আরব বিশ্বের কবি অ্যাডোনিসের সাক্ষাৎকার

‘পরিচয় এক ধরনের সৃষ্টিকর্ম’

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য কবি অ্যাডোনিসের নাম ২০০৩ সাল থেকেই অব্যাহতভাবে উচ্চারিত হলেও মাহমুদ দারবিশের মতই এ পুরস্কারের দেখা এখনো তিনি পাননি। এ বছরও নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য তার নাম উচ্চারিত হয়েছিল। তাঁর এ সাক্ষাৎকারটি খ্যাতনামা ফরাসি সাহিত্যিক গিলাম বাসেট।

আরবি সাহিত্যের টি.এস এলিয়ট খ্যাত সিরিয়ান কবি অ্যাডোনিস এর জন্ম ১৯৩০ সালে আল কাসাবিন গ্রামে। তাঁর পিতৃ প্রদত্ত নাম আলি আহমেদ সাঈদ। সংবাদপত্রের পাতায় জায়গা করে নিতেই ১৯ বছর বয়সে তিনি গ্রহণ করেন গ্রিক দেবতা অ্যাডোনিসের নাম। ছেলেবেলা থেকেই অসাধারণ মেধাবী এই কবি নিজের লেখাপড়ার বন্দোবস্তও করে নিয়েছিলেন সিরিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকরি আল কুয়াতলি-কে স্বরচিত কবিতা শুনিয়ে, মাত্র ১৪ বছর বয়সে।

প্রেসিডেন্ট সুকরি’র সহযোগিতায় তিনি ভর্তি হন লাতাকিয়া অঞ্চলের একটি ফরাসি স্কুলে। তারপর ভর্তি হন দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই সুফি তত্ত্বের উপর গবেষণার জন্য তিনি অর্জন করেন পিএইচডি ডিগ্রি।

দামেস্কে থাকাকালিন তিনি যোগ দেন আন্তুন সা’দার সিরিয়ান ন্যাশনাল পার্টিতে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে অভ্যুত্থানের অভিযোগে সা’দাকে মৃত্যুদ- দেয়ার পর দীর্ঘ সময় অ্যাডোনিসকেও কাটাতে হয় জেলখানায়। তবে কারামুক্তির পর ১৯৫৬ সালে তিনি পালিয়ে চলে যান বৈরুতে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়। পরিচয় হয় অনেক খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক ও চিত্রশিল্পীদের সাথে। ‘কবিতা’ নামক একটি সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন এখানে।

পরাবাস্তব কবি অ্যাডোনিসের কাব্য চিন্তায় বিখ্যাত আরব কবি আল নিফ্ফারি ও আবু নুয়াস এবং ফরাসি কবি র‌্যাবো ও মালার্মে’র প্রভাব সর্বাধিক। অ্যাডোনিস সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদকে তুলনা করেছেন ঈশ্বরবিহীন মরমিবাদের সঙ্গে। তিনি বিশ্বাস করেন, কোন বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করার ক্ষমতা কোন শব্দেরই নেই। তাঁর অধিকাংশ কবিতাতেই এ বিশ্বাসের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। দামেস্কের মিহিয়ার (২০০৮), গোলাপ ও ছাইয়ের মধ্যবর্তী সময় (২০০৪), কেবল যদি সমুদ্র ঘুমাতে পারতো (২০০৩),  দিবা-রাত্রির পাতা (২০০১), অ্যাডোনিসের রক্ত (১৯৭১)  তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য কবি অ্যাডোনিসের নাম ২০০৩ সাল থেকেই অব্যাহতভাবে উচ্চারিত হলেও মাহমুদ দারবিশের মতই এ পুরস্কারের দেখা এখনো তিনি পাননি। এ বছরও নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য তার নাম উচ্চারিত হয়েছিল। তাঁর এ সাক্ষাৎকারটি খ্যাতনামা ফরাসি সাহিত্যিক গিলাম বাসেট গ্রহণ করেন ২০০৮ সালের ২৬ আগস্ট।

 

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011December/adonish 120111208200426.jpgগিলাম বাসেট : নিজের সম্পর্কে আপনার চিন্তাধারা কেমন? আমি বলতে চাচ্ছি, আপনার জন্মতো সিরিয়ায়।

