php glass

মানুষ ক্যান ফকির অয়....

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

খবরে প্রকাশ এনজিও’র মাধ্যমে ভিক্ষুক শুমারি করবে সরকার। উদ্দেশ্য প্রকৃত ভিক্ষুক সংখ্যা নিরূপণ এবং দুই হাজার ভিক্ষুকের পুনর্বাসন। খবরের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একজন অতিভক্ত আওয়ামী লীগার বললেন, ‘ঘটনা মদীনারাষ্ট্রের কার্যক্রমের কাছাকাছি’।

খবরে প্রকাশ এনজিও’র মাধ্যমে ভিক্ষুক শুমারি করবে সরকার। উদ্দেশ্য প্রকৃত ভিক্ষুক সংখ্যা নিরূপণ এবং দুই হাজার ভিক্ষুকের পুনর্বাসন। খবরের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একজন অতিভক্ত আওয়ামী লীগার বললেন, ‘ঘটনা মদীনারাষ্ট্রের কার্যক্রমের কাছাকাছি’।

কতিপয় নিন্দুক ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবী মুচকি হেসে ইঙ্গিত করেন-- ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ আর কি।

সূত্র জানায়, ঘোষণার পরপরই সংশ্লিষ্ট আমলারা ধুলো ঝেড়ে খুঁজে পান এরশাদের পথকলি ট্রাস্টের ফাইল। লাল ফিতা খুলতেই ভুমিকা অতি চমৎকার। সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিতদের উন্নয়নে এটাইতো দরকার।

ফাইলের নীচে কত ফাইল! খুঁজে পায় দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নের কত প্রকল্প! খাল কাটা স্বনির্ভর আন্দোলন, গুচ্ছ গ্রাম, একটি বাড়ি একটি খামার, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলার কালো ছাগল (ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট), আরো কত কি!

জাদরেল কিন্তু কর্ম দক্ষতায় নবিশ আমলারা বিস্মিত, শশব্যস্ত। ইস! কী মেধাবী সিএসপি, ডক্টরেট আমলাই না ওনারা ছিলেন! প্রকল্পের ফলাফল? কখনই ব্যাপার ছিল না। ফাইলে তো সাফল্য জ্বলজ্বল করবেই। তহবিল তছরুফের মামলা হবে, খারিজও হবে। ধর্তব্যের বিষয় না।

হালের প্রসঙ্গ ভিক্ষুক শুমারিতে ছবিসহ জীবন বৃত্তান্তও নাকি সংগৃহীত হবে। কি প্রশ্ন থাকতে পারে ভিক্ষুক শুমারির প্রশ্নপত্রে? কেমন হবে গবেষণা প্রতিবেদন? প্রিয় পাঠক, আসুন আমরা একটি কাল্পনিক গবেষণা করি।  নিরুত্তরজনিত ভ্রান্তি, গবেষকদের অসততা, অদক্ষতা যদি বাদও দেই। তারপরেও নিন্মোক্ত বিষয়গুলো প্রতিফলিত হতে পারে।

জনসংখ্যা তাত্ত্বিক অবস্থা: যেমন: নাম, ঠিকানা, বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, স্ত্রী সংখ্যা? বিবাহের সংখ্যা, সন্তান সংখ্যা? পিতা-মাতা: জীবিত/মৃত? নাম না হয় কানা হাসেম, সখিনা বেওয়া ধরনের একটা কিছু পাওয়া গেল। ঠিকানায় বড়ই সমস্যা। যার ঠিকানা আছে সে কেন ভিক্ষা করবে? ঠিকানাহীন মানুষগুলোই তো ভিক্ষুক।

লেইখ্যা দ্যান স্যার অমুক বস্তি, তমুক রেললাইনের পাশে। ‘আইজ এইহানে তো কাইল ঐহানে।’

এটা কি ঠিকানা হলো?

- অইবো না ক্যান?’ ভাড়া দিয়া থাহি না?

কাকে ভাড়া দেন? কে ভাড়া নেয়?

হেইডা সরকাররে যাইয়া জিগান। সরকার সবই জানে। আগেতো পরধানমন্তীর পুলারে দেওন লাগতো।

আচ্ছা ঠিক আছে। স্থায়ী ঠিকানা? নাই।

আগে ছিল, এখন গাঙের মইধ্যে, বন্দকীতে।

ভিক্ষায় নারীরা এগিয়ে থাকবে ইনশাআল্লাহ। মায়ের জাত আর যাবে কোথায়? দুনিয়ায় দরিদ্রদের মধ্যে নারীরাই বেশি দরিদ্র। পুরুষ ভিক্ষুকদের বর্তমান স্ত্রীর সংখ্যা দুই বা ততোধিক। বড়ই আচানক ব্যাপার। বিবাহের সংখ্যা আরো বেশী। ভাত খাইতে পায় না, এত বউ দিয়া কি করে?

