানি ঢালার সময়ে হঠাৎ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হবে! সত্যি কী তাই? বুক বেঁধে থাকতে চাই আশায়। অবশ্য মনমোহনের সফরের কতটা আমাদের এই চিকিৎসক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানেন তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রস্তুতির অনেক কিছুতে তাকে এবং পররাষ্ট্র সচিবকে রাখেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হিল্লি-দিল্লির প্রাক আলোচনা, চুক্তির খসড়া প্রস্তুতির সব কিছু করেছেন তার উপদেষ্টারা। ভারতীয় চানক্য কূটনীতির ঘাগু আমলাদের সামাল দিতে কৌশলটা মন্দ না! কিন্তু লাভের গুড় শেষ অবধি কী বরাবরের মতো চলে যাচ্ছে ভারতের গোলায়?
 
ভারত আমাদের কাছে ট্রানজিট চুক্তি, অনুপ চেটিয়াদের ফেরতসহ অনেক কিছু চায়। মিডিয়ার খবরে বেরিয়েছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলাপ না হলেও ট্রানজিটের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে এক রকম চাপাচাপি করে সম্মতি আদায় করেছেন তাঁর দুই উপদেষ্টা আর বিতর্কিত নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান! বিশ্বজনীন বাস্তবতা ট্রানজিট। আমরাও এর বাইরে যেতে বা থাকতে পারি না। কিন্তু যেখানে এখন অবধি এর অবকাঠামোই নেই, সেখানে এসব চাপাচাপির নেপথ্য মাজেজা জানতে কী অপেক্ষা করতে হবে উইকিলিকসের লেটেস্ট কোন নথির? কারণ ভারতের সঙ্গে নৌচলাচল চুক্তি যেটি আছে সেটিতে কোন শুল্ক পায় না বাংলাদেশ। নৌপথ ঠিক রাখতে বার্ষিক একটি টাকা পায়। যা খরচ হয় পানির নিচে। নৌপথ আর ঠিক হয় না!
 
মনমোহনের কাছে বেশি আশার কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে গাঙ্গেয় বদ্বীপের এদেশটাকে তিনি চেনেন জানেন। মুক্তিযুদ্ধের পরপর ঢাকা এসে যুদ্ধবিধবস্ত দেশটির পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গেও কাজ করেছেন। এসব অভিজ্ঞতায় নানা সময়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবে না ভারত! আমরা তাকে বিশ্বাস করি অথবা করে যাচ্ছি।

কারণ তিনি কংগ্রেস নামের এমন একটি দলের সরকারের প্রধানমন্ত্রী যে দলের নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। হানাদার পাকিস্তানি সেনা আর তাদের এদেশীয় দোসরদের হামলা-আক্রমণে ভীত-সন্ত্রস্ত প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এককোটি বাঙ্গালি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তখন তাদের খাবার-আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন ইন্দিরা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমেরিকা-চীনসহ নানাদেশের বিরোধিতার মুখে সারা দুনিয়া ঘুরে সমর্থন জোগাড় করেছেন বাংলাদেশের পক্ষে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১১ হাজারের বেশি জওয়ান। মুক্তিযুদ্ধের ৩৯ বছর পরে হলেও ইন্দিরাকে দেয়া হয়েছে সে সব অবদানের কৃতজ্ঞার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান।

কিন্তু সীমান্তের তিন দিক থেকে ঘেরা ভারত নামের সেই বৃহৎ প্রতিবেশি দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এত সবকিছুর পরও বরাবর ভালো যায়নি। বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে খায় তেমন বিগ ব্রাদার সুলভ ভারতীয় দাদাগিরি, আমাদের ভিতরের পাকিস্তানপন্থি মানুষগুলার বিট্রেসহ নানাকিছুর কারণে এটা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু এতসব কিছুর পরও যে বিষয়টি একদিনের জন্যেও থেমে থাকেনি তাহলো গত ৩৯ বছরে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে ভারতীয় পণ্যের বিশাল এক বাজার! এখন ঢাকার বিমান বন্দরে নেমে সিএনজি অটো, ট্যাক্সি থেকে শুরু করে ঘরেবাইরে যেখানে যা চাই যা পাই সব ভারতীয়!

অথচ এই ৩৯ বছরের বেশিরভাগ সময় ঢাকার ক্ষমতায় ছিলেন সো-কল্ড অ্যান্টি ইন্ডিয়ানরা। বাংলাদেশকে ভারতের বড় বাজারে পরিণত করাটা তাদের আমলেই বেশি হয়েছে। সবশেষ বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে ভারতীয় লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ির একচেটিয়া বাজার সৃষ্ট করতে জাপানি রি-কন্ডিশন্ড গাড়ির আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেসব গাড়ির বেশিরভাগ এরই মাঝে পরিত্যক্ত হয়ে গেছে।

চিকিৎস, বেড়ানো,আজমির শরিফ জিয়ারত ও পড়াশুনাসহ নানা কারণে প্রতিবছর এদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভারতে যায়। এদের অনেকে আছেন, দেশে ভালো কামাই-রোজগার করেন, মাঝে মাঝে একটু বিয়ার খেতে মন চায়। এখানে তা সহজলভ্য নয় বা কেউ দেখে ফেলার ভয় আছে। সৌদি আরবের লোকজন যেমন এমন আমোদ-ফূর্তি করতে বাহরাইন চলে  যান, বাংলাদেশিদেরও তেমন সহজ গন্তব্য ভারত।
 
ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস বছরে ছয়লাখের বেশি ভিসা ইস্যু করে। ভিসাপ্রার্থীদের চাপের চোটে তারা এর মাঝে বিষয়টি নানান এজেন্সির হাতে তুলে দিয়েছে। শুধু সাংবদিকসহ স্পর্শকাতর(!) চিহ্নিত পেশার লোকজনের ভিসার আবেদন নেয়া-দেয়ার বিষয়টিই নিজেদের হাতে রেখেছে। এমনিতে ভারতে যেতে কোন ভিসা ফি লাগে না। কিন্তু এই ভিসাপ্রাপ্তদের সঙ্গে বৈধ-অবৈধভাবে কী বিশাল পরিমান ডলার চলে যায় তা কী কেউ কোনদিন হিসাব করে দেখেছেন? অস্ট্রেলিয়ায় যে ছাত্রটি পড়তে আসে সে কাজ করে পড়ে। আর ভারতে যারা পড়তে যায় তাদের সবাই পড়ে বাবার টাকায়। ভারতের সঙ্গে ট্রেন-বাস যতকিছু চালু হয়েছে এসবের নব্বুই ভাগ বা এরও বেশি যাত্রী বাংলাদেশি। সীমান্তে ফালানির মতো ঘটনায় যখন প্রতিবাদ, হৈচৈ হয় তখনও এ বিষয়গুলো ওঠে না।
 
কাজের আশায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশসহ নানান বাস্তব সমস্যার সময়েও ভারতীয় নেতারাও বাংলাদেশের অবস্থার উন্নতিতে সহায়তার কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে তা করেন না।

গঙ্গার পানিচুক্তি ঠিকমতো বাস্তবায়ন হলে কী তাতে তা বাংলাদেশের অবস্থার উন্নয়নে সহায়ক হতো না? তিস্তার পানির ন্যায্য হিসসা দিয়ে চুক্তি, তা বাস্তবায়ন করলে কী তা দু’দেশের আস্থার সম্পর্কের অগ্রগতি ঘটাতো না? আসলে বিগ ব্রাদার আর চানক্য কূটনীতির মূল সুরটিই লিখে গেছেন বাঙালি সেই বিশ্বকবি, ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভুরি ভুরি....!’
 
মনমোহনের সফরে অতিথিদের কী কী ব্যঞ্জনের খাওয়া-দাওয়া হবে সে তালিকা ছাপা হয়েছে। উপহারের জন্য তৈরি রাখা হয়েছে দেড়শ মন ইলিশ আর জামদানির বিশাল কালেকশন্স। আসলে আমরা এসবই ভালো পারি। অতিথিদের জন্য সব পারি। কিন্তু এই সব কথার মূল কথা হচ্ছে এবারের মনমোহনের সফরের সুবাদে তিস্তা চুক্তিই যদি না হয়, তিস্তাই যদি না হাসে, অর্থনীতিবিদ মনমোহন যদি প্রতিবেশী পটেনশিয়াল এই বন্ধুরাষ্ট্রটির অর্থনৈতিক বিকাশের বাস্তব গুরুত্বই না বোঝেন তাহলে সব কিন্তু বিফলে যাবে।
 
শেখ হাসিনার সবশেষ সফরের সময় স্বাক্ষরিত ঋণ চুক্তি, খাদ্য সরবরাহ চুক্তির বাস্তবায়ন এখনও হয়নি। বন্ধ হয়নি সীমান্তে বিএসএফ’এর মানুষ হত্যা। এসব যদি অবিরাম অমিমাংসিত থাকে, শুধু মিঠা কথায় সম্পর্ক আগাবে না। মনমোহনের সফরের বাস্তব আউটপুট চায় বাংলাদেশ। নইলে তা কিন্তু দেশে সরকার বিরোধী আন্দোলনেরও নতুন ইস্যুর সৃষ্টি করবে। ঢাকায় ক্ষমতাসীন তাদের বন্ধু-সরকার বিপদে পড়বে । যে সরকারের বিপদের আশংকা স্বয়ং মনমোহনই কিছুদিন আগে প্রকাশ করেছিলেন।

ফজলুল বারীঃ সিডনিপ্রবাসী সাংবাদিক।

বাংলাদেশ সময় ১০৩৬ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০১১

নদীর পাড়ে ঈদ বিনোদন
হবিগঞ্জে দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১, আটক ৪
জেনারেল হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু
শুধু সাধারণ জীবাণু নয়, করোনা রুখতেও মাউথওয়াশ!
আনোয়ারা রাব্বীর মৃত্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শোক


পালানোর চেষ্টা করোনা রোগীর, ধরে হাসপাতালে পাঠালো পুলিশ
মঠবাড়িয়ায় তরুণীকে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় যুবক গ্রেফতার
ঈদের দিনেও বিষোদগারের রাজনীতি থেকে বের হয়নি বিএনপি
ঈদেও থেমে নেই সিএমপির সদস্যরা
প্রকৌশলী দেলোয়ারের হত্যাকারীদের বিচার চায় টিআইবি