অ্যাডোনিস: আমার জন্ম সিরিয়ায় এবং স্বভাবে আমি লেবানিজ। বর্তমানে আমি ফ্রান্সে আছি এবং একজন ফরাসি নাগরিক। আমার কাছে পরিচয় কোন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কিংবা অনায়াসলব্ধ বস্তু নয়। পরিচয় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়ার মতোও কিছু নয়। প্রত্যেকেই তার নিজ পরিচয় সৃষ্টি করে থাকেন; যে কোন পরিচয় সৃষ্টি প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। জীবন ও কর্ম সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আমিও আমার পরিচয় সৃষ্টি করেছি। অর্থাৎ আমি তিনবার জন্ম নিয়েছি : প্রথমে সিরিয়ায়, পরে লেবাননে এবং তারপর ফ্রান্সে।

 

গিলাম বাসেট: তার মানে আপনার প্রতিটি নতুন গ্রন্থ প্রকাশের সাথে সাথে আপনার পুনর্জন্ম ঘটে?

অ্যাডোনিস: ঠিক বলেছেন। বিষয়টি--  নতুন জন্ম ও উন্মুক্ত পরিচয় ধরণের। অর্থাৎ আমার পরিচয় সামনে থেকে আসে, পেছন থেকে নয়। প্রেম কিংবা কবিতার মত পরিচয়ও এক ধরণের সৃষ্টিকর্ম। এটি এমন একটি বিষয় যা যে কোন মুহূর্তে সৃষ্টি এবং পুনঃসৃষ্টি হতে সক্ষম। এটি একটি অসমাপ্ত প্রক্রিয়া।

গিলাম বাসেট: সিরিয়া ও লেবাননের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কিভাবে দেখেন?

অ্যাডোনিস: রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে এই দুই দেশের পরিস্থিতি আমাকে মোটেও বিস্মিত করে না। কারণ, বিভিন্ন ঘটনার পেছনের যুক্তি, ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রাম, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত-সংঘর্ষ এবং পশ্চিমের সাথে তার সম্পর্ক, মৌলবাদের উত্থান ইত্যাদি এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক। আমার কাছে এটি বোধগম্য। একই পরিস্থিতি এক সময় ইউরোপেও ছিল। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে যা ঘটেছিল তা ছিল ভয়াবহ কিন্তু এই দুই দেশের নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ঐ ভায়ানক সম্পর্ককে এড়িয়ে যেতে সহায়তা করেছে। সুতরাং, সিরিয়া ও লেবাননের মধ্যে যা ঘটছে আমাদের অবশ্যই তা বুঝতে হবে। কারণ, তারা দুই ভাই। আর ভাইদের দ্বন্দ্ব সবসময়ই একটু বেশি দুর্বোধ্য ও জটিল হয়। তবে তা একেবারেই অব্যাখ্যেয় কিংবা অবোধগম্য নয়। কিন্তু এর থেকে বের হবার জন্যে আমাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে। আর আমিসহ অনেক বুদ্ধিজীবী এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

গিলাম বাসেট: আরব-মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে দুঃখজনক দিকটি হলো এর বর্তমান ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের মধ্যকার ফারাক, যা বহুবার উল্লেখিত হয়েছে। সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, দর্শন এবং এমনকি ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও তাদের বেশ বড় মাপের সাফল্য ছিল। বিভিন্ন শাসনামলে রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে বহু ইহুদি ও খ্রিস্টান ব্যক্তিত্বের কাজ করার নজির আছে।

অ্যাডোনিস: এ কথা এখনো সত্য। মরক্কোর বাদশাহ’র প্রধান উপদেষ্টা একজন ইহুদি। ইহুদিদের প্রতি আরবদের ঔদার্য এখনো অব্যাহত আছে। মিশর ও জর্ডান ইসরাইলের সাথে শান্তি চুক্তি করেছে। উপসাগরিয় রাষ্ট্রগুলোর ঔদার্য, বিশেষ করে কাতার...

