ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস

ব্যানকো [পর্ব-৭]

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের  হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ। এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে।

ব্যানকো [পর্ব-৬], [পর্ব-৫], [পর্ব-৪], [পর্ব-৩], [পর্ব-২], [পর্ব-১]

[দুনিয়াজুড়ে সাড়া জাগানো এবং দীর্ঘদিন ধরে বেস্ট সেলার, জেলপালানো কয়েদির মনোমুগ্ধকর আর শিহরণ জাগানিয়া কাহিনী ‘প্যাপিলন’ফ্রান্সে জন্ম নেয়া হেনরি শ্যারিয়ার ওরফে প্যাপিলন লিখিত বাস্তব এই ঘটনা নিয়ে একই নামে হলিউডে সিনেমাও হয়েছে। 

১৯৩১ সালের অক্টোবরে ফরাসি আদালত কর্তৃক বিনা অপরাধে (প্যাপিলনের দাবি মতে) খুনের আসামি হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকে ১৯৪৪ সালের জুলাই পর্যন্ত পরবর্তী ১৩টি বছর হেনরি শ্যারিয়ারের জীবন কেটেছে জেল পালানো এবং আবারো জেলে ফেরার মধ্যে দিয়ে। তবে সত্যিকারার্থে প্যাপিলন জেলমুক্ত হন ১৯৪৫ সালের ১৯ অক্টোবর। এদিন এল ডোরাডো কারাগার থেকে প্যারালাইসিস আক্রান্ত আরেকজন প্রতিবন্ধী কয়েদি পিকোলিনোসহ মুক্ত হন প্যাপিলন।

 হেনরি শ্যারিয়ারের দীর্ঘ ১৩ বছরের ফেরারি এবং জেল-জীবনের  হৃদয়স্পর্শী, দুর্ধর্ষ, মানবিক আর আবেগমথিত অমানবিক সব অভিযানের কাহিনী লেখা হয়েছে প্যাপিলন-এ।

এরপরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে শ্যারিয়ার রচিত দ্বিতীয় বই ‘ব্যানকো’ তে। স্পেনীয় দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে জন্মভূমির মুক্তি আনয়নকারী মহান নেতা সিমন বলিভারের দেশ এবং বর্তমান সময়ের আলোচিত নেতা হুগো শ্যাভেজের দেশ ভেনিজুয়েলা’একজন নাগরিক হিসেবে শুরু হয় তার নয়া জীবন। প্যাপিলনের শেষ পৃষ্ঠায় ছিল এল ডোরাডো পেনাল সেটলমেন্টের অফিসার প্যাপিলনকে ‘গুড লাক’ বলে বিদায় জানাচ্ছেন।

আর ব্যানকো’কাহিনী শুরু ঠিক এর পর থেকে। প্যাপিলনের মতই ব্যানকো-উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনায় জমজমাট, শ্বাসরুদ্ধকর আর এক নিঃশ্বাসে পড়ার মত। যারা প্যাপিলন পড়েননি তাদেরও নিরাশ করবে না এই কাহিনী। এখানে প্যাট্রিক ও’ব্রায়ান-এর করা ব্যানকো’ইংরেজি অনুবাদের সংক্ষেপিত বাংলা রূপান্তর করা হয়েছে। বিভিন্ন নামের উচ্চারণের ক্ষেত্রে ইংরেজিকেই অনুসরণ করা হয়েছে, যেমন- ফরাসী শব্দ ‘পাপিলঁ’-কে করা হয়েছে প্যাপিলন, আবার লেখক অঁরি শারিয়ারকে করা হয়েছে হেনরি শ্যারিয়ার।]


http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/b=20111110195516.jpgআমরা সারারাত পথ চললাম মোটামুটি ঝামেলা ছাড়াই। কিন্তু সকাল বেলা ফ্লাক্স থেকে ঢেলে কিছু কফি খাওয়ার পর থেকে আমার খচ্চর আগাস্টা পা ছেঁচড়াতে শুরু করলো। টালমাটাল হয়ে বারবার জোজোর থেকে প্রায় শ’খানেক গজ পিছিয়ে পড়তে লাগলো। আমি এর পাছায় সব ধরনের কায়দায় গুঁতো মেরে দেখলাম। আমার অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তোলার জন্য জোজো তার উপদেশের হুল ফোঁটাতে শুরু করলো।

‘কেন যে তুমি রাইডিং-এর কিছুই জানো না, মিয়া। এটা খুবই সহজ একটা ব্যাপার। আমাকে দেখ। এই বলেই সে তার বাহনের পাছায় পা ছোয়ানো মাত্রই ওটা গতি বাড়িয়ে ছুট লাগালো। আর সে উচ্ছাস ভরে রেকাবীতে দাঁড়িয়ে পড়ে চিৎকার করছে, ‘আমি হচ্ছি, ক্যাপ্টেন কুক!’ অথবা বলছে, এই যে, স্যাঞ্চো! তুমি আসছো তো? তুমি কি তোমার প্রভুর সাথে তাল রাখতে পারছো না, ডন ক্যুইক্সোট?’

