অশীতিপর সেই রাবেয়ার মামলার কার্যক্রম স্থগিত

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

হাইকোর্টের ফাইল ফটো

walton

ঢাকা: ১৮ বছর আগে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় অশীতিপর রাবেয়া খাতুনের মামলার কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।

php glass

সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর করা আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) এ আদেশ দেন।

‘অশীতিপর রাবেয়া; আদালতের বারান্দায় আর কত ঘুরবেন তিন ‘ শীর্ষক শিরোনামে ২৫ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনযুক্ত করে এ আবেদন করেন আইনজীবী মো. আশরাফুল আলম।

এরপর আদালত মঙ্গলবার এ আদেশ দেন বলে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সরওয়ার কাজল। 

তিনি জানিয়েছেন, মামলার নথি তলব করে বিচার বিলম্বের ব্যাখ্যা দুই সপ্তাহের মধ্যে জানতে চেয়েছেন আদালত। পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ১২ মে দিন রেখেছেন হাইকোর্ট।

রাবেয়া খাতুনের বরাতে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ বছর ধরে আদালতে হাজিরা দেন রাবেয়া। মামলা শেষ হয় না। কবে শেষ হবে, তাও জানেন না। ওই দৈনিককে রাবেয়া বলেন, ‘পুলিশরে শরবত, মোরাব্বা বানাই খাওয়াছি। তারপরেও মামলায় আমারে আসামি বানাইছে। আমি আর বাঁচতে চাই না। মরতে চাই। অনেকদিন ধরে এই মামলায় হাজিরা দেই। আদালত আমাকে মামলা থেকে খালাসও দেয় না, শাস্তিও দেয় না।’

অবৈধ অস্ত্র ও গুলি নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধে তেজগাঁও থানার এসআই আবদুর রাজ্জাক বাদী হয়ে অশীতিপর রাবেয়া খাতুনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিলেন ২০০২ সালের ২ জুন। 

মামলা নম্বর ১৯৩৮/০২। এরপর তিনি গ্রেফতার হন, ছয় মাস কারাগারে থেকে জামিনও পান। পরে তাকেসহ দুই আসামি জুলহাস ও মাসুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ২০০৩ সালের ২৪ মার্চ শুরু হয় মামলার বিচার।

তেজগাঁও থানা এলাকার ৩/ক গার্ডেন রোড, কাজী আবদুল জাহিদের ঘরের দক্ষিণ পাশ থেকে গ্রেফতার করা হয় রাবেয়া খাতুনকে। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধারের দাবি করে পুলিশ। সেই মামলা থেকে মুক্তি পেতে ঢাকার আদালতের বারান্দায় ১৮ বছর ধরে ঘুরছেন এই অশীতিপর মানুষটি।

রাবেয়ার আদালতে হাজিরার দিন ছিল ২৪ এপ্রিল (বুধবার)। যথাসময়ে সকাল সাড়ে ৯টায় তিনি ঢাকা মহানগর ১ নম্বর অতিরিক্ত জজ আদালতের দোতলায় লাঠিতে ভর দিয়ে হাজির হন। পরনে ম্যাক্সি ও চোখে চশমা। এক হাতে পানের পলিথিন ব্যাগ, সঙ্গে মোবাইল। 

হাজির হন এজলাস কক্ষের পেছনের বেঞ্চে। ন্যুব্জ হয়ে গেছেন বয়সের ভারে। পরিচয় দিয়ে মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি, ‘কেউ যদি আমাকে গলা কেটে মেরে ফেলতো তাও শান্তি পেতাম। এই যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।'

মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরের সমীরপুর গ্রামে জন্ম রাবেয়ার। বিয়ের পর বাবা আদর করে শ্বশুরবাড়ি যেতে দেননি। টাঙ্গাইল জেলার বাসিন্দা স্বামী শাহজাহান সিরাজ কৃষিকাজ করতেন সে সময়। স্বাধীনতার পর দেশে কলেরা মহামারির রূপ নিলে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। 

রেখে যান দুটি মেয়ে। বর্তমানে রাবেয়া মিরপুর কাজীপাড়ায় তার ছোট মেয়ের বাসায় থাকছেন। সেখান থেকে প্রতি তারিখে এসে আদালতে হাজিরা দেন।

ছোট মেয়ে লাইলী ও তার জামাই ২০০২ সালে থাকতেন কারওয়ান বাজার কাজীপাড়ার আন্দার ব্রিজের পাশে। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তেজগাঁও থানার এক দারোগা ও তার ফোর্সসহ ওই এলাকায় ফেনসিডিল আসক্তদের ধরতে অভিযান চালান। 

