কনভার্শান ডিজঅর্ডার

একটি শিশুর অন্ধ হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনী

5145 | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton
চার বছর পেরিয়েছে ছেলেটির বয়স। বাবা মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। তবে অল্প বয়সী মা তার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যান নি। দৈনন্দিন দুঃখ-অভাব-আনন্দ নিয়েই দিন কাটছিল। সময়ের পথ চলায় মা-ছেলের ভেতরে গড়ে উঠলো এক অন্য জগৎ। ‘অন্তর জগত’। দুজনই যেন দুজনের দিন-রাত, জীবন ঘড়ি।


ঢাকা: চার বছর পেরিয়েছে ছেলেটির বয়স। বাবা মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। তবে অল্প বয়সী মা তার শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে যান নি। দৈনন্দিন দুঃখ-অভাব-আনন্দ নিয়েই দিন কাটছিল।

সময়ের পথ চলায় মা-ছেলের ভেতরে গড়ে উঠলো এক অন্য জগৎ। ‘অন্তর জগত’। দুজনই যেন দুজনের দিন-রাত, জীবন ঘড়ি।

ধরে নেই, ছেলেটির নাম ‘অন্তর’। আর মা ‘মেদেনী’।

একদিন মেদেনীর শ্বশুর-শ্বাশুড়ি তার মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে। জানায়, মেদেনীরতো বয়স বেশি হয় নি। এভাবে আর কতদিন? শুধু ছেলেকে নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেবে? বরং আবার বিয়ের ব্যবস্থা করুন।

মেদেনীর মা-বাবাও প্রস্তাবটি খারাপ চোখে দেখেন নি। দুই পরিবারের সিদ্ধান্তের বিষয়টি মেদেনীকে জানানো হলো। মেদেনী প্রথমে আপত্তি জানালেও পরবর্তীতে রাজি হয়। তবে একটি কথা বারবার মনে নাড়া দিতে থাকে ‘অন্তরের কী হবে?’
 
মেদেনীর শ্বশুর-শাশুড়ি এবং বাবা-মা দায়িত্ব নিতে চান। বলেন, ওকে নিয়ে তোমার ভাবার কি আছে? আমরা সবাইতো ওর জন্য আছিই। আর তুমিও তো আছো। ভালো পরিবার এবং ছেলে দেখে বিয়ে দিলে সেটাতেও কোনো সমস্যা হবে না।

সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, এবার শুধু ভালো একটা সম্বন্ধ খোঁজা। বিপত্তিটা হলো তখনই। অন্তর হঠাৎ অন্ধ হয়ে গেলো।

বলা নেই! কওয়া নেই! সে  আর চোখে দেখতে পাচ্ছে না, দুই চোখই অন্ধ। ওদিকে আবার বিয়ের কথাও চলতে থাকলো। কিন্তু মেদেনী আর সেসবে মন দিতে পারছিলো না। তাই বিয়ের বিষয়টি স্থগিত রেখে আপাতত চিকিৎসার বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া হলো। প্রথমে স্থানীয় ডাক্তার, তারপর সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ সব জায়গায় একই কথা। অন্তরের চোখে তো তেমন কোনো সমস্যা নেই।

মেদেনী আরো অস্থির হয়ে উঠলো চোখে কোনো সমস্যা নেই তবে, দেখতে পাচ্ছে না কেন? চিকিৎসকদের পরামর্শে অন্তুরকে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসা হলো। শিশু চিকিৎসক, চোখের ডাক্তার, ব্রেনের সিটি স্ক্যান সহ সব ধরনের ব্যাবস্থা নেয়া হলো। কিন্তু চোখে কিছু ধরা পরছে না। আবার অন্তর কিছু দেখছেও না। এক সময় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগে ভর্তি করা হলো অন্তরকে। সেখানে সব ধরনের সম্ভাব্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও কিছু ধরা না পরায় মনোরোগবিদ্যা বিভাগে স্থানান্তর করা হলো। আত্মীয়দের অনেকেই বিরক্ত হলো। ছেলেটি চোখে দেখতে পাচ্ছে না আর পাঠানো হচ্ছে মনোরোগবিদ্যা বিভাগে! কিন্তু কোনো উপায়ও নেই। যদি কোনো ভাবে ছেলেটির চোখ ভালো হয়ে যায়!

