ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

ব্যানকো [পর্ব--৯]

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের  হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ। এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে।

ব্যানকো [পর্ব--৮], [পর্ব-৭], [পর্ব-৬], [পর্ব-৫], [পর্ব-৪], [পর্ব-৩], [পর্ব-২], [পর্ব-১]

 

চতুর্থ অধ্যায়
বিদায় এল ক্যালাও

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/Sun 320111120173239.jpgপরদিন সকাল প্রায় দশটার দিকে আমি লেবানিজটার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। ‘সুতরাং আমি এল ক্যালাও অথবা সিঁউদাদ বলিভারের যেখানেই যাই, তোমার দেওয়া ঠিকানায় গেলে তারা  আমাকে এই বিলে উল্লেখিত টাকা বুঝিয়ে দেবে?’
: এক্কেবারে ঠিক। তুমি নির্বিঘ্ন চিত্তে রওনা করতে পার।
‘কিন্তু তোমাকেও যদি খুন করা হয় তখন কী হবে?’
: তোমার পাওনা-দেনার ব্যাপারে এতে কোনই ব্যাঘাত ঘটবে না। যা-ই ঘটুক, পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হবে। তুমি এল ক্যালাও যাচ্ছো তো?
‘হ্যাঁ।’
: ফ্রান্সের কোন এলাকায় যেন তোমার বাড়ি?
‘রু অ্যাভিনন। মার্সেইলিস থেকে খুব একটা দূরে নয়।’
: জিজ্ঞেস করলাম, কারণ মার্সেইলেসের এক বন্ধু আছে এখানে আমার। তবে সে থাকে বেশ দূরে। তার নাম আলেক্সান্দ্রে গুইগ।
‘ভাল খবর, তুমি জানো সে আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু?’
: আমারও। তুমি তাকে চেন জেনে আনন্দ লাগছে।
‘কোথায় থাকে সে? তার ওখানে যাওয়ার ঠিকানা?’
: সে বোয়া ভিস্তায় আছে। তার কাহিনী  বেশ দীর্ঘ আর জটিলতায় ঠাসা।
‘সে করে কি সেখানে?’
: সে একজন নাপিত। খুঁজে পাওয়া খুব সহজ--- লোকজনকে শুধু জিজ্ঞেস করবে ফরাসি দন্তবিদ-নাপিতকে কোথায় পাওয়া যাবে?
‘অর্থাৎ সে একজন দন্ত চিকিৎসকও?’
আমি না হেসে পারলাম না। কারণ আমি আলেক্সান্দ্রে গুইগকে খুব ভালভাবেই চিনি। সে এক অদ্ভুত চিড়িয়া। তাকেও আমার মত একই সময়ে পেনালে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৩৩ সনে  আমরা একই সঙ্গে পগার পার হয়েছি। এবং তার কার্যকলাপ সবিস্তারে বর্ণনায় আলেক্সান্দ্রের সময়ের কমতি হতো না কখনো।
              
চার কি পাঁচদিন পর আমি এল ক্যালাওয়ে ফিরে এলাম। কষ্টকর টানা সফরে পরিশ্রান্ত, ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় কাঠির মত লিকলিকে স্বাস্থ্য নিয়ে এক সন্ধ্যায় মারিয়াদের দরজায় কড়া নারলাম।
                  
‘সে এখানে! সে এখানে!’ তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল এসমারেল্ডা।
‘কে?’ অন্য ঘর থেকে জিজ্ঞেস করল মারিয়া। ‘অমন করে চেঁচাচ্ছো কেন?’
কয়েক সপ্তাহের বিচ্ছেদের পর আনন্দের এই সুখস্পর্শের আবেশে আমার সমগ্র অস্তিত্ব শিহরিত হয়ে উঠল। আমি এসমারেল্ডার মুখ চেপে ধরলাম যাতে মারিয়ার প্রশ্নের জবাব দিতে না পারে।
‘কেউ একজন আসলেই এভাবে চেঁচামেচি করতে হয় নাকি?’ ঘরে প্রবেশ করতে করত বলল মারিয়া।
                   
একটি কান্না, হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ থেকে উথলে ওঠা এক কান্না, আনন্দের এক কান্না যা ভালোবাসা আর প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ-- হুঁ হুঁ করে অনুরণিত হয়ে উঠলো এবং মারিয়া নিজেকে আমার বাহুতে ছুঁড়ে দিল।
                  
