পোল্ট্রি শিল্প বাঁচাতে কিছু প্রস্তাব

| বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

walton

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৃশ্যত অভিভাবকহীন বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পকে নিয়ে দু’একটি কথা না লিখলে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। তাই নিতান্তই বিবেকের তাড়নায় দু’একটা কথা লিখছি। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান হালচাল।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৃশ্যত অভিভাবকহীন বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পকে নিয়ে দু’একটি কথা না লিখলে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। তাই নিতান্তই বিবেকের তাড়নায় দু’একটা কথা লিখছি। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান হালচাল।

সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্প এখন এক নির্মম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে কমপক্ষে ১৫০ মিলিয়ন পোল্ট্রি ভোক্তা রয়েছে। পোল্ট্রি সেক্টরে বিনিয়োগ আছে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে অন্তত ৬ মিলিয়ন (৬০ লাখ) মানুষ পোল্ট্রি শিল্পে কর্মরত আছে, ফলশ্রুতিতে এ শিল্পের উপর নির্ভর করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকানির্বাহ করছে ১ কোটিরও বেশি মানুষ। তাই পোল্ট্রি শিল্প বাংলাদেশে আমিষের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

বলা যায়, পোল্ট্রি শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশকে একটি অপ্রত্যাশিত করুন পরিণতির মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমানে যে বেহাল দশা চলছে তা আপন গতিতে চলতে থাকলে খুব শিঘ্রই অপ্রত্যাশিত সে অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে আমার আপনার তথা গোটা দেশের। সময় এসেছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করে এ শিল্পকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করার।  

বিগত ২০০৭-০৮ এর আগে বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখ পোল্ট্রি খামার ছিলো। গত দুই দশকে পোল্ট্রি শিল্পের প্রবৃদ্ধি ছিলো বছরে ২০% এর আশেপাশে। ২০০৭-০৮ সালে ব্যাপক আকারে বাংলাদেশে বার্ড ফ্লু দেখা দেয়, যার কারণে খামারিরা আর্থিকভাবে মারাত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, লোকসান হয় প্রায় ৭১৪ মিলিয়ন ইউএস ডলার (প্রায় ৫ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা)। লোকসানের ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে একে একে অনেক খামারি তাদের খামার গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। সারাদেশে বর্তমানে মাত্র ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার পোল্ট্রি খামার রয়েছে। অথচ গত বছর জুন মাসেও ছিলো ১ লাখ ১৪ হাজার এবং ডিসেম্বরে ৯৮ হাজার।

চলতি বছরের শুরুর দিকে দেশের পোল্ট্রি শিল্পে আবার বার্ড ফ্লু আক্রমণ করায় ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয় (ব্রিডারর্স এসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী)। এতে বন্ধ হয়ে যায় শত শত খামার, কর্ম হারায় অগনিত কর্মরত কর্মচারী। এহেন দারুণ নাজুক পরিস্থিতির সঙ্গে নতুন মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে পোল্ট্রি খাবার, ঔষধ ও একদিনের বাচ্চার অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। পক্ষান্তরে পোল্ট্রি ও ডিম উৎপাদনের খরচের তুলনায় কম মূল্য পাওয়ার কারণে অসহা খামারিদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে পথে বসার মত অবস্থা। প্রতিনিয়ত যে অবস্থার নির্মম শিকার হয়েছে বা হচ্ছে অগনিত খামারি।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে পোল্ট্রি উৎপাদনে মোট খরচের শতকরা ৬৫ থেকে ৭৫ ভাগ খরচ হয় শুধুমাত্র খাবারের পেছনে। সুতরাং খাবারের মূল্য কমানো বা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে সহজতর করা প্রয়োজন। পত্রপত্রিকা ও ডিজিটাল মিডিয়ার বদৌলতে জানা গেছে, গত ছয় মাসে পোল্ট্রি খাবারের দাম শতকরা ৩০ ভাগ বাড়ায় প্রতিটি ডিমে ১ দশমিক ৫০ টাকা ও প্রতিকেজি ব্রয়লারে ২৫ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে খামারিদের। অবশ্য পোল্ট্রি খাবারে কত ভাগ দাম বাড়লো আর কত টাকা লোকসান হলো সেটা সাধারণ ভোক্তাদের জানার বা বিবেচনারও বিষয় নয়। তাদের কাছে কম মূল্যে মুরগি ও ডিম খেতে পারাই বড় কথা। তবে পোল্ট্রি সেক্টরের পুরো সিস্টেমে যে খারাপ প্রভাব পড়েছে তা সহজেই সবার গোচরে এসেছে।

একদিকে হ্যাচারি মালিকেরা লোকসান গুনছে কেননা তাদের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে না, অন্যদিকে খামারিরা বাচ্চা কিনে তা পালন করার সাহস পাচ্ছে না। পরিনামে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক মুরগি খামার। ক্রমাম্বয়ে পোল্ট্রি খামার সংখ্যা এভাবে কমতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কি ঘটবে তা সহজেই অনুমেয়। একদিকে দেশের মানুষ আরো বেশি অপুষ্টিতে (বিশেষ করে আমিষের অভাবে) ভুগবে, অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পাবে অপকর্ম-সন্ত্রাস-ছিনতাই-রাহাজানি ইত্যাদি। নষ্ট হবে সমাজের ভারসাম্য, যা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।

ন্যাশনাল পোল্ট্রি ইন্ড্রাস্ট্রিজ প্রোটেকশন কাউন্সিলের সূত্র মতে, গত বছরের জুনে বাংলাদেশে প্রতিদিন পোল্ট্রি উৎপাদন হয়েছিল ১ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন কেজি, যা ডিসেম্বরে কমে নেমে আসে ১ দশমিক ৭০ মিলিয়ন কেজিতে। চলতি বছরের মার্চে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ দশমিক ৬০ মিলিয়ন কেজিতে। অন্যদিকে ডিম উৎপাদন গত বছর জুনে ছিল ২৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন (প্রতিদিন), যা ডিসেম্বরে ২৬ মিলিয়ন ও চলতি বছর মার্চে ২৩ দশমিক ৫ মিলিয়নে নেমেছে। গত নয় মাসে বাংলাদেশে পোল্ট্রি উৎপাদন গড়ে ১৮% কমেছে যা রীতিমত উদ্বেগের বিষয়।

ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অরগানাইজেশনের (ফাও) তথ্যানুযায়ী, একজন মানুষকে বছরে ৫৮ কেজি মাংস এবং ৩৬৫টি ডিম খাওয়া দরকার। যেখানে বাংলাদেশের মানুষের বছরে মাংস খাওয়া পড়ে মাত্র ১১ দশমিক ২৭ কেজি (হিসাবটি পোল্ট্রি এবং অন্য উৎস একত্রে), আর ডিম মাত্র ৩০টি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন মানুষ বছরে ৪৭টি ডিম খেয়ে থাকে, আর ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মাথাপিছু বছরে ২৩০টি ডিম খাওয়া হয়।
    
বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১,২৬৩ জন মানুষ বাস করে (২০১১ সালের বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী)। যেখানে মঙ্গোলিয়াতে বাস করে ২ জনেরও কম মানুষ। অত্যন্ত ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান শিল্প ও বাড়তি মানুষের আবাসনের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর ১% হারে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। বিষয়টা ইতিমধ্যে সরকারের গোচরীভুত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যদিও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং আমাদের মোট জমির সীমাবদ্ধতা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পরিবেশের উপর প্রভাব ও সময়ের চাহিদার উপর ভিত্তি করে বিকাশমান কিছু শিল্পের উপর গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। বিভিন্ন দিক বিবেচনায় পোল্ট্রি বাংলাদেশের জন্য মানানসই এবং উপযোগী একটি শিল্প। কেননা পোল্ট্রি বাংলাদেশের জন্য এখনো একটি সস্তা কিন্তু উন্নত আমিষের উৎস। পোল্ট্রি উৎপাদন করতে প্রয়োজন হয় মাছ বা গরুর তুলনায় কম জায়গা ও সময়, পোল্ট্রি খামার শুরু করতে অপেক্ষাকৃত কম পুঁজি প্রয়োজন হয় যা স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষেও অল্প পুঁজিতে শুরু করা সম্ভব। মাল্টি লেয়ার (ফ্লোর) খামারের মাধ্যমে অল্প জায়গায় স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক বেশি উৎপাদন করা যায় যা গরু বা মাছ চাষের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

