মিলান কুন্ডেরার সাক্ষাৎকার

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

মিলান কুন্ডেরার এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে ‘দ্য রিভিউ অব কনটেমপোর‌্যারি ফিকশান’ থেকে। তার ‘দ্য আর্ট অব দ্য নোবেল’ প্রকাশিত হবার পর ১৯৮৯ সালে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপের অন্যতম প্রধান ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরা। জন্ম ১৯২৯ সালের ১ এপ্রিল চোকোশ্লোভাকিয়ায়। ১৯৪৮ এ তার উচ্চ মাধ্যমিক লেখা পড়া শেষ হয়। তখন কম্যুনিস্ট পার্টি চোকোশ্লোভাকিয়া’য় ক্ষমতা গ্রহণ করে। প্রাগের চালর্স ইউনিভার্সিটি থেকে সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের উপর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করেন দুই বছর। চলচ্চিত্রের উপরও পড়ালেখা করেছেন।

 

১৯৬৭ সালে তার প্রথম উপন্যাস The Joke প্রকাশিত হয়। সেই কম্যুনিস্ট শাসন আমলে এটা ছিলো কম্যুনিজমের একনায়কতন্ত্র কে পরিহাস করে লেখা একটি উপন্যাস। তিনি রাশিয়ার আক্রমণকে তীব্র ভাবে সমালোচনা করেছিলেন। তার উপন্যাসটিকে ব্লাক লিস্ট করা হয়। ১৯৭৫ এ তাকে দেশ ছাড়তে হয়।

 

১৯৭৯ তে তিনি প্রকাশ করেন The Book of Laughter and Forgetting এই উপন্যাসে তিনি চেক জনগণকে নানা ভাবে কম্যুনিস্ট সরকারের বিরোধীতা করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করেছেন। তার ছোট গল্প, উপন্যাস আর চিন্তা ভাবনায় নির্বাসিতের কণ্ঠস্বর পাওয়া যায়। ১৯৮৪ এ প্রকাশিত হয় The Unbearable Lightness of Being, এটা তার উল্লেখযোগ্য কাজের একটি। ব্যক্তির ভাগ্য যে বড় ভঙ্গুর, যে জীবন চলে যায় তা আর ফেরে না কোন দিন, ফেরার কোন সম্ভাবনাও নেই, অভিজ্ঞতা, বিচার আর ভুল এ সমস্তের কালপঞ্জি রচিত হয়েছে এ উপন্যাসটিতে। ১৯৮৮ সালে আমেরিকান চলচ্চিত্র পরিচালক ফিলিপ কাউফম্যান এই কাহিনী নিয়ে একটা ফিল্ম তৈরি করেছিলেন। চলচ্চিত্রটিতে মূল কাহিনীর কিছু কিছু পরিবর্তন করা হয়েছিলো যা কুন্ডেরার একদমই ভালো লাগেনি। তার কোন উপন্যাসের অ্যাডপটেশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। ১৯৯০ এ প্রকাশিত হয় Immortality, এটাই তার চেক ভাষায় লেখা শেষ উপন্যাস। আগের উপন্যাসগুলো থেকে এটা বেশ বিশ্বচেতন। রাজনীতি থেকে তিনি যেন দর্শনের দিকেই তার চোখ ফেরালেন। কেউ কেউ তাকে এমন ঔপন্যাসিক মনে করেন যার মূল উপকরণই রাজনীতি। কিন্তু তা মোটেও ঠিক নয়।

 

The Book of Laughter and Forgetting এর পর থেকে তার উপন্যাসে যুক্ত হতে শুরু করে  দর্শনের নানা বিষয়। দর্শনের গতানুগতিক মূল বিষয়গুলো থেকে সরে গিয়ে তিনি সেই দর্শনের আরেকটা উপলব্ধি তৈরি করেন নিজের মত করে। রবার্ট মুসিলের উপন্যাস আর নিৎসের গদ্য দ্বারা তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত। কাফকা, হার্ম্যান ব্রুখ, গাম্বোভিক্স, মার্টিন হাইডেগার এদের প্রভাবও দেখা যায় তার লেখায়। 

 

তার অন্যান্য উপন্যাসগুলো হলো Immortality (1990),  Slowness  (1993), Identity  (1998) , Ignorance (2000)। তিনি নাটকও রচনা করেছেন। উপন্যাসের চরিত্রগুলো কে তিনি তৈরি করেন তার কল্পনার চরমতম একটা জায়গা থেকে। চরিত্রগুলো নিদারুণ শব্দ বুননে তাদের শরীর সমেত পাঠকের সামনে হাজির হয় পাঠকের সামনে, যে কৌশলটা কুন্ডেরার একান্ত নিজস্ব।

 

The Art of the Novel  এ তিনি বলেছেন যে পাঠকের কল্পনা একাএকাই তার চরিত্রগুলোকে আরও উদ্ভাসিত করতে সক্ষম হয়। তিনি লেখক হিসাবে কিছু কিছু জায়গার উপর আলো ফেলেন মাত্র। চরিত্র গুলোর শরীরী বর্ণনার প্রয়োজন নেই এমন কি তাদের ভেতরের কথাগুলো পর্যন্ত বলে দেবার প্রয়োজন নেই। তার গঠন শৈলি একদমই আলাদা।  Jacques and His Master (১৯৭৫) তার রচিত নাটক। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকার নিয়ে The Art of the Novel প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। এছাড়া উপন্যাস ভাবনা ও নানা রকম বিষয় নিয়ে তিনি রচনা করেছেন D`en bas tu humeras des roses (1993), The Curtain  (2005)।

 

মিলান কুন্ডেরার এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে "The Review of Contemporary Fiction, Summer 1989, 9.2 ” থেকে। The Art of the Novel প্রকাশিত হবার পর ১৯৮৯ সালে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে। ফলে এটি আলাদা গুরুত্ব রাখে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন লুইস অপেনহেইম। ভাষান্তর : মৃদুল মাহবুব

 

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/P519104720111115163011.JPGলুইস ওপেনহেইম : সাধারণ অসাধারণ দু’একটি বিষয় দিয়ে কথা শুরু করতে চাই। The Art of the Novel এ আপনি খুব দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, কারও সাক্ষাৎকার নেওয়ার ধারণাটা বেশ গতানুগতিক একটা ধারা। কখনও কখনও তা জোরপূর্বকও নেওয়া হয়। আপনি আরও বলেছিলেন, যে সাক্ষাৎকারের নিচে আপনার কপিরাইট সিল নেই, তাকে যেন সবাই জালিয়াতি হিসাবে ধরে নেয়। সাংবাদিকদের উপর আপনার বিরক্ত হওয়ার কারণ আমি বুঝি। কারণ তারা কথার অংশ বিশেষ উল্লেখ করে।

 

সাক্ষাৎকারদাতাকে তাঁর কথাগুলো পুনঃবিবেচনার জন্য না দেখিয়েই সাংবাদিকরা তা ছেপে ফেলে। আমি আপনাকে সাধুবাদ জানাই এ কারণে যে, আপনি ‘সংলাপ’ আর ‘সাক্ষাৎকার’ এ দুটো বিষয় কে আলাদা করে দেখেন। সংলাপের ক্ষেত্রে দুজনের প্রকৃত আদান প্রদান সম্ভব। এক্ষেত্রে নানা রকম বৈচিত্র্যপূর্ণ চেতনার বিকাশ ঘটার সম্ভবনা থাকে। আর অপর দিকে সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে  একজন প্রশ্ন করে আর  সে প্রশ্নের উত্তর ততটুকুই রাখা হয় যে অংশটুকু প্রশ্নকর্তা প্রয়োজনীয় মনে করে। উত্তরের যে অংশটা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী পছন্দ করে, সেই সীমিত অংশই তিনি ছাপেন। কোন কোন ক্ষেত্রে যা বলা হয়নি তাও ছাপা হয়। এত কিছুর পরও আপনি আপনার পাঠকদেরকে বঞ্চিত করছেন না।

