বিশ্রামহীনতা ঘাতক করে তুলছে চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের চালকদের

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

চালক ও সহকারীদের ত্রুটিপূর্ণ শিডিউল দিয়েই বছরের পর বছর চলছে ‘চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স’ পরিবহন। এ পরিবহন কোম্পানিটির শিডিউলে চালকদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।



ঢাকা: চালক ও সহকারীদের ত্রুটিপূর্ণ শিডিউল দিয়েই বছরের পর বছর চলছে ‘চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স’ পরিবহন। এ পরিবহন কোম্পানিটির শিডিউলে চালকদের বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

এমনকি চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকা পৌঁছে তড়িঘড়ি ফিরতি পথ ধরতে হয় তাদের। অনেক সময় বাস থেকে নামারই ফুরসৎ মেলে না। চালকদের এরকম বিশ্রামহীন শিডিউল অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের মালিক স্থানীয় মজিবুল হক। তিনি ২০ বছর ধরে ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা পরিবহন ব্যবসায় জড়িত। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ , আলমডাঙ্গা  ও ঢাকার গাবতলিতে কাউন্টার রয়েছে। ঢাকায় চলাচল করে তার মোট ৮টি গাড়ি।

এ সার্ভিসের চালক ও সহকারীদের বিরতিহীন সিডিউলের পক্ষে সাফাই গাইলেন মালিক নিজেই। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, গত ১৫ বছর ধরে একজন চালকই ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা যাওয়া আসা করছে। এতে তাদের শারীরিক কোনো সমস্যা হয়নি। শনিবার এত বড় দুর্ঘটনার পেছনে চালকের বিরতিহীন গাড়ি চালানোর দিকে ইঙ্গিত করা হলেও চালকদের এই সিডিউল পরিবর্তন করার আপাতত কোনো চিন্তা নেই বলে তিনি জানান।

শনিবার মানিকগঞ্জে সংঘটিত ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে এ ত্রুটিপূর্ণ শিডিউলও অনেকাংশে দায়ী বলেও ভাবা হচ্ছে।

ওই দুর্ঘটনার সময় বাসে থাকা যাত্রী ও বাস পরিচালনায় জড়িতদের সাথে আলাপ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা গেছে, এমনই এক বিশ্রাম না পাওয়া চালক শনিবার ঢাকা-মানিকগঞ্জ সড়কে খ্যাতনামা চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও সংবাদ মাধ্যম ব্যক্তিত্ব মিশুক মনিরসহ ৫ জনের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ান।

ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গার দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। চুয়াডাঙ্গা থেকে ছেড়ে আসা গাড়ি ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর মোড় হয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে এসে ফেরিতে ওঠে। এপারে পাটুরিয়া ঘাটে নামার পর  মানিকগঞ্জ দিয়ে গাবতলী পৌঁছায়।

এভাবে ঢাকা আসতে সময় লাগে ৫/৬ ঘণ্টা। দশ থেকে পনেরো মিনিট বিরতি দিয়ে আবার ফিরতি পথ ধরতে হয় চালককে।

রোববার চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরবহনের গাবতলীর কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বসে আছেন দু’জন স্টাফ। এদের মধ্যে একজন কাউন্টার মাস্টার, অপরজন তার সহকারী।

কাউন্টার মাস্টার স্বপন বাংলানিউজকে জানান, দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যে চালক চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় একটি ট্রিপ নিয়ে আসেন তিনিই আবার তা ছ’ঘণ্টা চালিয়ে চুয়াডাঙ্গা নিয়ে যান। এর মাঝখানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বিরতি। এভাবেই বছরের পর বছর এ সার্ভিস চলছে।

তিনি জানান, কাউন্টারে বসে বিশ্রাম করার কোন জায়গা নেই, তাই বিরতির সময়টুকু বাসের মধ্যেই কাটিয়ে দেন চালক ও সহকারীরা।

কেন একই চালক যৎসামান্য বিরতিতে এতবড় ঝুঁকি নেয় তা জানতে চাইলে এ ব্যাপারে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হননি।

অথচ এই সার্ভিসেরই নাম আবার ‘ডিলাক্স এক্সক্লুসিভ’।

এদিকে শনিবারের দুর্ঘটনার সময় বাসে থাকা দ্ইু যাত্রী বাংলানিউজকে দুর্ঘটনার বর্ণনা দেন। তারা হলেন- চুয়াডাঙ্গা শহরের শেখ পাড়ায় বাপ্পী ও একই জেলা সদরের ভালাইপুর গ্রামের রুপক।

বাংলানিউজকে তারা বলেন, ‘বাসটি গাবতলী থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশে রওয়ানা হয়। সাভারে যানজটের কারণে কিছুটা দেরি হয়। ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১২ টা ৪০ মিনিট। বৃষ্টি ঝরছিল। রাস্তায় যানবাহন তেমন ছিল না। বাসটি মানিকগঞ্জের জোকা নামক স্থানে এলে প্রথমে একটি ট্রাক বাসটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তারপর আসে মাইক্রোবাস। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচ- শব্দে আমাদের বাসের সাথে মাইক্রোটির সংঘর্ষ হয়। মাইক্রোর এক পাশ পুরো দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