সে সময় ছাপড়ার পাশে রাবেয়ার পান-সিগারেটের টং দোকান ছিল। রাবেয়া বলেন, ‘দারোগাকে (এসআই) ঘরে নিয়ে বসতে দেই। মোরাব্বা ও শরবত বানিয়ে খাওয়াই। এই সময় বাচ্চু নামে একজন ফরমার (পুলিশের সোর্স) ঘরে ঢুকে বলেন, নানি একটা লাঠি দেন। এই বলে ঘরের ভেতর থেকে একটা লাঠি বের করার সময় সে চিৎকার করে বলে, পাইছি, পাইছি।অস্ত্রসহ ব্যাগ দারোগার হাতে দেয় সে। এরপর দারোগা আমাকে বলে, খালা তোমাকে তেজগাঁও থানায় সাক্ষী দিতে যেতে হবে। পরে থানায় আসার পর একটা টিপসই দেই। রাতে থানায় থাকি। পরদিন কোর্টে চালান করে দেয় আমাকে। কোর্টে আনার পর বিচারক ওই দারোগাকে বলেন, এই বৃদ্ধ মহিলাকে নিয়ে আসছ কেন? একজনকে দেখলেই তাকে ধরে আনতে হবে? এরপর ছয় মাস কারাগারে থেকে জামিনে বেরিয়ে আসি। তারপর থেকে প্রতি মাসেই একবার করে হাজিরা দেই আদালতে।’

আলাপচারিতায় রাবেয়া দাবি করেন, তার বয়স ১০৪ বছর। কিন্তু পুলিশের করা ২০০২ সালের মামলায় রাবেয়ার বয়স ৬০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। সে হিসাবে তার বয়স ৭৭ বছর। 

রাবেয়ার আইনজীবী মেহেদী হাসান পলাশ জানান, আসামির বয়স ৮০ বছরের বেশি। পুলিশ সাধারণত মামলার সময় আসামির বয়স অনেক ক্ষেত্রে কম লিখে থাকে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামি রাবেয়া খাতুনকে তেজগাঁও থানা এলাকার ৩/ক গার্ডেন রোড, কাজীপাড়া আবদুল জাহিদের ঘরের দক্ষিণ পাশ থেকে পালানোর সময় একটি চটের ব্যাগসহ গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। 

রাবেয়ার সঙ্গে আরও দুইজন আসামি জুলহাস ও মাসুদের সম্পৃক্ততা ছিল। আইনজীবী জানিয়েছেন, জুলহাস ছিল রাবেয়ার মেয়ের জামাই। তাকে ধরার জন্য পুলিশ সেদিন বাসায় গিয়েছিল। পরে জুলহাস মারা গেছে বলে জানা গেছে। মামলার অবস্থানগত কারণে রাবেয়াকে আসামি করা হয়েছে।

২০০২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবদুল আজিজ তদন্ত শেষে ১২ জনকে সাক্ষী করে রাবেয়াসহ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অপর এক আসামি মাসুদের বিরুদ্ধে সঠিক নাম-ঠিকানা খুঁজে না পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করেন। 

আদালতের নথিতে জুলহাস বর্তমানে পলাতক। মামলাটিতে এ পর্যন্ত ১২ সাক্ষীর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ৬ জনকে আদালতে উপস্থাপন করেছেন।

বাংলাদেশ সময়: ১৫২০ ঘণ্টা, এপ্রিল ৩০, ২০১৯
ইএস/এমএ 

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: আদালত
সীতাকুণ্ডে পুলিশের উপর হামলা, ইয়াবাসহ আসামি ছিনতাই
বর্ষার আত্মহত্যার তদন্তে মোহনপুর থানার ওসি প্রত্যাহার
পদবঞ্চিত ছাত্রলীগ নেত্রীর আত্মহত্যার চেষ্টা
পেকুয়ায় ধর্ষণের শিকার শিশুর আত্মহত্যার চেষ্টা
বেলকুচিতে ঝড়ে গাছ পড়ে শিশুর মৃত্যু


ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবরোধ প্রত্যাহার
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পণ্য তৈরি, ১২ লাখ টাকা জরিমানা
পলাশবাড়িতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১
শ্রীমঙ্গল থেকে বিশালাকৃতির ‘শঙ্খিনী’ সাপ উদ্ধার
মহম্মদপুরে আম পাড়া নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে আহত ১৫, আটক ৪