ব্যাপারটা আমাকে রাগিয়ে তুললো এবং আমি হাজারো কায়দা করলাম খচ্চরটাকে বাগে আনতে। শেষতক আমি অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি কৌশল কাজে লাগালাম যাতে করে এটা একটা ছুট লাগালো। আমি এর কানে জলন্ত সিগারেটের গোড়া ফেলে দিলাম। পাগলা ষাঁড়ের মতো ছুটে চললো এটা; আমি উল্লসিত হয়ে উঠলাম, এমনকি আনন্দের আতিশয্যে আমি আমার ক্যাপ্টেনকেও ছাড়িয়ে গেলাম। কিন্তু একটা খচ্চরের পক্ষে হঠাৎ করে দ্রুতগামী ঘোড়া বনে যাওয়ার বিষয়টা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। এটা আমাকে শেষ পর্যায়ে একটা গাছের উপরে ঠেলে তুলে দিল, আরেকটু হলে আমার পা গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল। এরপর মাটিতে ধপাস, আমার পাশ্চাৎদেশে জংলা কাঁটা তারাফুল হয়ে ফুটে উঠলো। আর ওদিকে জোজো, শিশুর মত হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়লো।
পরের দিন আমরা ঐ শূয়োরমুখো নির্বোধ বর্বরটাকে আমরা একটি পোসাডায় ছেড়ে আসলাম : এরপর দুইদিন ক্যানো নৌকায়, তারপর পিঠে বোঝা নিয়ে দীর্ঘ একদিনে হাঁটা পথ শেষ করে ডায়মন্ড-মাইন-এ পৌঁছলাম।

একটি উন্মুক্ত জায়গায় খাবার আর মালপত্র নামালাম। আমি ক্লান্তির শেষপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছি। ওদিকে বুড়া জোজোকে দেখছি বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে-- সে কপালে মাত্র ক’বিন্দু ঘাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমার দিকে একটা কৌতুককর অবজ্ঞার হাসি ঝুলিয়ে।

‘কেমন বোধ করছো দোস্ত? সব ঠিকতো?’
‘চমৎকার, চমৎকার। খারাপ থাকার কোন কারণ আছে কি? শুধু একটা কথা : আমরা যেহেতু এখানে কোন খোড়াখুড়ি করতে যাচ্ছি না তাহলে কেন আমাকে সারাদিন এভাবে বেলচা, কুঠার, চালনি এসব বয়ে বেড়াতে হলো?’
জোজো বিরক্তি প্রকাশ করল। প্যাপিলন, তুমি আমাকে হতাশ করছো। একটু চিন্তা কর: মগজটা খাটাও। এখানে কোন লোক এসব না নিয়ে আসলে,  এখানে সে এসেছেটা কি করতে? এই প্রশ্ন  টিনের চাল আর ফোঁকড় দিয়ে তাকিয়ে থাকা সবগুলো চোখ করবে, যারা তোমাকে দেখেছে গ্রামের ভিতর দিয়ে হেঁটে আসতে। তোমাকে এ সমস্ত জিনিসে সজ্জিত দেখে তারা আর কোন প্রশ্ন করবে না। বুঝতে পেরেছো?’
‘বুঝতে পেরেছি, গুরু।’
‘আমার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে যেহেতু আমি কিছুই বহন করিনি। ধর আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে বাবুটি সেজে এখানে এসে জুয়োর টেবিল বসিয়ে দিলাম অন্য কোন কাজ না করে , তাহলে মাইনার আর তাদের মহিলারা ভাববেটা কি, হেহ, প্যাপি? এই বুড়ো ফরাসিটা পেশাদার জুয়াড়ি, তারা একথাই বলবে। যাহোক এখন, তুমি দেখ আমি কি করতে যাচ্ছি। যদি পারি একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড মটর-পাম্প খোঁজার চেষ্টা করবো গ্রামে, নাহলে কাউকে পাঠাবো এটা জোগাড় করার জন্য। আর দরকার হবে বিশ গজ লম্বা পাইপের এবং দুই তিনটা স্লাইস। এর দ্বারা তৈরি কাঁদা ছাঁকার পাম্পের সুবিধা যারা গ্রহণ করবে তারা পাম্পের মালিক হিসেবে আমাকে সংগৃহীত হীরার শতকরা পঁচিশভাগ দিবে; আর অন্য ফলটা হলো, এর দ্বারা আমার এখানে অবস্থানটা বিধিসম্মত হলো। কেউ বলতে পারবে না যে জুয়াই আমার পেশা, কারণ পাম্প চালিয়ে আমি জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু যেহেতু আমি একজন জুয়াড়িও, রাত্রে আমি জুয়া খেলাও চালিয়ে যাই। এটা খুবই স্বাভাবিক, কারণ আমাকে অন্য সবার মতো প্রচলিত কর্মব্যস্ত দিন পার করতে হয় না। বুঝতে পেরেছো হিসাবটা?’
‘জিনের মতই ঝকঝকে পরিষ্কার।’
‘বুদ্ধিমান বালক। দুই পাত্র ফ্রেসকোস লাগাও, সেনোরা।’
একজন মোটাসোটা, উজ্জ্বল ত্বকের বন্ধুভাবাপন্ন চেহারার বৃদ্ধ মহিলা গ্লাসভর্তি চকোলেট রঙের পানিয় নিয়ে এলো। ভিতরে আইস-কিউব আর লেবুর টুকরো ভাসছে।
‘আটভলিবার দাম হোম্বরেস।’
‘দুই ডলারেরও বেশি। নরক, জীবনযাত্রা এখানে খুব ব্যয়বহুল দেখছি।’
জোজো বিল মিটালো। ‘দিনকাল কেমন কাটছে?’ সে জিজ্ঞেস করলো।
‘মোটামুটি।’
‘পাওয়া যাচ্ছে কিছু?’
‘মানুষ প্রচুর কিন্তু হিরা মিলছে খুবই অল্প। এই জায়গাটার সন্ধান তিন মাস আগে মিলেছে। তখন থেকে এ পর্যন্ত চার হাজার লোক ছুটে এসেছে। অল্প ক’টা হীরার অনুপাতে অসংখ্য মানুষ। আর এর বিষয়টা কি?’ সে আমার দিকে থুতনি নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো। ‘জার্মান না ফ্রেঞ্চ?’
‘ফরাসী, আমার সঙ্গে এসেছে।’
‘বেচারা।’
‘কি ব্যাপার, বেচারা মানে?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘কারণ মরার পক্ষে তুমি খুবই অপরিণত বয়স্ক আর সুদর্শন। জোজোর সাথে যেসমস্ত লোক আসে ভাগ্য কখনো তাদের পক্ষে থাকে না।’
‘তোমার ওই নোংড়া ফাঁটলটা বন্ধ কর, বুড়ি আহাম্মক কোথাকার।
আস, প্যাপি, আমরা যাই।’
আমরা দাঁড়াতেই হস্তিনী বিদায় সম্ভাষণের ভঙ্গিতে আমাকে বললো, ‘নিজের দিকে খেয়াল রেখ।’

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/bratislava-casino-rouletteb20111110202426.jpgঅবশ্যই, জোসে আমাকে যেসব কথা বলেছিল সে আমি জোজোকে কিছুই বলিনি আর জোজো বেশ বিস্মিত হয়েছে যেহেতু আমি ওই মহিলার এহেন মন্তব্যের কারণ খুঁজতে চাইনি। আমি বুঝতে পারলাম? এ সম্পর্কে যে প্রশ্নগুলো করা হয়নি জোজো সেগুলোর জন্য প্রতীক্ষা করছে। তাকে বিমূঢ় দেখালো এবং বারবার পাশ থেকে আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর, অনেকের সাথে কথা বলার পর জোজো একটা ঝুপড়ি খুঁজে পেল। তিনটা ছোট ছোট ঘর, হ্যামক ঝোলানোর রিং আর কিছু কার্টুন। একটি ঘরে বিয়ার আর রামের খালি বোতল পড়ে আছে কিছু, আরেকটিতে চ্যাপ্টা একটা এনামেলের পাত্র আর একটা পানিভর্তি ক্যান। কাপড় ঝোলানোর জন্যে দড়িও টানানো আছে। মাটি পিটিয়ে মেঝে তৈরি করা। খুব পরিষ্কার। প্যাকিং কেসের তক্তা দিয়ে খুপড়ির দেয়ালগুলো বানানো হয়েছে--- এখনো এগুলোতে পড়া যাচ্ছে ক্যামে সাবান, এ্যাসেটে ব্রানকা, নেসলে দুধ প্রভৃতি পণ্যের নাম। প্রতিটি ঘর প্রায় দশ ফুট বাই দশ ফুট। কোন জানালা নেই। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। শার্ট খুলে ফেললাম। জোজো এবার খুব মর্মাহত হলো।
‘পাগল হলে নাকি? যদি কেউ ভিতরে এসে পরে এখন? এরই মধ্যে তুমি নিজেকে এখানে অপাংক্তেয় করে ফেলেছো কিছুটা, আর এখন যদি তুমি আবার তোমার উল্কি আঁকা দেহটা দেখিয়ে বেড়াও, এর মানে হবে একথা প্রচার করে বেড়ানো যে, তুমি জেলখাটা ঘুঘু ছিলে। আত্মসম্বরণ করতে শেখ।’
‘কিন্তু আমারতো দম বন্ধ হয়ে আসছে, জোজো।’
‘তোমাকে এটা সইয়ে নিতে হবে। পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে অভ্যাসের ব্যাপার। আত্মসম্বরণ কর, ঈশ্বর পরাক্রমশালী। সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আত্মসম্বরণ কর।’

অনেক কষ্টে নিজের হাসি সম্বরণ করলাম । জোজোকে মনে হচ্ছে এক ভীমরতি পাওয়া বুড়ো ভাম।
পার্টিশন খুলে আমরা দুইটা ঘরকে একটা ঘরে পরিণত করলাম। ‘এটা হবে ক্যাসিনো। দেঁতো হাসি দিয়ে জোজো বললো, বিশফুট বাই দশফুট জায়গা এর ভেতরে। আমি খুব আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছিলাম দেখার জন্যে যে খেলাটা কী রকম হয়।
বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। জোজোর কৌশল অনুযায়ী আমরা এলাকার ছোট ছোট বারগুলোতে গোটা কয়েক চক্কর লাগালাম জনসংযোগের জন্যে। এতে সবাই জেনে গেল যে আমাদের ঘরে আজ রাত আটটায় ক্র্যাপসের খেলা হবে। আমরা শেষ যে পানশালায় গেলাম তা একটা শেডের নিচে গোটাকয় টেবিল চারটা বেঞ্চি আর একটা খুঁটিতে ঝুলন্ত একটি কার্বাইড ল্যাম্প নিয়ে গঠিত। দোকানদার বিশালদেহী বয়সহীন এক লালমাথাধারী লোক। কোন কথা না বলে পানীয় পরিবেশন করলো। চলে আসার সময়ে সে অমার কাছে এসে ফরাসীতে বললো, আমি জানি না তুমি কে আর জানতেও চাই না। কিন্তু আমি তোমাকে শুধুমাত্র এই উপকারটুকু দিতে পারবো, ‘যেদিন তোমার এখানে থাকতে মন চাইবে, চলে এসো। আমি তোমার সাহায্য করবো।’
সে গেঁয়ো ধরনের ফরাসি ভাষায় কথা বলছিলো, পরে তার বাচনভঙ্গি থেকে আমি ধরতে পারলাম সে একজন কর্সিকান।
‘তুমি কর্সিকান?’
‘হ্যাঁ, এবং তুমি জান কর্সিকানরা কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না। উত্তরাঞ্চলের লোকদের মত না তারা।’ সবজান্তার হাসি দিয়ে সে বললো।
‘ধন্যবাদ। জেনে ভাল লাগলো।’
সাতটার দিকে জোজো কার্বাইড ল্যাম্প জ্বালালো। দু’টি কম্বল মাটিতে বিছানো হলো। কোন চেয়ার নেই। জুয়ারীরা হয় দাঁড়িয়ে থাকবে নয়তো হাঁটুমুড়ে বসবে। আমরা ঠিক করলাম আজ রাতে আমি খেলায় অংশ নিব না। শুধু দেখবো, ব্যস।

লোকজন আসা শুরু করলো। কিছু বেঁটে লোক: বেশিরভাগই দশাসই শরীরের দাঁড়িওয়ালা, মছুয়া টাইপের। তাদের মুখমণ্ডল আর হাত পরিষ্কার, শরীর থেকে কোন গন্ধ আসছে না, যদিও তাদর কাপড় চোপড় ময়লা দাগে একেবারে ভর্তি এবং ছিঁড়েছুড়ে অবস্থা এমন যে ফেলে দেয়ার যোগ্য। ব্যতিক্রম একটাই-- প্রত্যেকের শার্ট, অধিকাংশই হাফহাতা, একেবারে পরিষ্কার করে কাচা।
বিছানার মাঝখানে আটজোড়া ডাইস সাজানো হলো। প্রত্যেকটাই ছোট একটি বাক্সের মধ্যে রাখা। জোজো আমাকে বললো প্রত্যেক খেলোয়াড়কে একটি করে কাগজের কাপ বিতরণ করতে। বিশজনের মতো লোক। আমি রাম ঢেলে ঢেলে দিলাম। ঢালার সময়ে কেউই বললো না যে ‘যথেষ্ট হয়েছে, আর না।’ ফলে মাত্র একদান দেওয়ার পরেই তিন বোতল রাম হাওয়া হয়ে গেল।
প্রত্যেকেই এক চুমুক করে খেয়ে তাদের সামনে কাপ নামিয়ে রাখলো এবং এর পাশে একটি করে এ্যাসপিরিনের টিউব রাখলো। আমার জানা আছে টিউবগুলোতে হীরা ভর্তি। একটা জবুথবু থুত্থুরে বুড়ো চাইনিজ সামনে স্বর্ণকারদের একটি তুলাদণ্ড নিয়ে বসলো। কেউ তেমন কথাবার্তা বলছে না। লোকগুলো সবাই-ই পরিশ্রান্ত। প্রখর সূর্যতাপে সারাদিন পরিশ্রম করেছে, কেউ কেউ সকাল ছ’টা থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোমর পানি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে কাজ করেছে।

হ্যাঁ, খেলা শুরু  হতে যাচ্ছে! প্রথমে একজন পরে দ্বিতীয়জন, তারপর তৃতীয় একজন একজোড়া ডাইস তুলে একটা আরেকটার সাথে জোড়সে চেপে পরীক্ষা করে দেখলো এবং দেখে পাশের জনকে দিল একই উদ্দেশ্যে। মনে হলো সবকিছুই পছন্দ হয়েছে এদের, কারণ ডাইসগুলো কম্বলে নামিয়ে রাখা হলো এবং কেউ কোন মন্তব্য করলো না। প্রতিবার জোজো কম্বল থেকে ডাইসের জোড়াগুলো তুলে যার যার বাক্সে রেখে দিচ্ছিল শুধু শেষের জোড়া বাদে, ওই জোড়া কম্বলে রাখা আছে।

কয়েকজন লোক যারা তাদের শার্ট খুলে ফেলেছে তারা মশার ব্যাপারে অভিযোগ করলো। জোজো আমাকে বললো ক’মুঠো শুকনো ঘাস জ্বালাতে যাতে এর ধোঁয়ায় মশাগুলো দূর হতে পারে। ঘন কোঁকড়ানো দাঁড়ি, ডানবাহুতে একটি বেঢপ ফুলের উল্কি আঁকা তামাটে রঙের দশাসই এক লোক জিজ্ঞেস করলো, ‘কে শুরু করবে?’
‘তুমিই কর, যদি ইচ্ছা হয়’ জোজো বললো।
রূপোর কাজ করা বেল্ট থেকে, গরিলাটা (যেহেতু দেখতে তাকে গরিলার মতই লাগে) রাবারের ব্যান্ডে মোড়ানো বলিভারের মোটাসোটা এক তাড়া বের করলো।
‘শুরু করছো কত দিয়ে চিনো?’ একজন জিজ্ঞেস করলো।
‘পাঁচশ’ বোলোস।’ বোলো হচ্ছে বলিভারস-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। ‘ঠিক আছে, পাঁচশ’ই সই।’
ক্র্যাপ ঘুড়ানো হলো। আট উঠলো। জোজো আটই ধরতে চেয়েছিল।
‘একহাজার বোলোস বাজি তুমি ডাবল ফোর দিয়ে আট তুলতে পারবে না,’ একজন খেলোয়াড় বললো।
‘আমি দেখাচ্ছি করে,’ জোজো বললো।
চিনো আট তুললো, পাঁচ আর তিন মিলিয়ে। জোজো হেরে গেল। পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত চলা খেলায় কাউকে কোন বিষয় ব্যাখ্যা করতে হলো না, বিন্দুমাত্রও ভুল বোঝাবুঝি ছাড়াই খেলা শেষ হলো। এই লোকগুলো অস্বাভাবিক ধরনের জুয়াড়ি। এই রাতে জোজো সাত হাজার বোলোস হারলো আর খোঁড়া এক জুয়াড়ি হারলো দশ হাজার।
কথা ছিল মধ্যরাতে খেলা শেষ হবে। কিন্তু সবাই মত দিল খেলা আরও একঘণ্টা চালানোর জন্য। রাত একটায় জোজো বললো এটাই শেষ দান।
‘শুরু করেছিলাম আমিই’ চিনো বললো ডাইসগুলো হাতে নিয়ে। শেষও করবো আমি। আমি আমার জেতা সব মাল রাখছি, নয় হাজার বলিভারস।
তার সামনে প্রচুর নোট আর হীরক জমা হয়েছে। সে অন্য সবার প্রচুর পরিমাণে জমা সংগ্রহ করে ডাইস ঘুরালো সাত তুলতে।

জুয়ার জবরদস্ত এই দানটিতে প্রথমবারের মত সবার মাঝে একটু গুঞ্জন দেখা গেল। লোকজন সব উঠে দাঁড়ালো। ‘চল, একটু ঘুমিয়ে নেয়া যাক।’
‘যাহোক, দেখলে তো সব, দোস্ত?’ আমরা একা হতেই জোজো বললো।
হ্যাঁ। এবং আমি খুব ভালভাবে যা লক্ষ্য করেছি তাহলো ওই কঠিন পাত্রগুলোকে। তারা প্রত্যেকেই ছুরি এবং পিস্তল বহন করছে। কেউ কেউ তাদের ম্যাশেটের উপর বসেছিল। ওগুলো এত ধারালো যে এক হ্যাঁচকায় ধর থেকে মাথা নামিয়ে দেয়া যায়।
‘তা ঠিক । কিন্তু তুমি তো এরকম আগেও দেখেছো।
‘তারপরেও...আমি দ্বীপে থাকতে জুয়ার টেবিল চালিয়েছি। কিন্তু আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি আগে কখনো আজ রাতের মত এরকম বিপদের অনুভূতি হয়নি।’
‘এটা পুরোটাই অভ্যাসের ব্যাপার, বন্ধু। আগামী দিন তুমি খেলবে এবং আমরা জিতবো। এটা নিশ্চিত ধরে রাখ। যেহেতু তুমি খেয়াল করেছো,’ সে যোগ করলো, ‘বল দেখি কোন লোকগুলোর উপর ভাল নজর রাখা উচত?’
‘ব্রাজিলীয়দের উপর।’
‘সাবাস! মানুষ চিনতে পেরেছো ঠিক কায়দায়-- যে কায়দায় লোকজনের ওপর নজর বুলিয়েই বলে দেয়া যায় এদের মধ্যে মুহূর্ত মাত্র সময়ে কোন ঘুঘুটা নরকগুলজার করে ফেলতে পারে।
দরজা বন্ধ করে (তিনটি বিশাল বোল্ট এঁটে) আমরা যার যার হ্যামকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম এবং সাথে সাথেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, জোজোর নাক ডাকা আমার কানে আসার আগেই।

http://www.banglanews24.com/images/PhotoGallery/2011November/taka20111110195503.jpgপরদিন, বিশাল গণগণে সূর্য উঠলো সবকিছু পুড়িয়ে ভাজাভাজা করে ফেলার জন্যে-- এক ফোঁটা মেঘের চিহ্ন নেই আকাশে, না আছে বাতাসের কোন নাম গন্ধ। আমি এই কৌতুহলোদ্দীপক গ্রামটিতে ঘুরতে বেড়োলাম। সবাইকেই  দেখা গেল অতিথিপরায়ণ। বিরক্তিকর চরিত্রেরও অভাব নেই। কিন্তু তাদের কথা বলার নিজস্ব আন্তরিক একটা ভঙ্গি আছে (তা যে ভাষায় বা বাচনভঙ্গিতেই তারা বলুক না কেন)। আর তাই তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উষ্ণ একটা মানবীয় আন্তরিকতার ছোঁয়া আছে। দর্শনীয় লালমুখো কর্সিকানটার সাথে আবার দেখা হলো। তার নাম মিগুয়েল। সে প্রাণোচ্ছল ভেনিজুয়েলিয় ভাষায় কথা বলে আর মাঝে মধ্যেই সাবলীল দক্ষতায় ইংরেজি আর ব্রাজিলীয় শব্দের মিশেল দিয়ে দেয়, মনে হয় এই শব্দগুলো প্যারাসুটে করে হাল্কা চালে নেমে আসছে তার কথার মধ্যে। শুধু যখন সে ফ্রেঞ্চ বলে, বেশ কষ্টেই তাকে বলতে হয় আর কেবলমাত্র তখনি ওর কথার কার্সিকান টান ধরা পড়ে।

বাদামী বর্ণের অল্পবয়েসী এক তরুণী চুপচাপ কফি ঢেলে দিল। আমরা পান করলাম। আলাপচারিতায় মিগুয়েল আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কোত্থেকে এসেছো, ভাই?
‘গতকাল তুমি যা বলেছো আমাকে, এরপর আমি তোমাকে মিথ্যে বলতে পারি না। আমি কারাগার থেকে এসেছি।’
‘আহ? পালিয়েছো? তুমি আমাকে বলায় আমি আনন্দিত।’
‘আর তোমার ব্যাপার কি?’
সে উঠে দাঁড়ালো, ছ’ফুটের ঊর্ধ্বে, তার লাল মাথাওয়ালা মুখটায় একটা অভিজাত অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। ‘আমিও পালিয়েছি, তবে গায়ানা থেকে নয়। আমাকে গ্রেফতার করার আগেই আমি কর্সিকা ত্যাগ করি। আমি একজন ন্যায়বাদী দস্যু-- অ্যান অনারেবল ব্যান্ডিট।’
তার সমগ্র মুখমণ্ডল একজন সৎ মানুষ হওয়ার গর্বে আলোকিত হয়ে উঠলো, ব্যাপারটা আমাকে অভিভূত করলো। এই অনারেবল ব্যান্ডিট ভদ্রলোকটি দেখতে আসলেই অসাধারণ। সে বলে চলেছে, ‘কর্সিকা হচ্ছে পৃথিবীর স্বর্গ, একমাত্র দেশ যেখানে মানুষ সম্মান রক্ষার্থে অবলীলায় জীবন দানে প্রস্তুত। তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘আমার জানা নেই এটাই একমাত্র জায়গা কিনা কিন্তু আমার বিশ্বাস ম্যাকুইসদের* মধ্যে তুমি এখানে অনেক লোক খুঁজে পাবে যারা সাধারণ ডাকাতদের চেয়ে শুধুমাত্র আত্মসম্মান রক্ষার্থেই লড়াকু হয়েছে।’
‘আমি শহুরে দস্যুদের গোনায় ধরি না,’ সে চিন্তিতমুখে বললো।
অল্প কথায় আমি আমার বর্ণনা ওকে জানালাম এবং বললাম, আমি প্যারিসে ফিরে যেতে চাই আমার দেনা মিটিয়ে দেয়ার জন্য।
‘তোমার কথা ঠিক; কিন্তু প্রতিশোধ হচ্ছে এমন একটা উপাদেয় ভোজ যা তুমি ঠাণ্ডা করে খেতে চাও। যতদূর সম্ভব খুব সতর্কতার সাথে কাজ চালিয়ে যাও।
অন্যথায় এটা খুবই দুঃখজনক হবে যদি তুমি তৃপ্তির ঢেকুর তোলার আগেই ওরা তোমাকে পেড়ে ফেলে। তুমি জোজো বুড়োর সাথে আছো?’
‘হ্যাঁ।’
‘সে সোজাসাপ্টা লোক। কেউ কেউ বলে সে ডাইসের ব্যাপারে খুবই ধূর্ত। কিন্তু সে একজন জোচ্চর একথা আমি বিশ্বাস করি না। তোমার সাথে কি দীর্ঘদিনের পরিচয়?’
‘না, কিন্তু সেটা কোন ব্যাপার না।’
‘কেন, প্যাপি, যত তুমি জুয়া খেলবে ততই তুমি অন্যদের সম্পর্কে জানবে--- সেটাই নিয়ম; কিন্তু একটা ব্যাপারে আমি তোমার জন্য উদ্বিগ্ন বোধ করছি।’
‘কি সেটা?’

‘দুই বা তিনবার তার পার্টনারদেরকে খুন করা হয়েছে। সেজন্যেই আমি গত সন্ধ্যায় তোমাকে ওই কথাগুলো বলেছি। সাবধানে থেকো, আর যদি নিরাপত্তার অভাব অনুভব কর, আমার কাছে চলে এসো। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো।’
‘ধন্যবাদ মিগুয়েল।’
হ্যাঁ, কৌতুহলোদ্দীপক গ্রামই বটে একখান। গহীন অরণ্যে দিক হারানো চমকপ্রদ একদল পাঁচমিশালী লোকের বিচিত্র সমাবেশ, যারা একটি বিস্ফোরণোন্মুখ এলাকার মধ্যখানে এসে কঠিনতর জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে আছে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব গল্প আছে। তাদের সাথে পরিচিত হওয়াটা ভাগ্য বটে, তাদের কাছ থেকে তাদের গল্প শুনতে পারাটাও। এখানে তাদের আবাসস্থলগুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে শুধু পামগাছের পাতায় অথবা ঢেউটিনে ছাওয়া একটি ছাউনিমাত্র। আর খোদায় মালুম, তারা কিভাবে সেখানে দিন গুজরান করে। দেয়ালগুলো জোড়া দেওয়া কার্ড বোর্ডের অথবা কাঠের কখনো বা এমনকি কাপড়ের। কোন খাট পালঙ্কের বালাই নেই। শুধুমাত্র হ্যামক। আহার, নিদ্রা, মৈথুন, অবগাহন সমস্ত কিছুই এক প্রকার রাস্তায়ই ঘটে তাদের। অথচ কেউই ভেতরে কি হচ্ছে না হচ্ছে তা দেখার জন্যে কারও দেয়ালের কাপড়ের পর্দা ফাঁক করবে না বা কাঠের তক্তার মাঝ দিয়ে উঁকি দিবে না। প্রত্যেকের অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ের ব্যাপারে রয়েছে সর্বোচ্চ সম্মানবোধ। যদি কারও ঘরে গিয়ে দেখা করার প্রয়োজন হয় তাহলে, তার কাছাকাছি কয়েক গজ যাওয়ার আগেই দরজা খটখটানোর কায়দায় বলতে হয়, ‘বাড়িতে কেউ আছে কি?’ যদি জবাব আসে যে কেউ আছে অথচ সে আগন্তুককে চিনছে না, তাহলে বলতে হয়,‘জেন্টেস ডি বাহ’ অর্থাৎ আমি একজন বন্ধু। তখন কেউ একজন বের হয়ে বিনীতভাবে বলবে ‘এ্যাদলান্তে এসতা ক্যাম্প এস সুইদ্যা।’ অর্থাৎ ‘ভিতরে আসতে আজ্ঞা হোক, এ গৃহ আপনারই।’
মজবুত কয়েকটি খুঁটি দিয়ে গাঁথা একটি শক্তপোক্ত কুঁড়ের সামনে একটা টেবিল বিছানো আছে। টেবিলের উপরে মার্গারিটা দ্বীপের খাঁটি মুক্তার তৈরি নেকলেস, কিছু কাঁচা সোনার খণ্ড, গুটিকয়েক ঘড়ি, চামড়ার অথবা এক্সপান্ডেড মেটালের তৈরি ঘড়ির বেল্ট এবং বেশ কিছু এ্যালার্মওয়ালা ঘড়ি সাজানো। ‘মুস্তাফা’স জুয়েলারী শপ’ এটা।
টেবিলের পেছনে সদাশয় চেহারায় এক বৃদ্ধ আরব। অল্পবিস্তর আলাপচারিতা হলো। লোকটা মরক্কোর অধিবাসী। বিকাল পাঁচটা বাজছে তখন, সে জিজ্ঞেস করলো, ‘খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?’
‘এখনো নয়।’
‘আমি এইমাত্র খেতে যাচ্ছিলাম। যদি আমার খাবারে ভাগ নিতে...?
‘এটাতো চমৎকার হবে।’
মুস্তাফা একজন সহৃদয় প্রাণচঞ্চল পুরুষ। আমি বেশ একটা আনন্দঘন ঘণ্টা পার করে দিলাম তার সাথে। তার মধ্যে অন্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসু মনোবৃত্তি নেই এবং আমাকে জিজ্ঞেসও করলো না আমি কোত্থেকে এসেছি।
ব্যাপারটা অস্বস্তিকর লাগছে; সে বললো, ‘আমার নিজের দেশে আমি ফ্রেঞ্চদেরকে ঘৃণা করেছি,’ আর এখানে আমি তাদেরকে পছন্দ করি। কোন আরবের সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে কি?’
‘প্রচুর। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক খুবই ভাল ছিল আর বাদবাকি সব খুবই খারাপ ছিল।’
‘সবগুলো জাতির ব্যাপারেই এই কথা খাটে। আমি নিজেকে ভাল মানুষদের দলে বিচার করি। আমার বয়স ষাট এবং তোমার বাবার বয়সিই হব। আমার ত্রিশ বছরের এক ছেলে ছিল, দু’বছর আগে সে নিহত হয়েছে-- গুলিতে। সে দখতে সুদর্শন ছিল; সে সহৃদয়ও ছিল।’ তার চোখ পানিতে ভর এল।

আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম: এই আবেগমথিত অসুখী বাবাটি আমাকে আমার নিজের বাবার কথা স্মরণ করিয়ে দিল’ আর্ডেশে তার ছোট্ট বাড়িতে অবসর জীবনে সেও নিশ্চয় চোখ পানিতে ভরিয়ে ফেলে। যখন আমার কথা তার মনে পড়ে। বেচারা বুড়ো বাপ আমার। কে বলতে পারে সে কোথায় আছে, কি করছে। আমার স্থির বিশ্বাস বাবা এখনো বেঁচে আছে-- আমি এটা অনুভব করতে পারি। কায়মনোবাক্যে আশা করছি যে যুদ্ধের তাণ্ডব তার উপর খুব একটা আচড় ফেলতে পারেনি।
মোস্তফা অনুরোধ করলো যখন ইচ্ছা তার এখানে যেন আসি-- একবেলা খেয়ে যেতে। বা যদি অন্য কিছুর দরকার পড়ে আমার: যদি আমি কখনো তার সহায়তা চাই, তাহলে এটা তার জন্যে আমার পক্ষ থেকে দয়া করা হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল, আমি তাকে সবকিছুর জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজেদের ডেরায় ফিরে চললাম। শিঘ্রই খেলা শুরু হয়ে যাবে।

আমি আমার প্রথম খেলার জন্যে পুরোদস্তুর প্রস্তুত ছিলাম না। ঝুঁকি নাই, উপাজর্নও নাই,’ জোজোর কথা এটা এবং কথাটা পুরোপুরি ঠিক। যদি আমি ৬ কুয়াই ডেস অর্কেবরেসকে বারুদ দিয় উড়িয়ে দিতে চাই এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদেরকেও, তাহলে এর খরচ মোকাবেলার জন্য আমার  নগদ নারায়ণ দরকার প্রচুর পরিমাণে। আর এই নগদ নারায়ণ অচিরেই হাতে আসতে যাচ্ছে আমার এবং এটা অবশ্যম্ভাবী।

যেহেতু আজ শনিবার আর মাইনাররা তাদের রবিবারটাকে ছুটি হিসাবে বাধ্যতামূলকভাবে পালন করে, তাই নয়টার আগে আজ খেলা শুরু হচ্ছে না। কারণ এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হলে এটা আগামীকাল সূর্যোদয় পর্যন্ত চলবে। ভিড় করে লোক আসা শুরু করলো। জায়গার তুলনায় অনেক লোক। ভেতরে সকলের স্থান সঙ্কুলান অসম্ভব হয়ে পড়লো। তাই জোজো উঁচুদরের জুয়াড়ীদের বেছে আলাদা করলো। এই দলে চব্বিশজন হলো, বাকিরা বাইরে খেলবে। আমি মুস্তাফার কাছে গেলাম এবং অত্যন্ত সহৃদয়তার সাথে আমাকে একটা বড় কার্পেট আর একটা কার্বাইড ল্যাম্প ধার দিল বারান্দার জুয়াড়ীদের জন্য। ভিতরের মহারথীদের কেউ দেউলিয়া হয়ে পতন ঘটলো যাতে বাইরের অপেক্ষমাণদের মধ্য থেকে শূন্যস্থান পূরণ করা যায়।

বি: দ্র :-- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানীর বিরুদ্ধে লড়াইকারী দেশপ্রেমিক ফরাসিদের গোপন কাহিনী।

[চলবে]

ব্যানকো [পর্ব-৬], [পর্ব-৫], [পর্ব-৪], [পর্ব-৩], [পর্ব-২], [পর্ব-১]

বাংলাদেশ সময় ১৯৪১, নভেম্বর ১০, ২০১১

ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার, বাড়ছে দুর্ঘটনা
বাহুবলে বাস উল্টে ৩ জন নিহত
ড্রেজার মেশিন বিকল, বরিশাল নদীবন্দর এলাকায় খনন বন্ধ
দেউলিয়া আ’লীগ বিএন‌পির বিজয় বাধাগ্রস্ত করতে চায়: ফখরুল
শতভাগ দেশি কর্মীর হাতে তৈরি সিম্ফনি মোবাইল, লক্ষ্য রফতানি


লবণ যেভাবে রক্তচাপ বাড়ায় 
দুই মেয়র প্রার্থীসহ কোকোর কবর জিয়ারত করলেন ফখরুল
তীব্র শীত পঞ্চগড়ে, বাড়ছে শিশু-বৃদ্ধ রোগী
পাল্টে যাচ্ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই 
রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তাকে বদলি