ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

ব্যানকো [শেষ পর্ব]

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ। এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে। বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ‘ব্যানকো’-এর ধারাবাহিক অনুবাদ।

ব্যানকো [পর্ব--১৬], [পর্ব--১৫], [পর্ব--১৪], [পর্ব--১৩], [পর্ব--১২], [র্পব--১১],[র্পব--১০], [পর্ব--৯], [পর্ব--৮], [পর্ব-৭], [পর্ব-৬], [পর্ব-৫], [পর্ব-৪], [পর্ব-৩], [পর্ব-২], [পর্ব-১]

তারপরেও আমি তো স্রেফ ২৩ বছরের এক টগবগে তরুণ-যুবা ছিলাম! কিন্তু ওই বয়সে একমাত্র আমিই কি সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর আর হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিলাম। এটা সত্য, অর্বাচীনের মত অপরিনামদর্শী কিছু ভুল আমার ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌দ্বারা হয়েছে, কিন্তু তা ভয়াবহ কিছু তো ছিল না। এছাড়া আমাকে যখন বন্দী করা হয় তখন পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে একটাই শাস্তি ছিল, চোরাই জিনিস রাখার দায়ে ৪ মাসের স্থগিত দণ্ডাদেশ। স্রেফ ওই বরাহ-নন্দনদের অপদস্থ করার অপরাধেই এবং আমি একদিন বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারি আশঙ্কায় আমাকে দুনিয়া থেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হবে? আমি কি এতটা নির্মম শাস্তি পাবার যোগ্য ছিলাম?

এবং এই সব কর্মকাণ্ডের শুরু হয় যখন পুলিশের ক্রাইম বিভাগ বিষয়টায় হাত লাগায়। মঁমার্তেতে তখন রব উঠেছে-- পুলিশ  লিটল প্যাপিলন, পুসিনি প্যাপিলন, প্যাপিলন ট্রম্পে-লা-মর্ত অর্থাৎ এক কথায়  সব প্যাপিলনকেই খুঁজছে।

এদিকে আমি ছিলাম শুধুই প্যাপিলন। আর কখনো কখনো পুরোপুরি সন্দেহমুক্ত থাকার জন্য ‘শ্যারিয়ার প্যাপিলন’। আর আমার দৈনন্দিন জীবনাচারে তো বরাহ-নন্দন পুলিশদের সঙ্গে ইয়ার্কি-ফাজলামি আর লারেলাপ্পা করে সময় কাটানোর কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায না। সুতরাং এই ফ্যাঁসাদ থেকে বাঁচতে আমার যা করনীয় আমি তাই করলাম। হ্যাঁ, আমি পালালাম।

আবারো প্রশ্ন উঠতে পারে যেহেতু অপরাধী আমি ছিলাম না তাহলে পালালাম কেন?

এ কথা এখন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে? কেন তোমরা ভুলে যাও ওই ২৩ বছর বয়সেই কোয়াই ডেস অর্ফেভেরেস থানায় আমাকে বেশ কবার রিমান্ডের নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্বেচ্ছায় ওখানকার পুলিশ প্রধানের উদ্ভাবিত নিত্যনতুন পৈচাশিক সব নির্যাতন উপভোগের বিষয়ে আমি তো কখনোই আগ্রহী ছিলাম না। তাদের নির্যতনের দু’একটি নমুনা হল জোর করে পানিতে মাথা চুবিয়ে রাখা একেবারে দম বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত, এরপর তুমি বাঁচ-মর কুচ পরোয়া নেই, অণ্ডকোষ চিপে সেই নারকীয় মোচরানি যার ফলে অঙ্গটির ছাল-বাকল উঠে এমন অবস্থা হত যে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ তোমাকে চলতে হত আর্জেন্টাইন কাউবয়দের মত দু’পা চেগিয়ে, পেপার প্রেসে চেপে নখ ভর্তা করে রক্ত বের করা ততক্ষণ পর্যন্ত-- যতক্ষণ পর্যন্ত না তা আপনা আপনি জমাট লেগে বন্ধ হয়, রাবারের ডাণ্ডা দিয়ে পিটিয়ে বুকের ভেতরে ফুসফুস পর্যন্ত রক্তাক্ত করে ফেলা যার ফলে মুখ দিয়ে গল গল করে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং বারো থেকে ষোল স্টোন ওজনের শূকরছানাদের লাফিয়ে লাফিয়ে তোমার পেটের ওপর পরা-- যেন পেটটা তোমার একটা স্প্রিং বোর্ড!

