স্বাধীনতার ৪০ বছর পেরিয়ে

স্বীকৃতিহীন বীরাঙ্গনা আরিনা-মুক্তিযোদ্ধা স্বামী আজও অনাহারে-অর্ধাহারে

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর এক এক করে পেরিয়ে গেছে ৪০টি বছর। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এক বীরাঙ্গনা সৈনিক হয়েও তার ভাগ্যে জোটে এতটুকু স্বীকৃতি! বরং তার হতভাগ্য স্বামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে এখন আরো বিপদে পড়েছেন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই!

মৌলভীবাজার: ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর এক এক করে পেরিয়ে গেছে ৪০টি বছর। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের এক বীরাঙ্গনা সৈনিক হয়েও তার ভাগ্যে জোটে এতটুকু স্বীকৃতি! বরং তার হতভাগ্য স্বামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে এখন আরো বিপদে পড়েছেন স্বামী-স্ত্রী দুজনেই!

এই মহান বীরাঙ্গনার নাম মোছা. আরিনা বেগম। তার স্বামীর নাম
মো. মোতালিব মিয়া। বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বড়চেগ গ্রামে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে দিনমজুর মো. মোতালেব মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

এরপরের বছর ৭১-এ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখতে গিয়ে তিনি নিজের সম্ভ্রম হারিয়ে হয়ে যান এক মুক্তি  সৈনিক ‘বীরাঙ্গনা’। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের পর অনেকের ভাগ্য বদলালেও বদলায় নি এই বীরাঙ্গনা ও মুক্তিযোদ্ধা মোতালিবের ভাগ্য। তিনি এখন  দিন কাটাচ্ছেন কখনো অনাহারে, কখনো অর্ধাহারে। সেই সঙ্গে অর্থকষ্ট তো তাদের নিত্যসঙ্গী!

আরিনা বেগম জানালেন, তার যখন বিয়ে হয়, তখন স্বামী মোতালিব মিয়া শ্রমিকের কাজ করতেন চট্টগ্রাম জেনারেল আয়রন অ্যান্ড স্টিল মিলে।

চাকরির সুবাদে তখন শ্রমিকনেতা এম.এ. হান্নান, জহুর আহমদ চৌধুরীর মতো প্রখ্যাত রাজনীতিবিদদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। সে সুবাদে যুবক মোতালিব আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ট কর্মী হিসেবে জড়িয়ে পড়েন ৬৮-এর ৬ দফা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে।

৭১-এর ২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকায় গণহত্যার সংবাদ পরের দিন চট্টগ্রামে পৌঁছালে মোতালিব সব কিছু ছেড়ে দিয়ে ৭ দিন পায়ে হেঁটে ১লা এপ্রিল কমলগঞ্জের বড়চেগ এসে পৌঁছান। তখন মৌলভীবাজারের শেরপুরে পাকিবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ চলছে।

স্বামীর সাহসী ভূমিকার কথা বলতে বলতে আরিনা বেগমের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

তিনি জানান, বাড়ি এসে মোতালিব এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী মনাফ মিয়া, ইছাক মিয়া, মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ ও খাবার সংগ্রহ করে তা পৌঁছানোর কাজ শুরু করেন।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পাকিহানাদার এবং তাদের এ দেশিয় দোসররা বেশ কয়েকবার মোতালিবকে হাতেনাতে ধরার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়। এর পরপরই তিনি বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে প্রথমে মৌলভীবাজারের শ্যামেরকোনা গ্রাম ও পরে রাজনগরের নিদিরমহল গ্রামে আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় আত্মগোপনে থেকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে থাকেন।

পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ালো, তখন ২৫ অক্টোবর রাতে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে শেষবারের জন্য দেখা করতে এলে ধরা রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে যান মোতালিব।

আরিনা বেগম জানান, রাজাকার ছিদ্দেক ও মোস্তফা মিয়ার নেতৃত্বে ৭/৮ জন রাজাকার রাতের আঁধারে বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। পরে ঘরের দরজা ভেঙে মোতালিবের হাত-পা বেঁধে আমানুষিক নির্যাতন চালায়। রেহাই পেলেন না পাননি তার অসুস্থ মা, ছোট ভাই-বোন ও স্ত্রী আরিনা বেগমও।

নরপশুরা বাড়ির সবার সামনে তার স্ত্রী আরিনা বেগমকে জোর করে বিবস্ত্র করে পর্যায়ক্রমে পাশবিক নির্যাতন চালায়। ওইদিন রাতেই চোখ বেঁধে মোতালিবকে নিয়ে যাওয়া হয় চৈত্রঘাট রাজাকার ক্যাম্পে। ২৬ অক্টোবর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউজ এলাকার পাকিবাহিনীর নির্যাতন সেলে। সেখানে টানা ১০ দিন নির্যাতনের পর ৪ ডিসেম্বর মোতালিবসহ ৩ জন বন্দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তৎকালীন এসডিও বাংলোয় অবস্থানরত পাকি মেজর আজিজের সামনে।