আমেরিকাতে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এক পাউন্ড গরুর মাংস উৎপাদন করতে প্রয়োজন হয় ৪ পাউন্ড দানাদার খাবার এবং ৪ হাজার গ্যালন পানি। অন্যদিকে, এক পাউন্ড পোল্ট্রি উৎপাদনে প্রয়োজন হয় মাত্র ২ পাউন্ড দানাদার খাবার এবং মাত্র ৭৫০ গ্যালন পানি। এদিক দিয়ে গরুর তুলনায় পোল্ট্রি উৎপাদন একদিকে যেমন খরচ বাঁচায় অন্যদিকে পৃথিবীর জন্য হয় পরিবেশ বান্ধব।

পোল্ট্রি নিয়ে গবেষণায় আমরা পিছিয়ে থাকলেও, সারা বিশ্বে চলছে বিস্তর গবেষণা। আমেরিকাতে ১৯২৫ সালে যেখানে পোল্ট্রির ২ পাউন্ড ওজন হতে সময় লাগতো ১১২ দিন, একবিংশ শতাব্দীতে জিনগত, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে এখন ৭ পাউন্ড ওজন হতে সময় লাগে মাত্র ৪০ দিন।

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু প্রস্তাবনা নিচে দেওয়া হলো-

১. মানসম্পন্ন নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণা: দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন শিল্পকে স্থায়ী রূপ দিতে প্রয়োজন তার উপর নিরবিচ্ছিন্ন মানসম্পন্ন গবেষণা। বাংলাদেশের পোল্ট্রি সেক্টরকে ঘিরে মানসম্পন্ন Qualitative এবং Quantitative গবেষণার কোন বিকল্প নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কেবল রোগের প্রাদুর্ভব দেখা দিলে একটু আধটু গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্প রক্ষা পাবে বলে আমার মনে হয় না। গবেষণার মাধ্যমে কম মূল্যে দেশীয় কাঁচামাল দ্বারা উন্নত পোল্ট্রি খাবার প্রস্তুত করার কৌশল, দেশের উপযোগী কার্যকরী টিকা উদ্ভাবন ও উৎপাদন, দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই মুরগি-স্ট্রেইন উদ্ভাবন ইত্যাদি বিষয়কে মাথায় রেখে গবেষণা কাজে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পোল্ট্রি বিষয়ক গবেষণা কাজের জন্য অর্থ খরচ করার উৎকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে দেশের ভেটেরিনারি ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্টানসমূহ। গবেষণা (বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা) ছাড়া কোন দেশ উন্নত হয়েছে এমন নজির আমার জানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকল্পে অকৃপণ হস্তে অর্থ সরবরাহ করলে একদিকে যেমন উন্নত গবেষণার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সমাধান বের হয়ে আসবে অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা গবেষণা কাজের সঙ্গে একাত্বভাবে মিশে থাকবে। এতে তারা কর্মক্ষেত্রে অনেক বেশি অভিজ্ঞ হিসেবে ঢুকতে পারবে যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে জরুরি।

সূত্র মতে, বাংলাদেশ প্রতি বছর ৭ থেকে ৮ লাখ প্যারেন্ট স্টক (PS) বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। যার মূল্য ২১০-২৮০ মিলিয়ন টাকা। অথচ দেশের জন্য মানানসই প্যারেন্ট স্টক গবেষণা দ্বারা উদ্ভাবন করতে পারলে এত বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশকে দিতে হয় না। সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্টান (বিএলআরআই) ”বিএলআরআই-১” নামের একটি লেয়ার জাত উদ্ভাবন করেছে, যা বছরে ২৯২টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে এবং বাংলাদেশে বিদ্যমান রোগের মধ্যেও টিকে থাকতে সক্ষম। এটা সন্দেহাতিতভাবে একটি আশার কথা। কিন্তু এখানেই যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে স্থায়ী সমাধান হবে না। তাই এর জন্য প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণার। বেসরকারি প্রত্যেক হ্যাচারি, বড় খামার, ফিড-মিলের জন্য আলাদা গবেষণা শাখা (Research Unit অথবা Research Center) থাকা বাঞ্চনিয় এবং প্রয়োজনে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে মানসম্পন্ন গবেষণা চালানো উচিৎ।

সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গবেষণাকল্পে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে HEQEP (Higher Education Quality Enhancement Project) এর আওতায় বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছে যা এখন বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এটা একটা শুভ সূচনা, এটাকে নিরবিচ্ছিন্ন রাখা সরকারসহ সংশ্লিষ্ঠ বেসরকারী পর্যায়ের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। এক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ হতে পারে একটি উপায়। মনে রাখতে হবে দেশের বাইরের সহায়তা আমাদের জন্য অনন্তকাল থাকবে না। সার্বিকভাবে স্থায়ী একটা পোল্ট্রি গবেষণা কাঠামো তৈরি করার এটাই উপযুক্ত সময়। আমার জানা মতে পাস হওয়া প্রকল্পসমূহের মধ্যে বেশ কয়েকটি পোল্ট্রি বিষয়ক প্রকল্প রয়েছে। শুরু বিধায় বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগই হয়তো চলে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পেছনে। সুতরাং প্রাথমিকভাবে আশানুরূপ ফল না দেখতে পেলেও নিরাশার কিছু নেই।

২. ট্যাক্স এবং ব্যাংক ঋণ: পোল্ট্রি খাবারে ট্যাক্স বসালে এমনিতেই ডিম ও মুরগির দাম বেড়ে যায়। পোল্ট্রি খাবার বিশেষ করে ভুট্টা আমদানির উপর ট্যাক্স না থাকা বাঞ্চনীয়। সাথে সাথে দেশে ভুট্টা চাষে চাষীদেরকে আরো বেশি উৎসাহিত করতে হবে। চাষীদেরকে সহজ শর্তে ও সর্বনি¤œ (নাম মাত্র) সুদে ঋণ দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দেশ থাকলেও ঝুঁকি থাকায় বেশিরভাগ ব্যাংকই খামারিদেরকে ঋণ দিচ্ছে না, কিছু ব্যাংক এগিয়ে এলেও সুদের হার ১৭% পর্যন্ত যা খামারিদের কাছে অপ্রত্যাশিত। বিষয়টি বিবেচনায় এনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পোল্ট্রি খামারিদের জন্য নামে মাত্র বাৎসরিক-সুদে (৫ থেকে ৭%) ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য আলাদা বিভাগ থাকা দরকার এবং খামারিরা যাতে ব্যাংকে গিয়ে কম সময়ের মধ্যে সহজে ঋণ পেতে পারে তা নিশ্চিত করা দরকার।  

৩. মুরগি ও ডিমের দাম: সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশের মানুষকে আজ অনেক দাম দিয়ে ডিম ও মুরগি কিনতে হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ব্রয়লারের দাম ৩ থেকে ৪ গুন বেড়েছে। ক্রমেই মুরগি সাধারণ ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় এ বাড়তি দাম থেকে প্রাপ্ত টাকা খামারিদের পকেটে যাচ্ছে না। দুর্নীতিপরায়ন কিছু মধ্যস্বত্তভোগীদের দ্বারা প্রান্তিক খামারি এবং সাধারণ ক্রেতারা প্রতিনিয়ত নিস্পেশিত হচ্ছে। তাদের হাত থেকে খামারি এবং সাধারণ ভোক্তাদেরকে বাঁচাতে হবে। এজন্য মুরগি ও ডিম উৎপাদনের খরচ ও ভোক্তার ক্রয় ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দাম নিধারণের পাশাপাশি তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খামারিরা যাতে করে মধ্যস্বত্তভোগীদের ছাড়াই খুচরা ব্যবসায়ি বা ভোক্তাদের কাছে সরাসরি ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে পারে সেজন্য খামারিদের জন্য উপযোগী বাজারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনেক সময় আমরা মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ার জন্য হ্যাচারি মালিকদেরকে দোষারোপ করি। বিগত জুন-জুলাই মাসে বাংলাদেশের একটি নামকরা হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে লেয়ার বাচ্চা উৎপাদন খুব কাছ থেকে দেখার ও প্রকৃত ঘটনা জানার সুযোগ হয়েছিল। দেখেছি হ্যাচারিটি উৎপাদন খরচের থেকে ৩ থেকে ৭ টাকা কমে লেয়ার বাচ্চা বিক্রি করছে। কারণ জানতে চাইলে জানা যায়, বিক্রি কম তাই বাধ্য হয়ে কম দামে বাচ্চা ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কেননা লেয়ার বাচ্চা বেশিদিন হ্যাচারিতে রাখা যায় না। পক্ষান্তরে খামারিরা ভয় পাচ্ছে বাচ্চা কিনতে কারণ তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। বাচ্চা কিনে কিভাবে খাবার, ঔষধ ইত্যাদির টাকা জোগাড় করবে আর কত টাকা লোকসান গুনতে হবে সে চিন্তায় খামারিদের নাভিশ্বাস উঠে। তবে তাদের হারানো এ আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে সময় ক্ষেপন না করে সরকারিভাবে কার্যকরীব্যবস্থা নিতে হবে।  