 পিকোলিনোর সঙ্গে যখন কোলাকুলি করি আর মারিয়ার বোনদেরকে চুমু খাচ্ছিলাম--- জোসে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি মারিয়াকে পাশে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ শুয়ে রইলাম ওই ঘরে। ও আমাকে একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকল--- সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আসার পথে আমি বিগ শার্লটের ওখানে বা গ্রামের কোন ক্যাফেতে না থেমে সরাসরি তার কছে চলে এসেছি।
               
‘এল ক্যালাওয়ে অল্প কিছুদিন থাকতে যাচ্ছো তুমি, তাই না?’
: হ্যাঁ। সবকিছু এমনভাবে গোছগাছ করবো যাতে আমি কয়েকটা দিন এখানে কাটিয়ে যেতে পারি।
‘তোমার অবশ্যই নিজের দিকে খেয়াল করা উচিৎ আর শরীরের ওজন বাড়াও। আমি তোমার জন্য পুষ্টিকর খাবার পাক করে পাঠিয়ে দেব প্রতিদিন, সুইট হার্ট। যদিও  তোমার চলে যাওয়া আমার হৃদয়কে চিরদিনের জন্য জখম করে রাখবে। এজন্য অবশ্য আমি কোনোমতেই তোমাকে দোষ দেব না, যেহেতু তুমি আগেই আমাকে সতর্ক করেছিলে এ ব্যাপারে।  যখন তুমি চলে যাবে, সে সময়টায় আমি তোমাকে শক্তসমর্থ দেখতে চাই, যাতে করে যতদূর সম্ভব তুমি ক্যারাকাসের ফাঁদগুলো থেকে বেঁচে চলতে পারো।’
               
এল ক্যালাও, উয়াসিপাতা, উপাতা, তুমেরেমো--- একজন ইউরোপিয়র কাছে অপরিচিত সব নামের ছোট ছোট একেকটি গ্রাম ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় একটি দেশের মানচিত্রে ছোট্ট ছোট্ট কিছু বিন্দু বই ভিন্ন কিছু নয়। বিস্তীর্ণ পটভূমিতে যা হারিয়ে গেছে প্রায়, যেখানে প্রগতি একটি অচেনা শব্দমাত্র এবং যার কোন অর্থই নেই তাদের কাছে। ওখানে পুরুষ আর নারী, তরুণ আর বৃদ্ধ এমন এক জীবন যাপন করছে যেমন জীবন ছিল এই শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপের, সত্যিকারের মানবিক আবেগে ভরপুর।

 বিশাল ঔদার্য্য, আনন্দ আর সহৃদয়তায় ভরপুর জীবন...ওই সময়টায় এদেশের সমস্ত পুরুষ যারা চল্লিশোর্ধ ছিল, বলতে গেলে তাদের সবাইকে দুনিয়ার জঘন্যতম স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়েছে, তা ছিল গোমেজের শাসনকাল। তাদেরকে নির্বিচারে ধরপাকড় করা হতো এবং প্রায়ই অনেকটা বিনা কারণেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হত। রাখাল যেমন ভেড়ার পালের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য করে তেমনি কর্তৃপক্ষীয় যে কোন লোক এই জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব চালাত। ১৯২৫ থেকে ১৯৩৫-এ যাদের বয়স ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যে হত তাদেরকে পশুপাখির মত পিটিয়ে খেদিয়ে ব্যারাকে নিয়ে ঢোকানো হত আর্মি রিক্রুটিং এজেন্টদের মাধ্যমে, সৈনিক বানানোর জন্য। এমন দিন ছিল তখন যখন সুন্দরী মাত্রই একবারের জন্য হলেও কোন না কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা কর্তৃক অপহৃত হতে হতো। মেয়েটিকে হরদম ভোগ করতে করতে যখন অফিসারটির অরুচি ধরে যেত, শুধুমাত্র তখনি ছুঁড়ে ফেলে দিত রাস্তায়। এক্ষেত্রে  যদি মেয়েটির পরিবার তাকে বাঁচাতে বা এ অন্যায়ের প্রতিবাদে একটি আঙ্গুলও তুলতো--তাহলে তাদেরকে স্রেফ মুছে ফেলা হত দুনিয়া থেকে।
                   