মনোরোগবিদ্যা বিভাগে আসার পরে অন্তরের সমস্ত ব্যবস্থাপত্র ভালো করে দেখা হলো। তারপর শুরু হলো সমস্যার ইতিহাস নেয়া, অর্থাৎ অ্যাসেসমেন্ট পর্ব। একটা বড় ঘর, শ্রেণীকক্ষ। সেখানে মা এবং অন্যান্য আত্মীয়দের কাছ থেকে সমস্যার বিষদ ইতিহাস শুনা হচ্ছে। অন্তরকেও এক কোণায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কেউ যেন অন্তরের দিকে লক্ষ্য না করেন।

অন্তর উঠছে, পরে যাচ্ছে, হাটতে গেলে হোঁচট খাচ্ছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে। ছেলের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হচ্ছে বলে মেদেনী অভিযোগ করেন। আত্মীয় স্বজনরাও একইভাবে বিরক্ত। চিকিৎসকরা যতই বলছেন, ওর দিকে খেয়াল করার দরকার নেই, স্বজনরা ততই বিরক্ত হচ্ছেন। যে কারণে প্রথম দিন আত্মীয় স্বজনদের ঢুকতে দিলেও পরের দিন অন্তরকে ঘরে ঢুকিয়ে অন্যদের আর ঢুকতে দেয়া হয় নি। আত্মীয় স্বজনদের আলাপ করা হয় অন্য একটি রুমে।

অন্তরকে রুমের এক কোণায় বসিয়ে রেখে যে যার কাজ করছে, কেউ ওর দিকে খেয়ালও করছে না। এভাবে আরো দু’একদিন চলে। কয়েকদিন পর অন্তর ঘরে থাকা বিভিন্ন জিনিস নড়াচড়া শুরু করলো। তবু কেউ তার দিকে খেয়াল করছে না, এমন একটা ভাব নিয়ে যে যার কাজ করে যাচ্ছে। আসল বিষয় হলো রুমের সবাই ওর দিকে না তাকালেও ওকেই খেয়াল করছে। ও কি করছে? কিভাবে করছে? অন্তরের মা যখন ওকে নিয়ে চলে যায়, তখন সেসব নিয়ে আলোচনা হয়।

একদিকে ছেলেটিকে পর্যবেক্ষণ করা, অন্যদিকে পরিবারের কাছ থেকে ইতিহাস নেয়া- ছেলের জন্মের ইতিহাস, পরিবারের ইতিহাস, বাবা-মা’র বর্তমান অবস্থা এবং বিয়ে সক্রান্ত ঘটনা সব। সমস্ত তথ্য জানা শেষ। এবার অন্তরের সঙ্গে বসার পালা। মজার বিষয় হলো, অন্তর এর মধ্যেই বেশ কয়েকবার নিজের অজান্তেই দরজা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, কোন দিকে দরজা সে সেটা বুঝে গেছে।

তুলনামূলক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক অন্তরের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রথমেই চেষ্টা করা হলো অন্তরের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও বিশ্বাস স্থাপনের। চিকিৎসা পদ্ধতি অনুযায়ী এনজিওলাইটিক অর্থাৎ চিন্তা কমানোর ওষুধ দেওয়া হলো। তারপর একে একে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলো।

বেরিয়ে আসতে থাকলো ছোট্ট অন্তরের মনে লুকিয়ে থাকা অভিমান-কষ্টের কথা। তার মুখ থেকেই জানা গেলো মাসহ অন্যদের সঙ্গে তার প্রাত্যহিক সম্পর্কের বিষয়। এরপরই বেরিয়ে আসলো আসল গল্প।

অন্তর এর মধ্যেই বুঝে গেছে মায়ের বিয়ের বিষয়টি। বিয়ে মানে, অন্যের বাড়িতে চলে যাওয়া, তার অনিশ্চিত জীবনের আশঙ্কা। তবে মায়ের সঙ্গে বিষয়গুলো আলাপ করার সাহস হয় নি অন্তরের। আবার মেনেও নিতে পারে নি বিষয়টি। তার ছোট্ট মন পরিবর্তন দেখতেও চায় নি। তাই অজান্তেই সে সব কিছু দেখা থেকে বঞ্চিত হতে চেয়েছে। ধীরে ধীরে চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়।

এক পর্যায়ে মেদেনীকে তার সামনে আনা হলো। তাকে মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি বোঝানো হলো এবং তার মনের অন্ধকার সরে যেতে থাকলো এবং সে আবার সব কিছু দেখতে শুরু করলো।

অন্তরের অন্ধ হয়ে যাওয়ার রোগটির নাম ‘কনভার্শান ডিজঅর্ডার’।

কনভার্শান ডিজঅর্ডার: ব্যাখ্যা
‘কনভার্শান’ অর্থ পরিবর্তন বা রূপান্তর। এ রোগে আক্রান্ত হলে মানসিক সমস্যা রূপান্তরিত হয়ে শারিরীক বা মানসিক যেকোনো ধরনের উপসর্গ তৈরী করতে পারে।

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, অসুখ বিষয়ে যত ধরনের সমস্যা একজন ব্যক্তির জানা থাকে, সেগুলোর যেকোনোটিই এ রোগের উপসর্গ হতে পারে। উদাহারণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ জানে রোগের কারণে খিঁচুনী হয়, অত‌এব খিঁচুনি হতে পারে। মাথা ব্যাথা, শরীরের যেকোনো স্থানে ব্যাথা, প্যারালাইসিস, অন্ধ হয়ে যাওয়া, বমি, ঘণ ঘণ প্রসাব বা পায়খানা, কোনো অঙ্গ বাঁকা হয়ে যাওয়া, শ্বাস কষ্ট, বুক ধরফর করা, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ক্রমাগত শরীর কাঁপা, যৌন সমস্যা এসবই কনভার্শান ডিজঅর্ডারের উপসর্গ হতে পারে।

মানসিক উপসর্গের ভেতরে চিন্তা, রুক্ষ মেজাজ, কান্না, ঘুমের সমস্যা, ভুলে যাওয়া, পরিচিতদের চিনতে না পারা, অস্বাভাবিক আচরণ হতে পারে। মানসিক সমস্যাটি রূপান্তরিত হয়ে কোনো ব্যক্তির জানা যেকোনো উপসর্গের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেতে পারে।

তবে উপসর্গের পেছনে যদি কোনো শারিরীক কারণ থাকে তবে সেটা ‘কনভার্শান ডিজঅর্ডার’ নয়। অর্থাৎ রোগটির উৎস অবশ্যই মানসিক হতে হবে।

মোটা দাগে বলা যায়, একজন মানুষ যতটুকু মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন তার চেয়ে বেশি চাপ হলেই এ রোগ হতে পারে। একটু বর্ণনা করা হলে আরো স্পষ্ট হতে পারে। মানুষ যখন কোনো একটি বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড চাপ বা দোদুল্যমান অবস্থার ভেতর আটকে যায়;

-    যখন মনে হয় সমস্যা থেকে উতরে যাবার আর কোনো পথ নেই।
-    কারো কাছে প্রকাশ করার মতো নয় কিংবা প্রকাশ হয়ে গেলে আরো বেশি সমস্যা হবে।

সব মিলিয়ে মনের ভেতর যখন প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব তৈরী হয় এবং সমস্যাটি আটকে যায় তখনই এ রোগ হতে পারে। এই চেপে থাকা মানসিক সমস্যার বাহিঃ প্রকাশই হলো ‘কনভার্শান ডিজঅর্ডার’। মজার বিষয় হলো রোগী নিজে সমস্যাটির বিষয় জানতে পারেন, নাও জানতে পারেন বা নাও বুঝতে পারেন। এ রোগের জন্য ব্যাক্তিকেও দায়ী করা হয়। যারা নরম স্বভাবের মানুষ বা এনজাইটি বেশি হয় তাদের এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

যাদের হয় এ রোগ
যেকোনো বয়সী মানুষেরই এ রোগ হতে পারে। স্কুলে যাওয়া বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত। তবে সাধারণত ৪০ বছর বয়সের আগেই এ রোগে বেশি হয়। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদেরই এ রোগ বেশী হয়।

উপরের গল্পের ব্যাখ্যা
সুস্থ-স্বাভাবিক ছেলেটি যখন বুঝতে পারলো তার মায়ের বিয়ে হয়ে গেলে মা অন্য বাড়ীতে চলে যাবেন। তখন সে ভাবলো, তার কি হবে? সে কোথায় যাবে? কি করবে? মাকে হারানোর ভয় তার মনে প্রচণ্ড নিরাপত্তাহীনতা ও দুঃখবোধ সৃষ্টি করে। সেভাবে এই দৃশ্য সে দেখতে পারবে না। মাকে দেখলে বা মায়ের সামনে আসলেই তার কষ্ট বেড়ে যেতো। তাই সে মাকে দেখতে চাইতো না।

সতর্কতা
এ রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে মানসিক দ্বন্দ্বটি ঠিক হয়ে না গেলে বারবার রোগটি ফিরে আসতে পারে। অনেক সময় মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরে গেলে উপসর্গ কমে আসতে পারে। কিন্তু রোগটি ভালো হয়ে গেছে বলা যাবে না। তাই সঠিক চিকিৎসা হলো মানসিক চাপ কমানো এবং সেই সঙ্গে দ্বন্দ্ব দূর করা।

অনেক সময় রোগ নির্ণয় না হওয়ার কারণে ভুল চিকিৎসা এবং ভোগান্তি বাড়তে পারে। অন্তর এবং মেদেনী এখন কেমন আছে জানি না। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাবার সময় এবং পরবর্তীতে বেশ কিছুদিন তারা ভালো ছিলো। আশা করি এখনও ভালো এবং সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে।

প্রিয় পাঠক, ‘মনোকথা’ আপনাদের পাতা। মনোরোগ নিয়ে যে কোনো মতামত ও আপনার সমস্যার কথা জানাতে পারেন আমাদের। আমরা পর্যায়ক্রমে অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে আপনাদের প্রশ্নের জবাব জানিয়ে দেবো। আপনি চাইলে গোপন রাখা হবে আপনার নাম-পরিচয় এমনি কি ঠিকানাও।

সমস্যার কথা জানানোর সঙ্গে সমস্যার বিস্তারিত বিবরণ, আপনার নাম, বয়স, কোথায় থাকেন, পারিবারিক কাঠামো এবং এজন্য কোনো চিকিৎসা নিচ্ছেন কি না এ বিষয়ে বিস্তারিত আমাদের জানান। শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই সমস্যা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা জানানো সম্ভব হবে।
 
এছাড়া মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত বা এ বিষয়ে বিশেষ যে কোনো লেখা যে কেউ পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের। 





ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব
সহযোগী অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


বাংলাদেশ সময়: ০৬৩০ ঘণ্টা, অক্টোবর ০৪, ২০১৪

৬ বছর পর কোন্দলপূর্ণ শিবগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের সম্মেলন
'লাইটিং দ্য ফায়ার অব ফ্রিডম' দেখলেন প্রধানমন্ত্রী-রেহানা
ইতালিতে করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রথম মৃত্যু
ফেনী ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের আলোকচিত্র প্রদর্শনী
মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশকালে আটক ৪ 


জাতীয় হ্যান্ডবল দলের গোলরক্ষক সোহান দুর্ঘটনায় নিহত
গ্রন্থমেলায় মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের ‘ভালোবাসার গল্প’
কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাসে অন্যরকম একুশ
চুনারুঘাট সীমান্তে ভারতীয় মুদ্রাসহ আটক ৫
শহীদদের ‘স্মৃতিচিহ্ন’ এঁকে পুরস্কার পেলো শিশুরা