এভাবে বলা যায় ওই সময়টায় আমার গা ঢাকা দেওয়ার পেছনে স্রেফ এটি নয়, শত শত কারণ ছিল। যেহেতু বাস্তবিক পক্ষে আমি অপরাধী ছিলাম না তাই পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম শুধু ঝামেলা এড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে যা আসলে কাজে দেয়নি। এজন্য অবশ্য বিদেশে পালানোর চিন্তা করিনি, মনে করেছিলাম শুধু প্যারিসের আশপাশে ক’টা দিন লুকিয়ে থাকাই যথেষ্ট হবে। আর এরই মধ্যে প্যাপিলন রজার গ্রেফতার হয়ে যাবে, তা না হলেও অন্তত এসময়কালের ভেতরে তাকে চিহ্নিত তো করতে পারবে পুলিশ। এরপর তো আবার সব আগের মত। অজ্ঞাতবাস ছেড়ে লাফিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠে সোজা আবার প্যারিস। ভেবেছিলাম এই কায়দায় অন্তত আমার অণ্ডকোষ, নখ বা শরীরের অন্য কোন অংশ পুলিশের হাতে দুরমুশ হওয়া থেকে তো রক্ষা পাবে।

papillon কিন্তু আফসোস এটা যে শুধুমাত্র এই প্যাপিলন রজার বেটাকেই কোন মতে চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

এরপর হঠাৎ করেই ভোজবাজীর মতই একজন দাগী আসামী হিসেবে আমাকে খোঁজা শুরু করে দিল পুলিশ। কিভাবে? প্যাপিলন রজার থেকে শুধু ‘রজার’ অংশটুকু মুছে ফেল, ব্যস, পেয়ে গেলে হেনরি শ্যারিয়ারের ডাক নাম ‘প্যাপিলন’। এরপর কাজ বাকি থাকে শুধু একটার পর একটা ভুয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা। বিষয়টা আর হত্যা-রহস্য উদঘাটনের পক্ষে কোন নিরপেক্ষ আর ন্যায়নির্ভর তদন্তের আওতায় রইলো না, পুরোটাই হয়ে পড়লো আমাকে অপরাধী বানানোর মনগড়া বানোয়াট এক ষড়যন্ত্র।

অন্যদিকে পুলিশের তো আবার এই মহান পেশায় পদোন্নতিও দরকার হয়, আর সেজন্যে প্রয়োজন পড়ে এ ধরনের খুনের ঘটনার কৃতত্বপূর্ন রহস্য উদঘাটন।

আর ওই শালার প্যাপিলন তো আছেই একটা বজ্জাতের হাড্ডি। হারামিটাকে গ্রেফতার করতে গেলেই বিশ্রী সব আচরণ করে, সে আামদের প্রতি অবজ্ঞাভরে মুখভঙ্গী করে, মামুলী অসম্মান তো করেই। তার ওপরে ওর ছোট্ট পোষা কুত্তাটাকে ডাকে ‘চিয়াপ্পে’ নামে [সে সময়কালে প্যারিসের পুলশ প্রধানকে বল হত চিয়াপ্পে], আবার কখনো কখনো সে থানায় বন্দী অবস্থায় পুলিশকে বলতো, তোমরা বন্দীদের সাথে ব্যবহারটা একটু ভাল কর যদি সঠিক সময়ে অবসরে যেতে চাও। কাঁহাতক সহ্য করা যায় এতসব বাড়াবাড়ি। অতএব, প্রিয় সঙ্গী-সাথী ভাইসকল, বেটাকে শায়েস্তা করতে এগিয়ে যাও পরিকল্পনা মাফিক, তোমাদের চিন্তার কিছুই নেই।