বহুগামিতা তো রাজা-বাদশাদের ব্যাপার! এরা এই কাজে এত উৎসাহী কেন? চিত্তবিনোদনে স্ত্রী-সঙ্গই তাদের বেশি পছন্দ। নারীদের জন্য পরিচয়, নিরাপত্তা। কি করবে? ঝক্কি-ঝামেলার কি অভাব আছে? অধিকাংশ নারী ভিক্ষুকদের বর্তমান স্বামী সংখ্যা অর্ধেক কিংবা এক তৃতীয়াংশ।

এটা আবার কেমন কথা?

এইডাই ঠিক কথা। দুই তিনজন হতীনের (সতীন) একটা সোয়ামী।

 কিন্তু এরকম বিয়ের দরকার কি?

দরকার আছে। খালি থাকলে মাস্তানরা উত্যক্ত করে। বে....র চেয়েও খারাপ। যার খুশী সেই-ই...। নেশাখোড়....পাত্তি নেতা। অধিকাংশ নারীর প্রথম স্বামী মৃত নয়তো নিরুদ্দেশ।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীরাই ভিক্ষুকদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। বয়স্কদের সংখ্যা এত বেশি কেন? সন্তানরা বাবা-মাকে দেখে না? সন্তান সংখ্যা অনেক কিন্তু বাঁচলো কটা সেটাই দেখার বিষয়। দু’একজন পারিবারিক পেশায় কিন্তু ভাত কাপড় দেয় না। কাছাকাছি থাকে। তাতেই সান্ত্বনা। অন্যরা খবরও নেয় না। শিশু-কিশোর ভিক্ষুকরা হয় এতিম, না হয় উত্তরাধিকার সূত্রে ভিক্ষুক। এনজিওরা তাদের বর্ণমালা শেখায়। নাম লেখায়। সুন্দর সুন্দর সাফল্যের গল্প বানায়। ব্লাকবোর্ডে সাদা চকে দাগ টেনে কত কিছু কয়! কখনই জানা হয় না, দারিদ্র্যের সীমানা কোথায়?

ভিক্ষুকদের মধ্যে শিক্ষার হার খারাপ না। ‘শুধুমাত্র নাম লিখতে পারে’ এমন শিক্ষিতের হার ৫০ ভাগের উপরে।

ভিক্ষার স্থান?

বুঝলাম না।

রাস্তার মোড়ে, মসজিদ, গোরস্থান কিংবা মার্কেটের সামনে নাকি হেঁটে হেঁটে, বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে ভিক্ষা করেন?

সবেই।

সবই মানে? জাগা পাওনের থেইক্যা ধইরা রাহনই কঠিন। চান্দা, চেষ্টা-তদবীরেরও বিষয়। সরকার বদলাইলে আমগো জাগাও বদলায়।

অর্থনৈতিক অবস্থা: কামাই রোজগার কেমন? 

একেক জাগায় একেক রহম। শুক্রবারে মসজিদ আর গোরস্থানে ভালো। পরিবহনেও খারাপ না। যাত্রা পতে মাইনষ্যের মন থাহে ভীতু, নরম। তয় সবাইর না। ফেলাট বাড়ি অওনে খুব খারাব অইছে। দারোয়ানরা ঝামেলা করে। নেতাগো মিডিংয়ে, হুজুরগো মফিলে যাই না। কিচ্ছু দেয় না। বদ। উল্টা বোমাবাজি, মারামারি। তয় বিশ্বএজতেমা খুব ভালো।

গরীবের সৎভাবে বেঁচে থাকার জন্য এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর কি আছে? ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে তো জীবন চালাতে হয় না। আয় কমছে কারণ ভিক্ষুকের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। কত রকমের অসুখ-বিসুখ, অ্যাকসিডেন্ট! হাত-পা-চোখ হারায়, স্বজন হারায়! বন্যা, মঙ্গা, নদীভাঙ্গন। কত মানুষ! প্রতিবন্ধিত্ব এবং দারিদ্র্য ভিক্ষুকের জন্মদাতা। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি? কারো কারো বেয়ারিংয়ের গাড়ি আছে। ভাঙ্গা থালা, কয়েকটি পোটলা। ভিক্ষার পাশাপাশি আর কিছু? হু, করি। নারীদের একটা অংশ ঠিকা বুয়া, পুরুষদের কেউ কেউ মাদক বিক্রি করে।