গিলাম বাসেট: আমি ভেবেছিলাম আরব রাষ্ট্রগুলো থেকে ইহুদিরা অন্যত্র চলে গেছে-- বিশেষ করে ইসরাইলে।

অ্যাডোনিস: কিন্তু আরবে এখনো ইহুদিরা আছে, এমনকি দামেস্কেও। অধিকাংশ ইহুদিই অন্যত্র অভিবাসিত হলেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এখনো দামেস্কে, ইয়েমেনে এমনকি কায়রোতেও রয়ে গেছে। পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক ইতিহাস শুধুমাত্র আন্দালুসিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা ইতোমধ্যেই মূল আরব ভূখণ্ডের বিষয়। কোরআন নিজেই নবীকৃত, পুনরুৎপাদিত নয়। এটি বাইবেলের বর্ধিত অংশ। উদাহরণস্বরূপ-- একজন ইহুদি, একজন ইসরাইলি, বাইবেলের সমালোচনা করতে পারে, চাইলে যে কোন নবীর সমালোচনাও করতে পারে। কিন্তু তাতে ইহুদিরা কিছুই বলে না, তারা সমালোচনাকে গ্রহণ করে। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমি কোন ইহুদি নবীর সমালোচনা করতে পারি না, যদিও তাঁরা মুসলমানদের সম্পর্কে তেমন কিছুই বলেননি। ইসলাম আমাদের নির্দেশ দেয় নবী হিসেবে তাদের বিশ্বাস করতে। একবার আমার এক ইহুদি কবি-বন্ধুকে মজা করে বলেছিলাম, ‘শোন, এটা এক ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা। আজ হোক, কাল হোক কিংবা পরশুই হোক এর একটা সমাধান হবেই। এ সমস্যা আর থাকবে না। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্মীয় সমস্যা। লক্ষ্য করে দেখ, যে গ্রন্থটি ইহুদিবাদকে সমর্থন ও তার নিরাপত্তাবিধান করে তা বাইবেল নয়, কোরআন।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিকরা কোরআনকেই ইহুদিবাদের জন্য সমস্যা মনে করেন। বিষয়টি খুবই দুর্বোধ্য।

গিলাম বাসেট : আপনি কি কোন সমস্যায় পরেছিলেন? কারণ একবার আপনার গ্রন্থ ‘আল কিতাব’ নিয়ে বইয়ের দোকানে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। আমি যতদূর জানি, আরবিতে ‘আল কিতাব’ বললে লোকজন কোরআনকেই বুঝবে।

অ্যাডোনিস : কিন্তু গ্রন্থটি বেশ ভালভাবেই গৃহিত হয়েছিল। সত্যি বলছি, খুব ভালভাবেই। প্রকাশকের পক্ষ থেকে পাঠকদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছিল। পাঠকরা অভিমত দিয়েছিল- আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে সেরা বই ‘আল কিতাব’। শাসকরা এটাকে পছন্দ করেনি। তবে শাসক দেখে তো আর জনগণকে চেনা যায় না। স্কাউন্ড্রেল মোবারককে (হুসনি মোবারক) দেখে কি আর মিসরীয় জনগণকে চেনা যাবে! কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অতিরাজনৈতিক চিন্তার কেউ কেউ সিরিয়ার শাসকদের দেখেই সিরিয়ার জনগণকে মূল্যায়ন করেন। কিন্তু কেউ চাইলেই তা করতে পারেন না, কারণ এটা ভুল। এটা সেই ভুল যা গোরা মুসলমানরা করে থাকে--- ইসরাইলি শাসকদের দেখে সাধারণ ইসরাইলিদের মূল্যায়ন করা।

আল কিতাব এমন একটি গ্রন্থ যা আরব ইতিহাস সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা না থাকলে বুঝতে পারা কষ্টকর। এটা ভ্রমণ কাহিনী এবং আরব ইতিহাসের পুনর্পাঠ। কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা এই গ্রন্থ লিখতে আমাকে উৎসাহিত ও পরিচালিত করেছিল, যেমন- দান্তের ডিভাইন কমিডি (Divine Comedy)। কিন্তু তারপরও এ দুটি গ্রন্থের মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। কারণ ডিভাইন কমিডি মূলত স্বর্গ-ভ্রমণ এবং ধর্মীয় প্রেরণা থেকেই লেখা। অপরদিকে আমি যা করেছি তা এর ঠিক উল্টো। আমি পৃথিবীতে থেকেই আরব ইতিহাস ও রাজনীতিতে ভ্রমণ করেছি। আমার এই ভ্রমণ মোহাম্মদের মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে নবম শতাব্দী পর্যন্ত চলেছে। এই সময়কাল আরব ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় যা বার বার পাঠ করা প্রয়োজন। আমি তিন খণ্ডে এই গ্রন্থ লিখেছি, প্রথম খণ্ডটি ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই গ্রন্থের কাঠামো নির্মাণ করাই ছিল আমার জন্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমি চেষ্টা করেছি আমার এই গ্রন্থটি যাতে আখ্যান মূলক (Narrativ) না হয়। কারণ আমি তা পছন্দ করি না, বিশেষ করে কবিতার ক্ষেত্রে। কবি হতে হলে অবশ্যই আখ্যান বিরোধী হতে হবে। তা না হলে কবিতা হয়ে যাবে রূপকথা। কিন্তু বর্ণনাত্মক না হয়ে কিভাবে আমি সমস্ত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জটিলতাকে উপস্থাপন করতে পারি? তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারি?

আমি এই সমস্যাটি নিয়ে এক বছর কাজ করে আমার পছন্দের গঠনশৈলী অনুসন্ধান করেছি। একদিন একটি চমৎকার সিনেমা দেখে আমার মনে হলো আমি যা খুঁজছিলাম তা পেয়ে গেছি। পর্দায় অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন দৃশ্যের সাথে কানে ভেসে আসছিল সুমধুর সঙ্গীত। সিনেমার এই বিস্ময়কর জটিলতা আমাকে আমার গ্রন্থের গঠন শৈলী খুঁজে নিতে সাহায্য করেছিল। আমি একজন গাইড নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমার গ্রন্থ রচনা শুরু করলাম। আর এক্ষেত্রে আমি বেছে নিয়েছিলাম আল মুতানাব্বিকে, কারণ তিনি কবিতা ও রাজনীতিকে একীভুত করেছিলেন।

আমার গ্রন্থের প্রতিটি পৃষ্ঠাকে আমি চারটি ভাগে ভাগ করি। পৃষ্ঠার ডান অংশে (ফরাসি অনুবাদের বাম অংশে) লিপিবদ্ধ করি আমার গাইডের ব্যক্তিগত স্মৃতি--- আমার সাথে ইতিহাসে ভ্রমণ করবার সময় যা তার মনে আসছিল। পৃষ্ঠার মধ্য ভাগে স্থান দেই তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে, যা আমিই কল্পনা করেছিলাম। পৃষ্ঠার তৃতীয় অর্থাৎ নিচের অংশে পূর্ববর্তী দুই অংশের মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপন করি। আর সব শেষে পৃষ্ঠার বাম অংশে (ফরাসি অনুবাদে ডান অংশে) ইতিহাসপ্রেমি পাঠকদের জন্যে রেফারেন্স সংযুক্ত করি। এটাই ছিল আমার ঐ গ্রন্থের গঠনশৈলী। এরপর ঐ গ্রন্থে আমি সেই সব কবিদের প্রতি ধারাবাহিক শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করি যারা খুন হয়েছিলেন, কোণঠাসা  হয়ে পরেছিলেন কিংবা নির্বাসিত হয়েছিলেন। এই শ্রদ্ধাঞ্জলি ছিল সেই সব কবিদের জন্যে যারা ছিলেন আরব জাতির আলোকবর্তীকা অথচ এক বা একাধিক কারণে নিগৃহিত কিংবা নির্বাসিত। এই শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুরূপ অবস্থায় নিপতিত বর্তমান কবিদের জন্যেও বটে! গ্রন্থে আমি পাঠকদের বলতে চেয়েছি, আরব জাতির ইতিহাস তরবারির ইতিহাসের চাইতেও বেশি কিছু, কারণ আরবে অসংখ্য মহৎ ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল। আমার কাছে এ কাজ ছিল পর্বতপ্রমাণ। আমাকে পুরো আরব ইতিহাস পড়তে হয়েছিল। পাগলামীই বটে!

