php glass

বন্ডেড সুবিধার আড়ালে মেঘনা গ্রুপের ভয়ংকর অনিয়ম

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

মেঘনা গ্রুপ

walton

ঢাকা: শুল্কমুক্ত বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আড়ালে ভয়ংকর অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে মেঘনা গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ছয় কোম্পানি বন্ড লাইসেন্স নিয়ে অবাধে চালাচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে দুই কোম্পানির ১৪ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম ধরেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। ধরাছোঁয়ার বাইরে অন্য চার কোম্পানি। এছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে দেশের বিকাশমান সিমেন্টশিল্প ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে প্রতিষ্ঠানটি। মেঘনা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে কাস্টমস। ফলে নামমাত্র অডিটে খালাস পেয়েছে এই গ্রুপের আওতাধীন ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। 

কাস্টমস সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানায়, মেঘনা গ্রুপের ছয়টি কোম্পানির বন্ড লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেডের ৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস। এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে আরও চার কোটি ১০ লাখ দুই হাজার ৪৯৮ টাকার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় কোম্পানির বিরুদ্ধে। মেঘনা গ্রুপের আরেক বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান তানভির ফুড লিমিটেডে অডিট করে ১৯ লাখ ২৬ হাজার ৪৮৪ টাকার অনিয়ম পেয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। এ দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম পাওয়া গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে মেঘনা গ্রুপের বন্ড লাইসেন্সধারী অন্য চার প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সিমেন্টশিল্প খাতের একমাত্র বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ইউনিক সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অডিট চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি সম্পন্ন হয়। তবে মেঘনা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে অনিয়ম উদঘাটন না করেই প্রতিষ্ঠানটিকে অডিট থেকে খালাস দিতে বাধ্য হয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা।

ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অডিট হয় না মেঘনা গ্রুপের দুই বন্ড লাইসেন্সধারী কোম্পানি ইউনাইটেড ফাইবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও মেঘনা শিপ বিল্ডার্স অ্যান্ড ডকইয়ার্ড লিমিটেডের। ফলে কোটি কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি সহজে আড়াল করতে সক্ষম হচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। আরেক বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান তানভির পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট এর অডিট সম্পন্ন হয়। তবে মেঘনা গ্রুপের ক্ষমতার দাপটে কোনো অনিয়ম শনাক্ত না করেই তানভির পলিমারকে খালাস দেওয়া হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিশ্ববাজার থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানির পর পরিশোধন করে ‘ফ্রেশ সুগার’ নামে প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করে থাকে। তবে প্রতিষ্ঠানটি এই প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণের আড়ালে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের অপব্যবহার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি শুল্ক ফাঁকি দিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণ করেছে। এ বিষয়ে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি এনবিআরে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ১০ কোটি টাকার কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের জন্য মজুদ করে রাখা হয়েছে, যার প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস। এর মধ্যে শুল্ককর প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। এ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ মেঘনাঘাটে অবস্থিত ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় শিল্পের বিকাশে প্রণোদনার অংশ হিসেবে ২০০৭ সালে ইউনাইটেড সুগারকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়। বন্ড সুবিধায় একসঙ্গে কাঁচামাল এনে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড কমিশনারেটের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে তা পরিশোধন করার কথা। ওই সময় শর্ত দেওয়া হয়, শুল্ককর পরিশোধ করে তবেই এসব কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি শর্ত না মেনে অবৈধভাবে কাঁচামাল অপসারণ করে আসছিল। এ অভিযোগে ২০১৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড পরিদর্শন করে।

পরিদর্শনের পর বন্ডেড ওয়্যারহাউসে বন্ড রেজিস্টার অপেক্ষা দুই হাজার ৫৬৫ টন কাঁচামাল বেশি পাওয়া যায়। শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে অপসারণের জন্য এসব কাঁচামাল মজুদ করা হয়। এসব কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যার ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় চার কোটি ২৬ লাখ টাকা। প্রিভেনটিভ টিম এ নিয়ে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে কাঁচামাল অপসারণ করছে কি-না তা খতিয়ে দেখার সুপারিশ করা হয়। শুল্ককর পরিশোধ ও কাঁচামাল মজুদ বিষয়ে বন্ড কমিশনারেট থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়।

জানা গেছে, ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড ২০১৬ সালের ১০ আগস্ট চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ছয়টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে ১৪ হাজার ৫৭৭ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে। ৮ ডিসেম্বর বন্ড কমিশনারেট থেকে ছাড়পত্র (রিলিজ অর্ডার) নিয়ে কাঁচামাল অপসারণ শুরু হয়। এর মধ্যে প্রিভেনটিভ টিম বন্ডেড ওয়্যারহাউস পরিদর্শন করে দেখতে পায়, ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড শুল্ককর ফাঁকি দিতে অবৈধভাবে কাঁচামাল মজুদ করেছে। পরে এ নিয়ে শুনানি শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা বন্ড কমিশনারেট ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেডকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করে। এই অর্থদণ্ড প্রযোজ্য শুল্ককরের অতিরিক্ত হিসেবে পরিশোধ করার কথা বলা হয়। ইউনাইটেড সুগার মিলস লিমিটেড একই কায়দায় আরো বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে কি-না, এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির বন্ডিং কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বাজারে বিশৃঙ্খলা ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ভুল বুঝিয়ে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড সুবিধা নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। ভোগ্যপণের বাজারে সিন্ডিকেটের হোতা মেঘনা গ্রুপ বন্ড সুবিধাকে কেন্দ্র করে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। ফলে ভোগ্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলা ও বাজার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের নামে দেশি ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড সুবিধা কোনো বিশেষ মহল পেলে বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহকে দেশি ভোগ্যপণ্য (হোম কনজাম্পশন) উৎপাদনের জন্য বন্ড লাইসেন্স প্রদানের তাগিদ দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে গত ২০ জুন চিঠি পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১ মো. জিয়াউল হক। ওই চিঠিতে বলা হয়, অর্থনৈতিক অঞ্চলের যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভোগের জন্য দেশি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বন্ড লাইসেন্স গ্রহণ করে শুল্ককর পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করতে পারবে।

এদিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানসমূহকে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড লাইসেন্স প্রদানের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন ব্যবসায়ী নেতারা। কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের বন্ড সুবিধায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে। আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে একটি গোষ্ঠী বিদেশে অর্থপাচার করতে পারে। এতে ভোগ্যপণ্যের বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে বেকায়দায় ফেলতে একটি বিশেষ মহল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরকে ভুল বুঝিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরির নীলনকশা করছে।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সিনিয়র সহসভাপতি মুনতাকিম আশরাফ বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত, ভোগ্যপণ্যের বাজার একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে কোনো বিশেষ মহলের স্বার্থে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে বিশৃঙ্খলা কারও কাম্য নয়। আশা করছি এনবিআর অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সব কিছু পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশীয় বাজারের জন্য ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে বন্ড সুবিধা প্রদানের প্রয়োজন নেই। এতে ব্যবসায় অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এখানে সমতা অবশ্যই দরকার। এটা না হলে ভোগ্যপণ্যের বাজার মনোপলি বা একচেটিয়া হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ সময়: ১২১৬ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯
এইচএ/

ksrm
শনিবার জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাবে ছাত্রদল
ভবন থেকে পড়ে উপ-সচিবের গাড়ি চালকের মৃত্যু
কোম্পানীগঞ্জে অপহৃত স্কুলছাত্রী খাগড়াছড়ি থেকে উদ্ধার
আইজিসিসির আয়োজনে গাইলেন অদিতি মহসিন
রাস্তা খালি করতে দুই মোটরসাইকেল এসকর্ট রেখেছিলেন শামীম


‘ক্ষেপ’ বন্ধ করতে পয়েন্ট আনলো পাঠাও
আবুধাবি পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী
ভুটানকে হারালো বাংলাদেশের কিশোররা
বিখ্যাত লেখক স্টিফেন কিংয়ের জন্ম
বসুন্ধরা কিংস একাডেমি কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন যশোর