৪. ঝুঁকি বীমা ও সংকটকালীন ভর্তুকি প্রদান: বাংলাদেশের বীমা কোম্পানিগুলো পোল্ট্রি শিল্প উপযোগী বীমা পলিসি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। দেশে বিদ্যমান পোল্ট্রি বিষয়ক সমিতিগুলো এ বিষয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও লবিং করতে পারে। তাছাড়া সংকটকালীন সময়ে ব্যবহারকল্পে গঠিত ফান্ড থেকে বার্ড ফ্লু’র মত অবস্থার অবতারণা হলে জরুরি প্রয়োজনে খামারিদেরকে ভর্তুকি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। খুশির বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ সরকার পোল্ট্রি শিল্পকে রক্ষার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা ইতিমধ্যে হাতে নিয়েছে। কিন্তু তা প্রকৃতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ খামারিদেরকে কোন মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি দেওয়ার কার্যকরী ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি মুরগির মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে খামারিরা রক্ষা পায়। এমনটা হলে খামারিদের মধ্যে অত্মিবিশ্বাস ফিরে আসবে।   

৫. টিকা ও এন্টিবায়োটিক: মানসম্পন্ন টিকা উৎপাদনের জন্য দেশের সংশ্লিষ্ট অনুজীব বিজ্ঞানীদেরকে নিয়ে টিকা উদ্ভাবন ও উৎপাদিত টিকার প্রোটেকটিভ লেভেল নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করে টিকার মান নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশ থেকে আমদানি করা টিকার চেয়ে দেশে বিদ্যমান জীবাণু দ্বারা দেশে উৎপাদিত টিকা অনেক বেশি কার্যকরী। উপরন্তু, আমদানি করা টিকা অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়। এজন্য পোল্ট্রি টিকা উৎপাদনের নিরিখে প্রয়োজনীয় গবেষণাকল্পে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে যাতে করে স্বল্প সময়ের মধ্যে এটা করা সম্ভব হয়।

প্রশ্ন জাগতে পারে যদি গবেষণার পরও টিকা তৈরি সম্ভব না হয় তাহলে কি হবে? সেক্ষেত্রে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকমহলের সাহায্য নিতে হবে। বিদেশে টিকা উৎপাদন যেহেতু হচ্ছে আমাদের দেশেও সম্ভব। বার্ড ফ্লুসহ অন্যন্য রোগের টিকা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উৎপাদনের চেষ্টা করতে হবে। পোল্ট্রির জন্য ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক আমদানিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সূত্র মতে, সরকার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চিন্তাভাবনাও করেছে। পোল্ট্রিতে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কার্যকরী কোন নীতিমালা দেশে না থাকলেও বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে এন্টিবায়োটিক দেদারসে ব্যবাহার হচ্ছে, এটা আমরা সবাই জানি। এন্টিবায়োটিক আমাদানির অনুমতি দেওয়ার আগে একটি কার্যকরী এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালা তৈরি করা দরকার। পোল্ট্রিতে যথেচ্ছ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে রয়েছে মারাত্মক জন-স্বাস্থ্য ঝুঁকি। তারপরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও বিদেশ নির্ভর না হয়ে দেশে এন্টিবায়োটিক তৈরি করা গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। পোল্ট্রি খাবার তৈরিতে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করার ক্ষেত্রে দেশে বিদ্যমান ফিড-মিলগুলোকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে এবং কঠোরভাবে তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি মানসম্মত পোল্ট্রি খাদ্য তৈরি হচ্ছে কিনা সেদিকটাও গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশের সব পোল্ট্রি ফিড-মিলকে একই নীতিমালার অধীনে আনার সাম্প্রতিক সরকারি চেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। এখন দেখার বিষয় তা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়।  

