ঢাকা, বুধবার, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭, ০৩ মার্চ ২০২১, ১৮ রজব ১৪৪২

চট্টগ্রাম প্রতিদিন

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

‘বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা’

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৮৩০ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৪
‘বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা’

চট্টগ্রাম: দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত প্রতিরক্ষা বাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ডিজিএফআই ও এনএসআই’র উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যারা এ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন তাদের ‘বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।



মামলায় দণ্ডিত দু’টি সংস্থার অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা হলেন, এনএসআই’র তৎকালীন মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম, ডিজিএফআই’র তৎকালীন পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ডিজিএফআই’র তৎকালীন পরিচালক (নিরাপত্তা) অবসরপ্রাপ্ত উইং কমাণ্ডার সাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং এনএসআই’র তৎকালীন উপ-পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছেন, বিপথগামী এসব সামরিক কর্মকর্তা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পররাষ্ট্র নীতিকে কলংকিত করেছেন, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সুনাম ও সুখ্যাতির প্রতি তারা ভ্রুক্ষেপ করেননি। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অব্যাহত সুসম্পর্ক বিনষ্টের দুরভিসন্ধি ছিল তাদের।

তারা নিজ দেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে গোটা জাতিকে ধ্বংস করার করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন বলেও পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছেন আদালত।

মঙ্গলবার রায় প্রদানকারী চট্টগ্রামের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এস এম মুজিবুর রহমান পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন।

ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মো.ওমর ফুয়াদ বাংলানিউজকে বলেন, ‘মহামান্য আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ের নথিতে স্বাক্ষর করেছেন। এখন পূর্ণাঙ্গ রায় যত দ্রুত সম্ভব সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ’

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, দেশের দু’টি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সাথে নিবিঢ় সম্পর্ক ও যোগাযোগ রেখে উলফাকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদ চোরাচালানের মাধ্যমে এনে এ মামলার ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন। এতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সহ অবস্থানের ব্যত্যয় ঘটার আশংকার প্রতি ‌আসামীরা কোন গুরুত্বই দেননি।

আদালত উল্লেখ করেন, তাদের এ ধরনের আচরণে প্রতীয়মান হয় যে, ভ্রাতৃপ্রতীম প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে আমাদের অব্যাহত সুসম্পর্ককে বিনষ্ট করার দুরভিসন্ধি নিয়েই আসামীরা উলফা নেতার সাথে হাত মিলিয়েছিল। উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তাদের এটা অজানা নয় যে, সকল প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখা, কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কেউ হস্তক্ষেপ না করা বা কারও সাথে বৈরিতা নয় বরং সৌহার্দ্যপূর্ণ সুসম্পর্ক বজায় রাখাই আমাদের পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্য ও বৈশিষ্ট্য। কিন্তু কতিপয় বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তা এই মামলার ঘটনায় নিজেদের জড়িত করে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পররাষ্ট্র নীতিকে কলংকিত করে দিয়েছেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, আমাদের প্রতিরক্ষা বিভাগে কর্মরত সদস্যরা জাতিসংঘের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থেকে কোন কোন ক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করে আর্ন্তজাতিকভাবে সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করেছেন এবং করছেন। জাতিসংঘসহ গোটা বিশ্ব তাদের এ অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। অথচ এই আসামীরা দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অর্জিত সুনাম ও সুখ্যাতির প্রতি কোনরূপ ভ্রুক্ষেপ না করে বর্তমান মামলার ঘটনার মত একটি বড় ধরনের অপরাধের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করেছেন, যা অত্যন্ত দু:খজনক ও হতাশাব্যঞ্জক।

আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি সাক্ষ্যপ্রমাণে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর্ন্তজাতিক চোরাকারবারি ও সন্ত্রাসীরা সাধারণত যে দেশের নীতিনির্ধারকসহ উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের বিভিন্ন রকমের লোভলালসা দেখিয়ে বশীভূত করতে পারে সেই দেশকেই চোরাচালান বা অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য বেছে নেয়। বর্তমান মামলার ক্ষেত্রেও দেখা যায় উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া ওই পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাকে যদি আমাদের এনএসআই ও ডিজিএফআই প্রশ্রয় না দিত তাহলে এতবড় অপরাধ বাংলাদেশে ঘটতে পারতনা।

পর্যবেক্ষণে উল্লেখ আছে, দোষ স্বীকারোক্তি প্রদানকারী আসামী এনএসআই কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তিতে এসব তথ্যও বেরিয়ে এসেছে যে, তারা আরও কিছু দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্ক রেখে হাজার হাজার ডলার ও আকর্ষণীয় উপহার সামগ্রী গ্রহণ করেছে। উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়াসহ অন্য দেশের আতিথেয়তা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশে একাধিক গোপন মিটিংয়ে উপস্থিত থেকেছে। এতে বুঝা যায়, তারা নিজ দেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়ে গোটা জাতিকে ধ্বংস করার করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।

গত ৩০ জানুয়ারি দশ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় চোরাচালান (বিশেষ ক্ষমতা আইনে) ও অস্ত্র আইনে দায়ের হওয়া পৃথক দুটি মামলার রায় দেন বিচারক।

চোরাচালান মামলার রায়ে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদন্ড দেন আদালত। একই রায়ে তাদের পাঁচ লক্ষ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।

একই ঘটনায় অস্ত্র আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলায় একই আসামীদের ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯ (এ) ধারায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১৯ (সি) ও ১৯ (এফ) ধারায় সাত বছর কারাদন্ড দেন বিচারক। উভয় সাজা একসঙ্গে চলবে বলে বিচারক আদেশে উল্লেখ করেন। এছাড়া তাদের হাজতবাসের মেয়াদ দণ্ড থেকে বাদ যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে।

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল জেটিঘাটে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানটি ধরা পড়ে।

উলফাকে শক্তিশালী করতেই দশ ট্রাক অস্ত্র
খালেদার নীরবতা রহস্যজনক

বাংলাদেশ সময়: ১৮৩২ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ০৪,২০১৪

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Alexa