php glass

ধারাবাহিক উপন্যাস : পিতৃগণ, দ্বিতীয় পর্ব, অধ্যায় ১-৩

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

বরেন্দির ভূমিপুত্ররা বুকের রক্ত ঢেলে শত শত বছরের সংগ্রামের পরে নিজেদের মাটিকে মুক্ত করেছে দিব্যোকের নেতৃত্বে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই একবারই কোনো ভূখণ্ডের কৃষক-ভূমিপুত্ররা অর্জন করেছিল নিজেরাই নিজেদের জীবন নিজেদের মতো পরিচালনা করার অধিকার।

ভূমিকা অথবা কথারম্ভের সূত্র:
বরেন্দির ভূমিপুত্ররা বুকের রক্ত ঢেলে শত শত বছরের সংগ্রামের পরে নিজেদের মাটিকে মুক্ত করেছে দিব্যোকের নেতৃত্বে। পৃথিবীর ইতিহাসে এই একবারই কোনো ভূখণ্ডের কৃষক-ভূমিপুত্ররা অর্জন করেছিল নিজেরাই নিজেদের জীবন নিজেদের মতো পরিচালনা করার অধিকার।

কিন্তু উদারতাই তো এই মাটির সন্তানদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সেই উদারতার সুযোগ নিয়ে রীদের যোগসাজসে পালিয়ে গেছে রামপাল। সঙ্গে নিয়ে গেছে রাজাকোষের সমস্ত অর্থ আর ধনরত্। পাল-সাম্রাজ্যের অবশিষ্ঠাংশ মগধ অঞ্চলে বসে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে রামপাল। গৌড়-বরেন্দ্রী-পুণ্ড্রবর্ধন মুক্ত হওয়ার পরে প্রথম কয়েকদিনের যুদ্ধবিজয়ের উন্মাদনার পরেই শক্তহাতে কৈবর্তযোদ্ধাদের রাশ টেনে ধরেছে দিব্যোক। কোনো তি হতে দেয়নি পালরাজার মহিষীদের, তাদের অমাত্যদের, তাদের অনুরাগীদের। বরং যখন রাজমহিষী এবং অমাত্যমহিষীরা অনুমতি চেয়েছে রাজ্য ত্যাগ করার, তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে সসম্মানে রাজ্য ত্যাগের অনুমতি দিয়েছে দিব্যোক। তারা চলে গেছেন। সঙ্গে নিয়ে গেছেন নিজেদের অলংকার, স্বর্ণতৈজস, স্বর্ণ এবং রৌপ্যমুদ্রা। একবারও দিব্যোক বলেনি, এইসব স্বর্ণসম্পদ তো এই ভূমির মানুষদের রক্ত-ঘাম এবং জীবনপাত করে ফলানো ফসলেরই রূপান্তর। তার এই উদারতাকে রাষ্ট্রনৈতিক ভুল বলে বারবার সতর্ক করে দিয়েছে বন্ধু পদ্মনাভ। কিন্তু দিব্যোক কর্ণপাতই করেনি তার কথায়। সে বলেছে বরেন্দির ভূমিপুত্রদের কাছে রাষ্ট্রনীতির চেয়ে মানবনীতি অনেক বড়। ঐসব স্বর্ণালঙ্কার এবং তৈজসের সাথে অধিকারিণী নারীদের অনেক আবেগ জড়িত। সেইসব আবেগসঞ্চারী বস্তু থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করা অন্যায়। আর বরেন্দির সাধারণ মানুষের তো ঐসব প্রয়োজন নেই। তারা তাদের মাতৃভূমিকে নিজেদের মতো করে ফিরে পেয়েছে। তারা আবার নির্বিঘে ভূমির সাথে চাষাবাদে সম্পৃক্ত হতে পারবে। তাদের ঘামে-শ্রমে তুষ্ট হয়ে ভূমিদেবী তাদের আঙিনা ভরে দেবেন ফসলের সুগন্ধে। তাদের জলদেবী নদীগুলিতে দেবেন মৎসসম্পদের সমারোহ। তাদের বনভূমি ভরে উঠবে শিকারের পশুতে। তাদের আর কী চাই! তারা কেন অন্যের সঞ্চিত সম্পদের দিকে তাকাবে লোভাতুর দৃষ্টিতে।

এই যুক্তি মেনে নিয়েও পদ্মনাভ বলেছেন, সব সম্পদ নিয়ে অভিজাত মহিষীদের চলে যেতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ এই সম্পদ একদিন-না-একদিন ব্যবহৃত হবে কৈবর্তদের বিপক্ষেই।

পদ্মনাভের অনুমান সঠিক। রাজমহিষী এবং অমাত্যমহিষীরা তাদের সমস্ত সম্পদ এনে তুলে দিয়েছে রামপালের হাতে। এইসব সম্পদের সাথে রাজকোষ থেকে চুরি করে আনা সম্পদ মিলিত হয়ে রামপালের শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এখন ল সৈন্যের দল গঠনে রামপালের কোনো অর্থাভাব নেই। সৈন্যদলের জন্য অস্ত্র, অশ্ব, বর্ম, সাজপোশাক কিনতে রামপালের অন্য কারো দ্বারস্থ হতে হয় না।     

বাঘ একবার রক্তের স্বাদ পেলে আর কি কখনো সেই স্থান ত্যাগ করতে চায়? পালরাজা রামপালও বরেন্দিকে ঘিরে হায়েনার মতো সুযোগ খুঁজে চলেছে আক্রমণ শানানোর। দিব্যোকের পরিচালনা আর কৈবর্তদের বীরত্ব বারবার ব্যর্থ করে দিয়েছে তাকে।

দিব্যোকের পরে রুদোক। তারপরে ভীম।

ভীমের মতো এমন নৃপতি-নেতা আর কী কখনো জন্মাবে বাংলা-বরেন্দির মাটিতে!

কিন্তু এবার যে মরণ-কামড় দিতে মরিয়া রামপাল! তার সাথে আরো কত রাজ-রাজন্য! তাদের প্রশিতি সৈন্যদল! রথী-অশ্বারোহী-পদাতিক লাধিক! তার সাথে হস্তীযুথ! অঙ্গদেশাধিপতি মথন দেব, মহাপ্রতীহার শিবরাজদেব, রাজা কাহ্নুর দেব, রাজা সুবর্ণ দেব, পীঠীর রাজা দেবরতি, মগধের অধিপতি ভীমযশাঃ, কোটাটবীর রাজা বীরগুণ, উৎকলরাজ জয়সিংহ, দেবগ্রামের রাজা বিক্রমরাজ, অপরমন্দারের মহারাজা লক্ষ্মীশূর, তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর, কুজবটীর শূরপাল, উচ্ছালের রাজা ময়গলসীহ, ঢেক্করীর রাজা প্রতাপসীহ, কজঙ্গলের অধিপতি নরসিংহার্জুন, সঙ্কটগ্রামের চণ্ডার্জুন, নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ আর কৌশাম্বীপতি দ্বোরপবর্ধনÑ এই আঠারো সামন্ত-মহাসামন্তের সাথে রামপালের মিলিত বাহিনী যায় বরেন্দি অভিযানে ভীমের বিরুদ্ধে। তাদের আর্যরক্ত মেনে নিতে পারে না ভূমিপুত্রদের কাছে বারংবার পরাজয়। আর তাদের হয়ে বীরগাথা রচনা করে চলে কবিশ্রেষ্ঠ সন্ধ্যাকর নন্দী। তার কাব্যে আগ্রাসী পালরাজাই সঠিক, আর ভূমিপুত্র কৈবর্তরা ধিকৃত। এইভাবে বিকৃত হয়ে যাবে ইতিহাস। কেউ জানবে না ভূমিপুত্ররা যে যুদ্ধ লড়ছে, সেটাই ন্যায়যুদ্ধ। বরেন্দির মাটি ছুঁয়ে বয়ে চলে যে বাতাস, আর ভূমিপুত্র কৈবর্তদের রক্তে পুষ্টির আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে যায় যে বাতাস, তারা এক এবং অভিন্ন।

কিন্তু ইতিহাস অন্যরূপ হবে।

ইতিহাস বিকৃত হবে।

কারণ ইতিহাসের রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দীদের মতো মানুষ, যারা  আগ্রাসী পালরাজা আর সহযোগী আঠারো সামন্তের অন্নভোগী।
তাহলে কোনোদিন ভূমিপুত্রদের উত্তরাধিকারী কেউ কি কোনোদিন জানবে না তাদের পিতৃপুরুষের গৌরবের ইতিহাস?
জানবে।

সেই জন্যই তো দাসজন্মের শৃঙ্খল দুমড়ে-মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে মাতৃভূমিতে ফিরে আসছে কৈবর্ত-কবি পপীপ। সেই জন্যই তো পুঁথি, ভূর্জপত্র, খাগের কলম আর ভূষামাটি-লাক্ষার কালি ফেলে কবি পপীপ চলে যুদ্ধযাত্রায়।
   

০১. জন্মমাটির বুকে আবার

মাটি কী তাকে আর চিনতে পারছে না!

