ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

ব্যানকো [পর্ব--১৪]

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের  হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ। এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে। বাংলানিউজের পাঠকদের জন্য ‘ব্যানকো’-এর ধারাবাহিক অনুবাদ।

ব্যানকো [পর্ব--১৩], [পর্ব--১২], [র্পব--১১],[র্পব--১০], [পর্ব--৯], [পর্ব--৮], [পর্ব-৭], [পর্ব-৬], [পর্ব-৫], [পর্ব-৪], [পর্ব-৩], [পর্ব-২], [পর্ব-১]

ডিলফ্রে আমাকে আরমান্দোর সঙ্গে কোন রাখ-ঢাক ছাড়াই পরিচয় করিয়ে দেয় এভাবে--- এ হচ্ছে আমার বন্ধু প্যাপিলন, ফ্রেঞ্চ পেনাল সেটেলমেন্ট থেকে পালিয়ে এসেছে। আর প্যাপিলন, এ হচ্ছে সেই লোক যার সম্পর্কে আমি তোমাকে বলেছিলাম।

আরমান্দো সঙ্গে সঙ্গে আমাকে নিয়োগ দেয়। একজন সত্যিকারের সদাশয়ের ন্যায় তখনি জানতে চাইলো আমি কোনো রকম অর্থকষ্টে আছি কি না।

‘না, মঁশিয়ে আরমান্দো; আমার একটা চাকরির প্রয়োজন।’ সেই মুহূর্তে সত্যিকারার্থে আমার টাকা-পয়সার তেমন সংকট ছিল না।

‘আগামীকাল সকাল ন’টায় আমার সঙ্গে দেখা করো।’

পরদিন আরমান্দো আমাকে ফ্রাঙ্কো-ভেনেজুয়েলান নামের একটা গ্যারেজে তার লোকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।

জীবনের মদমত্ততায় পরিপূর্ণ তিন জন তরুণ, লক্ষ্য হাসিলে জ্যা-মুক্ত তীরের মত ছুটে যেতে প্রস্তুত। তাদের দু’জন বিবাহিত। একজনের স্ত্রী সিমোন, প্যারিস থেকে আসা ২৫ বছর বয়সী মনোলোভা তরুণী। অপরজনের স্ত্রীর নাম দেদী, বিশ বছর বয়সী নীল নয়না এক ব্রিটিশ, বুনো নীল ফুলের মতই কোমল। দেদীর ছোট্ট একটি ছেলে আছে, নাম ক্রিক্কি।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011December/ban 520111207164520.jpgতারা ছিল দেখতে আকর্ষণীয়, খোলামেলা আর উদার। তারা দুইহাত বাড়িয়ে আমাকে স্বাগত জানালো। মনে হলো আমি তাদের চিরদিনের চেনা। বিশাল গ্যারেজের কোনায় সঙ্গে সঙ্গে আমার থাকার ব্যবস্থা করে ফেললো। অচিরেই তারা যেন আমার সত্যিকারের পরিবারে পরিণত হয়। ছটফটে তরুণদের এই দলটি আমাকে পছন্দ করেছে, সযতনে ধারণ করেছে হৃদয়ে আবার ভক্তিও করেছে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে। তাদের এই উদার সাহচর্য আমাকে সুখে ভাসিয়ে দিল বলা যায়। কারণ বয়সে আমি তাদেরচে’ কিছুটা অগ্রজ হলেও জীবনের প্রতি আমার আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা ছিল তাদেরই মত একই উচ্চতার। সীমারেখার বাঁধনমুক্ত আর নিয়ম-শৃংখলের অর্গলমুক্ত জীবন যাপনে আমার আগ্রহ ছিল প্রশ্নাতীত।

কিছুদিনের মধ্যেই খেয়াল করলাম তাদের কেউ-ই সত্যিকারের মোটর মেকানিক নয়। মোটর বলতে কি বোঝায় এ ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল খুবই অস্পষ্ট। গ্যারেজে একটা লেদ মেশিন দেখলাম এবং জানা গেল আমার তরুণ সঙ্গীদের মধ্যে একজন লেদ-মিস্ত্রিও আছেন। মেশিনটা গাড়ির পিস্টন সারাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হয় বলে জানালো তারা। কিন্তু একটু ধাতস্থ হতেই দেখলাম, আরমান্দোর মালিকানাধীন এই ফ্রাঙ্কো-ভেনেজেুয়েলান গ্যারেজে ওপরে ওপরে গাড়ি সারাই আর মেরামতের কাজ চললেও ভেতরে ভেতরে বোমা তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকে তারা। ডিলফ্রের দল একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনায় আছে। একদিন সন্ধ্যায় আমি সঙ্গীদের সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম তারা এর পক্ষে কি না। তারা জানালো এ ব্যাপারে তাদের কিছু করার নেই, আরমান্দোর নির্দেশে তারা কাজ করছে, ব্যস। কিন্তু তারা যত সহজে বিষয়টা নিচ্ছে আমি তা পারছি না, আমাকে বিষয়টা জানতে হবে। তারা বললো, তুমি এখানে মোটা টাকা পাচ্ছো, মৌজ-মাস্তিতে দিন যাচ্ছে আর কি চাই, আদার ব্যাপারী হয়ে খামোখা কেন জাহাজের খবর নিতে চাও?

 

কিন্তু বিষয়টা মৌজ-মাস্তির না। আমি তোমাদের মত নই। আমাকে এই দেশটা আশ্রয় দিয়েছে, তারা আমাকে বিশ্বাস করেছে আর দিয়েছে মুক্ত বিহঙ্গের মত চলাফেরার অধিকার।

আমার এ ধরনের কথা-বার্তায় তারা বেশ হতাশ হলো। আমার অতীত এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ে আদ্যোপান্ত তাদের জানিয়েছি, শুধু পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে বন্ধকী দোকান লুটের কাহিনীটা গোপন করেছি। তারা আমাকে প্রবোধ দিতে চাইলো এই বলে যে ক্যু’টা সফল হলেই আমি আমার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সহজেই পেতে পারি। এছড়া তারাও এই গ্যারেজে বাদবাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য দক্ষিণ আমেরিকায় আসেনি। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য : অজস্র পরিমাণে নগদ কড়ি।

 

ক্যু’র সময়ে তোমাদের বউ-বাচ্চাদের কি হবে?

বউরা জানে। ঘটনা ঘটার ঠিক এক মাস আগে তারা বোগোতায় চলে যাবে।

সেই রাতেই ডিলফ্রে আর আরমান্দোর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হলো আমার। আরমান্দো বললো, ‘দেখ, আমাদের এই দেশটার সবকিছু অ্যাকশন ডেমোক্রেটিয়ার শিখন্ডির আড়ালে চালিয়ে নিচ্ছে বেতানকোর্ত আর গ্যালেগোস। সরলমনা সৈনিকরা মেদিনাকে গদিচ্যুত করে তাদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো ওই সৈনিকরা আসলে কি কারণে মেদিনাকে হটায় তাও তারা জানতো না। অন্যদিকে সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মেদিনা ছিলেন অনেক উদার আর সিভিলিয়ানদের চেয়েও মানবিক।মেদিনার সময়কার কর্মকর্তাদের নির্যাতিত, লাঞ্ছিত আর হত্যার শিকার হতে হচ্ছে আজ, অথচ আমি জানি তারা অপরাধী নয়। আমি বিষয়টা এখনো বুঝে উঠতে পারি না যে ‘সামাজিক ন্যায় বিচার আর সবার জন্য সমান মর্যাদার’ বাণীকে মূলমন্ত্র করে কিছু লোক বিপ্লব ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার পর তাদের পূর্ববর্তীদের চেয়েও জঘন্য হয়ে পড়ে কিভাবে? এ কারণেই আমি মেদিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।’

‘আরমান্দো, বুঝতে পারছি তুমি সবার আগে চাও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের দমন-নিপীড়ণের শাসন থামাতে। আর ডিলফ্রে, তোমার একমাত্র আরাধ্য ঈশ্বর হচ্ছেন মেদিনা, যিনি তোমার রক্ষক এবং তোমার বন্ধুও। এবার আমার কথা শোনো, এই আমাকে মানে প্যাপিলনকে যারা এল ডোরাডো কারাগার থেকে মুক্ত করেছে তারা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল। বিপ্লবের পরপর যে কারাপ্রধান এল ডোরাডোয় আসেন তিনি সঙ্গে সঙ্গে বর্বর অসভ্য যুগের অবসান ঘটান সেখানে। ডন জুলিও রামোস নামের ওই আইনজীবী এবং বিশিষ্ট লেখক যিনি আমাকে সেখান থেকে মুক্ত করেন, আমার বিশ্বাস এখনো সেই মহান প্রশাসক সেখানে আছেন। এখন তোমরা চাচ্ছো আমি সেইসব লোকদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে অংশ নেবো যারা আমার জন্য এতটা করেছেন! না, কষ্মিনকালেও সেটা হবার নয়। আমাকে তাহলে বিদায় নিতে হয় এখান থেকে। আমি তোমাদের বিষয়ে পুরোপুরি মুখ বন্ধ রাখবো-- এই বিশ্বাস নিশ্চয়ই তোমরা রাখো আমার ওপর।’

আরমান্দো আমার ত্রিশঙ্কু অবস্থার খবর জানতো। তাই একজন সুশীল সজ্জনের মতই সবদিক রক্ষার্থে বললো, ‘এনরিক, তুমি বোমাও বানাচ্ছো না কিংবা লেদও চালাচ্ছো না। তুমি এখানে গাড়ির দেখাশোনা আর এটা সেটা কাজ কর। আমি তোমাকে অনুরোধ করছি আরো কিছুকাল এখানে থেকে যাও, আমার প্রতি এটা একটা সৌজন্য হবে তোমার পক্ষ থেকে। আমি কথা দিচ্ছি, আমরা কাজে নামলে, ঘটনার এক মাস আগেই তোমাকে জানান দেওয়া হবে, যাতে তুমি তোমার পথে চলতে পারো।’  

সুতরাং আমি আরো কিছু সময়ের জন্য সেখানে থেকে গেলাম সেই তিন তরুণের সঙ্গী হয়ে। তারা এখনো বেঁচে আছে এবং নাম বললে সবাই চিনবেনও, তাই তাদের নামোল্লেখ করছি না। তবে নামের আদ্যক্ষরগুলো শুধু উল্লেখ করছি। তারা হলো পিআই, বিএল এবং জেজি। আমরা একটা অসাধারণ দলে পরিণত হলাম। ক্যারাকাসে বসবাসকারী ফরাসীরা আমাদেরকে ডাকতো ‘দ্য থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ নামে। আমরা ছিলাম চারজন আর সবাই জানেন থ্রি মাস্কেটিয়ার্স বাহিনীর সদস্যও ছিল তিনজন নয়, চারজন। তাদের সঙ্গে পাড় করা ওই কয়েকটি মাস ক্যারাকাসে কাটানো আমার জীবনের সবচেয়ে সুখী, সুন্দরতম আর প্রাণোচ্ছল সময় ছিল। জীবন চলেছে সারাক্ষণ আনন্দ স্ফূর্তি আর হৈ-হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে।

এর মধ্যে গ্যারেজে ঠিক করতে আনা সুইস অ্যাম্বাসেডরের গাড়ি মেরামত করতে গিয়ে বিএল আর আমি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হই। গাড়িতে আগুন লেগে সেটি ছাইভষ্মে পরিণত হয় আর আমরা দু’জন কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যাই। এ সময়ে আরমান্দোর কমিনা ভাই ক্লেমেন্তে এসে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। আমরা ভয়ে ছিলাম আরমান্দো ব্যাপারটা কিভাবে নেয়। কিন্তু পরদিন সে যখন আমাদের কাছে আসলো তখন পুরোপুরি শান্ত-স্থির দেখলাম। আরমান্দোর এটা একটা বিরল গুণ-- যে কোনো কিছু স্বাভাবিকভাবে নেওয়া। সহজিয়া কণ্ঠে সে বললো, ‘যারা কাজ করে তাদের সঙ্গেই ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে। যাহোক, চল এ বিষয়টা আমরা ভুলে যাই। আমি অ্যাম্বাসেডরের সঙ্গে পুরো বিষয়টা মিটিয়ে ফেলেছি।’

 

অ্যাম্বাসেডরকে অন্য একটা গাড়ি দেওয়া হয়েছিল, তবে আমাদের কাছে গাড়ি সারাতে তার লোকজন আর কখনো আসেনি।

অন্যদিকে আমি ফাঁক খুঁজছিলাম কবে সে দেশটিতে আবার যাবো, যে দেশটি তার হিমায়িত মাংসের জন্য বিখ্যাত। কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করছিলাম আমার লুকানো গুপ্তধন উদ্ধারে যাওয়ার বিমান ভাড়া হিসেবে। বন্ধকী দোকানে হানা দেওয়ার পর বেশ কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। এখন সেখানে যাওয়া আর কোনো ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

সুতরাং এক সন্ধ্যায় আমার গত ক’মাসের সঙ্গী-সাথীদের তাদের সহানুভূতি, আন্তরিকতা আর সান্নিধ্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নিয়ে ছুটলাম এয়ারপোর্টে। ভোর ছ’টায় বন্ধকী দোকানের দেশটিতে বিমান অবতরণ করতেই একটি গাড়ি ভাড়া করে সকাল ন’টার মধ্যেই জায়গামত পৌঁছে গেলাম।

কিন্তু হায়! এ কোন জায়গা? সবকিছু এমন বদলে গেলো কিভাবে? আমি ব্রিজ পার হলাম। ওই বিশাল গাছটি খুঁজলাম। হায় যীশু! আমি কি পাগল হয়ে গেলাম, নাকি মরীচিকা দেখছি! যে গাছটির নিচে আমার সম্পদ লুকিয়েছিলাম, সেটিসহ আশপাশের শত শত গাছ স্রেফ হাওয়া হয়ে গেছে। গত ক’মাসে এই রাস্তা অনেক চওড়া করা হয়েছে, ব্রিজ আর তার সংযুক্ত সড়কও পুরো নতুন করে করা হয়েছে। অনেক চেষ্টা করলাম অন্তত জায়গাটা চিহ্নিত করতে। কিন্তু তারা এখানাকর ভূমিকে অন্তত বারো ফিটেরও বেশি নিচু করে ফেলেছে কেটে, আর আমার লুটের মাল যে গর্তে লুকিয়েছিলাম তার গভীরতা এক গজের বেশি ছিল না।

চরম হতাশায় বিপর্যস্ত আমি ব্রিজের পাশের দেওয়ালে কিছুক্ষণ ভর দিয়ে ঝুঁকে রইলাম। বয়ে চলা পানির দিকে চেয়ে থাকেত থাকতে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম। কিন্তু মাথার ভেতরে তখনো ভাবনা-চিন্তার তুফান বয়ে চলেছে। আমি কি বারবারই এমন ব্যর্থ হতে থাকবো! এরপর কি করবো? আমি কি তাহলে এভাবে সম্পদ অর্জনের ধান্ধা ছেড়ে দেবো?

সহসাই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলাম। আমার অন্তর কথা বলে উঠলো, ‘চূড়ান্ত মুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত তোমার জেল পালানোর চেষ্টা কতবার ব্যর্থ হয়েছে, মনে আছে তো? কমপক্ষে সাত বা আটবার, ঠিক তো?

হ্যাঁ।

জীবন এরকমই। তুমি একটা বাজীতে হেরে গেছো? ঠিক আছে, আরেকটা ধরে জিতে নাও। জীবন এটাই, যদি তুমি তাকে সত্যিকারে ভালোবেসে থাকো।’

এমন একটি দেশ যার লোকজন নিজেদের পথ-ঘাট এত দ্রুত পাল্টে ফেলতে পারে, যে সে দেশে আর বেশিক্ষণ থাকাটা অবিবেচকের কাজ হবে। এই বিষয়টা অনুধাবন করে আমি প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়লাম যে সভ্য একটি জাতি তাদের প্রাচীন বৃক্ষগুলির প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধই রাখে না, এদর রক্ষায় থাকে উদাসীন! এবং কী দরকার ছিল, এমন একটি সড়ককে আরো চওড়া করার, যেটা এমনিতেই এতে চলমান যানবাহন ধারনের পক্ষে যথেষ্ট প্রশস্ত ছিল?

বিমানে ক্যারাকাসের ফেরার পথে আমি হাসতে থাকলাম আপন মনে। হাসলাম একথা ভেবে যে অনেক সময় মানুষ নিজেকে তার ভাগ্যের মালিক ভেবে বসে থাকে, মনে করে সে তার ভবিষ্যত নির্মাণ করবে, পরিকল্পনা করে আগামী বছর বা তার পরের বছরগুলোতে কি কি করবে। কিন্তু এর সবই অর্থহীন, প্যাপি! ভাগ্যের মুখোমুখি হয়ে সর্বাধুনিক ক্যালকুলেটর, মানুষের কল্পনায় সবচেয়ে মেধাবী পরিকল্পনাবিদও অক্ষম অথর্ব একটি খেলনা ছাড়া আর কিছু থাকে না। একমাত্র বর্তমানই সত্য। বাদবাকী বিষয় যা আছে এর সবই আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরের বিষয়, কখনো কখনো এগুলো অভিহিত করা হয় ভাগ্য, দুর্ভাগ্য, নিয়তি অথবা স্রেফ খোদার রহস্যময় আর অনুমান অযোগ্য হাতের কারসাজি বলে।

জীবনে বাস্তবিক পক্ষে একটা জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ, তাহলো কখনো মেনে না নেওয়া যে তুমি ভূ-পাতিত হয়েছো এবং প্রতিটি ব্যর্থতার পরে আবার নতুনভাবে শুরু করা। আর এখন আমিও তাই করতে যাচ্ছি।

মাস্কেটিয়ার্সদের কাছ থেকে আমি চির বিদায় নিয়ে এসেছিলাম। কারণ, লুটের মাল গর্ত খুঁড়ে তোলার পর ভেনেজুয়েলায় আপাতত ফিরে আসার কোন পরিকল্পনা ছিল না। অলংকার আর মণি-মাণিক্যগুলোর চেহারা পাল্টিয়ে (যাতে সেগুলো আর চেনা না যায়) বিক্রির পর সোজা স্পেন চলে যেতাম। তারপর সেখান থেকে প্যারিসে গিয়ে আমাকে ফাঁসানো আইনজীবীদের শায়েস্তা করাটা মোটেই কঠিন কাজ হতো না।

যাহোক, মাস্কেটিয়ার্সরা আমাকে আবারো তাদের গ্যারেজের সামনে আবিষ্কার করে এতটাই চমকালো যে রীতিমত হৈ চৈ বেঁধে গেল সেখানে। আমার ফিরে আসাটাকে উদযাপনের জন্যে বিশেষ ডিনার আর পার্টি কেকের ব্যবস্থা হলো। চার মাস্কেটিয়ার্সের সম্মানে দেদী টেবিলে চারটি ফুল সাজালো। আমাদের পুনর্গঠিত এই দলের কল্যাণ কামনায় মদ্যপানের মধ্য দিয়ে জীবন আবার তার পূর্ণ তেজে ছুটতে লাগলো। তবে আগের মত বে-এক্তিয়ার চলাফেরাটা আমার বদলে গেল।

আমি বুঝতে পারছিলাম অভ্যুত্থান বিষয়ে ডিলফ্রে আর আরমান্দোর কোন গোপন পরিকল্পনা আছে আমাকে নিয়ে। প্রায়ই আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো ডিলফ্রের আস্তানায় গিয়ে ড্রিংক অথবা ভোজনের জন্য। চমৎকার সুস্বাদু খাবারগুলো পাকাতো ডিলফ্রে নিজেই আর পরিবেশন করতো তার বিশ্বস্ত শোফার ভিক্টর, এছাড়া আর কোন সাক্ষী থাকতো না আমাদের এই মোলাকাতের। বিস্তর বিষয়-আশয় নিয়ে আলোচনা চলতো আমাদের, তবে সব কিছুই শেষ হতো জেনারেল মেদিনা প্রসঙ্গে গিয়ে।

ভেনেজুয়েলার সব প্রেসিডেন্টের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে উদার, তার সময়ে একজনও রাজনৈকি বন্দি ছিল না কারাগারে, তার নীতির কারণে কোথাও কাউকে নিগৃহীত হতে হয়নি। তার আন্তর্জাতিক নীতি ছিল সব তন্ত্র-মন্ত্র আর রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়াও। তিনি ছিলেন উত্তম আর আদর্শ একজন শাসক। তার সহজ-সরল জীবনাচারের জন্য লোকজন তাকে এতটাই ভালোবাসতো যে একদিন এল প্যারাইসো’তে এক উৎসব চলাকালে তারা তাকে সস্ত্রীক টেনে নিয়ে আসে শোভাযাত্রায়।

পর্যায়ক্রমিক আমাকে এই অসাধারণ মেদিনা সম্পর্কে বলতেই থাকলো তারা; মেদিনা এমন একজন শাসক ছিলেন যিনি একজনমাত্র ব্যক্তিগত কর্মচারি নিয়ে ক্যারাকাসের রাস্তায় হেঁটে বেড়াতেন, সিনেমায় যেতেন সাধারণ নাগরিকের মত। আরমান্দো আর ডিলফ্রে বুঝিয়ে ছাড়লো যে হৃদয় আছে এমন যে কোনো মানুষ মেদিনাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে পিছপা হবে না। তারা বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে ক্ষমতাসীনদের অবিচার আর প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘিনঘিনে ছবি এঁকে চললো আমার মনে। জেলখাটা দাগী হওয়া সত্ত্বেও ডিলফ্রে ছিল মেদিনার একজন ব্যক্তিগত বন্ধু। এসব কারণে সর্বশেষ অভ্যুত্থানে সে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে বলা যায়। তার বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট কাম ক্যাবারে যেখানে মেদিনাসহ ক্যারাকাসের শীর্ষ ব্যক্তিরা প্রায়ই আসতেন রাতের খাবার আর আড্ডায় সময় কাটাতে, বিপ্লবের পর তা রহস্যময় কিছু ব্যক্তি তছনছ করে দেয়।

শেষ পর্যন্ত আমি ওই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার পক্ষে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলাম (এটা যে ভুল ছিল পরে বুঝেছিলাম)। আমার মধ্যে যেটুকু ইতস্তত ভাব ছিল তাও পুরোপুরি উবে গেল (একথা এখানে বলছি কারণ পুরো বিষয়টায় আমি সৎ থাকতে চাচ্ছি) যখন তারা আমাকে এই প্রতিশ্রুতি দিল যে ক্যু সফল হলে আমার প্রতিশোধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দরকারি অর্থ আর প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা দেওয়া হবে।

আর তাই এক রাতে অ্যাকশনে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায় আমাকে দেখা গেল ডিলফ্রের আস্তানায় ভেনেজুয়েলিয় আর্মির একজন ক্যাপ্টেনের বেশভূষায়, ডিলফ্রে সেজেছে পুরোদস্তুর একজন কর্নেল।

 

কিন্তু সবকিছুই শুরু হল যাচ্ছেতাই ভাবে। আমাদের পাসওয়ার্ড নির্ধারিত ছিল ‘অ্যারাগুয়া’, অভ্যুত্থানে অংশীদার বেসামরিক লোকজনের প্রত্যেকেই পড়ে থাকবে সবুজ রঙের আর্মব্যান্ড, ঘটনাস্থলে আমাদের উপস্থিত থাকার কথা ঠিক রাত দু’টোয়। ডিলফ্যে সব কিছুই করেছিল তার নিজস্ব কেতাদুরস্ত কায়দায়। সবই ঠিক ছিল, কিন্তু রাত এগারোটার দিকে ডিলফ্রের গোটা চারেক চেলা ঘোড়ার গাড়িতে করে ক্যারাকাসে আসে, সবগুলো বেহেড মাতাল অবস্থায়। তারা হাতে গিটার নিয়ে সপ্তম স্বরে গলা ফাটিয়ে গান গাইতে গাইতে ডিলফ্রের আস্তানার কাছে এসে থামে, তাদের গানের বিষয়বস্তু ছিল আজকের রাতের পরিকল্পিত ক্যু সম্পর্কিত। পরোক্ষ ইঙ্গিতে তারা পুরো ক্যারাকাস প্রায় রাষ্ট্র করে এসেছে আজ রাতে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। ডিলফ্রের বাসার সামনে এসে একজন তো চিৎকার করে ডাকা শুরু করলো তাকে,‘হেই পিয়েরে! শেষ পর্যন্ত আজ রাতেই আমাদের দুঃস্বপ্নের অবসান হতে যাচ্ছে। সাহস আর আত্মমর্যাদা ধরে রাখো, বন্ধু! আমাদের পাপা মেদিনা অবশ্যই ক্ষমতায় ফিরে আসছেন!’

রাম-গাধামির চূড়ান্ত প্রদর্শনীর এর চেয়ে ভালো নমুনা আর হতে পারে না। মনে হচ্ছিল যে কোনো সময়ে পুলিশ এসে আমাদের পাকড়াও করতে যাচ্ছে, ভয়ে আতংকে দুশ্চিন্তায় আমি বোধ’য় পাগলই হয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা যে গাড়িতে বসে আছি তাতে তিনটি বোমা আছে, দু’টি বুটে আর একটি ব্যাকসিটে, ছেঁড়া ত্যানা দিয়ে প্যাঁচানো।

‘চমৎকার, তোমার কর্মীরা তো দেখছি একেকজন রীতিমত কামেল আদমি! তাদের সবাই যদি এই কিসিমের হয়, তবে সরাসরি গারদে ঢুকতে আমাদের আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না।’

ডিলফ্রে হাসিতে ফেটে পড়লো। তাকে বেশ সুস্থির আর আনন্দিত দেখাচ্ছিল, আয়নায় বারবার নিজের বেশভূষা দেখে সে আপ্লুত। আমাকে বললো, ‘প্যাপিলন, খামোখা চিন্তা করো না। আমরা কোনো ধরনের খুন-খারাপি করতে যাচ্ছি না। তুমি তো জানো এই তিনটি গ্যাস-বোতলে স্রেফ পাউডার ছাড়া আর কিছু নেই। এতে স্রেফ বিকট শব্দই উৎপন্ন হবে, অন্য কিছু নয়।’

‘আর ওই সামান্য বিকট শব্দে তুমি কি ফল আশা করছো?’

‘প্রধানত এটা হবে শহরে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমাদের লোকজনের জন্য একটা সংকেত বিশেষ। কোনো হানাহানি, মারামারি কিংবা বিভৎসতা চাচ্ছি না আমরা। আমরা শুধু চাই হাঙ্গামা-হট্টগোলে শত্রুপক্ষ ভয় পেয়ে পালিয়ে যাক, ব্যস।’

ঠিক হ্যায়। ব্যাপারটা আমি পছন্দ করি আর না করি, এর কাঁটাটা আমার গলায় আটকে গেছে ঠিক। আমার পক্ষে এ পরিস্থিতি রীতিমত ভয়াবহ। এখন ভয়ে ভীত হওয়া আর অনুশোচনায় আক্রান্ত হওয়ার সময় নেই আমার, যা করতে হবে তা হলো অভ্যুত্থানের মাহেন্দ্র ক্ষণটির অপেক্ষায় থাকা।

থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের তিনজন এলো একটি ক্রেনবাহী গাড়িতে করে। তাদের দায়িত্ব ছিল এয়ারলাইন কোম্পানি আর মডেল কারাগারের (দ্য কারসেল মডেলো) দুটি বিশাল সিন্দুক উঠিয়ে নেওয়ার, একাজে সাহায্য করবেন একজন গভর্নর অথবা শহরের সেনানিবাসের কমান্ডে থাকা ব্যক্তিটি। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এই লুণ্ঠনে যা পাওয়া যাবে তার অর্ধেক আমার হবে। কারাগারের সম্পদ লুটে নেওয়ার এই বিষয়টি আমার অন্তরের খুব কাছের একটি সুখ-সুখ অনুভূতিকে সতেজ করেছে। দুনিয়ার সব জিন্দানখানার বিরুদ্ধে এটা হবে প্যাপিলনের মধুর এক প্রতিশোধ।

একজন মোটরসাইকেলবাহী এসে চূড়ান্ত নির্দেশনা জানিয়ে গেল--- কাউকে গ্রেফতার করার দরকার নেই। শত্রুদের পালিয়ে যেতে দাও। শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত ক্যারলোত্তা বিমানবন্দর অনুকূল রাখা হয়েছে যাতে বর্তমান সরকার প্রধান এবং তার অনুগত কর্মকর্তারা হাল্কা বিমানে করে নির্বঘ্নে পালিয়ে যেতে পারে।

এসময়ে জানলাম, প্রথম বোমাটা কোথায় ফাটানো হবে, মিরার্ফ্লোসে অবস্থিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ঠিক সামনে। অপর দুটির বিস্ফোরণ ঘটানো হবে ক্যারাকাসের পূর্ব আর পশ্চিম প্রান্তে যাতে সবাই মনে করে যে পুরো রাজধানী জুড়ে শুরু হয়েছে ধুন্ধুমার কাণ্ড।

প্রাসাদের পেছনের দিকের বিশাল কাঠের দরোজার কাছে আমাদের উপস্থিত হওয়ার কথা রাত দু’টো বাজার ঠিক তিন মিনিট আগে। বাইরে থেকে আমাদের একজন বাচ্চাদের খেলনা দিয়ে ব্যাঙের ডাক দেবে পরপর দু’বার। সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেওয়া হবে। এরপর কি হবে সে সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। প্রেসিডেন্ট গ্যালেগোর রক্ষীরা কি এতে জড়িত? তারা কি প্রেসিডেন্টকে গ্রেফতার করবে? না তাদেরকে ভেতরে অবস্থানরত অন্য কোন পক্ষ নিরস্ত্র করবে? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই জানা ছিল না আমার।

আমার জানা ছিল একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে: এ মুহূর্তে আমার দুই হাঁটুর ফাঁকে ধরে রাখা গ্যাস-বোতলজাত বোমাটির ফিউজে রাত ঠিক দু’টোয় আগুন ধরাতে হবে। এরপর বোমাটি গাড়ির দরোজা খুলে প্রাসাদের দরোজার দিকে সজোরে গড়িয়ে দিতে হবে। ফিউজে আগুন দেওয়ার পর ডেটোনেটর সক্রিয় হতে সময় রাখা হয়েছে নব্বই সেকেন্ড। ব্যাপারটা এরকম নির্ধারিত ছিল যে যথা সময়ে আমার হাতে ধরা জ্বলন্ত সিগার থেকে ফিউজে আগুন দেওয়ার পর ডান পা’টা সরিয়ে দরোজা খুলে ত্রিশ সেকেন্ড পর্যন্ত গোণার পর গড়িয়ে দেবো টার্গেটের দিকে, এরপর চল্লিশ সেকেন্ডের মত সময় থাকবো তা বিস্ফোরিত হওয়ার আগে।

যদিও বোমাটায় কোনো ইস্পাত বা স্পিন্টার নেই, তারপরেও বোতল ফেটে যে স্পিন্টার তৈরি হবে তাতে আশপাশে যারা থাকবে তাদের মারাত্মক পরিণতি হতে পারে, সুতরাং আমাদেরকে যত দ্রুত সম্ভব গাড়ি নিয়ে পগাড় পার হতে হবে। ড্রাইভিংয়ে আছে ডিলফ্রের অতি বিশ্বস্ত শোফার ভিক্টর।

 

কোনো ঝামেলা ছাড়াই প্রাসাদের পেছনের ওই নির্দিষ্ট গেটের কাছে পৌঁছলাম রাত দুটো বাজার তিন মিনিট আগে। কোনো সেন্ট্রি বা পুলিশের দেখা পেলাম না। চমৎকার। দুটো বাজতে আর দুই মিনিট, এক মিনিট...হ্যাঁ দুটো বেজে গেল।

কিন্তু গেট খোলা হলো না কথা মত।

আমি উত্তেজনার চরম শিখরে। ডিলফ্রেকে বললাম, ‘পিয়েরে, দুটো বেজে গেল কিন্তু।’

‘আমি জানি, ঘড়ি আমার কাছেও আছে।’

‘আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি।’

‘ঘটনা কিছুই বুঝতে পারছি না। চলো আরো পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করি।’

‘ওকে।’

রাত দুটো বেজে দু মিনিট... গেট খুলে গেল। ভেতর থেকে দলে দলে সৈন্য বেড়িয়ে এসে পজিশন নেওয়া শুরু করলো। অস্ত্র নিয়ে  সবাই প্রস্তুত। ব্যাপারটা স্ফটিক স্বচ্ছ, আমরা প্রতারিত হয়েছি।

‘চল সটকে পড়ি, পিয়েরে। আমরা ধোঁকাবাজির শিকার হয়েছি!’

কিন্তু পিয়েরেকে দেখে মনে হলো বিষয়টা এখনো হজম করতে পারছে না। সে যন্ত্রচালিতের মত বললো ‘বাজে বকো না তো। তারা আমাদের লোক।’

ত্রিশঙ্কু এ অবস্থায় সহসাই আমার পয়েন্ট ফর্টি ফাইভটি বের করে ড্রাইভিং সিটে বসা ভিক্টরের পেছনে ঠেকিয়ে বললাম, ‘ছুট লাগাও জলদি, নয়তো খুন করে ফেলবো!’ আমি অপেক্ষা করছিলাম ভিক্টর সর্বশক্তিতে এক্সেলেটর চেপে ধরার পর গাড়িটি লাফিয়ে উঠে আগে বাড়ার ধাক্কাটা সামলানোর জন্য। কিন্তু কিসের কি? আমাকে চমকে দিয়ে ভিক্টরের বাণী বর্ষিত হলো, ‘হোম্বরে, তুমি এখানে কমান্ড করার কেউ নও, এ কাজের জন্য বস আছেন। বস, কি বলেন?’

কি ভয়াবহ! জীবনে আমি দুঃসাহসী লোক কিছু দেখেছি বটে, কিন্তু মনে হলো তাদের কেউ এই শংকর ইন্ডিয়ানটার ধারে-কাছে আসার যোগ্যও নয়। কঠিন একখান জিনিস বটে!

আমি নিজে থেকে কিছু করতে পারছিলাম না ওই অবস্থায়, কারণ মাত্র তিন গজ সামনে সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে। তারা ডিলফ্রের কাঁধের অ্যাপুলেটে আটকানো কর্নেল র‌্যাংক দেখে কাছে আসার সাহস পাচ্ছিল না।

‘পিয়েরে, ভিক্টরকে গাড়ি ছাড়তে আদেশ করো, নয় তো আমি যা করার করবো তোমার সঙ্গে।’

‘বাপধন প্যাপি আমার, আমি তো তোমাকে বারবার বলছি যে তারা আমাদেরই লোক। আরেকটু অপেক্ষা করতে দাও।’ আমার দিকে মাথা ঘুড়িয়ে বললো পিয়েরে। তার চেহারায় নজর পড়তেই দেখি নাসারন্ধ্রে সাদা পাউডার মত কি যেন লেগে আছে- সে কোকেনে পুরো চুর হয়ে আছে। আমার সর্বাঙ্গ বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত নেমে এলো। আগ্নেয়াস্ত্রটা ওর ঘারে চেপে ধরলাম এবার। সে ধীর স্থির শান্তভাবে বললো, ‘এখন দুইটা ছয় বাজে, প্যাপি। আরো দুটো মিনিট অপেক্ষা করবো। আমরা নিশ্চিতই বেঈমানির শিকার হয়েছি।’

সেই এক শ’ বিশটি সেকেন্ড আর এ জন্মে শেষ হতে চাইছিল না যেন। আমি সৈনিকদের দিকে নজর রাখছি, সবচেয়ে কাছেরটা আমাকে দেখছিল। শেষ পর্যন্ত ডিলফ্রের গলা ভেসে এলো, ‘পালাও, ভিক্টর! জলদি। ধীর লয়ে, স্বাভাবিক গতিতে, হুড়মুড় করে নয়।’

অবশ্যই আমাদের পক্ষে ওই মানব ফাঁদের মধ্য থেকে বহাল তবিয়তে বেড়িয়ে আসাটা ছিল এক কুদরতি ঘটনা। হাঁফ ছেড়ে বাঁচা আর কারে কয়! এর বেশ কয়েক বছর পর ‘দ্য লংগেস্ট ডে’ নামে একটি সিনেমা হয়েছিল। আমার মনে হয় আমাদের ওই দিনকার মুহূর্তগুলোর ওপর ভিত্তি করে ‘দ্য লংগেস্ট এইট মিনিট্স’ নামেও একটি জবরদস্ত সিনেমা বানানো যেতে পারে।

এরপর আর ডিলফ্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কোনো মানে হয় না। সে তার পথে আর আমরা আমাদের পথে চললাম। আরমান্দোর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আমি সোজা গ্যারেজে গিয়ে লেদ মেশিন আর পাঁচ-ছটি গ্যাসের বোতল যা ছিল সব সরিয়ে ফেললাম। ছটার দিকে ফোন বেজে উঠলো। রহস্যময় এক কণ্ঠ আদেশ করলো, ‘সরাসিরা, সবাই বেড়িয়ে যাও গ্যারেজ থেকে, প্রত্যেকে আলাদা আলাদা পথে পালাও। তবে শুধু বিএল একা থেকে যাবে গ্যারেজে। পরিষ্কার’

‘তুমি কে ভাই?’

ফোন রেখে দিল রহস্য মানব।

ফরাসি রেসিস্ট্যান্স বাহিনীর সাবেক এক ক্যাপ্টেনের গাড়িতে একজন মহিলার ছদ্মবেশে আমি কোনো ঝামলো ছাড়াই ক্যারাকাস থেকে রিও শিকোয় এসে পৌঁছাই। এই শহরটি ক্যারাকাস থেকে সমুদ্র উপকূলের দিকে এক শ’ পঁচিশ মাইল দূরে। এই ক্যাপ্টেন, তার স্ত্রী আর বোর্দ্যুক্স থেকে আসা দু’জন বন্ধুর সঙ্গে আমি এখানে পরবর্তী কয়েকটা মাস থেকে যাই। এই সময়ের মধ্যে ক্যারাকাসে যে ঝড় উঠেছিল তা অবশ্যই থেমে যাবে আশা করা যায়।

ওদিকে বিএল গ্রেফতার হয়। কোনো নির্যাতন করা হয়নি তাকে। শুধু দীর্ঘ, টানা আর বিরামহীন এক জিজ্ঞাসাবাদের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এ খবর জেনে আমার ধারণা হলো---  তাহলে গ্যালগস আর বেতানকোর্তের শাসন যতটা খারাপ শুনেছিলাম আসলে তারা ততটা খারাপ না। আর ডিলফ্রে ঘটনাবহুল ওই রাতেই নিকারাগুয়ান অ্যাম্বেসিতে আশ্রয় নেয়।

এদিকে আমি এখনো জীবনের ওপর পুরোপুরি আশাবাদী এক মানুষই রয়ে গেলাম। সপ্তাহ খানেক পরে ক্যাপ্টেন আর আমি রিও-শিকো পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টন্টের ট্রাক চালানোর কাজে লেগে গেলাম। দিনে আমাদের একুশ বলিভার করে আয়, এ দিয়েই আমরা মোটমাট পাঁচজনে চালিয়ে নিতে থাকলাম। বিকালের দিকে আমি সমুদ্রের পাড়ে মাছ ধরতে চলে যেতাম, মেনুতে বাড়তি কিছু যোগ করার আশায়। এক বিকেলে বিশাল এক রোবেলো মাছ ধরে ফেললাম। তবে মাছ ধরার আনন্দ ছাড়িয়েও আমি উপভোগ করছিলাম চমৎকার সূর্যাস্তের সময়টা।লোহিত আকাশ নতুন আশাবাদের ইঙ্গিতবহ, প্যাপি! আর পরপর এতগুলো ব্যর্থতার পরেও আমি মুক্তভাবে বেঁচে-বর্তে আছি! বিষয়টা ভেবে একা একা হাসতে লাগলাম।

 

[চলবে]

 

বাংলাদেশ সময় ১৬১৮, ডিসেম্বর ০৭, ২০১১

স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান: শ্বশুরবাড়ীতেই স্বামীর আত্মহত্যা
রাজউক আর দুর্নীতি এখন সমার্থক: ইফতেখারুজ্জামান
ভোটগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করুন: ইসিকে তাবিথ
সেই নারীর খোঁজে হাসপাতালে স্বামী
প্রচারণার জোয়ার ভোটের বাক্সেও দেখতে চান মেনন


আমার কোনো গ্রুপ নেই, চবি ছাত্রলীগ নিয়ে নওফেল
দারুণ দুর্দশায় মাইলি সাইরাস
মোদী ঢাকায় আসছেন ১৭ মার্চ
ঢাকার ভোট পর্যবেক্ষণে থাকছেন ৬৭ বিদেশি পর্যবেক্ষক
করোনাভাইরাস আতঙ্ক প্রভাব ফেলেছে চীনের ক্রীড়াঙ্গনেও