গিলাম বাসেট: আপনি কি পুরো বিষয়টিকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংশ্লেষিত করার চেষ্টা করে ছিলেন, নাকি সবার জন্যে উন্মুক্ত রেখেছিলেন?

অ্যাডোনিস: সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। আমি এমনভাবে কাজ করেছিলাম যাতে পাঠকরা পথের সন্ধান পায়, দিগন্তের সন্ধান পায়। আমি নিজে কোন বিচার করিনি, কোন সীদ্ধান্তও দেইনি। কারণ অন্যের পথ রুদ্ধ করা উচিত নয়।

গিলাম বাসেট: আপনি যখন মুদ্রণ শৈলী নিয়ে বলছিলেন তখন আমার নিজের অনুবাদ করা কোরআনের কথা মনে পড়ছিল। আপনার নতুন গ্রন্থ History Torn Over a Woman’s Body ’র সাথে ঐ অনুবাদকে তুলনা করে আমার ধারণা হয়েছে, আপনি কাব্যে প্রথমে ধর্মীয় কাঠামো ব্যবহার করেন এবং পরে প্রয়োজন মত পরিবর্তন করে তা নিজের করে নেন। প্রক্রিয়াটি দান্তের মত অতোটা আধ্যাত্মিক না হলেও তা আধ্যাত্মিকতারই পূর্ণাঙ্গ প্রতিমূর্তি। তবে আমার মনে হয়েছে, ঈশ্বর প্রেরিত একটি গ্রন্থকে বাস্তব ইতিহাসের সামনে উন্মুক্ত একটি গ্রন্থে রূপান্তরের জন্য এই প্রক্রিয়াটি অপরিহার্য ছিল।

অ্যাডোনিস: ঠিক তাই। আমি একবার জ্যঁ জেনেটকে বলেছিলাম, ‘জ্যঁ, আপনার উচিত সেলিনের ভাষার কাছাকাছি কোন ভাষায় লেখালেখি করা। আপনার জীবন ও অভিজ্ঞতা অবশ্যই আপনাকে সে পথেই নিয়ে যাবে। তবে কেন আপনি মালার্মের ভাষায় লিখছেন?’ তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘সেলিনের ভাষা সেই সব ভাষাগুলোর একটি যা লেখক ভেদে বদলে যায় কিন্তু মালার্মের ভাষা ফরাসি জাতীয় পরিচয়ের সাথে সম্পর্কীত। আর মালার্মের ভাষাই আমার পছন্দ, কারণ আমি ফরাসি সংস্কৃতিকে পরাস্ত ও ধ্বংস করতে চাই।’ আর আমার ক্ষেত্রে, আমি যখন বিবি হাজেরার মত কোন চরিত্রকে গ্রহণ করি, বিশেষ করে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে, আরব জাতি ও ঈসমাইলের জননী হিসেবে, ইহুদিদের জনক ইব্রাহিমের স্ত্রী হিসেবে--- যিনি তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন, তখন আমি মূলত তার কাহিনীকেই গ্রহণ করি এবং পরে তা আমূল বদলে দেই।

আমি বিবি হাজেরাকে একজন নির্বাসিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত নারীর আদর্শ প্রতিমূর্তি হিসেবে রূপান্তরিত করি; আমি তাকে একজন বিপ্লবী, ধর্ম বিরোধী ও নব্যুয়ত বিরোধী নারী হিসেবে উপস্থাপন করি। ধর্মকে ধ্বংস করতে হলে তার ভেতরে থেকেই করতে হবে, বাইরে থেকে নয়। যার সম্পর্কে আপনার কোন জ্ঞান নেই তাকে আপনি ধ্বংস করতে পারবেন না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমার অনেক কমিউনিস্ট বন্ধু ও বুদ্ধিজীবী ঠিক তাই করতে চেয়েছিলেন এবং ব্যর্থও হয়েছিলেন। অজ্ঞতা নিয়েই তারা আরব ঐতিহ্যের সমালোচনা করেছিলেন।