আর এসব কারণেই পুলিশ শুরু করলো আমার চিতাশয্যা বানানোর সর্বাত্মক অশুভ প্রস্তুতি। আমার বয়স তখন মাত্র ২৩ বছর, দিনটি ছিল ১০ এপ্রিল, সেইন্ট-ক্লাউডে বসে মজাসে শামুক খাচ্ছিলাম, এসময়ে দু’টি নোংরা শূকর-শাবক তাদের সর্বোত্তম ধূর্ততা আর কৌশলের প্রয়োগে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে আসে কোর্টে বিচারের সম্মুখীন করানোর জন্য, সেই বিচার নামের প্রহসন যা আমার জীবন থেকে এক লহমায় কেড়ে নেয় ১৩ টি সোনালী বছর।

তবে প্যাপিকে ফাঁসানো পুলিশের পক্ষে ততটা সহজ হয়নি যতটা তারা মনে করেছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মঁমার্তের অপরাধ জগত সম্পর্কে রীতিমত বিশেষজ্ঞ ইন্সপেক্টর মেইজ্যুদ আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে এতটাই মরিয়া হয়ে পড়ে যে বিষয়টা আদালতে আমার কৌশলীদের সঙ্গে তার একটা প্রকাশ্য বিরোধের রূপ নেয়।

ওই সময়ের সংবাদপত্রগুলোতে এর ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে। আদালতে মেইজ্যুদ জানায় তদন্তকালে ‘ঘটনাচক্রে’ গোল্ডস্টেইনের সঙ্গে তার প্রায় শতবার মোলাকাত হয়। প্রথম সাক্ষ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বলেছিল, বন্ধু রোলান্ড পেটে তিনটি গুলি খেয়েছে জেনে সে প্রকৃত ঘটনা জানতে হাসপাতালে যায়। তার এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হয় তার বন্ধু অপর ৩ সাক্ষীর বক্তব্যের সঙ্গে। কিন্তু মেইজ্যুদের সঙ্গে অসংখ্য মোলাকাতের পর, ৩ সপ্তাহেরও বেশি সময় পরে ১৮ এপ্রিলে সে নয়া স্বীকারোক্তি দেয়: হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগে তার আরো দু’জন সঙ্গীসহ সাক্ষাৎ হয় প্যাপিলন অর্থাৎ আমার সঙ্গে। এসময় প্যাপিলন তাকে জিজ্ঞেস করে লেগ্রান্ড কোথায়? লেগ্রান্ড জবাব দেয়, ক্লিচি পানশালায়। সঙ্গে সঙ্গে প্যাপিলন চলে যায়। অন্যদিকে সে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় লেগ্রান্ডকে সতর্ক করে দিতে। সে যখন লেগ্রান্ডের সঙ্গে কথা বলছিল তখন প্যাপিলনের দুই সঙ্গীর একজন এসে লেগ্রান্ডকে ডেকে বাইরে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর গোল্ডস্টেইন সেখান থেকে বেরিয়ে এসে পথে দেখতে পায় প্যাপিলন আর লেগ্রান্ড একান্তে কথা বলছে। সে তাদের মাঝে কোন বাগড়া না দিয়ে নিজের পথে চলে যায়। পরে প্লেস পিগ্যাল্লেতে ফিরে আসার পথে আবারো তার সেঙ্গ প্যাপিলনের দেখা হয়। এসময় প্যাপিলন তাকে বলে এইমাত্র সে লেগ্রান্ডকে গুলি করেছে এবং গোল্ডস্টেইন যেন হাসপাতালে গিয়ে দেখে মারা গেছে কী না। যদি তখনো সে বেঁচে থাকে তাহলে যেন তাকে এ ব্যাপারে মুখে তালা আঁটতে উপদেশ দেয়।

কিন্তু প্রতিপক্ষ আদালতে আমাকে একজন সন্ত্রাসী হিসেবে যেভাবে চিহ্নিত করেছে, আখ্যায়িত করেছে বুদ্ধিমত্তা আর ধূর্ততায় আমি অপরাধ জগতের অন্যতম দুর্ধর্ষ আর বিপজ্জনক এক সদস্য, সেই মোতাবেক আমি এতটাই রাম গর্দভ যে খোলা সড়কে এইমাত্র কাউকে গুলি করার পর আমি বুক টান করে ঘুরে বেড়াবো ঘটনাস্থল প্লেস পিগ্যাল্লের আশপাশে, অপেক্ষা করবো গোল্ডস্টেনের সঙ্গে আমার আবারো একবার দেখা হওয়ার জন্য যাতে এই ফাঁকে  বরাহ-শাবকরা এসে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, দোস্ত কেমন আছো? ভাল তো? ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না!