৬. বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশের পোল্ট্রি বেল্ট এরিয়াতে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি মুরগির বিষ্ঠা ও বর্জ্র ব্যবাহার করে বায়ো-বিদ্যুৎ (Bio-electricity) তৈরি হতে পারে একটি নতুন বিকল্প উপায়। যার মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের নামাক্ষাল জেলায় সম্প্রতি এ ধরনের প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে যা তামিলনাড়ুর অনেক গ্রামে ব্যবহার হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শেষে বিষ্ঠা ও বর্জ্রকে সার হিসেবে সহজেই ব্যবহার করা যায়। পোল্ট্রি বেল্ট এরিয়ায় ভালো রাস্তাঘাট না থাকলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভাঙা থাকলে তা জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হবে। যাতে কম সময়ের মধ্যে ও কম খরচে ডিম ও মুরগি বাজারে নেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি সরকারি সাবসিডিতে সরকারি গাড়িতে পরিবহনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

৭. ডিম ও ব্রয়লার রপ্তানি:  দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ডিম, ব্রয়লার ও এক-দিনের বাচ্চা বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত উৎপাদন আহামরি তেমন বেশি নয়। সূত্র মতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন চাহিদার চেয়ে ২ মিলিয়ন বেশি ডিম উৎপাদন হয়, ব্রয়লার একদিনের বাচ্চা উৎবৃত্ত থাকে সপ্তাহে ১ মিলিয়ন, লেয়ার একদিনের বাচ্চা উৎবৃত্ত থাকে সপ্তাহে দেড় লাখের মতো। বিদেশে রপ্তানির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হচ্ছে মান বজায় রাখা। কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যদি মানসম্পন্ন ডিম বা বাচ্চা উৎপাদন করা সম্ভব হয় তাহলে বিশেষ করে ডিমের ভালো একটা বাজার হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বার্ড ফ্লুর আক্রমণ থাকা সত্ত্বেও বিগত ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫ হাজার ৩৫২ লাখ ডিম মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রপ্তানি করেছে। যা ২০০৭-০৮ অর্থবছরের চেয়ে অর্ধেকমাত্র। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিৎ আরো অনেক বেশি উৎপাদন করা, নিজেদের চাহিদা ভালোভাবে মেটানো এবং মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করার চেষ্টা করা। যাতে করে গার্মেন্টস, চিংড়ি, চামড়া প্রভৃতি রপ্তানিমুখী শিল্পের পাশাপাশি পোল্ট্রিও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।     
       
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মাঝে মধ্যেই শ্রদ্ধেয় এক স্যারকে বলতে শুনতাম ‘প্রোট্রিনের অভাবে আমরা দিন দিন স্টুপিড হতে চলেছি’। স্যারের সে কথা তখন পুরোপুরি হৃদয়ঙ্গম করতে না পারলেও এখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে প্রোটিনের অভাবে একটি জাতি কিভাবে ধীরে ধীরে বুদ্ধিহীন হয়। আর প্রোটিনের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পোল্ট্রি শিল্পকে যেকোন মূল্যে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে, রক্ষা করতে হবে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খামারি, হ্যাচারি সর্বোপরি ভোক্তাদেরকে তথা দেশের মানুষকে, এ জাতিকে।   

ড. কে. এইচ. এম. নাজমুল হুসাইন নাজির, সহযোগী প্রফেসর, মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২। ই-মেইল- [email protected], মোবাইল- ০১৭১২৬২০১৫১

তেজগাঁওয়ে করোনা হাসপাতাল নির্মাণে বাধা কাটলো 
করোনার ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তারা
নোয়াখালীতে মৃত যুবকের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ
মোদীর করোনা তহবিলে ২৫ কোটি রুপি দিচ্ছেন অক্ষয় কুমার
কোভিড-১৯ সনাক্তকরণ কিট উদ্ভাবনে উদ্যোগ ঢাবির


করোনা: অতিরিক্ত সাড়ে ৬ কোটি টাকা, ১৩ হাজার টন চাল বরাদ্দ 
শ্বাসকষ্টে রোগীর মৃত্যু, করোনা আতঙ্কে বাড়ি ছাড়া প্রতিবেশীরা
সাগরপাড়ে রাত কাটানো সেই শিশুটির নতুন ঠিকানা ডিসি বাংলো
মানিকগঞ্জে ছিটানো হচ্ছে জীবাণুনাশক
করোনা: গুজব নিয়ে সতর্ক করেছে সরকার