সামাজিক সম্পদ: মান-ইজ্জত? না, তা নেই। আত্মীয়-স্বজনরা দুয়ারও খোলে না, চোখও মেলে না। ছেলে-মেয়ের বিবাহ-শাদী? বিয়া দেওনের সুযোগ নাই। পুলারা বড় অওনের আগেই বিয়া কইরা ফালায়। করবো না কি করবো? বস্তির মইধ্যে যা চলে! মাইয়াগুলা বড় অওনের আগেই পুলিশ, মস্তানগো চোখ পড়ে। শ্যাষম্যাষ ঠিকানা পতিতালয়, রাইতে পার্কে, ইংলিশ রোড। গ্রামে যৌতুক ছাড়া ভিক্ষুকের মেয়েরও বিয়ে হয় না। এহন আর রিশকা কিনা দিলে অয় না। বিদ্যাশে যাওনের ট্যাহা চায়।

দলবদ্ধভাবে ভিক্ষা করেন নাকি একা?

যহন যেইডা চলে। তয় ভাগবাটোয়ায় ঝামেলা। মাইনষ্যের মইধ্যে ইনসাফ নাই।

ভিক্ষায় দোয়া-খায়ের, হামদ-নাত ব্যবহার করেন নাকি লোক-সঙ্গীত?

বুঝাইয়া কন। মানে আল্লাহ-খোদার নাম নেন নাকি দেশী গান (মাইজভান্ডারী, পল্লীগীতি? সবেই।

সুমায় বুইঝ্যা, জাগা বুইঝ্যা করতে অয় আরকি। মসজিদ, গোরস্থানের সামনে কি গান গাইলে চলবো? গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে পল্লীগীতি, ভাওইয়া, মুর্শিদী, মাইজভান্ডারী ভালো চলে।

সপ্তাহে কয়দিন ভিক্ষা করেন?

সব দিনই। যুদি হরতাল, কারফু, বৃষ্টি-বাদলা না থাহে।

রাজনৈতিক পরিচয়? বুজাইয়া কন।

মানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয়পার্টি, .. ..কমিউনিস্ট?

আছে, মুক্তিযুদ্ধা আছে। তয় রাজাকার দেহি নাই। ফরিদপুইরা ফকিরদের মইধ্যে আমলীগ, বগুড়া, রংপুরের গুলা বিএনপি, এরশাদ পার্টি বেশি।তয় শ্যাষেরডা কি কইলেন.... কমুনিস্ট? এইডা আবার কি?

রাজনৈতিক দল, গরীবদের পক্ষে কথা বলে। কুনোদিন তো হুনলাম না।

আপনি কি ভোটার? হু। কোন এলাকায়?

জানিনা। তয় ভোট দেই, ভোটের সুমায় কদর বাড়ে। সোমবাদিকরা ফটো তুলে, টেলিভিশনে দেহায়। তইলে নাকি নিরবাচন সুষ্ঠ অইছে....মাইনষ্যে বিশ্বাস যায়, হা হা...। স্যার, আমার একখান কতা আছে।

জ্বি, বলেন। এইসব লেখতাছেন ক্যান?

প্রধানমন্ত্রী ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিচ্ছেন। আপনাদের সম্পর্কে তথ্য দরকার।

ও....আইচ্ছ্যা, পয়লা হুনলাম। কি কি দিবো? সেটা পরে জানতে পারবেন।

ও আইচ্ছ্যা। তয় কুন ওপিসে নাম লেখাইতে অইবো? কারে, কত ট্যাহা দেওন লাগবো?

গবেষক নিরুত্তর। পরধানমন্তী ফকিরগো লইয়া চিন্তা করনের আগে মানুষ ক্যান ফকির অয় হেইডা চিন্তা করলে ভালো অইতো। কত্ত সরকার কত্ত কিছুইতো কইলো! দেহা যাউক...। 

লেখক, গবেষক। ইউনিভার্সিটি অফ নিউক্যাসল, অস্ট্রেলিয়া।
ইমেইল:[email protected]

ksrm
জোট থেকে জামায়াত বাদ দেয়া হবে অদূরদর্শিতা: এহসানুল হুদা
মহিমাগঞ্জ ইউপি উপ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী
হাঁস-গবাদিপশু ছাড়াই চলছে যুব কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ
বাতি অকেজো, হাতের ইশারায় চলছে ট্রাফিক ব্যবস্থা
পর্যটন বিকাশে বিদেশে মেলা, আসছে নতুন নীতিমালা


উৎপাদনের আগেই বাজারজাত কেক!
বরিশালে দুই হোটেলকে জরিমানা
মোড়ক পরিবর্তন করে বাজারে সরিষার তেল, জেল-জরিমানা
বরিশালে কিং ব্র্যান্ড সিমেন্টের হালখাতা
রূপগঞ্জে গাঁজাসহ ১৭জন গ্রেফতার, সাজা