র‌্যাঁবো সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে আপনি তার প্রভাব থেকে নিস্কৃতি পেতে পারেন না। র‌্যাঁবোকে বুঝতে হলে র‌্যাঁবো পড়তে হবে। তাকে ছাড়িয়ে যেতে চাইলে হাজারবার পড়তে হবে। আর তা যদি না করেন, তবে আপনি তাকে অতিক্রম করতে পারবেন না। আমার ঐ বন্ধুরা মনে করতো ধর্ম অন্তঃসারশূন্য, ধর্মের দিন শেষ। তারা আমাকে বলতো: ‘ধর্ম নিয়ে কথা বলছো কেন? ধর্মের দিন শেষ, ধর্মের কাজও শেষ। আমাদের মঙ্গলের জন্যই ধর্মের সমাপ্তি ঘটেছে।’ কিন্তু ভেবে দেখুন, শুধুমাত্র ব্যক্তি অভিজ্ঞতা দিয়ে আপনি ধর্মের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না। ধর্মের বিরুদ্ধে যেতে হলে আপনাকে প্রতিষ্ঠান, শাসন ক্ষমতা কিংবা সামষ্টিক ভাবাদর্শের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

গিলাম বাসেট: গির্জা ও মরমিবাদের মধ্যে এটাই তফাৎ।

অ্যাডোনিস: অ্যাবসুলেটলি। এ তফাৎ না বুঝতে পারলে আমরা কিছুই করতে পারবো না। আর তার প্রমাণ হলো: কমিউনিজম ৭০ বছর টিকে ছিলো আর স্টালিন ২ কোটি মানুষকে হত্যা করেছিল, কিন্তু কিছুই বদলায়নি।

গিলাম বাসেট: দামেস্কের মিহিয়ার: তার সঙ্গীত ও স্বভাব--  আপনার এই গ্রন্থের সহায়তা নিয়ে আমি আপনার কাজের ধারা বুঝবার চেষ্টা করেছি। আমি এ গ্রন্থের মধ্যে এক ধরনের বিবর্তন লক্ষ্য করেছি। আর এই বিবর্তনের ধারা The Book  এবং History Torn Over a Woman’s Body  পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এই রূপান্তর কি ধারাবাহিক বিবর্তনের ফল? নাকি শুধুই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল।

অ্যাডোনিস : আমি মনে করি, এটা বিবর্তন। কোন বিষয়কে ভাল করে ব্যাখ্যা ও উপলব্ধি করতে আমি তা রূপান্তরের চেষ্টা করি। অভিজ্ঞতা লেখকের লিখন শৈলীকে বদলে দেয়।

গিলাম বাসেট: আমি লক্ষ্য করেছি, শব্দ খুঁজবার সময় আপনি হাত দিয়ে বৃত্ত তৈরি করছিলেন। এ দৃশ্য আমাকে কাব্য জগতের প্রচলিত দুটি ধারার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল: Narrative বা আখ্যানমূলক ধারা- যা প্রত্যক্ষভাবে মূল বিষয়বস্তুকে অনুসরণ করে এবং Non-narrative  ধারা, যা বিষয়বস্তুকে পুরোপুরি প্রকাশ না করে এর চারপাশে বারবার আবর্তিত হয়। এ ধরনের কবিতায় বিভিন্ন কন্ঠস্বরের উপস্থিতি ভাব প্রকাশের ক্ষেত্রে কবিতার সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরবার চেষ্টা করে।

অ্যাডোনিস: অ্যাবসুলুটলি। আমি দ্বিতীয় ধারার অন্তর্ভুক্ত। চুড়ান্তভাবে কেউই তার লক্ষ্যকে প্রকাশ করতে পারে না। শব্দের ক্ষমতার কথাই বলি আর দুর্বলতার কথাই বলি, শব্দ কোন কিছুকেই পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে না। যদি তাই হতো তবে শব্দের সাথে সাথে ঐ বিষয়টিও ধ্বংস হয়ে যেত; সেই সাথে সমাপ্তি ঘটতো বিশ্ব সভ্যতার। আমরা ভাগ্যবান, কারণ ধর্ম ও ভাবাদর্শ ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রে শব্দ কোন বিষয়কেই পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে না। কিছু একটা প্রকাশ করবার জন্যে শব্দ সে স্থানেই পর্যাপ্ত ক্ষমতার অধিকারী যেখানে কেবল এক পক্ষের কথাই চলে, অন্য পক্ষের নয়। ধর্ম কিংবা ভাবাদর্শ, কারো কোন সংস্কৃতি নেই; যা আছে তা হলো মতবাদ। আমরা জানি এ দুটোর ভিত্তি কী: মানবতা বিরোধীতা। শব্দের এই অক্ষমতার কারণেই আমরা ভাগ্যবান।