কখনো সখনো, অনিশ্চিত অনির্ধারিতভাবে বিক্ষোভ প্রতিবাদ হত, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যাওয়া আত্মঘাতি লোকজন বিদ্রোহ করতো, যেহেতু এসবের জন্য তারা  জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু স্বৈরাচারী সরকারের সৈন্যরা এ ধরনের সবগুলো ঘটনায় আচমকাই হামলে পড়ত মরিয়া হয়ে ওঠা বিদ্রোহীদের ওপর। এসব ঘটনায় যারা মরতে মরতে কোনমতে বেঁচে যেত, বাদবাকী জীবন অথর্ব ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে কাটাতে হত তাদের।
                  
 কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও, অনগ্রসর পশ্চাদমুখী এই ছোট ছোট গ্রামগুলোর প্রায় অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী একে অন্যের জন্যে সেই সনাতন ভালবাসাকে লালন করে যাচ্ছে, একইভাবে অন্যকে বিশ্বাসও করছে। আমার জন্য এ ব্যাপারটা ছিল একটি ধারাবহিক পাঠক্রমের মত যা হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
                   
http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/love-my-horse20111120173649.jpgমারিয়ার পাশে শুয়ে শুয়ে আমি এসব ভাবছিলাম। এই জীবনে আমাকে বিস্তর জিল্লতি ভোগ করতে হয়েছে সত্য,অন্যায়ভাবে নিগৃহীত হয়েছি, এরপর আরো সত্য হচ্ছে জেলখানার ফরাসী ওয়ার্ডাররা স্বৈরতান্ত্রিক সেনা আর পুলিশের মতই ছিল বর্বর অসভ্য, এমন কি তারচেয়েও ইবলিশ মার্কা। কিন্তু বর্তমানের আমি এখানে একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এইমাত্র যে একটি শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষ করে এসেছে-- নিশ্চিতভাবেই এক বিপজ্জনক অভিযান, তবে এটা ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদও। আমি অবিরাম হেঁটে চলেছি, ক্যানোতে বৈঠা বেয়েছি, জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সওয়ার হয়ে চলেছি; কিন্তু এই সময়টাতে আমার মনে হয়েছে একেকটি দিন যেন একেকটি বছর, এতটাই প্রাণপ্রাচুর্য্যে ভরপুর ছিল দিনগুলি; আইনের নিগড়মুক্ত মানব জীবন, সকল বন্ধন মুক্ত, সকল নৈতিক বিধিনিষেধের অর্গলহীন, বহির্জগতের যে কোনো ধরনের আনুগত্য স্বীকারের ঊর্ধ্বে।

                 
এসব ভেবে ভেবে কঠিন এক দ্বৈরথে পড়ে গেলাম, এই যে শান্তি-সুখের নন্দন কাননকে পায়ে ঠেলে আমি ক্যারাকাসের পথে রওয়ানা হতে যাচ্ছি--  এটা কতটা সুবিবেচনাপ্রসূত হচ্ছে? বারবার এই একই প্রশ্ন নিজেকে করে গেলাম আমি।
                 
পরদিন দুঃসংবাদের ধাক্কা। ওই লেবানিজের প্রতিনিধি, গোল্ড অর্কিড, মার্গারিটা পার্ল এবং অন্যান্য সব ধরনের খাঁটি স্বর্ণালংকারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীটি, আমাকে জানালো সে আমার ওই রশিদের বিপরীতে কোন টাকা দিতে পারবে না। কারণ তার কাছে ওই লেবানিজের প্রচুর টাকা ঋণ রয়ে গেছে। ঠিক আছে, অসুবিধা কি? আমি তাহলে ওই লেবানিজের দেওয়া সিঁউদাদ বলিভারের ঠিকানা থেকেও আমার পাওনা বুঝে নিতে পারি।
                  
‘তুমি কি এই লোকটাকে চেন?’
: ভাল মত। সে একজন দাগী। বর্তমানে গা ঢাকা দিয়ে আছে। ব্যবসা গুটিয়ে ভেগেছে। এমনকি আমি বিশ্বাস করে তার কাছে আমার পছন্দনিয় ও দামি কিছু জিনিস রেখেছিলাম-- সেগুলোসহ ভেগেছে ব্যাটা।
                 
এই রামগর্দভ যা বলছে তা যদি সত্য হয় তার অর্থ এই যে আমি জোজোর সঙ্গে অভিযানে যাওয়ার আগে যেমন কপর্দকহীন পর্যুদস্তু অবস্থায় ছিলাম, তারচেয়ে করুন দশা হবে এবার আমার। ভাল, খুব ভাল! হায়রে নিয়তি--কী চমৎকার রগড়। এই ধরনের তামাশা শুধু আমার সঙ্গেই ঘটছে, কেন? এবং এবারের ঘটনা ঘটালো একজন লেবানিজ, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েও!
                
