‘বঙ্গবন্ধু বললেন, এইবার আয় সমাজতন্ত্র গঠন করি’

রেজাউল করিম রাজা, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক ডাকসু ভিপি সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন। ছবি: শাকিল/বাংলানিউজ

walton

ঢাকা: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘দেখ- দেশ স্বাধীন করছি, এইবার আয় সমাজতন্ত্র গঠন করি। তিনি বলতেন, গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।’

স্বাধীনতার মহানায়ক ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে নিজের স্মৃতির কথা এভাবেই বলছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সাবেক ডাকসু ভিপি সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন।
 
রাজনীতির এই মহানায়কের জন্মশতবর্ষে ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে বাংলানিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। 
 
বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখা প্রসঙ্গে সেদিনের তরুণ নেতা রাশেদ খান মেনন বলেন, রাজনীতির ধারাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধারা এবং আমাদের ধারা ভিন্ন ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির ধারা ছিল জাতীয়তাবাদী, আমাদের ধারা ছিল বামপন্থি-কমিউনিস্ট ধারা। তারপরেও তার সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ স্মৃতি রয়েছে। ৬০ এর দশকে এবং বাংলাদেশ পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুকে বেশ কাছ থেকে দেখেছি। 

‘তবে বঙ্গবন্ধুকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬২ সালে। শিক্ষা আন্দোলনের কারণে আমি প্রথম জেলে যাই। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলখানার ২৬ নম্বর সেলে বন্দি ছিলেন। আমরা ছিলাম পুরনো হাজতে। সেল থেকে যখন তিনি জেল গেটে আসতেন, তখন তাকে দেখতাম। তবে কথা বলার সুযোগ হয়নি। বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের সময় আমরা যখন মিছিল করে যাচ্ছিলাম, তখন গুলিস্তানে একটা দোতলা অফিস থেকে তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছিলেন। সেই প্রথম আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখি।’ 

পড়ুন>>বঙ্গবন্ধু কখনও জনগণের পক্ষ ত্যাগ করেননি: সেলিম

বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক এ নেতা বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা হয় ১৯৬৪ সালে, যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। সবুর খান এবং মোনায়েম খান কর্তৃক লাগানো এই দাঙ্গা ছিল অনেক বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যে দাঙ্গার বিরুদ্ধে সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান রুখে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় ন্যাপ অফিসে সর্বদলীয় দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এই দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমি তখন ডাকসুর ভিপি এবং ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হই। তখন বঙ্গবন্ধু দাঙ্গাবিরোধী তৎপরতায় যেখানে যেতেন আমিও তার সঙ্গে অথবা তার পরের গাড়িতে যেতাম। তার ধারার ছাত্র সংগঠন ছিল ছাত্রলীগ, কিন্তু আমরা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম।’

তিনি বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি বঙ্গবন্ধুর একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল। তিনি মনে করতেন, ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা অনেক বেশি বিশ্বাসী, আদর্শনিষ্ঠ এবং কর্মঠ। সে কারণেই আমাদের প্রতি তার একটা ভালোবাসা এবং দুর্বলতা ছিল।
 
রাশেদ খান মেনন বলেন, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দিলেন। বিভিন্ন জেলায় জেলায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হল। সেই সময় এমন পরিস্থিতি হয় যে, উনি যখন-তখন গ্রেপ্তার হন আবার বের হন, আবারও গ্রেপ্তার হন। সম্ভবত ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসের দিকে আমার তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়েছিল। মোনায়েম খান আমার ওপর খুব রেগেছিলেন। আমাকে জেলখানায় ডিভিশন দেওয়া হয়নি। যদিও আমি ডাকসুর ভিপি ছিলাম, আমার বাবা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার, একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির ছিলেন। সামাজিক মর্যাদা হিসেবে আমার ডিভিশন পাওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি। তখন কঠিন শীতের মধ্যে আমাকে রাখা হলো জেলখানার পুরাতন ২০ নম্বর সেলে। তার উল্টো দিকেই বঙ্গবন্ধু থাকতেন। তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদি হিসেবে আমাদের সম্বল ছিল তিনখানা কম্বল। খাবার ব্যবস্থা ছিল সকালে রুটি আর লাবড়া। জেলখানায় সেদিনকার প্রথম রাত আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। পরদিন ভোর বেলায় দেখলাম- খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু আমার জন্য লেপ ও বালিশ পাঠিয়ে দিলেন। এভাবেই তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। 
 
‘এরপর আবার ১৯৬৭ সালের জুলাইয়ে আমি কারাগারে বন্দি। এবার আমাকে রাখা হয় নতুন ২০ নম্বর সেলে। বঙ্গবন্ধু জেলখানার রাজা ছিলেন! জেলখানায় তার অবাধ বিচরণ ছিল। আমার নামে তখন আটটা মামলা ছিল। ফলে সপ্তাহে চারদিন আমাকে কোর্টে যাওয়া আসা করা লাগতো। বঙ্গবন্ধু যখন জানতেন আমি কোর্টে যাচ্ছি, তখন কাকে কি বার্তা পাঠাতে হবে, তিনি সেটা আমার দ্বারা পাঠাতেন। এভাবেই তার সঙ্গে রাজনৈতিক অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়। ইতোমধ্যে তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সূত্রপাত শুরু হয়ে গেছে। এর মধ্যে একটা ঈদ চলে এলো। ঈদে তখন জেলখানার ৫ খাতায় (ওয়ার্ড) ঈদের জামাত হত। উনি আমার কাঁধে হাত রেখে ৫ নম্বর খাতায় ঈদের নামাজ আদায় করতে যেতে যেতে বললেন, দেখ- ওরা ষড়যন্ত্র করছে আমাকে মেরে ফেলবে। এরপর বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়।’
 
স্মৃতিচারণ করে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ১৯৬৯ সালে লাখ লাখ মানুষের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। এরপর মার্শাল ল’ জারি করা হয়। একদিন আমি এবং আমার বন্ধু হায়দার আকবর রনো ধানমন্ডির ৩২ নম্বর দিয়ে হাঁটছিলাম। তখন দেখি বঙ্গবন্ধু গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের দেখে তার বাসার ভেতরে ডাকলেন- আয় চা খেয়ে যা। ভেতরে গিয়ে আমি বললাম- মার্শাল ল’ হয়ে গেল। কী করবেন? উনি আমাদের বললেন- বাংলাদেশ স্বাধীন করবি? আমি বললাম, আপনি যদি স্বাধীন করেন, আমরা সঙ্গে আছি। উনি তখন বললেন- ওই যে ব্যালকনি দেখছিস, এখানে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ক্যাবিনেট মিটিং হবে। বঙ্গবন্ধুর কথা সত্যি হয়েছিল। এরপরে তো বাঙালি জাতির সমস্ত দিক নির্দেশনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ওই ব্যালকনি থেকেই আসতো।
 
‘১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন জনতান্ত্রিক পূর্ববাংলা কর্মসূচি দেওয়ার ফলে আমার সাতবছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন পাকিস্তানি সামরিক শাসক। আমি তখন আত্মগোপনে চলে যাই। ইতোমধ্যে পহেলা মার্চে বাংলাদেশে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এরপর তো ১৯৭১ সালের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন। এরপরের দিন ১১ জানুয়ারি আমি, কাজী জাফর এবং রনো দেখা করতে গেলাম।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখে বললেন- ‘দেখ, দেশ স্বাধীন করছি, এইবার আয় আমরা সমাজতন্ত্র গঠন করি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুরাগ ছিল। এর কারণ হচ্ছে আওয়ামী লীগের অনেক প্রগতিশীল লোক ছিলেন, অনেক বামপন্থি নেতারাও আওয়ামী লীগে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর উপলব্ধিতে এটা সবসময়ই ছিল যে- আওয়ামী লীগের প্রগতিশীলরাই মূল শক্তি। আওয়ামী লীগকে অসম্প্রদায়িক দল হিসেবে পরিণত করার ক্ষেত্রে বামপন্থিরাই তাকে সহযোগিতা করেছে। স্বায়ত্ত্বশাসনের প্রশ্নে বামপন্থিরাই তাকে সমর্থন দিয়েছে।’

বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র উদ্ধৃতি দিয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, আমাদের মধ্যে অনেক সমাজতন্ত্রী আছেন। সমাজতন্ত্রী এবং  বামপন্থিরা কখনো সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। উনি প্র্যাক্টিক্যালি সমাজতন্ত্রের দিকে আসছেন যখন ছয় দফা আন্দোলন হয়ে গেল। বিশেষ করে যখন ১১ দফায় জাতীয়করণ, কৃষক-শ্রমিকের দাবি বঙ্গবন্ধু মেনে নিয়েছিলেন। সেই সময় যে সমস্ত অর্থনীতিবিদরা বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেছিলেন বিশেষ করে, অধ্যাপক নূরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, আজিজুর রহমান খান, স্বদেশ বোস, তারা সবাই সমাজতন্ত্রী ছিলেন। ফলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর স্পষ্ট ধারণা ছিল। তিনি বলতেন গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে।
 
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, বাকশাল হওয়ার পর আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই। সেটিই ছিল তার সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। ওই সময় তিনি- আমাদের বাকশালে যোগ দিতে বলেন। বলেছিলেন, তোরা সমাজতন্ত্রের কথা বলিস। তোরা আমার সাথে আয়। কিন্তু আমাদের সেখানে যাওয়া হয়নি। 
 
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতিতে আমাদের উচিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ অনুসরণ করা। মুজিব শতবর্ষের মূল ভিত্তি হতে হবে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাভাবনা ও আদর্শের অনুসরণ। 

‘মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে জনগণের অদম্য উৎসাহ এবং উদ্দীপনা রয়েছে। কিন্তু জনগণের সম্পৃক্ততা কতটুকু সেটা আমার প্রশ্ন। মানুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেভাবে দেখেছে বাংলাদেশকেও সেভাবেই দেখতে চায়,’ যোগ করেন মেনন।  

বাংলাদেশ সময়: ১৬৫৪ ঘণ্টা, মার্চ ১৭, ২০২০
আরকেআর/এমএ

ঈদে তেঁতুলিয়ায় সব বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ, কড়া অবস্থানে পুলিশ
নগরবাসীকে মেয়র আরিফের ঈদ শুভেচ্ছা
করোনা আতঙ্ক নিয়েই ঘরে ফিরছে মানুষ
সড়কে দায়িত্ব পালনে গর্বিত, আফসোস নেই ট্রাফিক সদস্যদের
দেশবাসীকে ঈদ-উল-ফিতরের শুভেচ্ছা সাজেদা চৌধুরীর


‘চির উন্নত শির...’
আজ ১২১তম নজরুলজয়ন্তী

‘চির উন্নত শির...’

সাবেক এমপি মকবুলের মৃত্যুতে তাপসের শোক
হাসপাতাল কর্মচারীদের জন্য আতিকের ঈদ উপহার
সিলেট আওয়ামী পরিবারে করোনার হানা
হাজি মকবুলের মৃত্যুতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর শোক