আর কত হাঁটবে সে! সে তো হেঁটেই চলেছে অবিরাম। গত কয়েকটি দিন একনাগাড়ে হাঁটছে সে। কিন্তু যেখানে পৌঁছুলে তার মন বলে দেবে আর কোনো ভয় নেই, সে এখন পৌঁছে গেছে তার নিজের মাটির নিরাপদ আশ্রয়ে, মনে হচ্ছে, সেখানে পৌঁছুতে তার এখনো অনেক পথ হাঁটা বাকি। বাধ্য হয়ে সে পথের দূরত্ব আর দিন গণনা করা ছেড়ে দিয়েছে।  তাই কতদিন ধরে হাঁটছে এখন আর সেই দণ্ডগণনা-প্রহরগণনা তার মনে নেই।

পিতা বট্যপ তাকে পালাতে বলেছিল। পলায়ন মানেই সবসময় হার স্বীকার করা নয়। কখনো কখনো পলায়ন অন্য রকম তাৎপর্য নিয়ে উপস্থিত হয়। তার এই পলায়ন মানে মুক্তি। কোথায় যাবে সে? কোনদিকে যাবে সে পালিয়ে? কোনো পথই তো সে চেনে না। ঊর্ণাবতীর কাছে তিন বছর ছিল সে। তারপর রামশর্মা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে নিজের ইক্ষু সাম্রাজ্যে। যে লিখিত দানপত্র ছিল ঊর্ণাবতীর কাছে, সেটি চুরি হয়ে গিয়েছিল। ঊর্ণাবতীর কোনো দাবিই তাই শেষ পর্যন্ত আর টেকেনি। তাছাড়া মল্ল সংবাদ পাঠিয়েছিল ঊর্ণাবতীর কাছে। লোক পাঠিয়েছিল, যাদের সঙ্গে ঊর্ণাবতী পালিয়ে চলে যেতে পারবে তার বাঞ্ছিত পুরুষের কাছে। দেবদাসীর কলুষময় জীবন থেকে মুক্তিলাভ করে সে চাইছিল তার প্রেমিকের কাছে চলে যেতে মুক্ত জীবনের দিকে। তাই সে পপীপকে তার পিতার কাছে পাঠিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেছে। নিজে সে মল্লর কাছে যেতে চায়। পপীপকে ফেলে যেতে মন চায়নি। কিন্তু মল্ল যাদের পাঠিয়েছিল ঊর্ণাবতীকে বরেন্দিতে নিয়ে যাবার জন্য, তারা সম্মত হয়নি পপীপকে সঙ্গে নিতে। কারণ তারা যে পরিকল্পনা করে এসেছে, সেই পরিকল্পনায় সামান্য ত্র“টি হলেও সেটা নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার আশংকা। তাদের পথ-পরিকল্পনায় পপীপের কোনো স্থান নেই। তাই পপীপকে ফিরে যেতে হয়েছিল রামশর্মার ইক্ষু-সাম্রাজ্যে। পপীপের মনে হয়েছিল তার আর শিক্ষাগ্রহণ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এবার সেখানে এসে সে পেল বাসুবুড়োকে। বাসুবুড়ো হলো তার বাসুখুড়ো। মল্লকাকা যা কিছু শেখানো বাকি রেখে গিয়েছিল, তা সে শিখেছিল বাসুখুড়োর কাছে। বাসুখুড়ো খুবই বুড়ো হয়ে পড়েছিল তখনই। কিন্তু তার ছিল জীবনব্যাপী সংগ্রাম আর সাধনার নির্যাস। সেই নির্যাস সে দিয়েছে পপীপের হাতে তুলে। তাই গুরু বলতে পপীপ আজ মল্লকাকাকে ভাবে না, গুরুমা বলতে ঊর্ণাবতীকেও ভাবে না, তার কাছে গুরু এখন বাসুখুড়ো। ঊর্ণাবতীর কাছ থেকে চলে আসার পরে আর ইক্ষু-উদ্যানের সীমানার বাইরে পা রাখার তেমন সুযোগ পায়নি পপীপ। তাদের প্রভু রামশর্মার বিশাল দিগন্তছোঁয়া ইক্ষুক্ষেতের চৌহদ্দির বাহিরে তার পা পড়েছে তো কেবলমাত্র কামরূপের বীথিগুলিতে। সাপ্তাহিক হট্টদিনগুলিতে(হাটের দিনে) সেখানে ভিনদেশী সার্থবাহ আর শ্রেষ্ঠীরা আসে ইক্ষু কিনতে। কখনো কাঁধে বোঝা নিয়ে, কখনো মোষের গাড়িতে সেই বিথীগুলিতে ইক্ষু পৌঁছে দেওয়া, দেশী-বিদেশী মানুষ দেখা, নান রকম পণ্যসামগ্রীর দিকে অর্থহীন তাকিয়ে থাকা, তারপর হাটের কাজ শেষে প্রভুর নির্দেশে আবার তাদের জন্য নির্ধারিত ঝুপড়িতে ফিরে আসাÑ এই-ই তার সীমারেখা। এইটুকু ভিন্ন পৃথিবীর আর কোনো অংশে কোনোদিন পা ফেলেনি সে। রামশর্মার ইক্ষুতেই তার মতো সকল ক্রীতদাসের পৃথিবী। এত বিশাল ইক্ষুতে! রামশর্মা আস্ফালন করে বলে ‘ইক্ষু-সাম্রাজ্য’। যখন সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে গেল পপীপের পলায়ন-বিষয়ে, তখন পথের সন্ধানের জন্য সে আকুল উৎকণ্ঠা প্রকাশ করলে বাসুখুড়ো তাকে বলেছে সূর্যের দিকে মুখ করে এগিয়ে যেতে। নিজের মাটিতে পা না পড়া পর্যন্ত এগিয়ে যেতে।
নিজের মাটিকে সে চিনবে কেমন করে?

তাকে যখন নিজের মাটি থেকে তুলে নিয়ে কামরূপে রামশর্মার ইক্ষুক্ষেতে ক্রীতদাসত্ব করতে পাঠানো হয়, তখন তার শৈশব। কাঁচা শৈশব। সেগুলি এত এত বছর আগের কথা যে শরতের মেঘের মতো আবছা কোনো শৈশব-দৃশ্যও তার মনে পড়তে চায় না। তারপর কেটে গেছে আঠারোটি বৎসর। আঠারোটি সৌর বৎসর! এতদিন পরে নিজের মৃত্যুশয্যায় শুয়ে গুরু বাসুখুড়ো এবং পিতা বট্যপ তাকে বলেছে তার নিজের মাটিতে চলে যেতে। পালিয়ে যেতে। আমরণ ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার এছাড়া আর কোনো পথ নেই। একথা তো তারা সবাই জানে। কিন্তু তার পলায়নের উদ্দেশ্য ভিন্ন। তাকে পালিয়ে যেতে বলার পেছনে রয়েছে বাসুখুড়োর অন্য উদ্দেশ্য। পপীপকে এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে যোগ দিতে হবে ভীম কৈবর্তের সাথে।  কিন্তু খুড়ো নিজে পালায়নি। পিতা বট্যপও পালায়নি। বলেছে তাদের মতো বৃদ্ধদের আর দরকার নেই বরেন্দির। দরকার পপীপের মতো যুবকদের। তাই তাকে একাই বেরিয়ে পড়তে হবে।

কোন পাথেয় সঙ্গে নিয়ে যাবে সে?

তার বুক আর মাথায় কাঁপা কাঁপা আঙুল ছুঁইয়ে বাসুখুড়ো বলেছিলÑ তোকে যে বিদ্যা দিয়েছে মল্ল, যে সারতা দিয়েছে, বর্ণমালা পাঠের সমতা দিয়েছে, ঊর্ণাবতী তোকে যে শাস্ত্রপাঠ শিখিয়েছে, আর আমি দিয়েছি জীবনের যে পাঠ- সেগুলোই তোর পাথেয়। প্রতিকূল পৃথিবীতে সেগুলোই তোর প্রতিরোধের আয়ুধ। আর নিজের মানুষদের জন্য সেগুলোই তোর সবচেয়ে বড় উপহার-প্রতিদান।

নিজের দেশ চিনব কেমন করে?

বাসুখুড়ো আশ্বাস দিয়েছিল- তোকে কষ্ট করে চিনতে হবে না। নিজের মাটিতে পা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটিই চিনে নেবে তোকে।

সেই থেকে সে হাঁটছে। বাসুখুড়োর চিতায় আগুন দেবার আগেই সে বেরিয়ে পড়েছিল। বাসুখুড়ো বলেছিল তার আত্মা আর আশীর্বাদ পপীপের সঙ্গে সঙ্গে যাবে। পপীপের বুকের মধ্যে নিঃশ্বাস হয়ে গুরুর আত্মা তার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে যাবে নিজের মাটিতে। পপীপ সেখানে তার শেষ নিঃশ্বাসটুকু পৌঁছে দিতে পারলেই গুরুর আত্মা চিরশান্তি লাভ করবে।

বাবার আশীর্বাণী আর গুরুর আত্মাকে বুকে নিয়ে পপীপ হেঁটে চলেছে।

পালানোর সময় প্রথম ল্য ছিল দাসপ্রভু রামশর্মার সীমানা থেকে যত দূরে সম্ভব সরে যাওয়া। দাসপ্রভুর বাড়ানো হাত তাকে যেন ছুঁতে না পারে। এখন কামরূপের দাসপ্রভুরা খুবই সতর্ক। অনেকদিন ধরেই পালিয়ে যাচ্ছে আত্মবিক্রিত কৈবর্তরা। তারা জেনে গেছে যে, তাদের বরেন্দি এখন আবার কৈবর্তদের নিজেদের বরেন্দি হয়ে গেছে। একবার কোনোক্রমে পালিয়ে পুণ্ড্র-বরেন্দির সীমায় পা রাখতে পারলে আর ভয় নেই। এখন আর পালরাজাদের সৈনিক বা রাজপুরুষরা নেই, যারা পালিয়ে আসা কৈবর্তদের ধরে ধরে আবার কামরূপে ফেরত পাঠাবে। তাই কৈবর্তদের পালিয়ে যাওয়ার সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেয়েছে, দাসপ্রভুদের প্রহরাও তত বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে কামরূপের রাজপুরুষরা। কোনো দাসপ্রভু যদি রাজপুরুষদের জানায় যে তার দাস পালিয়ে গেছে, তাহলে তাকে পুনরায় ধরে আনার জন্য শিকারী কুকুরের মতো পথে নামে রাজপুরুষরা। কেউ কেউ পুনরায় ধৃত হয়। তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তার পূর্বতন প্রভুর কাছে। তখন তাদের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়, তা দেখে অনেক কৈবর্ত-দাসই নিজের মন থেকে পালিয়ে যাওয়ার সংকল্প ঝেড়ে-মুছে বের করে দেয়। তারপরেও পপীপ পালিয়েছে রামশর্মার ইক্ষু-উদ্যান থেকে। তারপর পথে পথে ভয়। তার তো কোনোমতেই ধরা পড়া চলবে না। সেই কারণেই বেশি সাবধানী পপীপ। দিনের আলোতে তাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে কোনো জঙ্গলে, ঝোপে বা বুনোপশুর খোঁদলে। লুকানোর মতো কোনো জায়গা তাকে খুঁজে বের করতে হয়েছে প্রত্যুষের আগেই। ধলপহর মানেই আলো ফুটে ওঠা আর মানুষের মুখোমুখি পড়ে যাওয়ার আশংকা। তাই পপীপ পথ চলেছে শুধু রাতের অন্ধকারে। রাতের বেলা তস্করের ভয়, বাঘ-সাপ-বুনোমোষের ভয় কামরূপের পথে-প্রান্তরে। কিন্তু এসব ভীতি পপীপকে স্পর্শ করেনি। তার ভয় ছিল মানুষকে। ভূমিপুত্রদের নয়, পুরবাসী মানুষকে ভয়। ভয় সংস্কৃত জানা নিজেদের সুসভ্য দাবি করা মানুষকে। ভিনদেশ থেকে এসে এই সুসভ্য মানুষরাই ভূমিপুত্রদের জমি-জনপদ কেড়ে নেয়, সুসভ্য মানুষরাই অন্য মানুষদের দাস বানায়, বন্দি করে রাখে, মাত্র কয়েক কার্ষাপণ মুদ্রার বিনিময়ে কিনে নেয় মানুষের দেহ, আত্মা আর উত্তরপুরুষকে। সেই মনুষ্যভক সুসভ্য মানুষদের দৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যই পপীপের দিনের পর দিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে লুকিয়ে পড়া, আর রাতের আঁধারে পথ চলা।   

গত দুইদিন আগে বিশাল একটি নদী পাড়ি দিয়েছে সে। বাবা বলেছিল, কামরূপ আর তাদের কট্টলি-বরেন্দি-পুন্ড্রর মাঝের সীমানায় রয়েছে কূল দেখতে না পাওয়া বিশাল একটি নদী। সেই নদীর এই পারে কামরূপ, ঐ পারে পুণ্ড্রবর্ধন। তারপরে বারো দিনের পথ পেরুলে তাদের নিজের মাটি। তাদের বরেন্দি। পপীপ বুঝতে পারছে না যে নদীটা সে পেরিয়ে এসেছে, সেটাই সেই নদী কি না। তবে এটুকু অন্তত নিশ্চিত যে সে এখন দাসপ্রভুর আয়ত্ত থেকে অনেকটাই দূরে। চাইলেই রামশর্মার লোকেরা এখন অতি সহজে তার নাগাল পাবে না। এখন তার মধ্যে পুনরায় ধৃত হবার ভীতি অনেকটা কমে এসেছে। সে এখন তাই দিনের বেলাতেও পথ চলতে শুরু করেছে। দিনের আলো ছাড়া নদী পার হওয়া তার পে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কোনো মাঝি রাতের অন্ধকারে এই উত্তাল নদী পেরুতে চায়নি। বাধ্য হয়ে পপীপকে স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি পাড়ানির কড়ি গুণতে হয়েছে। হাতে পুরো একটি রৌপ্য দ্রম্ম আর দশটি কার্ষাপণ নিয়ে তবেই একজন জেলেনৌকার মাঝি তাকে নদী পার করে দিয়েছে রাতের অন্ধকারে। মাঝিকে সে বারংবার জিজ্ঞেস করেছে এই নদীর নাম কী। মাঝি বলেছে নদীর নাম ত্রিস্রোতা। ওপারের জনপদটির নাম বলেছে কোটিবর্ষ। বরেন্দি কতদূর? মাঝি উত্তর দিয়েছে সে জানে না। কোনোদিন সে বরেন্দিতে যায়নি। তবে তার আরোহী বরেন্দিতে যেতে চাইলে ঠিক পথেই এগুচ্ছে। কারণ বরেন্দি যাওয়ার জন্য অনেক শ্রেষ্ঠী তার এই নৌকাতেই নদী পার হয়েছে। তবে বরেন্দি এখান থেকে ঠিক কত দূরে, বা কয়দিনের পথ পেরুলে বরেন্দিতে পৌঁছানো যায়, তা সে জানে না। তাকে পাড়ে নামিয়ে দেবার সময় মাঝি মৃদুকণ্ঠে শুধিয়েছিল- তুমি কি বিক্রি হওয়া মানুষ? কামরূপের ইুতে থেকে পালিয়েছ। লয়?

    একটু ইতস্তত করে পপীপ স্বীকার করেছেÑ হ্যাঁ।
    তুমি কি বরেন্দির কৈবর্ত?
    হ্যাঁ।
    মাঝি তাকে বলেছেÑ ওলান ঠাকুর তুমাক রা করুক!
    আবেগে-কৃতজ্ঞতায় পপীপের গলা বুঁজে এসেছিল। সে প্রশ্ন করেছিল- তুমিও কি কৈবর্ত?
    না, আমরা কোচ।

বাসুখুড়ো জানিয়েছিল কৈবর্তদের মতো কোচ আর পোদ-রাও এই মাটির আদি সন্তান। কাজেই মাঝির এই আশীর্বাদ আসলে  এক ভূমিপুত্রের জন্য আরেক ভূমিপুত্রের শুভকামনা।

    তারপরে আবার হাঁটা। এখন সে দিনের বেলাতেও পথ চলছে। আজ সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয়েছে তার পথচলা। কিন্তু বেলা যত বাড়ছে, ততই তার মনে হচ্ছে রাত্রিকালে পথচলাই বেশি ভালো ছিল। রোদের এমন ভয়ঙ্কর তীব্রতা সে কখনো কল্পনাই করতে পারেনি। সূর্য মাথার ওপর পৌঁছুতে না পৌঁছুতেই মাটি থেকে গরম ভাপ বেরুতে শুরু করেছে। গেরুয়া রঙের মাটি প্রতিমুহূর্তে আরো গনগনে আর নিষ্করুণ হয়ে উঠছে। পায়ের নিচে যেন মাটি নয়, কামারের নেহাই। সে এসে পড়েছে আদিগন্তবিস্তৃত বিশাল এক মালভূমির মাঝখানে। যেদিকে যদ্দুর তাকানো যায় কোনো মানুষ চোখে পড়ে না, কোনো বৃ চোখে পড়ে না, কোনো ঝোপ চোখে পড়ে না, কোনো সরোবর চোখে পড়ে না, কোনো সবুজ চোখে পড়ে না, এমনকি অন্য কোনো প্রাণীও চোখে পড়ে না। পপীপ অসহায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। নিচ থেকে আগুন ছুঁড়ে মারা গেরুয়া মাটি, আর মাথার ওপরের আগুনছিটানো জ্বলন্ত সূর্য তাকে দিশেহারা করে ফেলে। পলায়নমুহূর্ত থেকে সে সবসময় মনে মনে কামনা করেছে বরেন্দিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত কেউ যেন তাকে দেখতে না পায়। সে-ও কোনো মানুষের অবয়ব দেখতে চায়নি পারতপ।ে অথচ এখন এই ভয়াবহ নির্জনতা তার সমস্ত সত্তাকে অবশ-বিবশ করে ফেলছে। মাথা থেকে, কপাল থেকে, চিবুক থেকে ঘাম ঝরছে বর্ষার জলের মতো অনর্গল। কিন্তু ঘামের বিন্দু মাটিতে পড়ামাত্র মাটি তাকে শুষে নিচ্ছে নিমেষে। এমনকি মাটিতে ঘামের ফোঁটা পড়ার দাগটি পর্যন্ত টিকে থাকতে পারছে না কয়েক মুহূর্তের বেশি। এই ব্যাপারটি খেয়াল করে সে ভীত হয়ে পড়ে। এই মাটির সঙ্গে কি তাহলে জলের বৈরিতা রয়েছে? জলের কথা মনে আসামাত্র তার অনেক আগে থেকেই জেগে ওঠা তৃষ্ণাবোধ আরো প্রচণ্ড আরো অসহনীয় হয়ে ওঠে। তার নিজের সঙ্গে কোনো জল নেই। সে জলসন্ধানে আকুল হয়ে দেক্ষিণ-বামে, সামনে-পেছনে তাকায়। কিন্তু যতদূর দৃষ্টি চলে, জল বা জলজ কোনোকিছুর সন্ধান মেলে না; দেখা যায় শুধু তাপতরঙ্গের নাচানাচি। সেই তাপতরঙ্গ আকাশের সূর্য থেকে পায়ের নিচের গেরুয়া মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত। সে মেঘজীবনের মতো আকুল হয়ে মেঘসন্ধানের প্রত্যাশায় আকাশের দিকে তাকায়। মুহূর্তে তার চোখের পাতা এবং ভুঁরুসমেত পুরো চুগোলক ঝলসে যায়। সূর্যের চোখে চোখ পড়েছে। সে অন্ধ হয়ে পড়ে কিছুণের জন্য। কোনো কিছু না দেখে ধাপ ফেলতে গিয়ে হোঁচট খায় এবরোথেবরো মাটিতে। পড়ে যায় হুমড়ি খেয়ে। গরম চুলির মতো মাটির স্পর্শ পাওয়ামাত্র সমস্ত শরীর ছ্যাঁৎ করে ওঠে। এতই গরম মাটির স্পর্শ যে মনে হয় তাকে একটি ফুটন্ত শর্ষপ তেলের কড়াইতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আর সেই মুহূর্তে সে বুকের মধ্যে একটি অচেনা হীমশীতল অনুভূতির বয়ে যাওয়া টের পায়। সেই অনুভূতির নাম মৃত্যুভীতি। সেই অনুভূতিই তাকে আবার দুই পায়ের ওপর নিজেকে তুলে ধরানোর শক্তি যোগায়। না! সে নিজের মাটিতে পা না রাখা পর্যন্ত মরবে না! কিছুতেই না!

    দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল সে। মস্তিষ্ককে আবার নিজের বশে আনার চেষ্টা করে প্রাণপণ। সূর্যের আলোতে নিজের ছায়াকে খোঁজে মাটিতে। ছায়া দেখে ফের মনে মনে ঠিক করে নেয় নিজের গন্তব্যের দিক-নির্দেশনা। তারপর আবার চলতে শুরু করে একটার পর একটা ধাপ ফেলে।

    কিছুণ পরেই তার অন্য সমস্ত বোধ লোপ পেয়ে যায়। রোদের অনুভূতি থাকে না, গরমের অনুভূতি থাকে না, ব্যথার অনুভূতি থাকে না, জলতৃষ্ণার অনুভূতিও নয়। বাসুখুড়োর আত্মা বুকের মধ্যে বসে তার সাথে অবিরাম কথা বলে চলে। বাসুখুড়োর আত্মাই তাকে এখন পথ দেখাচ্ছে, তাকে পথ চলার বিন্দু বিন্দু শক্তি যোগাচ্ছে। এক ধাপ, এইবার আরেক ধাপ, আবার বাম পা, এইবার দণি পা, এইবার আরেকটি ধাপ... এবার পরের ধাপ... তারপর আরেক ধাপ...

    মাটিতে কীসের যেন ছায়া পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে ওঠে পপীপ। কীসের ছায়া হতে পারে! সূর্যের কি ছায়া পড়ে? আকাশের? এতণের নিঃসঙ্গ পথচলার মাঝে একটি ছায়ার হঠাৎ উপস্থিতি তার আচ্ছন্ন চেতনাকে বড়সড় একটা ধাক্কা দেয়। সে সূর্যকে এড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। বিশাল একটা শকুন। ঠিক তার মাথার উপর। সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে উড়ে চলেছে তার সঙ্গে সঙ্গে। শকুনের কুৎসিত দুই লাল চোখে লালসা। কিন্তু পপীপ এখন ভয়-ভীতির উর্ধ্বে পৌঁছে গেছে। এই নির্জন দুপুরের গনগনে রোদঢালা মালভূমিতে মাথার ওপর শকুনের অবিচল ছায়া যে মৃত্যুর প্রতীক, একথা সবাই জানে। কিন্তু পপীপ ভয় পায় না একবিন্দুও। বুকের মধ্যে বসে গুরুর আত্মা তাকে পথনির্দেশ দিয়ে চলে। মনে মনে ভেবে নেয় বাসুখুড়ো সামনে সামনে হেঁটে তাকে পথ দেখাচ্ছে। সেই বাসুখুড়োর অদৃশ্য নির্দেশ শিরোধার্য করে সে এগিয়ে চলেÑ এক ধাপ... এরপর আরেক ধাপ... আরেক ধাপ...

    তারপরে, অনেক অনেক পরে, যেন একটি পুরো মানবজীবনের শেষে, যখন সে চোখ মেলে আবার, দেখতে পায় তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে আরেকটি অস্পষ্ট মুখ। প্রথমেই মনে জাগে শকুনটার কথা। কিন্তু না, শকুন নয়। তার ওপরে ঝুঁকে থাকা মুখটিকে মানুষের মুখ বলেই মনে হচ্ছে। একবার মনে হয় এটি বোধহয় তার গুরু বাসুখুড়োর মুখ। সেই একই রকম কালোপাথরে কুঁদে বানানো এদিক-ওদিক ছুটে যাওয়া নদীরেখার মতো অজস্র বলিরেখা আঁকা মুখ, ধূসর ভুঁরু, সাদায়-ধূসরে মেলানো একমুখ অযত্ন দাড়ি, দুই কোণে রক্তজমা বড় বড় দু’টি চোখ যেখানে টলটল করে বেদনা, ফোলা ফোলা মোটা দুই ঠোঁট। আর সেই রকমই শীর্ণ একটি শরীর।

    পপীপ একটু অবাক হয়। বাসুখুড়ো এখানে কেন? কেমন করে এল! গুরুর আত্মা কি তার সঙ্গে সঙ্গে এতদূর চলে এসে পুনরায় দেহধারণ করেছে?  এবার মনে মনে একটু সমস্যাতেই পড়ে যায় পপীপ। গুরুর আত্মাকে এতদূর বয়ে নিয়ে এসেছে সে, কিন্তু এখন হাত-পা-ধড়-মুণ্ডুসহ পুরো একজন মানুষকে কীভাবে সে বুকের মধ্যে পুরে নেবে! আবার তার একটু অভিমানও হয়। গুরু যদি দেহধারণ করলই, তাহলে এত দেরিতে করল কেন? সে যে গত কয়েকটি দিন একা একা এত পথ এত বিপদ পাড়ি দিয়ে এই পর্যন্ত এসে পৌঁছুল, শুরু থেকেই দু’জন একসঙ্গে চললে তাকে নিশ্চয়ই একাকিত্বের দুঃসহ কষ্টটুকু অন্তত সইতে হতো না। তারা পথে পথে বিপদে-আপদে তাৎণিক পরামর্শ করে চলতে পারত। বিশেষ করে তার সেই রোদ-তাপদাহময় মালভূমির অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বারবার মনে পড়ে। গুরু নিশ্চয়ই এই পথের সুলুক-সন্ধান সব জানে। সে নিশ্চয়ই বিকল্প কোনো পথের সন্ধান তাকে জানিয়ে দিতে পারত। অথবা এই মরুপ্রায় মালভূমি পেরুতে হলেও মনে করিয়ে দিতে পারত যে মালভূমি পাড়ি দেবার আগে সঙ্গে অন্তত উপযুক্ত পরিমাণে জল সঙ্গে নিতে হবে।

গুরুর প্রতি তার এই অভিমান অবশ্য কয়েক মুহূর্তের বেশি স্থায়ী হয় না।  গুরু একে অনেক বুড়ো, তার ওপর চিররোগী। তার পে সেই দেহ নিয়ে এমন দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল না একেবারেই। সে নিজে পরিশ্রমী পেশল শরীরের যুবক হওয়া সত্ত্বেও রৌদ্রতাপের সন্ত্রাসী আগ্রাসনে মরতে বসেছিল প্রায়। রৌদ্রতাপের কথায় তার মনে আবার সেই অবর্ণনীয় তৃষ্ণার স্মৃতি জেগে ওঠে। এবং সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের প্রত্যেক প্রকোষ্ঠে তৃষ্ণার অনুভূতি ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার। যেভাবে মানুষ স্নানশেষে পরনের ভেজা কপনি চিপে জল ঝরায়, সেইভাবে মোচড়াতে থাকে তার বুক। গুরু বাসুখুড়ো কি বুঝতে পারছে না জলকষ্টে তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে? শরীরে রোদ-সূর্য-লালমাটির তাপদাহের কামড় এখন আর টের পাচ্ছে না পপীপ। সূর্য হয়তো এখন কোনো মেঘের আড়ালে রয়েছে, তাই চোখও ঝলসে যাচ্ছে না আগের মতো। তবু এই মসৃণ আলোর মধ্যেও হঠাৎ করে তার চোখদু’টি আবার আঁধার হতে শুরু করলে সে অচেতনায় তলিয়ে যাওয়ার আগে কোনোক্রমে তার মুখের ওপর ঝুঁকে থাকা মুখটির কাছে আকুল নিবেদন জানাতে পারে- জল!