সেখান থেকে তার সঙ্গের অপর ২ সহযোগীকে গুলি করে হত্যা করা হলেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান মোতালিব। কী মনে করে মেজর তাকে গুলি করতে নিষেধ করেন। পরে তাকে হত্যা না করে জেল-হাজতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

৭ নভেম্বর তারিখে একইভাবে ধরা পড়ে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে জেল-হাজতে আসেন তার অপর এক সহযোগী ইছাক মিয়াও। মাসাধিক কারাভোগের পর ৮ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী মৌলভীবাজার শহর আক্রমণ করে জেলের দরজা ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করলে তারা দু’জনও মুক্ত হন।

দেশ স্বাধীনের পর বিগত ৭৯ সালে মোতালিব ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তুু বিধি বাম! সেখানে এক সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন মোতালিব।

এ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন বীরাঙ্গনা আরিনা বেগম।

১৯ মে বিকেলে বাংলানিউজের সঙ্গে যখন আরিনা বেগম কথা বলছিলেন, তখন পাশে বসে মোতালিব স্ত্রীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।

তিন কন্যা সন্তানের জনক মোতালিব সেই থেকে আজ পর্যন্ত আর্থিক দৈন্যতার কারণে তার পরিবার-পরিজনদের নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটালেও কোনো সরকারি সাহায্যের ছিটেফোঁটাও তাদের ভাগ্যে জোটেনি।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কিংবা সরকারি-বেসরকারিভাবে কেউই এই অসহায় পরিবারটির জন্য সাহয্যের হাত বাড়ায়নি। সাহায্যের হাত বাড়ানো তো দূরের কথা, খোঁজও নেয়নি। প্রয়োজনও বোধ করেননি কেউ!

আর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতিটুকু? সেটুকও মেলেনি! কমলগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, স্থানীয় বতর্মান সাংসদ সরকার দলীয় চিফ হুইপ, উপাধ্যক্ষ আব্দুশ শহীদ, আওয়ামী লীগ নেতারাসহ  অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মোতালিবের পরিবারকে অনেক আশ্বাস দিলেও সেই আশ্বাস আর আলোর মুখ দেখেনি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঘোষণা দেওয়ায় তারা সিদ্ধান্ত নেন আদালতে এলাকার যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের।

তারপর ২০০৯ সালের ১ জুলাই সেই আরিনা-মোতালিবের মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতালিব নিজে বাদী হয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কমলগঞ্জের কুখ্যাত রাজাকার ছিদ্দেক মিয়াসহ ১৫ জনকে আসামি করে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আইনজীবীদের ফি যোগাতে না পারায়  মৌলভীবাজারে কোনো আইনজীবীর সহায়তা তারা পাননি। এরপর থেকে বাদী মোতালিব নিজেই মামলাটি পরিচালনা করে যাচ্ছেন।

এদিকে, মামলার অভিযুক্তরা এখনও এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মোতালিবের পরিবারকে নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি  দেখিয়ে যাচ্ছে।

আরিনা বেগম বাংলানিউজকে ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, ‘আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ট কর্মী ও একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও এই মামলার ব্যাপারে তার স্বামী কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না।’

এরপরও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার যখন এই স্বাধীন বাংলার মাটিতে হয়েছে, তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও অবশ্যই একদিন হবে।’

তিনি আশা করেন, তাদের পরিবারও একদিন অবশ্যই ন্যায় বিচার পাবে।

আরিনা ও মোতালিব দম্পতির ব্যাপারে মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সাংসদ ও মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলী বাংলানিউজকে বলেন, ‘মোতালেব মিয়া ও আরিনার মতো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্বাধীনতার ৪০ বছরেও আমরা কেউ কিছুই করতে পারিনি, এটা আমাদের সবার জন্য লজ্জার!’

বাংলাদেশ সময়: ১৮৪০ ঘণ্টা, মে ২২, ২০১১

ওসির গাড়িতে গর্ভবতী নারীকে নেওয়া হলো হাসপাতালে
রামগতিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সাংবাদিক নিহত
করোনায় সিরিয়ায় প্রথম মৃত্যু
স্বল্প পরিসরে চেক ক্লিয়ারিং করার নির্দেশ
করোনায় ইতালিতে আরও ৭৫৬ জনের মৃত্যু


করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ১ দিনের বেতন দিলেন সেনা সদস্যরা
মাঠে নেমে সহায়তা করছেন বলিউড তারকারা
ল্যাব না থাকলেও সিংড়ায় গেল দুই'শ করোনা টেস্টিং কিট
মানুষকে টেলিফোনে চিকিৎসাসেবা দিতে ফারাজের উদ্যোগ