ঢাকা, রবিবার, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৭, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬ রজব ১৪৪২

জাতীয়

ছিন্নমূল মানুষের মুখে ফুটেছে খুশির ফোয়ারা

শরীফ সুমন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৮২০ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৭, ২০২১
ছিন্নমূল মানুষের মুখে ফুটেছে খুশির ফোয়ারা

রাজশাহী: করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় দেশব্যাপী লকডাউন চলাকালীন গরিব-অসহায়, ছিন্নমূল মানুষেরা পড়েন চরম বেকাদায়। অর্থের যোগান বন্ধ থাকায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করতে হয়েছে তাদের।

ওই সময় রাজশাহীতে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে থাকা সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হেল্প পিপল অর্গানাইজেশন’।

রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একদল উদ্যোমী শিক্ষার্থী নিজেদের পকেট খরচের টাকা সাশ্রয়ের মাধ্যমে নিজেরাই পুঁজি তৈরি করে। এই স্বল্প পুঁজি নিয়েই তারা অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায়।

পরে সংগঠনের সদস্যরা লক্ষ্য করেন, লকডাউনের পর একদিকে যেমন পাড়া-মহল্লায় ভিক্ষুক বেড়েছে, তেমনিভাবে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের খাবারের কষ্টও বেড়ে গেছে। ঠিক তখনই তারা নিজেদের চিন্তা শক্তিকে আরও প্রসারিত করেন। ভাবতে থাকেন, এই মুহূর্তেই তাদের জন্য কিছু একটা করা দরকার।

আর এই ভাবনা থেকেই ক্ষুধার্তকে এক বেলা খাওয়ানোর আনন্দ থেকে তাদের উদ্যোগে যাত্রা শুরু হয় ‘২ টাকার হোটেল’।

প্রতিমাসে একবার আর্থিক অসংগতি থাকা মানুষের জন্য এক বেলা সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা করার ক্ষুদ্র এই প্রয়াস শুরু হয়- ‘হেল্প পিপল অর্গানাইজেশন’র মাধ্যমে। তারা নিজেরাই বাজার করে নিজেরাই রান্না করে সুস্বাদু খাবার। এর নিয়ে যান তাদের নির্দিষ্ট জায়গায়।

তাদের এই রান্না করা খাবার এখন পরিতৃপ্তি জোগাতে অনেকটাই সক্ষম। রাজশাহী মহানগরীতে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা কম নয়। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও রাজশাহী শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব ছিন্নমূল মানুষদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে সংগঠনটি। আর অর্থের যোগানের পুরোটাই আসছে শিক্ষার্থীদের পকেট খরচ থেকে।

আর এক বেলার এই খাবার যেন অসহায় মানুষগুলোকে ভিক্ষাবৃত্তি বলে মনে না করায় সেজন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে ন্যূনতম একটি মূল্য রাখা হয়। আর সেই ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে-মাত্র ২ টাকা। অপরের দেওয়া খাবার খেতে যেন অসহায় মানুষগুলোকে ভাবতে না হয় তারা সত্যিকার অর্থেই খাবারের মূল্য পরিশোধে অপারক-এমনটিই বললেন এই কার্যক্রমের প্রধান উদ্যোক্তা আল-রশিদ রাহি।

২ টাকার ভাসমান হোটেল সম্পর্কে কথা হয় এই তরুণ সমাজহিতৈষীর সঙ্গে। তিনি বলেন, তাদের এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘হেল্প পিপল অর্গানাইজেশন’ রাজশাহীতে ব্লাড ডোনেশনসহ নানান সামাজিক কাজ করে থাকে।

করোনাকালে সুবিধাবঞ্চিতদের মধ্যে খাবার বিতরণ, রাস্তায় জীবাণুনাশক ওষুধ স্পেসহ নানান সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন তারা। তাদের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬০ জন। সদস্যদের প্রায় সবাই রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। কয়েকজন চাকরিজীবীও রয়েছেন তাদের সঙ্গে।

সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ ও সময় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। প্রত্যেকের প্রতিদিনের যে হাত খরচ হয় তার মধ্যে হতে প্রতিদিন কিছু টাকা নিজেরা রেখে দেন। প্রতিমাসের শুরুতে সবার টাকা একত্র করা হয়। এ টাকায় ঘরোয়া পরিবেশে খাবার তৈরি করে পথচারী, শিশু, ভিক্ষুক, রিকশাচালক, ভ্যান চালকসহ ছিন্নমূল মানুষদের পরিবেশন করা হয়।
এভাবে গত পাঁচমাস থেকে তাদের এই কার্যক্রম চলছে। প্রতি মাসের প্রথম শনিবার মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় তারা খাবার বিতরণ করেন।

‘হেল্প পিপল অর্গানাইজেশন’র প্রধান আল-রশিদ রাহি বাংলানিউজকে জানান, লকডাউনের শেষে তারা দেখেন করোনার কারণে গরিব-অসহায়, ছিন্নমূল মানুষের খাবারের কষ্ট বেড়ে গেছে। এতে মহানগরীতে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন যেন কিছু মানুষকে হলেও মাসে অন্তত একদিন ভালো খাবার দিতে পারেন।

তিনি বলেন, গত পাঁচমাস ধরে আমরা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এর পুরো টাকা আসে আমাদের পকেট খরচ থেকে। প্রতিমাসের পকেট খরচ থেকে কিছু অংশ আমরা সঞ্চয় করি। পরের মাসের শুরুতে সে টাকাগুলো একত্র করা হয়। সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরা এসব খাবার বিতরণ করেন। এত কম দামে ভালো মানের খাবার পেয়ে ছিন্নমূল মানুষরা খুবই খুশি।
রাহি আরও বলেন, প্রতিমাসের প্রথম শনিবার মটন বিরিয়ানি রান্না করে মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করা হয়। এক বেলা খাবার বিতরণ করে এসব অসহায়কে হয়তো সাময়িক উপকার করছি। ভবিষ্যতে প্রতি সপ্তাহে খাবার বিতরণের জন্য আমরা চেষ্টা করছি।

সুস্বাদু এই খাবারের বিনিময়ে কেন ২ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২ টাকার বিনিময়ে ছিন্নমূল মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া হয়। অন্তত ২ টাকা হলেও যেন তারা ভাবতে পারে আমরা খাবারটা কিনে খাচ্ছি। এতে চেয়ে খাওয়ার মতো হীনম্মন্যতা তৈরি হবে না। তারা সুবিধাবঞ্চিত মানুষ বলে আমরা তাদের আত্মসম্মান চাপা দিতে পারি না। আর ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যেন সমান থাকে এবং সমুন্নত থাকে। কখনোই আমাদের মধ্যে যেন বড়-ছোট ভেদাভেদ তৈরি না হয় আমরা সেটাই চাই।
আপাতত তারা নিজেরাই এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে চান। তবে সমাজের কোনোও বিত্তবান বা সহৃদয় ব্যক্তি যদি এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চান তাহলে তাদের অর্থ সহায়তা তারা গ্রহণ করবেন বলেও জানান। সেই ক্ষেত্রে কেউ যদি সরাসরি বাজার করে রান্না করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে খাওয়াতে চান সেটাই তারা সবচেয়ে বেশি সমর্থন করবেন। এজন্য তারা পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করবেন বলেও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন- রাজশাহীর এই তরুণ স্বেচ্ছাসেবী।

বাংলাদেশ সময়: ০৮১৯ ঘণ্টা, জানুয়ারি ১৭, ২০২১
এসএস/এএটি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa