ছোটগল্প

ফ্রেম

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

সেজুতী মা’র ঘর থেকে ড্রেসিং টেবিলটা দখল করলো বিয়ের দিনই। এটাকে আসলে দখল বলা যাবে না। দখল বললে অনেকটা দোষারোপের মতো শোনায়। এটা তো সেজুতীর দোষ না।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011December/galpo 120111201154303.jpgসেজুতী মা’র ঘর থেকে ড্রেসিং টেবিলটা দখল করলো বিয়ের দিনই। এটাকে আসলে দখল বলা যাবে না। দখল বললে অনেকটা দোষারোপের মতো শোনায়। এটা তো সেজুতীর দোষ না।

আমাদের যেদিন বিয়ে হলো সেদিন সকালে মা বলে উঠলো, ‘আরে! আমার বউটা ঘরে এসে সাজবে কোথায়! ওর রুমে ড্রেসিং টেবিল দরকার।’
 
আব্বু দুষ্টুমী করে বলেছিল, ‘কেন? তোমার গাধা ছেলেটা কি যৌতুক পাচ্ছে না?’
 
মা অভিমানী স্বরে বলে, ‘যৌতুক? আমার ছেলেকে পড়াশুনা করিয়েছি কী যৌতুক নেওয়ার জন্য?’

আব্বু হাসতে হাসতে বলতো, ‘আরে তুমি এতো ক্ষ্যাপো কেনো? এখন হচ্ছে আধুনিক যুগ। আর তাছাড়া শিক্ষিত সমাজের যৌতুক প্রথা হয় যথেষ্ট মার্জিত। যেমন, আমাদের সময় চেয়ে নেওয়া হতো। বলত, খাট দিতে হবে, শোকেইজ দিতে হবে, আলমারি দিতে হবে, মোটরসাইকেল দিতে হবে। কিন্তু আমাদের মার্জিত সমাজে বলবে, কিচ্ছু দেওয়া লাগবে না। শুধু ঘরটা একটু সাজিয়ে দেবেন। যদিও বা অনেকে মুখ ফুটে কিছুই বলে না। কিন্তু মনে মনে ঠিকই ওত পেতে থাকে যৌতুক পাবার জন্য। না দিলেই বেজার।’
 
আব্বু বলতো আর হাসতো। আব্বুর এই এক স্বভাব। কিছু থেকে কিছু হলেই খোঁচানো মার্কা কথা বলে আম্মুকে ক্ষ্যাপাবে।
 
যাইহোক। ৩৫ বছরের সংসার জীবনে মা’র এসব বোঝা হয়ে গেছে। নিজের স্বামীকে তিনি ভালো মতই চেনেন। স্বামীর সাথে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই তিনি অভিমানে মুখ ভার করে থাকেন। আর বলেন, ‘আমার সারাটা জীবন কুরে কুরে খাচ্ছে লোকটা। আর জ্বালাতন ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনটা চায় কোথাও চলে যাই।’  

আব্বু তখন চুপ করেই শুনতো। চেচামেচির মাত্রা অতিরিক্ত হলে দিব্বি এক ঘুমে দিন কাবার।

তবে মজার বিষয় হলো আমাদের ছোটকাল থেকে শুনতে হয়েছে, ‘তোরা বড় হয়ে তোর বাবার মতো হবি। সৎ। নিষ্ঠাবান মানুষ। সরল। পৃথিবীর জঞ্জাল থেকে তোরা দূরে থেকে শান্তির জীবন পার করবি।’
 
আমি এখন চিন্তুা করি। স্বামীর প্রতি হাজারো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মা চাইতেন আমরা যেন বাবার মতই হই।

আমরা বাবার মতো হয়েছি কি মার মতো হয়েছি তাও জানা নেই। তবে আমার অন্য ভাই বোন বলে, আমি মা ঘেষা ছেলে। যাকে বলা চলে মা নেউটা।

তো, সেই মা নেউটা ছেলেটার বিয়ে হচ্ছে। এতে যে মার খুশিটা যে আকাশচুম্বী তা আমি বুঝি। বউমার জন্য তার সব কিছুতে ভিন্নতা থাকতেই হবে। শাড়ি-গয়না থেকে সব কিছু। আমার ঘরটাও সুন্দর করে সাজানো হলো। নতুন খাট, নতুন আলমারি, নতুন টেবিল চেয়ার। বাদ ছিল শুধু ওই ড্রেসিং টেবিল। এতো বড় প্রয়োজনীয় একটি জিনিস যে কিভাবে সবার আড়ালে চলে এলো তা মাও চিন্তা করে পায় না।

আমার বিয়ের দিন সকালে আমার ঘরে চলে আসলো মায়ের ড্রেসিং টেবিল। অসাধারণ এই ড্রেসিং টেবিল বাবা সুন্দর বন থেকে কাঠ আনিয়ে বানিয়েছিলেন। ড্রেসিং টেবিলটা কেমন হবে সেটাও বাবার আঁকা ডিজাইন।

বাবার কাছে এই কাঠের গল্প বহুবার শুনেছি। মা-বাবার ২৫তম বিবাহ বার্ষিকীতে বাবা ড্রেসিং টেবিলটি উপহার হিসেবে মাকে দিয়েছিল।
 
উপহার হিসেবে কেন ড্রেসিং টেবিল? সেটারও একটা গল্প আছে। বাবা প্রায়ই বলতো গল্পটা। বাবা বলতো, ‘যেদিন আমাদের বিয়ে হলো সেদিন আমি মনে মনে মহা বিব্রতকর অবস্থায় আছি। ঘরে আমার খাট নেই, চেয়ার-টেবিল কিচ্ছু নেই। আমি মাটিতে বিছানা পেতে শুতাম। আসলে এসব কেনার দরকারও হয়নি। একা একা ব্যাচেলার জীবন। সেখানে এতো সব কেনারও বা কি দরকার? কিন্তু যখন হুট করে তোর মার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েই গেলো তখন আমি লজ্জার সাগরে। আহারে! না জানি মেয়েটা কি ভাববে। ফকির একটা ছেলের কাছে বিয়ে বসছে। মজার বিষয় হলো, তোর মা আমার ঘরে আসলো। একটা অগোছালো ঘর। কিছুই নেই ঘরে। আমি রাতে প্রশ্ন করলাম, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না। আমি ধীরে ধীরে সব কিনে দিবো। তোর মা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, শুরুতেই কিন্তু একটা ড্রেসিং টেবিল কিনবেন। শুনেই আমি আশ্চর্যের হাসি দিয়ে বসলাম। হায়রে! মেয়ে মানুষ নিজেকে প্রতিদিন একবার হলেও দেখতেই হবে।’

আমরা বাবার এ গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। বাবা গল্পের শেষে বলতো, ‘সেদিন সকালেই আমি ড্রেসিং টেবিল কিনে আনি। তবে মনে মনে চিন্তা করতাম, আমি আমার বউয়ের জন্য পৃথিবীর সব চাইতে ভিন্নগোছের ড্রেসিং টেবিল বানিয়ে দেবো। আর তাই এতো বছর শুধু সন্ধান করছিল আনকমন কী হতে পারে! কি করে ড্রেসিং টেবিল কিনে দিলে সবাই ভাববে সেটা ভিন্ন গোছের। আর তখনই বের করলাম সুন্দরবনের কাঠের কথা। আমি সুন্দরবন থেকে কাঠ আনালাম। আর এই ড্রেসিং টেবিল বানালাম। আর আমি তোর মাকে বললাম, পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে তৈরি এটি। বুঝলা! নাক দিয়ে শুকে দেখো, বাঘের গন্ধ পাবে। হা হা হা’

যাইহোক। আমি মনে হয় আমার গল্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। কথা হচ্ছিল সেজুতীকে নিয়ে। সেজুতীর সাথে আমার বিয়ের দিনই সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে তৈরি ড্রেসিং টেবিল আমার রুমে ঢুকলো। যেই ড্রেসিং টেবিলটি আমার একমাত্র বোনটাও কখনও দখল করতে পারেনি। সেটি এখন সেজুতীর দখলে চলে আসবে। সেই অভিমানি কথাটা আমার বোন বলতে একদমই ভুলেনি। সে সাথে সাথে মাকে খোঁচা মেরে বলে দিয়েছে, ‘ও তাহলে আমার কোন মূল্য নেই তোমাদের কাছে? এতো বছর ধরে চাইলাম তুমি দিলে না আর এখন বউকে না চাইতেই দিয়ে দিলে। ভালো ভালো।’  

মা তখন মুচকি মুচকি হাসছিল।

২.

সেজুতীর সাথে বিয়ের পরদিন থেকেই মা একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। মাকে আমি আড়ালে গিয়ে প্রশ্ন করলাম। মা তুমি কি কোন কারণে আমার উপর রাগ?
মা বলল, কই? নাতো...
- তাহলে মুখটা এমন করে রেখেছো কেন?
মা গম্ভীরভাবে বলল, ‘আসলে ব্যপারটা আমার কেমন যেন লাগছে। আমার ছেলের বউ। তাও মনে হচ্ছে সব কিছু আমার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে।’
 
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘কি যে বলো মা। আর তাছাড়া তো তোমার বয়সও হয়েছে। ফসকে গেলে গেলো। তাতেও বা কি!’
 
আসল বিষয়টা কিন্তু আমি ঠিকই ধরতে পারছিলাম। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় মায়ের একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি আটা ছিল। ওই ছবিটা সেজুতী খুলে ফেলেছিল। আমি সেজুতীকে কিছুই বলিনি। ভেবেছিলাম, ওকে বললে ওর মধ্যে শাশুড়ীর প্রতি রাগ জন্মাবে। আর তাছাড়া ছবিটা খুললেই বা কি! মার ছবি সরালে কিই বা হবে!

কিন্তু মা যখন আমাদের রুমে ঢুকে প্রশ্ন করলো, ‘আয়নার ছবিটা কোথায়?’
সেজুতী তখন ড্রয়ার থেকে ছবিটা বের করতে করতে বলল, ‘মা আয়নায় কেউ কি ছবি লাগায়? আমার কাছে ব্যপারটা গেঁয়ো গেঁয়ো মনে হয়েছে। তাই খুলে ফেলেছি।’
 
মার মুখটা তখনই গম্ভীর হয়ে গেলো।
 
এটাতো একদিনের ঘটনা। আরও বহু গল্প আছে।
 
মার জন্য বাবার কেনা শখের ড্রেসিং টেবিল আমার রুমে স্থানান্তরিত হলেও মা একবারও ভাবেনি এটার উপর থেকে মা তার কর্তৃত্ব হারাবে। মা এখন আর ওটা ব্যবহার করতে পারে না।

হুটহাট কিছু কিনে ফেলার ক্ষমতা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের নেই। তাই মাকে সান্তনা দিলাম, ‘মা তোমাকে সামনের মাসেই একটা ড্রেসিং টেবিল কিনে দেবো।
 
বাবা উদাস হয়ে বলল, ‘সামনের মাস! যেই মানুষ একদিনও নিজেকে দেখা ছাড়া থাকতে পারে না সে এক মাসেরও বেশি সময় নিজেকে না দেখে থাকবে!’
 
মা একদিন আপুকে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, ‘আমার স্বামীর কত্ত ভালোবাসা ওটাতে।’
 
এসবই আমার আর সেজুতীর আড়ালে হয়। আমার কানে যাতে না আসে সে ব্যপারে আমার পরিবারের সবাই খুব-ই সচেতন। কিন্তু আমি বুঝতে পারি। এ বাড়ির সবার চেহারা দেখলেই আমি বুঝে ফেলি কে, কি ভাবছে আর কি বলতে চাচ্ছে। জন্মের পর থেকে এই মানুষগুলোর সাথেই তো থাকছি। বুঝবো না!

বিরোধের জন্ম ছিল ড্রেসিং টেবিল। এরপর বহু পানি গড়িয়েছে। ঘরের সব ছবির ফ্রেমগুলোও দখল করেছে সেজুতী। সেখানে কোনো কোনোটাতে আমাদের বিয়ের ছবি। কোনোটাতে সেজুতী একা। কোনোটাতে সেজুতী আর আমি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ছবি।
 
মা শুধু একদিনই প্রশ্ন করলেন যখন দেখলেন তার প্রবাসী বড় ছেলের ছবির ফ্রেমটাও দখল হয়ে গেলো। মা সাথে সাথেই বলল, ‘হাসানের ছবিটা কই?’

সেজুতীর সহজ উত্তর। ‘আরে মা, ভাইয়াকে এই ছবিতে একটুও ভালো লাগছে না। তার চেয়ে আমি ভাইয়াকে বলবো, যাতে সুন্দর দেখে একটা ছবি তুলে পাঠায়। আমরা তখন সেটাকে বড় করে ফ্রেম বন্দি করবো।’
 
সোনালী ফ্রেমে মায়ের সুন্দর একটা ছবি ছিল। যুবতী বয়সের ছবি। সবাই দেখে বলত, সুবর্ণা মোস্তফার মতো লাগছে। মা তখন খুব খুশি হয়ে যেত। সে ফ্রেমের ছবিটাও সেজুতী সরিয়ে ফেলেছে। এর কারণ হিসেবে সে বলেছে, ‘মার এই ছবিটা কেমন যেন ঘোলাটে। তাই সরিয়ে ফেলেছি।’
 
সোনালী সেই ফ্রেমে আমার বউ তার কলেজ জীবনের একটা ছবি লাগিয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে ওকে।



৩.

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011December/sherif 020111201154902.jpgআমার বউ সেজুতী। সেজুতী ইসলাম। মা-বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে। ওর কোন ভাই বোন নেই। পরিবারে একাই রাজত্ব করেছে। নিজের যত চাহিদা যত আবদার তা সে একাই করেছে। আশেপাশে কেউ আবদার করেনি। অসম্ভব জেদী, ইমোশনাল মেয়ে সেজুতী। পৃথিবীটা ওর কাছে একদম রঙিন। পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে দেখে নিজের মতো করে। কারও ভাবনা কিংবা কারও বাস্তবতা সেতুজীর কাছে মূল্যহীন। সেজুতীর কাছে তার নিজস্ব ভাবনাটাই সবচেয়ে বড়। সেজুতী ভাবে ও যা করছে তা সঠিক। সেজুতী তার ভুবনকে সাজাতে চায় স্বপ্নের মতো করে। সেজুতী ভাবে, স্বপ্ন দেখেছিলাম আমার জামাই আমায় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়ে যাবে। সুতরাং জামাইকে সেটাই দিতে হবে। তা না হলে ভাবতে হবে আমার জামাই আমাকে ভালোবাসে না। এটা সেজুতী বিশ্বাসও করে। ও চায় আমি পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ শুধু ওর সাথেই ভাগাভাগি করি। ওখানে আর কারও অধিকার থাকতে পারে না। ও চায় শুধু সুখ আর সুখ। যেখানে কোন দুঃখ দেখলেই সেজুতী আঁতকে ওঠে। ও ভাবে এই বুঝি সব ভেঙে পড়লো। এই বুঝি ওর অধিকার ছুটি নিলো।
 
সেজুতীর বর্ণনা দিলাম। সেজুতী এমনই। আমাকে সবসময় ও আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। আর সেজুতী সব কিছু করতে চায় ওর মতো করে। সেখানে বাধা আসলেই ও ভাববে অন্য কিছু। নতুন করে অন্য এক বিশৃঙ্খল ভাবনায় আবার নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে।
 
এই যে মায়ের ড্রেসিং টেবিলের আয়না থেকে মায়ের ছবি সরিয়ে ফেলা; আমি জানি এটা ও এতো কিছু ভেবে করেনি। ওর কাছে ভালো লাগেনি তাই সরিয়ে ফেলেছে। হয়তো মা ভেবেছে ঘরের সব কিছুতে নিজের দখলদারিত্ব দেখানোর জন্যই হয়তো সেজুতীর এই কা-। কিন্তু আমিতো জানি এতো সাত-পাঁচ চিন্তা সেজুতী করেনি।

আবার ঘরের সব ছবির ফ্রেমগুলো দখল করা। এগুলোও ওর কাছে বড় কিছু না। নিজের মা-বাবার ঘরে নিজের মতো করে সব কিছু করবার অধিকার ছিল। বলার মতো কেউ ছিল না। ঘরে একা অধিপত্ত্ব ভোগ করে এসেছে।