তবে আমাদের এই গোল্ডস্টেইন বেটা অতটা আহাম্মক ছিল না। এই মিথ্যা জবানবন্দি দেওয়ার পরদিনই সে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যায়।

অন্যদিকে নিজেকে বাঁচাতে সর্বাত্মক শক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ালাম। ‘গোল্ডস্টেইনকে? তাকে তো আমি চিনি না। হয়তো আমি তাকে দেখে থাকতে পারি, এমনও হতে পারে যে তার সঙ্গে দু’একটি বাক্য বিনিময়ও হয়ে থাকতে পারে পাথে-ঘাটে, একই এলাকায় থাকলে যা হয়। তাকে যখন আমার মুখোমুখি করা হয়  কেবলমাত্র তখনি তাকে সনাক্ত করতে পারি। আমি একেবারে বিষ্ময়ে হতচকিত হয়ে গেলাম যে এলাকার একটা ছোটোখাট স্কয়ার যাকে আমি ঠিকমত চিনিও না তা আমার বিরুদ্ধে এতবড় একটা শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে! আর ভেবে হয়রান হই এই শালার ভেরুয়াটা কি এমন অপরাধের দায় থেকে বাঁচতে পুলিশের এমন ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে? পুলিশের এতটাই নিয়ন্ত্রণ তার ওপরে যে তারা যখন যেভাবে চালাচ্ছে নিষ্প্রাণ পুতুলের মত সে সেভাবেই চলছে। আমি এখনো ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি; কি ছিল গোল্ডস্টেইনের গোপন অপরাধটা? নারীঘটিত কোন অপকর্ম? না কোকেন?

তাকে ছাড়া, তার ধারাবাহিক মিথ্যা সাক্ষ্য, শূকর-শাবকদের ইচ্ছামাফিক যাতে প্রতিবারই থাকতো নিত্য ভুয়া তথ্য, উদ্ভট প্রমাণ দাঁড় করাতে সচেষ্ট। তার নিরঙ্কুশ সমর্থন ছাড়া পুলিশ কিছুই করছিল না। কিচ্ছু না। এই পর্যায়ে এসে ঘটনা এমন মোড় খেলো যা পুরো পরিস্থিতিকেই বদলে দিল। প্রথমে বিষয়টা মেনে নেয়াটা হয়েছিল আমার জন্য অলৌকিক কোন সাহায্য বুঝি, পরে দেখা গেল এটাই আমার কাল হয়ে দেখা দিল। এটা ছিল পুলিশের এক জঘণ্য ষড়যন্ত্র, যা আমরা প্রথমে ধরতেই পারিনি। ফাঁদটায় প্রথমে পা দেয় আমার আইনজীবী। এ যাবত আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আর গোল্ডস্টেইনের সাক্ষ্য, যা কিছুই তারা দাঁড় করিয়েছল, সেগুলো ছিল খুবই দুর্বল-- প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব। অভিযোগ এতটাই ঠুনকো ছিল যে ওই খুনে এমনকি আমার কোন মোটিভই দাঁড় করাতে পারেনি তারা। এতে আমার সংশ্রব এতটাই অসম্ভব ছিল যে দুনিয়ার যে কোন বিচারক-জুরি এমনকি নির্বোধতম ব্যক্তিটিও এটা পরিষ্কার ধরতে পারবে। এই দৃষ্টিকোন থেকেই পুলিশ তার সবটুকু কৌশল আর বুদ্ধির অপপ্রয়োগে আমার একটি মোটিভ উৎপাদন করলো।

এই অপকর্মের রূপকার ছিল আরেকজন পুলিশ যে মঁমার্তে গত দশ বছর যাবত দায়িত্ব পালন করছে, ইন্সপেক্টর মাজিল্লিয়ের।