মস্তকাবনত দশায়, পা দুটো ছেঁচড়ে টেনে কোনোমতে বাসায় ফিরলাম। ওই রক্তঘাম ঝরানো দশ হাজার ডলার জেতার জন্য আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি এরকম দশ বার, বিশ বার, বারবার; আর বিনিময়ে এখন আমি একটি ফুটো কড়ির গন্ধ পর্যন্ত পাচ্ছি না আমার নিজের হিসেবে। উত্তম, অতি উত্তম: ওই লেবানিজটা জুয়োর বাজি জেতার জন্য ডাইসে হাতও ছোঁয়ায়নি একবারের তরে। এমনকি এগুলো পকেটস্থ করার জন্য তাকে একটুমাত্র নড়াচড়াও করতে হয়নি-- সে নিজের ঘরে হাত-পা গুটিয়ে বসেছিল, নগদ লক্ষ্মী তার কাছে আপনা আপনিই হেঁটে আসবে, এ প্রতীক্ষায়।
                
কিন্তু জীবনের জন্য আমার তৃষ্ণা এতটাই প্রখর ছিল যে সহসাই আমি নিজেকে তিরস্কৃত করলাম এত সহজে হতাশায় নিমজ্জিত হওয়ার অপরাধে। বৎস, তুমিতো মুক্তবিহঙ্গ, বন্ধনহীন, স্বাধীন আর তুমি কী না ভাগ্য নিয়ে বিলাপ করছো! তুমি নিশ্চয়ই স্রেফ মজা করার জন্যই এরকম করছো, তুমি মোটেই সিরিয়াস নও। হয়তো তুমি তোমার জেতা বাজির সম্পদ হারিয়ে ফেলেছ; কিন্তু ভেবে দেখতো, কি চমকপ্রদ একটা জুয়াবাজির অভিযান ছিল এটা! বাজি লাগাও! আর জিতে নাও ধনভাণ্ডার। জোজোর সঙ্গে থাকাকালীন ওই সময়টায় আমার মনে হত কয়েক সপ্তাহর ব্যবধানেই আমি লাখপতি-কোটিপতি বনে যাব আর না হয় সরাসরি নিষ্প্রাণ মুর্দায় পরিণত হতে হবে আমাকে! সে সময় সর্বদা যে ভীতিকর উদ্বেগটা আমায় ঘিরে থাকতো, তাতে মনে হত আমি যেন কোন আগ্নেয়গিরির পাশে দাঁড়িয়ে এর জ্বালামুখের দিকে তাকিয়ে আছি। একই সঙ্গে এ আশংকাও ছিল যে আশপাশের অন্যান্য জ্বালামুখগুলোতেও যে কোন সময়ে অগ্নুৎপাত শুরু হয়ে যেতে পারে। সুতরাং এ ভয়াবহ বিপদ থেকে বাঁচার পক্ষে দশ হাজার ডলার খোয়ানো মোটেই মন্দ বাজি নয়।
              

এবার নিজের বিক্ষিপ্ত মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সফল হলাম। এখন আমি নিজের অবস্থানকে আরো পরিস্কারভাবে জরিপ করতে পারছি। ওই লেবানিজ পিঠটান দেওয়ার আগেই আমার এখন খনি এলাকায় দৌড় লাগানো ফরজ। এবং যেহেতু সময় মানেই টাকা, তাই সময় নষ্ট করা কোনোমতেই উচিৎ নয়। একটা খচ্চর আর কিছু দরকারী জিনিসপত্র নিয়ে আমাকে বেড়িয়ে পড়তে হবে। পিস্তল আর ছোরাটা এখনো সঙ্গেই আছে। প্রশ্ন একটাই, আমি কি পথ খুঁজে যেতে পারবো? মারিয়ার পরামর্শে আমি একটা ঘোড়া ভাড়া করলাম, কারণ ঘোড়া খচ্চরের চেয়ে অনেক উপযুক্ত। তবে যাত্রার আগে জঙ্গলে ভুলপথে চলার সম্ভাবনাটা আমাকে আতংকিত করে তুলল।
              