আমাদের বাড়িতে প্রতিপদে চিন্তা করতে হয় অনেক কিছু। এখানে চিন্তা করতে হয়, ঘরের আরও দুই সন্তানের কথা। বড় ছেলে ও তার পরিবার। মেজো মেয়ে ও তার পরিবার। সবাই এই ঘরে না থাকলেও এই ঘরে সবার অধিকার আছে। ঠিক যেমনটা সেজুতীরও আছে। সবাই এই ঘরের ঠিক ততটাই পরিবর্তন করতে পারবে; যতটা সেজুতী পারবে। তবে সব পরিবর্তনই হতে হয় আলোচনা করে। সব কিছু নির্ভর করে সবার মতামতের ওপর। কিন্তু সেজুতীর তো আর সেসব চিন্তার বালাই নেই। সেজুতী ভাবে যেহেতু সে এ ঘরের বউ; তাই এ ঘরের সমস্ত ক্ষমতা ওর দখলেই থাকবে।
 
তবে একটি কথা হলো। অদৃশ্যভাবে এ ঘরের সমস্ত ক্ষমতা আমাদের মা-বাবার হাতে। আমরা কখনও কেউ কোনদিন তাদের মতামতের বাইরে কথা বলিনি।
 
তাই যখনই আমার মা-বাবা দেখছে চোখের সামনে তাদের তোয়াক্কা না করে ঘরের ছোট বউ ঘরে একটার পর একটা পরিবর্তন আনছে ঠিক তখন তাদের মাঝে কালো মেঘের সঞ্চার হয়।
 
এ অভিযোগ আমার বোন এসেও আমাকে করে গেছে। বলেছে, ‘তুই কিছু বলছিস না?’
 
আমি বললাম, ‘ঠিক এভাবেই ও বড় হয়েছে। ওর পরিসরটাকে, ওর ভাবনাগুলোকে আমি কিভাবে হত্যা করবো? আর ওতো পর ভেবে করছে না। ও এটাকে ওর সংসার মনে করছে তাই করছে।’
 
আমার বোন চুপ হয়ে ছিল। কিছু বলেনি।

আমি বলেছি, ‘একজন মানুষের এতোদিনের স্বপ্ন তুমি একদিনেই ভেঙে দিতে পারো না। ওকে সময় দাও। আস্তে আস্তে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করে নেবে।’
 
সেজুতীকে যে একদমই আমি কিছু বলিনি তাও কিন্তু না। ওকে বলেছি, ‘তুমি শুধু শুধু কেন ছবিগুলো সরিয়ে দিচ্ছো? মা মনে কষ্টে পাচ্ছে না?

সেজুতীর আবার সহজ উত্তর, ‘এতো সিম্পল একটি বিষয় নিয়ে মা মন খারাপ করবে? এটা কি বললে?’

আমি বললাম, ‘সংসারে মন কষাকষির শুরুটা হয় সিম্পল বিষয় নিয়েই। এই সিম্পল বিষয়গুলোই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে। তখন? তখন কি করবে?’
সেজুতী কিছুটা হয়তো বুঝেছিল। বুঝতে পেরেছিল বলেই আমাকে বলল, ‘মার জন্য আমি কালকেই সুন্দর দেখে একটা ফ্রেম কিনে আনবো। তারপর আমাদের ঘরে মার যুবতী বয়সের ছবিটা ঝুলাবো।’
 
এই বলে মিষ্টি হাসিও দিয়েছিল সেজুতী। সেই হাসিতে কোন রহস্য নেই। সরল হাসি।

পরদিন সকালে আমি যখন অফিসে চলে গেলাম। তখন আমার মোবাইলে সেজুতী ফোন দিলো। বলল, ‘আমি একটু মার্কেটে যাচ্ছি। মায়ের জন্য ফ্রেম কিনতে।’
 
আমি নির্বিঘ্নে কাজ করছি। অফিসের বসের একগাদা আবদার পালন করে চলেছি।

হঠাৎ অফিস ছুটির কিছুক্ষণ আগে আমার মোবাইলে ফোন আসলো। ফোনটা দিলো মা। বলল, ‘বাবা, কিছুক্ষণ আগে বাসার নাম্বারে ফোন এসেছে। সেজুতী নাকি এক্সিডেন্ট করেছে।’
 
এরপর আর কিছু শুনিনি। হাসপাতালের সাদা চাদর মোড়ানো বিছানায় আমার সেজুতী রক্তাক্ত।
 
আমার লক্ষ্মী সরল বউ সেজুতীর রিক্সা একটি বাস নাকি শূন্যে তুলে দিয়েছিল।
 
আহ। কি ব্যাথা। কি যন্ত্রণাটা পাচ্ছে সেজুতী। একটি অপরিচিত লোক আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার হাতে কাগজে মোড়ানো একটি ব্যাগ তুলে দিতে দিতে বলল, ‘আমি তখন রাস্তার ওপারেই ছিলাম। আমার সামনেই ঘটনাটা ঘটেছে। মানুষজনের ভিড়ের মাঝে ওনার ব্যাগট্যাগ কিছুই পাইনি। হয়তো ভিড়ের মধ্যে কেউ সব নিয়ে গিয়েছে। তবে হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল এই ব্যাগটি। জ্ঞান ততক্ষণে গেছে। হঠাৎ জ্ঞান আসলো আর ধীরে ধীরে আপনাদের বাসার নাম্বারটা দিলো।’
 
আমি লোকটিকে থ্যাঙ্কস বলে বিদায় দিলাম। আমি, আমার মা, আমার বাবা, আমার বোন সবাই তখন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি ব্যান্ডেজে মোড়ানো সেজুতীর দিকে।
 
আমরা এখনও সেজুতীর মা-বাবাকে খবর দেইনি। বাবা বলল, ‘কি বলবো ওনাদের? ওনাদের একমাত্র মেয়েকে আমরা সামলাতে পারলাম না।’
 
বলতে বলতে বাবা কেঁদে দিলো। আমার মা একদম নিশ্চুপ। আমি হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার হাতে ব্যাগ। আমার মা আমার পিছু পিছু। আমার মা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আকাশে দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার সব কিছু আমি সেজুতীকে দিয়ে দেবো। তারপরও ওকে বল, ওর যাতে কিছু না হয়। ওকে বল ভালো হয়ে যেতে। ওকে বল...’

মা নিস্তব্ধতা ভেঙে এক আর্তনাদ শুরু করলো। আমি তখন মাকে জড়িয়ে ধরে আছি। আর তখন আমার হাতে কাগজে মোড়ানো ব্যাগে একটি ফ্রেম। শূন্যে উঠে যাওয়া রিক্সাটা যখন ভূমিতে এসে পড়লো তখন সেজুতী দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও ফ্রেমটি আছে একদম অক্ষত।

পরদিন সকালে আমি বাসায় যাই। রাতেই মাকে পাঠিয়ে দিয়েছি বাসায়।
 
বাসায় গিয়ে দেখি নতুন ফ্রেমটি মার ঘরের দেওয়ালে ঝুলানো। আর ছবির ভেতর ফ্রেমবন্দি আমার লক্ষ্মী সেজুতী।

বাংলাদেশ সময় ১৫২৬, ডিসেম্বর ০১, ২০১১

বরিশাল বোর্ডে অনিয়মিত এসএসসি পরীক্ষার্থী ২১ শতাংশ
টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
আশুলিয়ায় বাসচাপায় নির্মাণ শ্রমিক নিহত
সেরেনার হতাশাজনক বিদায়, চতুর্থ রাউন্ডে শীর্ষ বাছাই বার্টি 
রাতের আঁধারে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কীর্তনখোলায়


ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার, বাড়ছে দুর্ঘটনা
বাহুবলে বাস উল্টে ৩ জন নিহত
ড্রেজার মেশিন বিকল, বরিশাল নদীবন্দর এলাকায় খনন বন্ধ
দেউলিয়া আ’লীগ বিএন‌পির বিজয় বাধাগ্রস্ত করতে চায়: ফখরুল
শতভাগ দেশি কর্মীর হাতে তৈরি সিম্ফনি মোবাইল, লক্ষ্য রফতানি