পুরো বিষয়টাই ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। আমার কৌশলীদের একজন, বাফে তার নাম, মঁমার্তেতে ওই শূকর-শাবকের সঙ্গে এক অবসরে তার দেখা। ইন্সপেক্টর মাজিল্লিয়ের তাকে জানায় ২৫ ও ২৬ মার্চের মাঝের ওই রাতের প্রকৃত ঘটনা সে জানে এ ব্যাপারে সে সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। অর্থাৎ এতে আমার নির্দোষিতা প্রমাণ সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাফে আর আমি অনুমান করলাম সম্ভবত এই ইন্সপেক্টর পেশাগত সততায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা এমনও হতে পারে এবং এ সম্ভাবনাই বেশি, তা হল, ইন্সপেক্টর মেজ্যুদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব-বিরোধের ফসল এটি। এবং আমরা তাকে একজন সাক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করলাম। আর নিজের পায়ে কুড়লটাও মারলাম এভাবেই।

কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাজিল্লিয়ের জানাল, আমার সঙ্গে তার খাতির অনেক পুরনো এবং আমার দ্বারা সে অনেকবার উপকৃত হয়েছে। সে আরো বললো, ‘শ্যারিয়ারকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে আমার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমি বেশ কিছু অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়েছি। আর এই খুনের ব্যাপারে আমি প্রত্যক্ষ্যভাবে কিছুই জানি না। তবে আমি শুনেছি (হা ঈশ্বর, এই মামলায় কত শতবার যে আমাদের এই ‘আমি শুনেছি যে...’ কথাটা শুনতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই) যে পুলিশের সঙ্গে সুসম্পর্কের কারণে প্যাপিলন আমার অজ্ঞাত কিছু লোকের বদ নজরে পড়ে যায়। ’

অর্থাৎ এবার বেরিয়ে আসছে খুনের কার্যকারণ। এই নয়া উদ্ভাবিত মোটিভের প্রেক্ষাপট হল, লেগ্রান্ড মঁমার্তেতে এ কথা বলে বেড়াচ্ছিল যে আমি পুলিশের একজন ইনফর্মার। এর সূত্র ধরে তার সঙ্গে বিবাদের এক পর্যায়ে আমি তাকে গুলি করে হত্যা করি।

কিন্তু এত কিছুর পরেও, পুলিশের পকেটে থাকা তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট রোববে বাদে অন্যরা কিন্তু ওই বেজন্মাদের তৈরি এ নোংরা আবর্জনা গিলতে রাজী হলেন না। আদালতে যখন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যার পর মিথ্যার ফিরিস্তি ফেনিয়ে উপস্থাপিত হচ্ছিল, তারা এতে পরিষ্কার ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পান। এই সূত্রে আমি অবশ্য এই সান্তনা খুঁজে পাই যে, সব সময়ে বিচারক, পুলিশ, জুরি, আইন আর কারা কর্তৃপক্ষকে একই ষড়যন্ত্রের অংশ ধরে তুমি একই পাল্লায় মেপে এসেছো প্যাপিলন, কিন্তু এটা তোমায় স্বীকার করতেই হবে তাদের মধ্যে অসাধারণ পর্যায়ে কিছু সৎ বিচারকও ছিলেন।

যাহোক, আদালত ওইসব ভুয়া আর ভিত্তিহীন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমার বিচার চালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফেরত পাঠালেন পুনরায় তদন্তের জন্য।

এ ঘটনায় শূকর-শাবকরা রীতিমত পাগলা কুত্তায় পরিণত হল। তারা জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে সর্বত্র সাক্ষীর খোঁজে ছুটলো-- জেলখানায়, সবে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে বা ছাড়া পাবে এমন সব অপরাধীদের সরণাপন্ন হলো। কিন্তু পুণঃ তদন্ত নতুন কিছুই প্রসব করতে পারলো না। কণামাত্র ক্লু বা বিন্দুমাত্র প্রমাণও নতুন করে দাখিল করতে পারলো না। শেষে মামলার নথি-পত্র বিচারিকে কাজের জন্য আবারো প্রেরণ করা হলো। আইন-আদালতের জগতে যে ঘটনা প্রায় ঘটেই না বলা যায়, তেমনি ঘটলো।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011December/pizon-land120111224183953.jpgএখানে আরেক মার অপেক্ষা করেছিল পুলিশের জন্য। পাবলিক প্রসিকিউটর, যার কাজই হল সমাজকে অপরাধীদের ছোবল থেকে রক্ষা করা, যত সম্ভব বেশি পরিমানে এইসব দুষ্ট ক্ষতকে গারদে পুরে একের পর এক পদোন্নতি কব্জা করা, সেই তিনিও এই মামলায় অবিচারের গন্ধ পেলেন। তিনি তার টেবিল থেকে ফাইল সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ আমি এই মামলায় আর সংশ্লিষ্ট হচ্ছি না। আমার কাছে এটা ষড়যন্ত্রমূলক এবং পূর্ব-পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। এই কেসের দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়া হোক।’