‘আমি ওইপথগুলো চিনি; তুমি কি আমাকে তোমার সঙ্গে নেবে?’ মারিয়া আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করল। ‘ওহ, তাহলে কি মজাটাই না হবে! আমি শুধু পোসাডা পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আসবো, যেখান থেকে তুমি ঘোড়া ছেড়ে ক্যানো (নৌকা) ধরবে।’
: তোমার পক্ষে এ সফর খুবই বিপজ্জনক হবে মারিয়া। তারচেয়ে বড় বিপদের ঝুঁকি হচ্ছে তোমার একা ফিরে আসাটা।
‘সেক্ষেত্রে এ পথে এল ক্যালাওয়ে ফেরত আসছে এমন কারও অপেক্ষা করব আমি ওখানে। তাহলেতো আমি নিরাপদেই ফিরতে পারব। প্লিজ, হ্যাঁ বল, মি. অ্যামোর!’
     
এ ব্যাপারে জোসের সঙ্গে আলাপ করলাম। তার মত হল, মারিয়াকে সঙ্গে নেওয়াই উচিত। ‘আমি ওকে আমার রিভলবারটা ধার দেব। মারিয়া এটা ব্যবহার করতে জানে,’ সে বলল।
মেয়ের বিষয়ে জোসের রায় ঘোষণার ফলশ্রুতিতে মারিয়া আর আমি পাঁচ ঘণ্টা ঘোড়া চালিয়ে আসার পর এখন জঙ্গলের প্রান্তে বসে আছি। আমি আরেকটা ঘোড়া ভাড়া করেছি ওর জন্যে। ভেনেজুয়েলান ল্যানা হচ্ছে বিশাল এক সমভূমি, এবং যে রমণীকূল এই অঞ্চলে বসবাস করে তারা হয় সাহসী আর অকুতোভয়, রাইফেল-রিভলবার চালায় পুরুষের মতই সাবলীল দক্ষতায়, ম্যাশেটে ঘোরাতে পারে দক্ষ তরোয়ালবাজের মতই, আর অশ^চালনায় বীর অ্যামাজন নারীদের সমকক্ষ--তবে এতকিছু সত্ত্বেও এরা ভালোবাসার জন্যে যে কোন সময়ে জান কবুলেও থাকে প্রস্তুত।
             
অবশ্য মারিয়া ছিল এ বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। সে শান্ত আর অনুভূতিপ্রবণ এবং প্রকৃতির এত কাছের যে মনে হয় সে আসলে এরই অংশ। কিন্তু এ বৈশিষ্ট্যটা আবার তাকে আত্মরক্ষায় অক্ষম করে রাখেনি, সশস্ত্র বা নিরস্ত্র-- দুই অবস্থায়ই সে সমান উদ্যমী।
               
পোসাডায় পৌঁছা পর্যন্ত আমাদের মধুময় ওই ভ্রমণের দিনগুলো ভোলা আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হবে না। অবিস্মরণীয় দিন আর  রাতগুলো, যখন আমাদের পরষ্পরের অন্তর কথা বলতো, গান গেয়ে উঠতো নিজে থেকেই, কারণ আমরা নিজেদের অনাবিল সুখানুভূতি নিয়ে কথা বলার পক্ষেও ক্লান্ত হয়ে পড়তাম ওই সময়টায়।
              