    জলের অমৃতস্পর্শ তাকে অতলে তলিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রা করে। সে টের পায় তার ঠোঁট, তার জিভ, মুর্ধ্বা, তালু, কণ্ঠনালী জলস্পর্শের জীবনদায়ী অনুভূতিতে ক্রমান্বয়ে শান্ত ও পুনর্জীবিত হয়ে উঠছে। আহ কী শান্তি! নতুন জীবন যেন বরাভয় নিয়ে বিন্দু বিন্দু করে হেঁটে যাচ্ছে তার দেহের প্রতিটি লোমকূপের দিকে। সে আবার চোখ খুলতে পারে।

এবার তার দৃষ্টিতে প্রথম ধরা পড়ে শিরাবহুল একটি হাত এবং সেই হাতে ধরে রাখা একটি ঝিনুক। ঝিনুক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঢেলে দেওয়া হচ্ছে তার ঠোঁটের ফাঁকে। সে নিজের অজান্তেই মাথা তুলে বড় হা করে মুখ এগিয়ে দেয় ঝিনুক ধরা হাতটির দিকে। কিন্তু দূরে সরে যায় ঝিনুক ধরা হাত। পপীপের চোখের ওপর তখন কৃতজ্ঞতার অশ্রুর একটি পাতলা প্রলেপ পড়েছে। সেই প্রলেপের নিচ থেকে সে ঝাপসা হয়ে আসা গুরুর মুখের দিকে তাকায় অনুযোগের দৃষ্টিতে। বাসুখুড়ো কেন সরিয়ে নিচ্ছে জলের ঝিনুক! সে নিজের ঘাড় এবং মাথাকে শক্ত করে উঁচুতে ধরে রাখতে পারে না বেশিণ। তার মাথা ফের নিচে নেমে এসে ভূমিলগ্ন হয়। তখন আবার সে ঠোঁটে অনুভব করে জলস্পর্শ। তার মুখে আবার ফোঁটায় ফোঁটায় ঢেলে দেওয়া হচ্ছে জলবিন্দু। এবার অনেকণ ধরে নিরন্তর চলে তার জলপ্রাপ্তি। ধাতস্থ হয়ে ওঠে পপীপ। সাড়া ফিরে পায় হাতে-পায়ে এবং সমস্ত শরীরে। বামহাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ পরিষ্কার করে এই প্রথম পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার মুখের ওপর ঝুঁকে থাকা অবয়বটির দিকে। ডাকেÑ বাসুখুড়ো!

    এবং তৎণাৎ-ই সে বুঝতে পারে জলদাতা মানুষটি তার গুরু বাসুখুড়ো নয়। কিন্তু প্রায় তার মতোই দেখতে আরেকজন মানুষ। মস্তিষ্কের এই আধো-জাগরিত অবস্থাতেও পপীপ বুঝে ফেলে, এই মানুষটি তার নিজের জাতিরই মানুষ। সেই জাতিÑ যে জাতির রক্ত বয়ে চলেছে তার বাবার শিরা-উপশিরাতে, তার গুরু বাসুখুড়োর দেহে, যে রক্ত বয়ে চলেছে তার নিজের দেহে। সে কি তাহলে পৌঁছে গেছে তার নিজের গাঁয়ের মানুষের কাছে? পৌঁছে গেছে তার নিজের মাটিতে? তার বরেন্দিতে? কট্টলিতে? উত্তেজনায় ধড়ফড় করে উঠে বসে পপীপ। তার সামনে বসে থাকা মানুষটির কালোপাথরকোঁদা মুখটিতে আবছা খুশির আলো খেলে যায়। সে জিজ্ঞেস করে- তুই কে রে বাপ্?

আমি কিবাত! নিঃসংশয়ে নির্ভয়ে উত্তর দেয় পপীপ।
কুথা থেকে আসছিস বটি?
কামরূপ থেকে। আমি বরেন্দি যাব।
প্রৌঢ়ের মুখে তাকে আশ্বস্ত করার হাসি- তুই এখন বরেন্দির মাটিতেই আছিস রে বাপ।
এতণ চিত হয়ে শুয়ে ছিল পপীপ। এবার সে উবু হয়ে শোয়। মুখ আর কপাল ঠেকায় বরেন্দির মাটিতে। প্রণাম হে জন্মভূমি!
আর মাটিও যেন তাকে জলদাতা বৃদ্ধের মতো বরাভয় দেয়- হ্যাঁ হ্যাঁ তুই এখন বরেন্দিতেই আছিস!

০২. ভাষাই আপন করে

একই মানুষ। কিন্তু জায়গাভেদে কত আলাদা! দুই জায়গাতে পুরোপুরিই দুই রকম। কামরূপে রামশর্মার ইক্ষুক্ষেতে অনেক কৈবর্ত। শত শত। হাজার হাজারও হতে পারে। কিন্তু তারা সবাই সেখানে দাস। আর এখানে নিজের দেশে নিজের মাটিতে তারা স্বাধীন কৈবর্ত জাতির মানুষ। কামরূপে কৈবর্তরা থাকে পুত্তলিকার মতো প্রাণহীন হয়ে। যেদিন তারা আত্মবিক্রয়পত্রে আঙুলের ছাপ দেয়, সেদিন থেকে তারা তাদের সমস্ত হাসি-গান-প্রাণচাঞ্চল্যও সমর্পণ করে দাসপ্রভুর ইচ্ছার কাছে। তারা হয়তো তিনবেলা খেতে পায়। দাসপ্রভু নিজের স্বার্থেই তাদের তিনবেলা খেতে দেয়। কেননা দাস অভুক্ত থেকে গেলে শরীরের শক্তি হারায়। তখন তাকে দিয়ে প্রয়োজনমতো কাজ করানো যায় না। আবার দাসের মৃত্যু হলে সে তো পুরোপুরি মুক্তই হয়ে যায়। দাসের মরণে বৈষয়িক তি হয় দাসপ্রভুর। তাই তাদের নিয়ম করে তিনবেলা খেতে দেওয়া হয়। এখানে অনেক মানুষ হয়তো তিনবেলা খেতে পায় না, কারো কারো একটার বেশি দু’টি কপিন নাই, শিশুদের পরনে প্রায় কিছুই থাকে না। তবু তাদের হাসি কী প্রাণখোলা বাধাহীন! যুবতীদের শরীরে সুন্দর কাপাসবস্ত্র নাই, কণ্ঠিমালা নাই, কর্ণোৎপল নাই, হাতের আঙুলে কারুয়া(আংটি) নাই; আছে হয়তোবা শুধু একজোড়া মেটে হাঁসুলি, কানের পেছনে গোঁজা হয়তো শুধু করঞ্জের ফুল, কাঁকই পড়ে না চুলে, তবু তারা কত প্রাণবন্ত! এখানে এসেই প্রথম যেন সত্যিকারের কৈবর্ত যুবতী দেখতে পেল পপীপ। যুবক-যুবতীর মধ্যে কী যেন একটা জিনিস থাকতে হয়! তাকে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সেটি না থাকলে বয়সের যৌবন থাকলেও আসল যৌবন থাকে না। তার নাম কী স্বাধীনতা! নিজের জীবনকে নিজের বলে মনে করার অধিকার! এখানে সধবা নারীদের চলনে কী অসাধারণ গোপন গর্ব! তাদের সিঁথির সিঁদুর তো শুধু তাদের বৈবাহিক চিহ্ন নয়, তাদের জাতির সম্ভাবনারও প্রতীক। নিজের অজান্তেই শ্লোক উঠে আসে কবি পপীপের ঠোঁটে-

বন্ধনভাজোহমুষ্যা শ্চিকুরকলাপস্য মুক্তমালস্য
সিন্দূরিতসীমন্তচ্ছলেন হৃদয়ং বিদীর্ণমেব।।
(এই নারীর মুক্তমালায় আবদ্ধ কেশপাশ যেন সীমন্তের সিঁদুররেখায় বিদীর্ণহৃদয় হয়েছে।)

    পপীপ যেখানে শুয়ে আছে, তার থেকে একটু দূরে উঠোনে বসে কাজ করছে একটি যুবতী। যুবতী কাজ করছে, আর কাজের ফাঁকে ফঁকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে পপীপের দিকে। শ্লোকমগ্ন পপীপ লই করেনি যে সে-ও তাকিয়ে রয়েছে যুবতীর দিকেই। সে যে যুবতীর দিকে তাকিয়ে শ্লোকটি মনে মনে উচ্চারণ করছে, তার এই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার জন্যই হয়তো মেয়েটির কপোলে ডালিম ফুলের লালিমা ফুটে উঠছে। মেয়েটি তার দিকে পপীপকে এত দীর্ঘ সময় ধরে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছে। যে কোনো যুবতীর ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটবে হয়তোবা। মেয়েটি উঠোনে বসে ধানের আটি বাঁধছে খড় দিয়ে। তার পাশে তার চেয়ে একটু কম বয়সের এক তরুণী। হয়তো তার বোন।  ছোট মেয়েটিও ল করেছে তার বোনের দিকে পপীপের একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার ঘটনাটি। সে সকৌতুকে ঠেলা মারে বোনকে। তারপর দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়ে।

    এবার সচকিত হয় পপীপ। আরে, সে এইভাবে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে তো মেয়েরা অন্য অর্থ করে নেবেই! সে একটু লজ্জিত হয়েই দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। তখন আসতে দেখে তার নতুন জীবনদাতাকে। হড়জন। এই গাঁয়ের মোড়ল। হড়জন এসে বসে তার পাশে। সস্নেহ হাত রাখে তার কাঁধেÑ এখন কি তোর শরীলে কষ্ট আছে রে বাপ?