কি অসাধারণ এক ব্যাপার ছিল এটা যখন আমার অপর আইনজীবি হাজতখানায় এসে আমাকে বললেন, ‘বিশ্বাস করতে পার শ্যারিয়ার! তোমার বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগ কতটা ভিত্তিহীন যে একজন সরকারী কৌশলী পর্যন্ত এটা ফিরিয়ে দিয়েছেন।’

... ৩৭ বছর পেরিয়ে গেছে।  বুলেভার্ড ডি ক্লিচির ওই পাথুরে বেঞ্চটার আশপাশে বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। ওভার কোটের কলারটা টেনে দিলাম, টুপিটাও একটু ঠেলে দিলাম পেছনে যাতে মাথায় একটু শীতলতার পরশ পাই। ঠাণ্ডার মধ্যে বসে থেকেও কষ্টকর ওই স্মৃতির এই জাবরকাটার ধকলে মাথা বেশ গরম হয়ে পড়েছে, রীতিমত ঘাম ঝরছে। আমি বেঞ্চের উল্টোদিকে ঘুরে বসলাম। আমার হাত দুটো বেঞ্চের হেলানিতে দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ালাম যেমন দাঁড়িয়েছিলাম আদালতের কাঠগড়ার রেলিংয়ে ভর দিয়ে আজ থেকে ৩৭ বছর আগে, ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে আমার মামলার প্রথম প্রথম শুনানীকালে।

হ্যাঁ, আমার মামলায় শুনানী একবার নয়, দু’বার হয়েছিল। প্রথমটি জুলাইয়ে আর দ্বিতীয়টি একই বছরের অক্টোবরে।

প্রথম শুনানীটা ছিল আমার জন্য খুবই উপভোগ্য। বিচারকের এজলাসটা দেখতে মোটেই রক্তাভ লাল ছিল না কসাইখানার মত, এর সবকিছুই ছিল দৃষ্টি মনোহর। বিচারকদের আলখাল্লা, জমিনে বিছানো কার্পেট, ঝাড়বাতি সব ছিল প্রীতিকর। আর সবার উপরে ছিলেন স্মিত হাসিমুখের  সেই সদাশয় সন্দেহপ্রবণ প্রধান বিচারক, যিনি ফাইলে ফাইলে আমার বিরুদ্ধে যা লেখা ছিল তা পড়ে খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি বিচারকাজ শুরু করেন এই বলে, ‘শ্যারিয়ার, হেনরি, আনিত অভিযোগ মোতাবেক আমরা দলিলপত্রে যেসব প্রমাণাদি থাকা দরকার, এখানে তেমন কিছুই দেখছি না। তুমি কি আদালত এবং জুরীদের সামনে তোমার বিষয়টা একটু বর্ণনা করবে?

একটি বিচারাদালতের সভাপতি খোদ আসামীকে বলছেন তার মামলাটা খুলে বলার জন্য! তোমার মনে আছে প্যাপি সেই রৌদ্রকরোজ্জল জুলাইয়ের সেই আদালত আর তার সম্মানিত বিচারকদের কথা? সদাময় সেই বিচারক দল পুরো মামলাটাকে প্রশংসনীয় নিরপেক্ষতায় নিরীক্ষণ করেন, প্রধান বিচারপতি শান্তভাবে এবং সততার সঙ্গে অনুসন্ধান করছিলেন সত্যের, পুলিশদের একের পর এক সব বিব্রতকর প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন, গোল্ডস্টেইনের দেয়া সাক্ষ্যের পরষ্পর বিরোধীতাগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে তাকে বার বার ফেলে দিচ্ছিলেন পেরেশানিতে, আমাকে এবং আমার উকিলদের সুযোগ দিচ্ছিলেন গোল্ডস্টেইনকে ঘাম ছুটিয়ে দেওয়া সব বেকায়দা ধরনের প্রশ্ন করতে, ব্যাপারটা পুরোটাই ছিল অনন্য অসাধারন। আমি তোমাকে আবারো বলছি, প্যাপি, এটা ছিল একটি আলোকিত বিচারকার্য।

কিন্তু আমার বিপক্ষে তো ছিল পালে পালে শত্রু। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী, নিহত লেগ্রান্ডের মা, তিনি এখন আর স্বীকার করছিলেন না যে তিনি এবং পুলিশ কমিশনারের সামনে তার মৃত্যুপথযাত্রী ছেলে খুনীর নাম ‘প্যাপিলন রজার’ বলেছিল। এখন তিনি বলছেন, তার ছেলে বলেছে তার খুনী প্যাপিলন এবং তার বন্ধু গোল্ডস্টেইন তাকে চেনে। তিনি ভুলে গেছেন খুনীর নামের ‘রজার’ অংশটি আর সাক্ষ্যে নতুন যোগ করলেন ‘গোল্ডস্টেইন তাকে চেনে’। অথচ এই কথা কিন্তু জবানবন্দি গ্রহণকারী কমিশনার গেরার্ডিন বা ইন্সপেক্টর গিরিমাল্ডি শোনেননি। আশ্চর্য, কমিশনারের মত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এ বষিয়টা লিখবেন না! এড়িয়ে যাবেন? বিশ্বাস হয়?

ওদিকে নিহতের পরিবারের আইনজীবি গাউত্রাত আমাকে প্রস্তাব করেছিলেন লেগ্রান্ডের মায়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে। আমি তাকে বলেছি, ‘মাদাম, আপনার কাছে আমার ক্ষমা চাওয়ার কিছুই নেই কারণ আমি তাকে খুন করিনি। আমি স্রেফ আপনার এই শোকে সহমর্মিতাই প্রকাশ করতে পরি, ব্যস।’

এবার আসলো প্রধান সাক্ষী গোল্ডস্টেইনের পালা। ৩৬ কুয়াই ডেস অরফেভ্রেসের এই রেকর্ডিং মেশিনটা আমার বিপক্ষে একের পর এক বানোয়াট সাক্ষ্য দিয়েই যাচ্ছিল, হোক তা পরষ্পর বিরোধীতা, কুচ পরোয়া নেই! সাক্ষ্য প্রদানের সময়ে তার ক্ষীণ কণ্ঠের কাঁপা কাঁপা উচ্চারণে বলা ‘আমি শপথ করে বলছি’ এখনো আমার কানে বাজছে। আমার উকিল বেফে যখন তাকে প্রশ্ন করে, তোমার প্রথম সাক্ষ্যে তুমি বলেছিল তুমি ঘটনা সম্পর্কে বিন্দু-বিসর্গ কিছুই জানো না; পরে দেখা গেল তুমি প্যাপিলনকে চেন, তারপরে জানালে ঘটনার কিছুক্ষণ আগে তোমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, তারপর বললে হত্যাকাণ্ডের পর সে তোমাকে বলেছে হাসপাতালে গিয়ে লেগ্রান্ডের অবস্থা জানতে-- তোমার সাক্ষ্যের এতসব বৈপরিত্যের কী ব্যাখা দেবে তুমি?

এতসব প্রশ্নের জবাবে গোল্ডস্টেইনের কাজ ছিল শুধু এই শেখানো বুলির পুনরাবৃত্তি করা, ‘আমি ভয় পেয়েছিলাম। কারণ মঁমার্তেতে প্যাপিলন হচ্ছে এক আতংকের নাম।’ 

পরবর্তী বিচারকার্যে প্রধান বিচারক আগের বিচারকের মত আমাকে সুযোগ দেননি আত্মপক্ষ সমর্থনের। বারোজন বেজন্মা জুরির কর্মকাণ্ডে মানবিক নৈতিক কোন বিধি-বিধানের বালাই ছিল না। বিচারকার্যের একদম শেষে, আমার শেষ বক্তব্যে বলেছিলাম, ‘আমি নিরপরাধ। আমি পুলিশের ষড়যন্ত্রের শিকার। এর বাইরে আর কিছু নেই।’