কেউ কি ভালবাসার কথা বলতে পারে? কখনোই না। একজন কবি কেবল তার ভালবাসার অভিজ্ঞতার কথাই বলতে পারে, কিংবা বলতে পারে আপন আলোয় সে ভালবাসাকে কিভাবে দেখেছে। এর চাইতে বেশি কিছু নয়। দুর্ভাগ্যবসত, এধরনের কবিতা খুব বিরল। কবিরা এখন তাদের মাথা দিয়ে লিখেন। এ ধরনের  ভালবাসা বলে কিছু নেই--- যা আছে তা সম্পর্ক, নারী ও পুরুষের মধ্যে আবেগীয় সম্পর্ক। এটাকেই আপনি ভালবাসা বলতে পারেন। কিন্তু এরকম ভালবাসা, ভালবাসার কিংবদন্তি, বইয়ের ভালবাসা--- এর কোনটিরই অস্তিত্ব নেই। 

গিলাম বাসেট: কিছুক্ষণ আগে আমরা প্রয়াত মাহমুদ দারবিশ সম্পর্কে কথা বলছিলাম। তাঁর সম্পর্কে কিছু বলবেন?

অ্যাডোনিস : বন্ধু সম্পর্কে আমি কি-ই বা বলতে পারি; তাঁর মৃত্যু আমার জন্য বিপর্যয়কর। আমি আমার সত্তার একটি অংশকে হারিয়েছি। তাছাড়া আর কী বলার আছে! মৃত্যুকে জীবনের অংশ হিসেবেই মেনে নিতে হবে...।

তবে আমার মনে হয়, রাজনীতি কিছুটা হলেও তাকে আড়াল করে দিয়েছিল। মানুষ তাকে কবিতার লেন্সে নয়, রাজনীতির লেন্সে দেখতেই বেশি অভ্যস্ত ছিল। অন্য অনেকের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অনেক বড় মাপের লেখক হওয়া সত্ত্বেও অ্যারাগনকে সবাই রাজনৈতিক পরিচয়েই চিনতো। একটা সময় আসবে যখন কবিতার মানদণ্ডেই দারবিশকে নিয়ে গবেষণা হবে, কিন্তু এ কাজ তাঁর পাঠকরাই করবে। কারণ বর্তমানে এমন কিছু লোক আছে যারা জনপ্রিয় কবিদের বাস্তবতাকে লুকাবার চেষ্টা করে। তারা কবিদের জন্যে যবনিকা স্বরূপ। আর পাঠকরা এর ঠিক বিপরীত।

 

বাংলাদেশ সময় ১৮৪৪, ডিসেম্বর ০৮, ২০১১

রূপগঞ্জে চার প্রতিষ্ঠানে অবৈধ গাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন
অবৈধ বালু উত্তোলন: ড্রেজার মেশিন ধ্বংস-জরিমানা
পুলিশের ভুলে একদিন জেল খাটলেন নিরাপরাধ মিজান
মধুপুরে থাই রাষ্ট্রদূতের কৃষি খামার পরিদর্শন
কুষ্টিয়ায় যুবককে কুপিয়ে-পায়ের রগ কেটে হত্যা


ভৈরবে মাদকদ্রব্য অফিসে আগুনের ঘটনায় মামলা 
৯৯৯ ফোন করে বখাটের হাত থেকে রক্ষা পেলো স্কুলছাত্রী
নায়করাজের ৭৯তম জন্মদিন বৃহস্পতিবার
চার কারণে ভোটের নিরাপত্তায় চিন্তার ভাঁজ
রাজাপুরে উপজেলা বিএনপির সভাপতিসহ আটক ২