আমি কখনোই সেই আনন্দঘন স্বপ্নীল যাত্রাবিরতির মুহূর্তগুলো ভুলতে পারবো না যখন আমরা জঙ্গলের স্ফটিকস্বচ্ছ জলাশয়ে অবগাহনে মত্ত হয়ে উঠতাম, এরপর ভেজা শরীরে আপাদমস্তক দিগম্বর হয়ে পাড়ের নরম ঘাসের বিছানায় চলতো উল্লসিত ভালোবাসায় মগ্ন মৈথুন, আমাদের ঘিরে চতুর্দিকে তখন রঙ-বেরঙের প্রজাপতি, হামিংবার্ড আর ড্রাগন ফ্লাই লুকোচুরির আনন্দমেলা বসিয়ে দিতো।
               
http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/western_horse20111120172706.jpgভালোবাসার আবেশে টালমাটাল হয়ে আবার কখনোবা আনন্দ আর তৃপ্তির চূড়ান্ত আতিশয্যে এভাবেই আমরা এগিয়ে চললাম, এসময় কখনো কখনো আমার ইচ্ছে হতো নিজেকে এই সুখ সম্ভোগের দিনগুলোতে স্থায়ীভাবে বিলীন করে দিতে।
               
যতই পোসাদার নিকটবর্তী হচ্ছিলাম ততই আমি মারিয়ার বিশুদ্ধতম প্রাকৃতিক স্বরের প্রেমগীতি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। মঞ্জিল কাছিয়ে আসতেই ঘোড়াটাকে টেনে বিশ্রাম নেওয়ার মত কোন উপযুক্ত স্থানের দিকে যেতে যেতে আরেকটা বিরতি নেওয়ার অজুহাত খাড়া করতে পরষ্পর সচেষ্ট হতে থাকলাম।
                
‘মারিয়া, আমার মনে হচ্ছে ঘোড়াগুলোকে একটু বিশ্রাম দেওয়া উচিৎ।’
: এইটুকুন পথ এসে ওরা মোটেও ক্লান্ত হয়ে যায়নি। প্যাপি, বরঞ্চ এখন বিশ্রাম নিতে থামলে কিছুক্ষণের মধ্যে উল্টো আমরাই আবার ক্লান্তিতে চুরমার হয়ে যাবো।
মুক্তো ঝরানো হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে বলল মারিয়া ।

                 

পোসাদা নজরে আসার আগ পর্যন্ত এই সফরে আমরা মনের চাহিদাকে সম্মান দেখিয়ে প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর এই নন্দন কাননে ছ’টা দিন পার করে দিলাম। পোসাদার পথটি দেখামাত্রই  ইচ্ছে হল আজকের রাতটা এখানে কাটিয়ে পরদিন সোজা এল ক্যালাওয়ে ফিরে যাবার পথটি ধরবো। নিখাঁদ ভালোবাসার আবেগে মথিত ছয়টি দিনের স্মৃতি আমার কাছে ওই দশ হাজার ডলারের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। ফিরে যাবার কামনাটা আমার এতই তীব্রতর হল যে আমি হঠাৎ করেই কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। তবে তারচেয়েও তীব্রতর আর কঠিন স্তরে বেজে উঠলো আমার অন্তরের অন্তস্থলে লুক্কায়িত সেই কণ্ঠস্বরটি। সে আমাকে শাসাচ্ছে, ‘বালখিল্যতা কোর না, প্যাপি। দশ হাজার ডলার রীতিমত একটা রাজভা-ার, এটা তোমার প্রতিশোধ চরিতার্থের স্বপ্ন বাস্তবায়নের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় বিশাল অর্থের প্রথম কিস্তি। এর দাবি এত সহজে ছেড়ে দিতে চাও কোন যুক্তিতে?’
          
‘ওই যে পোসাদা দেখা যাচ্ছে,’ মারিয়া জানান দিল।
আমার আমির বিরুদ্ধে, যা কিছু আমার অনুভূতি আর বিবেচনায় ছিল, সেসবের বিরুদ্ধে আমি উচ্চারণ করলাম-- যা আমি বলতে চেয়েছিলাম ঠিক তার উল্টোটা। ‘হ্যাঁ, ওইতো পোসাদা। আমাদের যাত্রা শেষ হল। আগামীকাল আমি তোমার কাছ থেকে বিদায় নেব।’
                     
চারজন দশাসই লোক বৈঠা বাইছে, এর সঙ্গে বইছে অনুকূল স্রোত, ক্যানোটি পানি বেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলল। পানিতে বৈঠার প্রতিটি চাপড় আমাকে মারিয়ার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। ওদিকে পাড়ে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে আমার অপসৃয়মান মূর্তির দিকে স্থনুর মত তাকিয়ে রইল ও।
                   
সেখানে ছিল শান্তি, ছিল ভালোবাসা এবং সেখানে ছিল সেই নারী যার সঙ্গে জুটি বেঁধে আমার ঘর বাঁধা আর পরিবার গড়ে তোলাটা সম্ভবত ছিল নিয়তি নির্ধারিত একটি বিষয়। পেছনে না তাকানোর জন্য আমাকে রীতিমত নিজের ওপর জোর খাটাতে হল। কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম, এটা না করলে আমি যে কোন সময়ে মাঝিকে বলে বসতাম, ‘নৌকা ঘোরাও, ভাই!’
                    