১৯৩১ সালের অক্টোবরে দেওয়া ওই রায়ে বিচারক বলে, ‘তেমাকে যাবজ্জীবন কালাপানি দণ্ড দেওয়া হল। প্রহরী, অপরাধীকে নিয় যাও।’

পরদিন সকালে আমি মঁমার্তেতে ফিরে আসি। আমি ৮ দিন প্যারিসে ছিলাম। এর মধ্যে আট দিনই আমি ওই বিখ্যাত খুনের স্পটটিতে গেছি।  আট বার আমি ওই গাছটিকে ঠুকেছি এবং ওই বেঞ্চটাতে গিয়ে বসেছি।

আট বার আমি চোখ মুদে সেখানে বসে আমার দুটি বিচার পর্বের তদন্ত সম্পর্কিত যা যা জানতাম তার স্মৃতি তর্পন করেছি। আটবার আমি আমাকে দেওয়া ওই অন্যায় দণ্ডের নির্মাতা শূকরদের কুৎসিত মুখ দেখেছি। আটবার আমি ফিসফিসিয়ে উচ্চারন করেছি, ‘এটা সেই জায়গা যেখান থেকে সব কিছুর সূত্রপাত হয়েছিল, তোমার যৌবন থেকে সেই তেরটি বছর ছিনিয়ে নেওয়ার যজ্ঞ।’ পরপর আটদিনে আটবার আমি সেখানে পুনরাবৃত্তি করেছি, ‘ তুমি প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছো; খুব ভাল কথা; কিন্তু কখনো তুমি তাদের ক্ষমা করতে পারবে না।’ আটবার আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি আমার প্রতিশোধস্পৃহা ছেড়ে দেওয়ার পুরস্কার স্বরূপ যেন এ ধরনের ঘটনা আর কোন হতভাগার জীবনে না ঘটে। আটবার আমি ওই বেঞ্চটিকে প্রশ্ন করেছি ওই ভুয়া সাক্ষী আর বেঈমান পুলিশের দল এই জায়গায় আর কোন নাটক মঞ্চায়ন করেছে কী না।

আটবার আমি সেখানে গেছি, প্রতিবার আগের চেয়ে কম ঝুঁকে দাঁড়িয়েছি, যেন শেষবারের বার আমি ঋজু ভঙ্গীতে একজন তরুণের মত হেঁটে যেতে পারি। প্রতিবারই আমি নিজেকে ফিসফিসিয়ে বলেছি, ‘ শেষপর্যন্ত আসলে খেলায় তুমিই জিতেছ। কারণ তুমি এখন এখানে দাঁড়িয়ে আছ মুক্ত, সুস্থ, সম্মানিত এবং নিজের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রা তুমি নিজেই। তুমি তাদের পরিণতি কি হয়েছে তা দেখার আশায় তাতের খুঁজতে যেও না। তারা তোমার অতীতের কারাগারে বন্দী আছে। আজ তুমি এখানে আছ, এটা তো অলৌকিক ঘটনাই বলা যায়। খোদা এইসব কেরামতির ঘটনা রোজ রোজ ঘটান না। তুমি শত-সহস্র ভাগ নিশ্চিত থাকতে পার, তোমার এই ঘটনায় যে সব লোক জড়িত ছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র তুমিই সবচেয়ে সুখে আছ।’

(শেষ)

বাংলাদেশ সময় ১৭৪৫, ডিসেম্বর ২৪, ২০১১

বিমানবন্দরে ১৫৩ কার্টন সিগারেট জব্দ
বার্সাকে হটিয়ে শীর্ষে রিয়াল মাদ্রিদ
শিক্ষক সংকটে বাগেরহাটের দুটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে মোংলা বন্দর, একনেকে উঠছে প্রকল্প
ঋষিধামে কুম্ভমেলা শুক্রবার


গ্র্যাজুয়েটদের চাকরির পথ দেখালো ইউজিসি
করোনা ভাইরাসে চীনে মৃত বেড়ে ৮০
পুকুরে মিললো পুলিশ পুত্রের মরদেহ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবক নিহত
বেলজিয়ামে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি কিশোর নিহত