তারা বলেন, ‘প্রচ- ঝাঁকুনিতে আমাদের বাসটি পার্শ্ববর্তী একটি গাছের সাথে ধাক্কা খায়। এতে বাসের সামনের গ্লাস ভেঙ্গে যায়। বের হওয়ার দরজা বাঁকা হয়ে যায়। এ সময় বাসযাত্রীদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ জানালা দিয়ে লাফ দেয়। পরে একটি শাবল দিয়ে দরজা খোলা হয়। তৈরি হয় নারকীয় পরিবেশ।’

বাসের ওই দুই যাত্রী আরো জানান, বাসটি রাস্তার একটি গতি নিয়ন্ত্রক পার হয়েই একটি বাক ঘোরার সময় দুর্ঘটনায় পড়ে। বৃষ্টির কারণে তখন বাসের সামনের কাঁচ দিয়ে বাইরের সবকিছু অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল।’

বাসের ভেতরে সুপাভাইজার ও চালকের সহকারীকে মাঝে-মাঝে তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল বলে জানান তারা।

দুর্ঘটনার পর ওই সার্ভিসের আরেকটি বাসে করে যাত্রীরা চুয়াডাঙ্গা পৌঁছেন বলেও জানান ওই দুই যাত্রী।

চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের এই ত্রুটিপূর্ণ শিডিউলের কথা নিশ্চিত করে চুয়াডাঙ্গা কাউন্টার ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন আনু বাংলানিউজকে জানান, চুয়াডাঙ্গা-ঢাকা আসা-যাওয়ায় সময় একটি গাড়িতে ৩ জন স্টাফ থাকে । তাদের ১ জন ড্রাইভার,  ১ জন সুপার ভাইজার ও  ১ জন সহকারী (হেলপার)। যে গাড়ীটি ভোর সাড়ে ৪টায় চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকা যায় সেই গাড়িটিই আবার ঢাকা থেকে সকাল সাড়ে ১০টায় চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

তিনি জানান, ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা একবার আসা যাওয়া করলে চালক  ৮৫০ টাকা, সুপার ভাইজার ৪৫০ টাকা ও সহকারী ৩৫০ টাকা পায়। এদের মাসিক বেতন ৫০০ টাকা। প্রতিমাসে প্রতি চালক ও সুপার ভাইজার গড়ে ১৩-১৪ দিন ঢাকা- চুয়াডাঙ্গা আসা যাওয়া করে।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাস ছাড়ার কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে চালক ও সহকারীদের কাউন্টারে আসতে হয়। সে হিসেবে বিরতিহীনভাবে ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা গাড়ী চালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য চালক ও সহকারীদের এ ত্রুটিপূর্ণ শিডিউল পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে শনিবারের দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির চালক জামির হোসেনসহ বাসে থাকা তিন স্টাফের এখন পর্যন্ত কোন হদিস দিতে পারেনি তাদের পরিবার ও বাস কর্তৃপক্ষ।

চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স সঠিক আছে কি-না তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কাউন্টার ব্যবস্থাপক আনু।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে চুয়াডাঙ্গা বিআরটিএ কর্মকর্তা শেখ মামুন আল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, ‘লাইসেন্স নম্বর না জানলে বলা মুশকিল। চুয়াডাঙ্গা অফিস থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে প্রায় ৪ হাজার লাইসেন্স ইস্যু হয়েছে।’

চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান বাংলানিউজকে জানান, ঘটনার পর থেকে বাসের চালক জামির পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

তদন্ত কমিটি, মামলা
শনিবারের দুর্ঘটনার পর থেকে দুর্ঘটনা কবলিত বাসটি এখনও মানিকগঞ্জের ঘিওর থানায় রয়েছে।

থানার ওসি রইচ উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, ঘটনার পর এ ব্যাপারে পুলিশ বাদি হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছে।

এদিকে এ ঘটনায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটিও কাজ শুরু করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- মনিকগঞ্জ সদর সার্কেলের এএসপি নুরে আলম, ঘিওর থানার ওসি রইচ উদ্দিন, জেলা ডিবি ওসি আশরাফ উদ্দিন ও ট্রাফিক পরিদর্শক মুরাদ হোসেন।

কমিটিকে পাঁচদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ ব্যাপারে কমিটির প্রধান জাকির হোসেন বাংলানিউজকে জানান, কমিটির সদস্যরা রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কমিটি দুর্ঘটনার কিছু কারণ ইতিমধ্যেই পেয়েছে এবং বাকি কাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হবে।

এর আগে সড়ক ও জনপদ ঢাকা সর্কেলের তত্ত্বাবধায়ক আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।  

বাংলাদেশ সময়: ২১২৭ ঘণ্টা, আগস্ট ১৪, ২০১১

ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে জ্বলে উঠলো ৫২শ' মোমবাতি
সারাদেশে একুশের প্রথম প্রহরে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
গর্বের সঙ্গে বাংলার ব্যবহার চায় ভারতের নদীয়ার প্রতিনিধিদল
ভেঙে পড়লো রাসিক মেয়র লিটনের সংবর্ধনা মঞ্চ
রামুতে বর্ণমালা হাতে হাজারো শিক্ষার্থীর কন্ঠে একুশের গান


ভাষাশহীদদের প্রতি বিরোধী দলীয়নেতা রওশনের শ্রদ্ধা
মাতৃভাষার জন্য ভালোবাসা
একুশে ফেব্রুয়ারি: বাঙালির আত্মপরিচয়ের দিন
বাংলায় দেওয়া রায়ে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ
প্রথম প্রহরেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জনস্রোত