আমাকে খনিতে ফিরে গিয়ে টাকাটা উদ্ধার করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব পরবর্তী অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, প্যারিসের পথে কঠিনতর অভিযান চালানো এবং সাফল্যের সঙ্গে তা শেষ করে ফিরে আসার লক্ষ্যে যে বিশাল অঙ্ক প্রয়োজন তা হাত করার জন্যে। তবে অবশ্যই যদি ভাগ্যে আমার প্যারিস থেকে ফিরে আসা থেকে থাকে।
                    
নিজেকে একটা দিব্যি দিয়ে রাখলাম এই সুযোগে, আমি ওই লেবাননীকে মারধর করবো না। আমার যা পাওনা শুধু তাই ফেরত নেব তার কাছ থেকে, কমও না আবার বেশিও না। সে কখনো জানবে না যে কেন তাকে আমি ক্ষমা করেছি। তার ক্ষমা পাওনা হয়েছে শুধু ওই ছয়টি মোহময় অবিস্মরনীয় দিনের জন্য। ওই সময়টায় আমি স্বর্গোদ্যানের ভেতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে মোহনীয় তরুণীর সঙ্গে অভিসার-অবগাহন করে বেড়িয়েছি, চিত্তচাঞ্চল্য সৃষ্টিকারীনি এই তরুণী হচ্ছেন এল ক্যালাওয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মারিয়া।

‘ওই লেবানিজের কথা বলছো? আমি যতটুকু জানি সে তো চলে গেছে।’ মিগুয়েল তার আলিঙ্গণে আমাকে চুরমার করতে করতে বললো।
আমি দেখলাম লেবানিজটার কুঁড়ের দরজা বন্ধ। তবে সেই চমৎকার সাইনবোর্ডটা তখনো ঝুলছে, ‘সততাই আমার সর্বোত্তম সম্পদ’।
‘অর্থাৎ তুমি বলছো বেটা ভেগেছে? শালা হারামীর বাচ্চা!’

‘শান্ত হও, প্যাপি! আমরা ওকে খুঁজে বের করছি।’


আমার শেষ আশাও শেষতক মিলিয়ে গেল। মুস্তাফা নিশ্চিত হয়ে জানালো যে লেবানিজটা পালিয়েছে। দু’দিনের  অনুসন্ধানের পর এক মাইনারের কাছে খবর পাওয়া গেল যে তিনজন দেহরক্ষীসহ ব্রাজিলের পথে গেছে সে। মাইনাররা সবাই বলছিল সে ভাল লোক। তখন আমি তাদের এল ক্যালাওয়ের কাহিনী শোনালাম। এছাড়া তার পলায়নের বিষয়ে সিঁউদাদ বলিভারে যা শুনেছি তাও বললাম। এই কথায় একজন ইটালিয়ানসহ চার-পাঁচ জন জানালো আমার কথা সত্য হয়ে থাকলে তারাও সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। তবে গায়ানার এক বৃদ্ধই শুধু আমাদের সঙ্গে দ্বিমত করলেন। তার মতে আসল তষ্করটা হচ্ছে সিঁউদাদ বলিভারের ওই গ্রিকটা। অন্তরের অন্থঃস্থলে আমি অনুভব করলাম, গচ্ছিত পুরো সম্পদটাই আমি চিরতরে হারিয়েছি। এখন আমি কি করতে যাচ্ছি তাহলে?
ব্রাজিলের বোয়া ভিস্তায় যাবো আলেকসান্দ্রে গুইগের সঙ্গে দেখা করতে? কিন্তু এটা পাক্কা তিন শ’ মাইলের এক কষ্টকর পথের ধাক্কা। এতদসংক্রান্ত সর্বশেষ অভিজ্ঞতা বলছে খুবই বিপজ্জনক হবে এই সফর, এমনকি জীবনের সর্বশেষ সফর হয়ে যেতে পারে।