মিলান কুন্ডেরা : সাক্ষাৎকার যখন ছাপা হয় তখন এর অনেক কথাই আর সাক্ষাৎকার দাতার থাকে না। এটার ভয়াবহতা তখনই উপলব্ধি করা যায় যখন দেখবে তোমার না বলা কথা লোকে উদ্ধৃত করছে। এও দেখবে আলোচোকেরা তোমার না বলা কথা ধরেই তোমার লেখাগুলো কে বিশ্লেষণ করছে। ভুল কথাগুলোই শেষপর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। ফলে এমন সব ভ্রান্তি তৈরি হয় যা তুমি কল্পনাও করোনি। আমাকে রীতিমত ধ্বংস করা যাবে কথাগুলো দিয়ে।

 

এখন আমার কাছে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার তা হলো কোন লেখক যদি সাংবাদিকের কাছে কিছু বলে তবে তা আর তার কথা থাকে না। সে কথা অবশ্যই অগ্রহণযোগ্য। খুব ভেবে চিন্তে আমি এর একটা সহজ সমাধান খুঁজে বেরে করেছি। এই ধরো তুমি আমি এক সাথে বসে আছি, আমাদের আগ্রহ আছে এমন নানা বিষয়ে আমরা কথা বলতে পারি। আর এই আলোচনার ভেতর যদি তোমার কোন প্রশ্ন এসে যায়, তবে তুমি তা আমাকে লিখিতভাবে দিবে। আমি তার লিখিত উত্তর দেব। তারপর এর একটা কপিরাইট হবে। এভাবে যদি বিষয়গুলো ঘটে তবে আর কোন সমস্যা থাকে না।

 

লুইস ওপেনহেইম : এই পদ্ধতিটা আমার কাছে অনেক বেশি যৌক্তিক মনে হয়। তবে এক্ষেত্রে মনে হয় কপিরাইটের দরকার নেই। সেন্ট্রাল ইউরোপ নিয়ে আপনি বিস্তর আলোচনা করেছেন। আপনার সমস্ত উপন্যাসের পটভূমি যুগোস্লাভিয়া, এমনকি আপনার  `The Art Of The Novel` এ-ও সেন্ট্রাল ইউরোপ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মনে যদি না করনে তবে সেন্ট্রাল ইউরোপ পদটা কি রিপ্রেজেন্ট করে তা একটু ব্যাখ্যা করবেন কি? আর এটা পরিমাপ করার মাপকাঠি সম্পর্কেও কিছু বলুন।

মিলান কুন্ডেরা: ব্যাপারটাকে আমি খুব সহজ ভাবে দেখি। উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমরা খুব সীমাবদ্ধ ছিলাম। মাত্র চারজন মহান উপন্যাসিক : কাফকা, ব্রখ, মুসিল আর গম্ব্রোভিক্স। সেন্ট্রাল ইউরোপের এই মহান লেখকদের কে আমি ‘Pleiad’* বলি। প্রুস্তের পূর্বে আমি কোন উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক খুঁজে পাই না। এদের না বুঝলে আধুনিক উপন্যাসের ধারাকে যথার্থভাবে বোঝা যাবে না। সংক্ষেপে বলা যায় এরা হলো আধুনিকতাবাদী। এদের সম্পর্কে বলা যায় তারা একটা নতুন ফর্মে নিজেদের উন্মোচিত করতে সচেষ্ট ছিলেন। একই সাথে তাদের ভেতর নান্দনিক আইডোলজির অভাব ছিলো (প্রগতি, বিশ্বাস, বিপ্লব, এমন অনেক কিছু )। তবে শিল্প, ইতিহাস আর উপন্যাস কেন্দ্রিক একটা ভিন্নতর দৃষ্টি তাদের ছিলো। কোন মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে তারা ছিলো না। উপন্যাসের সাধারণ সম্ভাবনাগুলো ভেঙে ফেলতে তারা নারাজ। তারা মৌলিকভাবে সনাতন ধারাগুলোর দীর্ঘায়ন ঘটিয়েছে।

 

অতীতের উপন্যাস ধারার সাথে তাদের একটা সেতুবন্ধন ছিলো। ঐতিহ্যকে তারা অস্বীকার করতে পারলো না। আঠারো শতকের উপন্যাস নিয়ে তারা বেশ মুগ্ধ ছিলো। এই সময়টাকে আমি বলি উপন্যাস ইতিহাসের ‘মধ্যবিরতি’। এই সময় আর এই কাল-সেবকেরা ধুলোয় মিশে গেছে, হারিয়ে গেছে। ‘মধ্যবিরতি’র বিশ্বাসঘাতকতায় মৌলিক উপন্যাস চরিত্র তখন ঠিক দেখা যায়নি। আমি যাকে বলি ‘উপন্যাস-ধ্যান’ ---  তাকেই ধ্বংস করা হয়েছে এই সময়ে। ‘উপন্যাস-ধ্যান’ এই শব্দটিকে ভুল বুঝো না। তথাকথিত দর্শন নির্ভর উপন্যাসের কথা আমি বলছি না। আমি বোঝাতে চাচ্ছি উপন্যাসের দর্শন, উপন্যাস ধারণার নির্মাণকেই আমি বোঝাতে চাচ্ছি। সার্ত্রের ভেতর এই গুণ ছিলো। ক্যামুর ভেতর আরও বেশি।

 

যেমন  ‘La Peste’ বিশ্লেষণাত্মক এই জাতীয় উপন্যাস কাঠামো আমার বেশি প্রিয়। মুসিল আর ব্রখ দু’জনে পুরোপুরি আলাদা। তাদের ভেতর হয়তো দার্শনিক জরিপ কার্য নেই। তবে দেখবে, মানুষের অস্তিত্ত্ব সংকট যার উত্তর মেটাফিজিক্স চর্চাকারী দর্শনের বইগুলোতে নেই, তার কিছু সহজ উত্তর তুমি তাদের উপন্যাসে পেয়ে যাবে। এই সমস্যাকে কিভাবে এঁটে ধরতে হয়  সে সম্বন্ধে কোন ধারণাই দর্শন দিতে পারে না। একমাত্র তাদের উপন্যাসে তুমি এর সমাধান পাবে। এটা বলা যায় যে, বিশেষত ব্রখ আর মুসিল উপন্যাসের ভেতর প্রেরণ করেছিলো সর্বোচ্চ কাব্যশক্তি আর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যা ধারণ করেছিলো সংস্কৃতির সমগ্রতাকে।

 

এই লেখকেরা আমেরিকায় খুব বেশি পরিচিত নন, এ কথাটাকে আমার বুদ্ধিবৃত্তিক অপপ্রচার বলে মনে হয়। আমেরিকার উপন্যাসের কোন একটি বিশেষ ঐতিহ্যকে যদি হিসাবে আনা হয় তবে তা একটা ভুল বোঝাবুঝির সুত্রপাত করবে। যে কেউ খুব সহজে একথা বুঝতে পারবে। প্রথম কথা হলো, আমেরিকার উপন্যাসের ইতিহাসে আমাদের মত কোন ‘মধ্যবিরতি’ নেই। আমাদের এই ‘মধ্যবিরতি’র ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ওদের উপন্যাস বেড়ে ওঠেনি। আর দ্বিতীয় কথা হলো, সেই সময় সেন্ট্রাল ইউরোপ তার মাস্টারপিসগুলো লিখে চলেছে। আমেরিকার উপন্যাসে ‘Pleiad’এর অবির্ভাব হয় হেমিংওয়ে, ফকনার আর ডস পাসোস (Dos Passos) এদের আগমনের ভেতর দিয়ে। আর তাদের সুদূর প্রসারী প্রভাব সারা পৃথিবীই অনুভব করেছিলো। তবে তাদের নান্দনিকতা ছিলো মুসিলের ঠিক উল্টো। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, লেখকের চিন্তাশীল কোন বক্তব্যকে যদি উপন্যাসের মূল ঘটনার সাথে বুনে দেওয়া যায়, তবে তাকে জোর করে ঢোকানো বস্তু হিসাবেই ধরে নেওয়া হয় আমেরিকায়। আমার মনে আছে, ‘The New Yorker’ এ আমার ‘Unbearable Lightness Of Being’ এর প্রথম তিন পরিচ্ছেদ ছাপা হয়েছিলো। কিন্তু নিৎসের চিরন্তন পুনঃআবির্ভাব অংশটুকু তারা বাদ দিয়েছিলো। নিৎসের চিরন্তন পুনঃআবির্ভাব সর্ম্পকে আমি যা লিখেছিলাম তা কখনোই কোন দার্শনিক ডিসর্কোস ছিলো না। আজ অবধি আমার তাই মনে হয়। এটা ছিলো একটা প্যারাডক্স যা কোন কোন সংলাপ থেকে অনেক বেশি উপন্যাস সম্মত।

 

লুইস ওপেনহেইম : ঐ লেখকদের কোন প্রভাব কি আপনার উপর আছে?

মিলান কুন্ডেরা : আমাকে প্রভাবিত করেছিলো? না। তা ঠিক নয়। আমার আর তাদের মাথার উপর একই নন্দনতাত্ত্বিক আকাশ ছিলো। তবে মাথার উপর প্রুস্ত কিংবা জয়েসের আকাশ ছিলো না। এমনকি হেমিংওয়েও নয়। তবে তার প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা আছে। এরা হয়তো একে অন্যের লেখা পছন্দ করে না। ব্রখ, মুসিলের লেখার তীব্র সমালোচনা করতেন। মুসিল, ব্রখকে  ঘৃণা করতো। গ্যাম্ব্রোভিক্স কাফ্কাকে অপছন্দ করতো। আর সম্ভবত মুসিল ও ব্রখ, কেউই গ্যাম্ব্রোভিক্সের নামই শোনেনি। আর তারা যদি জানতো তাদেরকে আমি একই শ্রেণীভুক্ত করেছি তবে তারা আমার উপর ক্ষিপ্ত হতো। হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এই মহারথীরা আকাশের মত সুবিশাল বিস্তৃতি নিয়ে আমার মাথার উপর বসে আছে।   

 

লুইস ওপেনহেইম : ‘স্লাভিক সংস্কৃতি’র যে ‘স্লাভিক দুনিয়া’ আর আপনার সেন্ট্রাল ইউরোপ ধারণা -- এই দুই ধারার মধ্যে আপনি কিভাবে সর্ম্পক স্থাপন করেন?

মিলান কুন্ডেরা : অবশ্যই সর্ম্পক আছে। স্লাভিক ভাষার সাথে এর ভাষাতাত্ত্বিক ঐক্যতান রয়েছে। তবে সাংস্কৃতিক মেল বন্ধন নেই। যদি আমার কোন উপন্যাসের পটভূমি হয় স্লাভিক, তবে আমি সেটা বেশ গুছিয়ে উঠতে পারি না। সেটাকে কৃত্রিম, মেকী বলে মনে হয়। আমার উপন্যাস সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান কনটেক্সটে (ভাষাতাত্ত্বিকভাবে একে বলা হয় জার্মনো-স্লাভো-হাঙ্গেরীয়ান) বিচার করলে তা হবে সব থেকে যৌক্তিক। যদি তুমি উপন্যাসের অর্থময়তা আর মূল্যমানকে আমার কনটেক্সটের সাথে যুক্ত করো তবে কিন্তু হবে না। 

  

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/art-novel-milan-kundera-paperbackলুইস ওপেনহেইম : আপনি ইউরোপীয় উপন্যাস পছন্দ করেন। আপনি কি মনে করেন আমেরিকান উপন্যাসের ঔজ্জ্বল্য বেশ কম?

মিলান কুন্ডেরা : তুমি যথার্থই বলেছেন। এটার উপর আমি এতটাই বিরক্ত যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। যদি আমি ‘পশ্চিমা উপন্যাসে’র কথা বলি তবে বুঝবে তাতে রাশিয়ান উপন্যাসের কোন স্থান নেই। আর এ কথা বলি আর নাই বলি, যদি ‘বিশ্ব উপন্যাস’এর কথা আসে তবে আমি সেই সমস্ত উপন্যাসকেই বুঝি যেগুলো ইউরোপীয় উপন্যাস ধারার সাথে সম্পর্কযুক্ত। একারণে ‘ইউরোপীয় উপন্যাস’ বিশেষণটাকে আমি হুজএ্যারলিয়ান** দৃষ্টিকোন থেকে দেখি। এটা কোন সুনির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমাকে নির্দেশ করে না; এটা একটা আত্মিক ব্যাপার। আমেরিকা বা ইসরায়েল সবাই এই আত্মার অংশ হতে পারে। ‘ইউরোপীয় উপন্যাস’ বলতে আমি যে ইতিহাস বুঝি তাতে সার্ভেন্তে থেকে ফকনার কেউই বাদ যায় না।

 

লুইস ওপেনহেইম : আমার মনে হয় উপন্যাস ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শাখা হওয়া সত্ত্বেও আপনি প্রতারণা করছেন। উপন্যাসের উন্নয়নের ইতিহাসের সাথে আপনি প্রতারণা করছেন। কোথাও কোন নারী নেই। যদি আমি ভুল বলি তাহলে আমাকে সংশোধন করে দেবেন। আপনার প্রবন্ধ বা সাক্ষাৎকার কোথাও কোন নারী লেখকের নাম উল্লেখ করেননি। এর কারণ ব্যাখ্যা করবেন কি?

মিলান কুন্ডেরা : উপন্যাসের একটা লিঙ্গ আছে বটে তবে সেটা লেখকের লিঙ্গ নয়। সব মহান প্রকৃত উপন্যাস বাইসেক্সুয়াল। এটা পৃথিবীর নর ও নারী উভয়কেই রূপকে উন্মোচিত করে। লেখকের লিঙ্গ নিয়ে খুব বৈষয়িক মানুষের মত কথা বলা যায় বটে, তবে এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

 

লুইস ওপেনহেইম : আপনার প্রতিটা উপন্যাসে চেক অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। ফ্রান্সেতো আপনি বহুদিন হলো আছেন। এর সামাজিক-ঐতিহ্য নিয়ে কি কিছু লেখা যেতে পারে না?

ডমলান কুন্ডেরা : বেশ। আমার একটাই উত্তর জানা আছে : ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত আমি চোকেস্লাভিয়ায় ছিলাম। আমার প্রকৃত লেখক কেরিয়ার গড়ে উঠেছিলো মূলত ৩০ বছর বয়সে। আমার জীবনের সৃজনশীলতার বড় একটা অংশ হয়তো ফ্রান্সে কেটেছে তবে আমি এখানে খুব ক্লান্তবোধ করি।

 

লুইস ওপেনহেইম : আপনার The Art Of The Novel সামগ্রিক ভাবে একটা আত্মবিবৃতি। আমার মনে হয়, খুব বেশি মনে হয়, সর্বজনীন যে নান্দনিক দৃষ্টিবোধ তার উপর আপনি আপনার ব্যক্তিগত অর্ন্তদৃষ্টি জোর করে চাপিয়ে দিয়েছেন। উপন্যাস সম্পর্কে আপনার একান্ত ব্যক্তিগত তত্ত্ব বলে মনে হয় The Art Of The Novel।

মিলান কুন্ডেরা : ওটা কোন তত্ত্ব নয়। এটা একজন লেখকের স্বীকারোক্তি। ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন শিল্পীর কাজ শুনতে ভালোবাসি। অলিভার মিশ্যায়ানের ‘Technica De Mon Language Musical’, অ্যাডর্নের ‘hilosophy Of Modern Music’ থেকে শতগুন ভালো। সম্ভবত আমি একটা ছোট্ট ভুল করেছিলাম। এটা এর সাধারণত্ব নিয়ে যেমন হতে পারতো ঠিক তেমন না হয়ে এর ভেতর তত্ত্ব আলোচনার গন্ধ পাওয়া যায়। অ্যারন অ্যাশার, আমার আমেরিকান প্রকাশক, বইটা নাম রাখতে বলেছিলো এর শেষের একটা অংশ থেকে : ‘Man Thinks, God Loughs’ আজ আমার মনে হয় ঐ নামটা রাখলেই ভালো হতো।  The Art Of The Novel এই নামটা রেখেছিলাম একান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা থেকে। আমার বয়স যখন ২৭ কী ২৮,  তখন চেক ঔপন্যাসিক ভ্লাডিস্লাভ ভেনকুরার (যাকে আমি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি) উপর একটা বই লিখেছিলাম। বইটার নাম ছিলো The Art Of The Novel বইটা আমার পছন্দের তবে অপরিপক্ক। সে কারণে আর পুনঃমুদ্রন করা হয়নি। তবে অতীতের স্মৃতিটা রয়ে গেছে।

 

লুইস ওপেনহেইম :  সাহিত্য, এর সাথে পৃথিবীর সম্পর্ক, সংস্কৃতি, মানব জাতি এগুলো সম্পর্কে আপনার চিন্তার কি কোন মৌলিক পরির্বতন ঘটেছে? অথবা চিন্তা কাঠামোর কোন বিবর্তন? এমন কোন মুহূর্তের কথা কি স্মরণ করতে পারেন যা আপনার নান্দনিক বোধের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছে?

মিলান কুন্ডেরা : ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি অনেক কিছু লিখেছি। সংগীত সম্পর্কে লিখেছি, এছাড়া কবিতাই শুধু নয় নাটকও লিখেছি। আমার কন্ঠ, শৈলী আর আমার দিকে তাকাও --- দেখবে কত ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে আমি কাজ করেছি। আমার প্রথম গল্প ‘Laughable Love’ (১৯৫৪ সালে রচিত) লেখার সময় আমি ‘আমার আমি’ কে খুঁজে পেলাম। আমি গদ্যকার, ঔপন্যাসিক হয়ে গেলাম। এর বেশি আমি কিছু নই। এরপর থেকে আমার নান্দনিক বোধের উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ঘটলে হয়তো খুব ধীরে ধীরে ঘটেছে। তোমার কথায় বললে খুব এক রৈখিক ভাবে ঘটেছে।

 

 

বি: দ্র :- * Pleiad : Pleiades শব্দ থেকে আগত। খৃষ্টপূর্ব ২৮০ আলেকজ্যান্ডারিয়ার সাত ট্র্যাজিক কবিদের Pleiad বলা হতো। তবে ফ্রান্সে ১৫৫৩ সালে একদল অত্যুৎসাহী কবিদেরকেও Pleiad  নামে নির্দেশ হয়। তারা ল্যাতিন প্রভাব থেকে বেরিয়ে ফরাসী ভাষার নিজস্ব প্রকৃত লেখা লিখতে চেয়েছিলো। আধুনিক ফরাসী ভাষায় সাহিত্য রচনার প্রচেষ্টা তারা প্রথম শুরু করেছিলো। তারা মূলত ধ্রুপদী ল্যাতিন ধারায় কাজ করেছিলো। বিশেষত সনেটের ব্যাপক উন্নয়ন হয় তাদের হাতে।

 

**হুজএ্যারলিয়ান : জার্মান দার্শনিক, ফোনেমেনোলজির জনক এডমুন্ড গুস্তাভ অ্যালবের্খ্ট হুজএ্যারল (১৮৫৬-১৯৩৮) বিজ্ঞান এবং দর্শন বোঝার জন্য তাত্ত্বিক দিকগুলোকে গৌণ করে তিনি নিরপেক্ষ অভিজ্ঞতার উপর জোর দেন। হাইডেগার, জ্যাক দেরিদা, মিলান কুন্ডেরা এমন অনেক লেখক, দার্শনিকের উপর তাঁর প্রভাব রয়েছে। 

 

 

বাংলাদেশ সময় ১৩৫৩, নভেম্বর ১৫, ২০১১  

‘ই-পাসপোর্ট ডিজিটাল জগতে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে’
সিএএ স্থগিত করতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অস্বীকৃতি
ঝালকাঠিতে ২ ‘মাদক ব্যবসায়ী’ আটক
কাউন্সিলর প্রার্থী সারোয়ারের প্রার্থিতা বাতিল চান তাবিথ
৬ মাসের মধ্যে শেষ হবে বিজিএমইএ ভবন ভাঙার কাজ


ধানের দামের অজুহাতে ফের বাড়ালো চালের দাম
সিআরবি জোড়াখুন মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার
দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে যা করবেন 
ভিকি কৌশল ও ক্যাটরিনা কাইফের লুকোচুরি
কর বাড়ানো নয়, সমন্বয় করা হবে: তাপস