    স্মিত হেসে উত্তর দেয় পপীপ- না বাবা, আমার কোনো কষ্ট নেই।
    শরীলে বল ফিরে পেয়েছিস আগের মতোন?
    হ্যাঁ পেয়েছি।
    তুই তো কৈবর্ত জাতির মানুষ। কিন্তু কথা বলিস বেদী(বেদ পাঠকারী হিন্দু) আর নিগ্গন্থদের(বৌদ্ধ ও জৈন পণ্ডিত) মতোন। কোথায় শিখলি বটি এমন ভাষা?
    মল্লকাকা, ঊর্ণাবতী, বাসুখুড়োর মুখ ভেসে ওঠে তখন পপীপের মনে। কিন্তু সে কোনো উত্তর দেবার আগেই আবার প্রশ্ন আসেÑ তুই কি কৈবর্তদের ভাষা বলতে পারিস না?
কে বলেছে পারি না! এই যে বলছি বটি!

পপীপ বাক্যটি শেষ করামাত্র, সে এবং প্রৌঢ়, দু’জনেই হেসে ওঠে হো হো করে। তাদের হাসি শুনে উঠোনের মেয়েদুটি চমকে উঠে একবার তাদের দিকে তাকায়, তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করে তাদের হাসির কারণ, তারপর আবার নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

হাসি শেষ হলে অনেকটা সময় কেউ কোনো কথা বলে না। কিছুণ পরে পপীপ আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে- এখন বরেন্দির মানুষ কেমন আছে কাকা?

তৃপ্তি এবং প্রশান্তির হাসি হড়জনের মুখে- মোদের দেবতা ফিরে এসেছে হে। এখন আমরা খুব ভালো আছি। ওলান ঠাকুর দেবতা ফিরে এসেছিল দিব্যোকের রূপ নিয়ে। তারপরে রুদোকের রূপে। আর এখন আছে ভীম। দেবতা কৈবর্তের বরেন্দি কৈবর্তের হাতে ফিরত দিয়েছে বটি। কৈবর্তের নিজের মাটি এখন আবার কৈবর্তের। এই বন এই আকাশ এই বাতাস এই নদী এই লালমাটিÑ সব এখন আবার কৈবর্তের লিজের। হাজার বছর পরে আবার ফিরে এসেছে বটি কট্টলির সুখের দিন, কৈবর্তের সুখের দিন। এখন রাজার উৎপাত নাই, রাজপুরুষের উৎপাত নাই, বেদী-নিগ্গন্তের উৎপাত নাই, গাঁও কেড়ে নিয়ে মন্দির-মঠ বানানোর উৎপাত নাই। আমরা এখন নদী সেঁচে মাছ আনি, জঙ্গল টুকে টুকে মধু আনি কাঠ আনি শিকার আনি, মাঠে মাঠে মুগ-মসুর-শর্ষে ফলাই। আর ধান ফলাই। কত রকম ধান! ওগরা আছে, শালি ধান আছে, তারপর আছে অঞ্জনলী, আগুনবান, আন্ধারকুলি, আমপাবন, আমলো, আসতির, ককচি, কনকচূড়, গুজুরা, গোহোম, কামরঙ, কোটা, খড়কি, কেসুরকেলী, কৈজুড়ি, ছায়ারত্ন, ছিছরা, গুয়াথুপী, গয়াবালি, চন্দনসাল, কোঙরভোগ, জলরাঙ্গি। যা ফলাই, তার আটভাগের একভাগ দিয়ে দেই ভীমের ভাণ্ডারে। বাকি সব মোদের।
বিড়বিড় করে পপীপÑ তাহলে বরেন্দি এখন সত্যিকারের কৈবর্তদের দেশ। নিজের গ্লানি ধুয়ে-মুছে বরেন্দি এখন আবার কৈবর্তজাতির শুদ্ধ মাতা। তার গায়ে শ্বাপদের নখ যেন আর কখনোই থাবা বসাতে না পারে, তার জন্য এই দেশটাকে এইভাবে চিরদিন স্বাধীন রাখতে হবে। ভীমের পাশে দাঁড়াতে হবে। বাসুখুড়ো সেই জন্যই এখানে আসতে বলেছে আমাকে।
পপীপের বুকের মধ্যে বসে আবার কথা বলতে থাকে বাসুখুড়ো- “তখন কট্টলি একা। একা একাই বরেন্দি বানিয়েছে সে। বরেন্দির লালমাটি তৈরি করা হয়েছে, সূর্যের তাপ থেকে সেই লালমাটিকে রার জন্য তৈরি করা হয়েছে গাছ-পাল-ঝোপ-ঝাড়-বন-জঙ্গল। লালমাটির বরেন্দির পা ধুইয়ে দেবার জন্য তৈরি করা হয়েছে নদ-নদী। সেই নদ-নদীতে কত জলচর, সেই বনে-জঙ্গলে কত বনচর! কিন্তু কট্টলির মনে হয়, এখনো তার সৃষ্টি সম্পূর্ণ হয়নি। বরেন্দিকে তার কেমন যেন শূন্য শূন্য মনে হয়। পট আঁকা শেষ করে পটুয়ার যেমন মনে হয় কোথায় কোথায় যেন রং দেওয়া হয়নি ঠিক মতো, সেই রকম কট্টলিরও মনে হচ্ছে কী যেন একটা কাজ করে ওঠা হয়নি! কী যেন করে ওঠা হয়নি! কিন্তু সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না খামতিটা কোথায়। সে তখন সূর্যকে ডাকেÑ আমার এই বরেন্দি-সৃজন পুরো হচ্ছে না কেন? তুমি সকল দেবতার দৃষ্টিদায়ক দেবতা। তুমি আমাকে বুঝিয়ে দাও কোথায় আমার কমতি। তুমি দয়া করে আমার সৃষ্টিকে পূর্ণতা দাও।

সূর্য বলে- তাহলে তোমাকে রজঃস্বলা হতে হবে। মিলিত হতে হবে আমার সাথে। তবে তারও আগে তপস্যায় তুষ্ট করতে হবে আমাকে।

নিজের এত সাধের সৃষ্টিকে পূর্ণতা দিতে কট্টলি যে কোনো শর্তেই সম্মত। তার রজঃ আসে। পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লালমাটিতে। লালমাটির চাইতেও লাল তার রণ। আর ঝরছে তো ঝরছেই। সেই ঝোরা লালমাটিতে স্রোত হয়ে বইতে শুরু করল। সেই স্রোত নদী হয়ে নামল। সেই নদীর নাম হলো লালনদী। সেই লালনদীতে স্নান করে কট্টলি তাকিয়ে রইল সূর্যের দিকে। দিনের পর দিন এইভাবে কেটে গেল সূর্যপূজায়। অনেক অনেকদিন পরে তার পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে নেমে এল সূর্য।

সেদিন হঠাৎ আকাশজুড়ে বজ্রপাত। শোঁ শোঁ কলজে-কাঁপানো শব্দ। আকাশ থেকে নেমে আসছে বিশাল একটি পাখি। কী বিশাল সেই পাখি! তার ডানায় ঢাকা পড়ে গেছে পুরো আকাশ। তার পাখার ঝাপটায় কেঁপে কেঁপে উঠছে পুরো পৃথিবী। পাখার ঝাপটায় নদী উঠে আসতে চাইছে ডাঙায়। কিন্তু কট্টলি নির্বিকার, ভয়ডরহীন। বরং তার মুখে ফুটে উঠেছে অপোসমাপ্তির হাসি। শরীরে নৃত্যহিল্লোল তুলে কট্টলি স্বাগত জানাল সেই পাখিকে। কট্টলির দিকে বর্শাফলকের মতো ধেয়ে এল পাখি। কট্টোলি তৎণাৎ রূপ নিল রূপসী এক পণিীর। শুরু হলো উড়ে উড়ে লুকোচুরি খেলা। বিশাল পাখি তাকে ধরার জন্য তাড়া করে, আর কট্টলি খিলখিল করে হাসতে হাসতে পাশ কাটিয়ে উড়ে যায়। এই লুকোচুরি খেলা আসলে প্রেমের আগের পূর্বরাগ। সঙ্গমের আগের শীৎকার। এইভাবে উড়ে উড়ে সারা আকাশটাকে সাতবার প্রদণি করে কট্টলি অবশেষে ধরা দিল রাজপাখির বাহুবন্ধনে। এবার শুরু হলো শৃঙ্গার। আলিঙ্গনে জাপ্টাজাপ্টি আর দুজনের নিঃশ্বাসের হল্কায় মাটিতে নুয়ে পড়ছিল আকাশছোঁয়া মহীরুহগুলি। অনন্ত সময় ধরে শৃঙ্গারের পরে পূর্ণ মিলন। সৃষ্টির অমোঘ প্রক্রিয়া। সময়ের নিয়মে দুটি ডিম পাড়ল কট্টলি। সেই ডিম ফুটে বের হয়ে এল একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। হাম্মা আর হাম্মি। প্রথম কৈবর্ত নর-নারী। সূর্য আর কট্টলির সন্তান। কট্টলি তাদের জন্যই বানিয়েছে এই দেশ। এই বরেন্দি। বরেন্দির আরেক নাম কট্টলি। মায়ের নামে নাম।”
হড়জন জিজ্ঞেস করে- তোর গাঁয়ের নাম কী রে বাপ?
দেদ্দাপুর।
সে তো অনেক দূর!
সেই গাঁয়ে কে কে আছে তোর?
গাঁয়ের কথা উঠতেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে পপীপ। উত্তর দেওয়া হয় না হড়জনের কথার।
কিছুণ অপো করে নিজেই আবার প্রশ্ন করে হড়জনÑ সেখানে তোর বাবা-মা আছে?
বাবা কামরূপে। রামশর্মার ইক্ষুক্ষেতে কাজ করে।
আর মা?
মায়ের তো সেই গাঁয়েই থাকার কথা। যদি বেঁচে থাকে এতদিন।

চোখের কোণে নুন জমে বোধকরি চোখ জ্বালা করে ওঠে। যে বয়সে তাকে মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন তার কোনো স্মৃতি জমাট বেঁধে ওঠারই সময় হয়নি। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মনে হয় সে এখন তার মায়ের চেহারা, তার মায়ের শরীরের মা মা গন্ধ, তার মায়ের  আদরের স্পর্শ, এমনকি তার মাতৃগর্ভে থাকার সময়ের অনুভূতিগুলি পর্যন্ত মনে করতে পারছে। সেইসব স্মৃতি এখন একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার মনের ওপর। জন্ম-জন্মান্তরের স্মৃতি নুনজল হয়ে বেরুচ্ছে তার চোখের পাতার বাধা অতিক্রম করে।
তাহলে তো তোর মাকে খুঁজতে যাওয়া দরকার বাপ!

কিন্তু হড়জন এটাও জানে, এখনই পপীপের পে এই আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়া সম্ভব নয়। মালভূমির তাপদাহ তার শরীরে অসংখ্য ত সৃষ্টি করে দিয়েছে। এখন সবেমাত্র তার চিকিৎসা-শুশ্রƒষা শুরু হয়েছে। বীভৎসভাবে পুড়ে যাওয়া মুখে দেওয়া হয়েছে চন্দনের প্রলেপ। গায়ের চামড়াতে জায়গায় জায়গায় ছোট-বড় ফোস্কা। সেসবে ভেষজ লাগানো হয়েছে। পায়ের তলা ফেটে গেছে, রক্ত ঝরছে একটু নড়াচড়া করলেই। তার পায়ের তলায় পুরু করে লেপে দেওয়া দূর্বাঘাসের ঘন ক্বাথ। কতদিন যে লাগবে তার সুস্থ হয়ে উঠতে!

হড়জন সান্ত্বনা দেয়- বেশিদিন লাগবে না বাবা! ওঝা তোকে যা যা নিদান দিয়ে গেছে কয়দিনের মধ্যেই তুই নিজের পায়ে খাড়া হয়ে যাবি। আর তোর সেবা করছে যে, সে কিন্তু যে সে মানুষ লয়! তার হাতে জাদু আছে!
সে কে?

ঐ যে কুরমি! উঠোনে কাজে ব্যস্ত বড় মেয়েটির দিকে আঙুল তুলে দেখায় হড়জন। তার চোখে রীতিমতো গর্বের ছাপ।
কুরমি এখন ধানের আটি বাঁধার কাজ শেষ করে বারান্দার এক কোণে বসে ঝুড়ি বুনছে একমনে। কিন্তু তার একটা কান বোধহয় এদিকের কথা শোনার জন্যই পেতে রাখা আছে। কেননা হড়জন তার নাম উচ্চারণ করার সাথে সাথে একবার সে মুখ তুলে তাকায় এদিকে আর তখন আরেকবার চোখাচোখি হয় পপীপের সাথে। মনে মনে কুঁকড়ে যায় পপীপ। হড়জন বলার পরে তারও মনে পড়েছে তার চেহারা না জানি এখন কী বিশ্রি দেখাচ্ছে! এবং আশ্চর্য যে এই প্রথম পপীপের মনে হয় তার আরো একটি সত্তা রয়েছে। সেই সত্তাটির নাম যুবকত্ব। সেই সত্তার নিজস্ব কিছু ধর্ম এবং চাহিদা রয়েছে। অনেক সময় তার প্রাবল্য এতই বেশি হয় যে সে তখন তার অধিকারীকে বাধ্য করে অন্য সত্তা-প্রতিজ্ঞা-উদ্দেশ্য স্থগিত রেখে কেবলমাত্র তার চাওয়াকে পূর্ণ করতে। সেই যৌবনত্বের সত্তা রামশর্মার ইক্ষু-উদ্যানের ক্রীতদাসপুত্র পপীপের মনে জেগে ওঠার অবকাশই পায়নি কোনোদিন। তাছাড়া প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রমের পরে ছিল বাসুখুড়োর কাছে বিদ্যাশিক্ষার কাজ। সেই কাজটিকে সবচেয়ে বড় ধর্মকাজ হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছিল পপীপ। তাই তার বয়সী অন্যদের বিয়ে হতে দেখেও কোনোদিন সে বিষয়ে চিন্তা পর্যন্ত করেনি পপীপ। অনেক যুবক দাসেরও বিয়ে হয়েছে গোলগোমী মেয়েদের সাথে। তার মতো  দাসদের বিয়ে হতে দেখেও পপীপের মনের মধ্যে কোনোদিন একটি নারীকে নিজের জন্য পাওয়ার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠতে পারেনি। তারপরে বাসুখুড়ো তাকে যে বিশাল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে শিখিয়েছে, সেই দায়িত্বই তার কাছে পরম কর্তব্য হিসাবে বিবেচিত হওয়ায় অন্য কোনো চিন্তা তার মনের মধ্যে ঢোকারই সুযোগ পায়নি। কিন্তু পরিবেশের কী অসম্ভব প্রভাব মানুষের জীবনে! বাসুখুড়ো বলেছিল সে যা শিখিয়েছে পপীপকে তার বাইরে আরো অনেক সত্য আছে মানুষের জীবনে। সে যে জীবন দেখেছে, তার বাইরেও অনেক রকম জীবন আছে পৃথিবীতে। সেগুলি সময়মতো জীবনই তাকে শিখিয়ে দেবে। সেই অনেক সত্যের একটি কি আজ তার সামনে উদ্ভাসিত হচ্ছে? তা নাহলে একটি তরুণীর সামনে নিজের রোদে ঝলসে যাওয়া বিকৃত চেহারা নিয়ে লজ্জা পাচ্ছে কেন পপীপ?

বাসুখুড়ো বলেছিল, তোকে যে আয়ুধ আমরা দিয়ে যাচ্ছি সেই সম্পদ কৈবর্তদের মধ্যে কারো নেই। কৈবর্তদের সমস্ত দুর্বলতার কারণ এটাই। এই আয়ুধের জোরেই ভিনদেশী বেদীজ্ঞানী পশুর রাখালরা এসে আমাদের ভূমি আমাদের মানুষ আমাদের সম্পদ হরণ করে নিচ্ছে। সেই অস্ত্রের নাম বর্ণমালা। এই বর্ণমালা দিয়েই ওরা একপুরুষের অর্জিত সব জ্ঞান তুলে দিয়ে যেতে পারে পরের প্রজন্মের হাতে। ওদের অর্জিত জ্ঞানের কণামাত্র অংশও হারায় না। উত্তরপুরুষের সঙ্গে পূর্বপুরুষের জ্ঞান যুক্ত হয়ে তাদের শক্তি আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলে তাদের মনে হয় অজেয়। তাদেরকে প্রতিহত করতে হলে কৈবর্তদেরও দরকার সেই একই অস্ত্র। মল্লকাকা, বাসুখুড়োরা দেবালয় থেকে আগুন চুরি করে আনার মতো আত্মসাৎ করেছিল এই বর্ণমালার জ্ঞান। তা তারা তুলে দিয়েছে পপীপের হাতে। দিব্যোক কৈবর্তদের নিজেদের বরেন্দি নিজেদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার ধরে রাখতে হলে ভীমের বাহুবলের সাথে যুক্ত হতে হবে পপীপের এই শক্তি। সেই কারণেই তাকে এখানে পাঠানো। এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কর্তব্য আর দায়িত্বের কথা ভোলেনি পপীপ। সে কি এখন এক অজানা অনুভূতির প্রভাবে বিচ্যুত হবে তার দায়িত্ব থেকে! জাতির প্রতি তার কর্তব্য থেকে!

নিজের মধ্যে কুরমি কিংবা নিজের যৌন-যুবক সত্তার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে পপীপ।

তার সামনে একটি ছায়া পড়ে। চোখ তুলে তাকায় পপীপ। কুরমি দাঁড়িয়েছে তার সামনে এসে। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই কুরমি কবিরাজের ভঙ্গিতে বলেÑ সুরুয চড়ে গেছে মাথার উপর। এই তাপে তোমার আর আঙিনাতে থাকা চলবে না। উঠো, ঘরে চলো!

পপীপ কাতরকণ্ঠে জানতে চায়- আর কতদিন লাগবে আমার আগের বল ফিরে পেতে?
কুরমি নিচের ঠোঁট কামড়ে বোধহয় মনে মনে গণনা করে। তারপরে বলেÑ ওঝা বলেছে অনেকদিন।
শুনেই চমকে ওঠে পপীপ। তারপর নিজেই হেসে ফেলে। তার মনে পড়ে, তারা কৈবর্তরা, দুইয়ের বেশি সংখ্যা গণনা করতে জানে না। তাদের কাছে দুইয়ের বেশি হলেই তা অনেক। তারা গোণেÑ এক... দুই... অনেক...
সেই ‘অনেক’ নিশ্চয়ই সংস্কৃত আর বেদজানা মানুষের ‘অনেক’-এর সমান হবে না!  

০৩. সে কোন অচেনা আমি ছিলাম নিজের গহনে

সূর্য সাতবার ওঠে; সাতবার অস্ত যায়।
এবার মনে মনে একটু তটস্থ হয়ে ওঠে পপীপ। এ যে সত্যি সত্যিই অনেকদিন পেরিয়ে যাচ্ছে। তবে আশার কথা এটাই যে তার শরীরের হারানো শক্তি প্রায় পুরোটাই ফিরে এসেছে। হাত ও বুকের যে অংশটুকু নিজের দৃষ্টিসীমায় আসে, সেখানকার তগুলি প্রায় সবই মিলিয়ে গেছে। পায়ের পাতা খরায় কামড়ে-ধরা মাটির মতো ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিল, নিটোল পাতার পরিবর্তে দেখা যাচ্ছিল এঁকেবেঁকে ছুটে চলা নদীর মতো অসংখ্য তরেখা। এখন সেগুলি বুঁজে এসেছে প্রায়। পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে দাঁড়ালে কিংবা হাঁটলে এখন আর বিদ্যুতের মতো ঝিলকে ওঠে না অসহ্য বেদনা। শুধু বোঝা যায় না তার নিজের মুখের অবস্থা এখন কেমন। কেননা নিজে সে নিজের মুখ দেখতে পায় না। কিন্তু মনে মনে ভাবে বোধহয় বীভৎস দাগগুলি মিলিয়ে যায়নি এখনো। তাই কুরমি সামনে এলেই নিজের কুৎসিত মুখের কথা কল্পনা করে সংকুচিত হয়ে পড়ে পপীপ। অথচ কুরমির মধ্যে কোনো ভাবান্তর চোখে পড়ে না। দিনে-রাতে অন্তত পাঁচবার তার কাছে আসে কুরমি। দুইবার আসে খাবার নিয়ে আর তিনবার আসে  দূর্বাঘাসের রস এবং চন্দনবাটা নিয়ে। সহজাত সেবিকার দতা ও মমতা নিয়ে ওষুধ মাখায় তার তগুলিতে। মুখের তগুলিকে কেমন দেখাচ্ছে এই প্রশ্ন করলেই সে হেসে বরাভয় যোগায়- এই তো সেরে আসছে!
কিন্তু পপীপের যে পুরো প্রতীতি জন্মেনি তার কথায় এটাও সে বুঝতে পারে।
নিজের চোখে দেখতে চাও?

কীভাবে দেখবে পপীপ। নিজের মুখ দেখতে হলে তাকে তো যেতে হবে পুকুর কিংবা কোনো জলাশয়ের পারে। জলে বিম্বিত না হলে কীভাবে নিজের মুখ দেখতে পারে মানুষ! এখানে তো ঊর্ণাবতীর ঘরের মতো কোনো দর্পণ নেই।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় কুরমি। একটু পরেই ফিরে আসে। তার হাতে ঝকঝকে মাজা একটা পেতলের থালা। সেই থালা মেলে ধরে সে পপীপের চোখের সামনে। খুব ভয়ে ভয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায় পপীপ। নাহ খুব বিশ্রি দেখাচ্ছে না তো! নিজেকে দেখতে অনেকদিন পরে তার ভালোই লাগে।

কুরমি চোখে যেন স্নেহ নিয়ে দেখছে পপীপের নিজেকে দেখার প্রতিক্রিয়া। এবার সে হাতে তুলে নেয় কাঁকইÑ দাঁড়াও তোমার চুল পাট পাট করে দি। কতদিন চুলে কাঁকই পড়েনি!

ছোট বাচ্চাকে চুল আঁচড়ে দেবার মতো করে একহাতে থুতনি ধরে পপীপের মুখটিকে উঁচু করে কুরমি। মুখ তুলতে গিয়ে পপীপের চোখ আটকে যায় কুরমির বুকে। একটাই শাটিকায়(একহাত মাপের চওড়া কাপড় জোড়া দিয়ে দিয়ে তৈরি শাড়ি) ঢাকা কুরমির শরীর। হাঁটুর উপর থেকে শুরু হয়ে কাঁধের ওপরে গিয়ে পিঠ থেকে বুকের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে শেষ হয়েছে শাটিকার দশতি(আঁচল)। বুকে আলাদা কোনো স্তনবন্ধনী নেই। কুরমির উজ্জ্বল কালো পাতলা ত্বকের নিচ দিয়ে কোনো কোনো শিরাপথে রক্তের ছুটে চলা স্পষ্ট বোঝা যায়। কুরমির শরীরের ডানপাশটা প্রায় পুরোই দেখতে পায় পপীপ। তার বক্ররেখার মতো কোমরের ত্বক এত মসৃণ যে সেখানে হাত বুলানোর লোভ নিজের অজান্তেই জেগে ওঠে পপীপের মনে। হরিণ ছুটতে ছুটতে পুরো ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনের দিকে তাকালে তার শরীর, মুখ, গ্রীবা নিয়ে যেমন রেখার সৃষ্টি হয়, কুরমির কোমরের বাঁক সেই রকম মনোহর লাগে পপীপের চোখে। ঈষৎ উঁচু হয়ে থাকা তার বুকের সর্বশেষ অস্থির সমান্তরালে ছুটে চলা একটি অস্পষ্ট শিরার ধুকপুকানি টের পাওয়া যায়। সেখানে কানপাতার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে পপীপের মন। নিজেকে অসম্ভব ইচ্ছাশক্তির বলে নিয়ন্ত্রণ করে চলে সে। এই সময় হঠাৎ যেন পৃথিবীতে ভূকম্পন ঘটে! ভালো করে চুল আঁচড়ানোর জন্য একটু নড়ে উঠেছে কুরমি। সাথে সাথে দুলে উঠেছে তার ডান স্তন। হয়তো বাম স্তনও। কিন্তু পপীপের পুরো চোখ জুড়ে এখন কুরমির ডান স্তন। পাকা গাবফলের সাথে পলিমাটি মিশিয়ে যেন রং করা হয়েছে কুরমির স্তনের। তার গঠন স্পর্শহীন কদমফুলের মতো নিটোল। এত সুন্দর কোনো দৃশ্য কী এর আগে দুইচোখে দেখেছে কখনো পপীপ! তার পৃথিবী দুলে দুলে উঠছে।

নিজেকে আর সামলাতে পারে না পপীপ। এমনভাবে মুখ গোঁজে কুরমির ডানস্তনে যেন তার মুখ থুবড়ে পড়েছে সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় কুরমির কাঁকই ধরা হাত। শক্ত হয়ে ওঠে কুরমির শরীর। কিন্তু একটু পরেই ঢিল পড়ে শরীরে। সে দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ। ঠেলে সরিয়ে দেয় না পপীপের মুখ, কিংবা সরে যায় না নিজেও। আবার সাড়াও দেয় না পাগলের মতো তার স্তনে মুখ ঘষে চলা পপীপের দেহকামনায়। কিছুণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সে। যেন অপো করে পপীপের উন্মাদনা থিতিয়ে আসার। তারপর আলতো করে হাত রাখে পপীপের মাথায়। তার হাতের ছোঁয়ায় নিষেধের আভাস টের পায় পপীপ। সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় সে। করঞ্জ ফুলের মতো রক্তজমা দুই চোখ তুলে তাকায় কুরমির চোখে। কুরমির চোখে কোনো রাগ নেই, ভর্ৎসনা নেই, আবার প্রশ্রয়ও নেই। সে নিচু অকম্প্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেÑ তোমার মেয়েমানুষ নাই?

এদিক-ওদিক মাথা ঝাঁকায় পপীপ। তারপর আবার আঁকড়ে ধরতে চায় কুরমিকে। এবার দুইহাতে তাকে একটু ঠেলে দেয় কুরমি। মুখে বলেÑ আমি মানকুর বউ হবো। বাবা আর মানকুর বাবা কথা কয়ে রেখেছে। সামনের ফাগুয়ায় আমাদের বিয়া।
তারপর খুব ধীর অচঞ্চল পায়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। পেছনে রেখে যায় অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকা পপীপকে।



 [চলবে]

বাংলাদেশ সময় ২২০০, জানুয়ারি, ৮, ২০১১

সু চির অস্বীকার: রোহিঙ্গারা বললেন ‘মিথ্যুক’
সোলায়মানের পদত্যাগ নিয়ে জামায়াতে তোলপাড়
রাজশাহীর মধ্য শহর থেকে বাস টার্মিনাল সরবে আগামী বছর
স্মার্ট রেফ্রিজারেটরের বিজ্ঞাপনে মাশরাফি
নেপিদোতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সেনাপ্রধানদের বৈঠক


এবার রাজ্যসভায়ও পাস হলো ‘বিতর্কিত’ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল
আগুনের সূত্রপাত ‘গ্যাস রুমে’, নেভাতে গিয়েই দগ্ধ শ্রমিকরা
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন মেয়র আতিকুল
মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট কোর্টে, শুনানি বৃহস্পতিবার
চট্টগ্রামে বিজয় স্তম্ভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হবে