না। ঠিক করলাম এখানকার লোকজনের সঙ্গে একটা যোগাযোগের সূত্র তৈরি করে যাবো, যাতে লেবনিজটা আবার উদয় হওয়া মাত্রই আমি খবর পাই এবং এসে পাওনা উসুল করতে পারি। এখানে ঝামেলা মিটে গেলেই আমি পিকোলিনোকে নিয়ে ক্যারাকাসের পথ ধরবো। আগামীকাল আমি এল ক্যালাওয়ের পথে রওয়ানা হব।

এক সপ্তাহ পর, এল ক্যালাওয়েতে জোসে এবং মারিয়ার সঙ্গে বসে আছি। তাদের সব খুলে বললাম। শান্তভাবে, অতি সহৃদয়তার সঙ্গে মারিয়া ঠিক উপযুক্ত শব্দগুলো উচ্চারণ করলো আমার হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য। তার বাবা এবার আমাকে জোরাজুরি করলো তাদের সঙ্গে থেকে যাওয়ার জন্য। ‘তুমি চাইলে আমরা ক্যারাটাল খনি রেইড করবো। বল?’ আমি স্মিত হেসে তার কাঁধ চাপড়ে দিলাম।

আমার এখানে থাকা চলবে না। শুধু মারিয়ার প্রতি আমার এবং আমার প্রতি ওর ভালোবাসাই আমাকে এখানে বেঁধে রাখতে। আমি আসলে যতটা ভেবেছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশি জড়িয়ে গেছি এখানে। এটা ছিল এক কঠিন আর সত্যিকারের ভালোবাসা। তারপরেও এটা আমার প্রতিশোধ কামনাকে নিবৃত্ত করার মত শক্তিশালী ছিল না। ঠিক হল আগামীকাল ভোর পাঁচটায় এক ট্রাক ড্রাইভারের সঙ্গে ক্যারাকাসের পথে রওয়ানা দেব।

সকালে আমি যখন দাড়ি কাটছিলাম, মারিয়া সন্তর্পণে বিছানা ছেড়ে তার বোনদের ঘরে গিয়ে লুকালো। নারীদের সেই সনাতন অনুভূতি তাকে জানান দিয়ে দিয়েছে যে এবার তার সঙ্গে আমার সত্যিকারের বিচ্ছেদ হতে যাচ্ছে। ধোপদূরস্ত অবস্থায় পিকোলিনো বড় ঘরটায় এসমারেল্ডার পাশে বসেছিল। এসমারেল্ডা ওর কাঁধে হাত দিয়ে ধরে রেখেছে।  মারিয়া যে ঘরে লুকিয়েছে আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। এসমারেল্ডা আমাকে থামিয়ে দিল। ‘না, এনরিক।’ এরপর সহসাই সেও দৌড়ে গিয়ে লুকালো দরোজার আড়ালে।

জোসে ট্রাক পর্যন্ত এগিয়ে দিল আমাদের। আমরা কেউই একটি শব্দও উচ্চারণ করলাম না।
আমার মাথায় তখন শুধু ক্যারাকাস। যত তাড়াতাড়ি সেখানে যাওয়া যায়।
বিদায় মারিয়া। এল ক্যালাওয়ের ছোট্ট সুন্দর ফুল, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আবেগের মিশ্রণে তুমি আমাকে এতটাই ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছ যা দুনিয়ার সবগুলো খনি থেকে আহরিত সমস্ত স্বর্ণ দিয়েও করা সম্ভব ছিল না।

বাংলাদেশ সময় ১৭০১, নভেম্বর ২০, ২০১১

লবণ যেভাবে রক্তচাপ বাড়ায় 
দুই মেয়র প্রার্থীসহ কোকোর কবর জিয়ারত করলেন ফখরুল
তীব্র শীত পঞ্চগড়ে, বাড়ছে শিশু-বৃদ্ধ রোগী
পাল্টে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই 
রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাকে বদলি


পারাবত এক্সপ্রেস ট্রেনের পাওয়ারকারে আগুন
ঢাকা-সিলেট ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
৯ ঘণ্টা পর কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল শুরু
ত্রিপুরা-আসামে এখনই সিএএ চালু না করার নির্দেশ আদালতের
শেষ রক্ষা হলো না অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের