php glass

নিউইয়র্ক মাইনিং ডিজাস্টার | হারুকি মুরাকামি (পর্ব-১)

ভিনদেশি সাহিত্য ~ শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

নিউইয়র্ক মাইনিং ডিজাস্টার | হারুকি মুরাকামি

walton

নিউইয়র্ক মাইনিং ডিজাস্টার
মূল: হারুকি মুরাকামি
ইংরেজি: ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল
ভাষান্তর: সালেহ মুহাম্মাদ

আমার এক বন্ধুর অভ্যাস ঘূর্ণিঝড়ের সময় চিড়িয়াখানায় চলে যাওয়া। দশ বছর ধরে সে এমনটা করছে। যে সময়ে অধিকাংশ লোকেরা নিজেদের ঘরের শাটারগুলো আটকাচ্ছে, দৌড়াদৌড়ি করে মিনারেল ওয়াটার মজুদ করছে অথবা পরীক্ষা করে দেখছে তাদের ফ্ল্যাশ লাইট আর রেডিওগুলো কাজ করছে কিনা, আমার বন্ধু নিজেকে ভিয়েতনাম আমলের আর্মিদের একটা কাপড় দিয়ে জড়ায় আর পকেটে কয়েকটা বিয়ারের ক্যান ঢুকিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পরে। সে থাকে প্রায় পনের মিনিট হাঁটার দূরত্বে।
 
তার ভাগ্য খারাপ হলে, চিড়িয়াখানা দেখা যায় বন্ধ , “ঝড়ো আবহাওয়ার হেতু” এবং দরজাগুলো তালাবদ্ধ। যখন এমন ঘটে, আমার বন্ধু প্রবেশদ্বারের পাশে কাঠবিড়ালির মূর্তিটার কাছে বসে পড়ে, তার ঈষদোষ্ণ বিয়ার পান করে, তারপর ঘরে ফিরে যায়।
 
কিন্তু যখন সে ওখানে সময়মতো পৌঁছায় সে প্রবেশ ফি দেয়, একটা ভেজা ভেজা সিগারেট ধরায়, আর এক এক করে জন্তু জানোয়ারদের পর্যবেক্ষণ করে। তাদের অধিকাংশ দেখা যায়, নিজেদের আশ্রয়ে ফিরে গেছে। কেউ কেউ শূন্য দৃষ্টিতে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্যরা আরও চঞ্চল, লাফালাফি করছে দমকা হাওয়ায়। বাতাসের চাপ আকস্মিক কমে যাওয়ায় কেউ কেউ ভীত হয়, অন্যরা হয়ে ওঠে হিংস্র।
 
আমার বন্ধু সর্বদা তার প্রথম বিয়ারটি পান করে বেঙ্গল টাইগারের খাঁচার সামনে। (বেঙ্গল টাইগাররা সবসময় ঝড়ের প্রতি সবচেয়ে হিংস্র প্রতিক্রিয়া দেখায়)। দ্বিতীয়টি সে পান করে গরিলার খাঁচার সামনে। অধিকাংশ সময় গরিলারা ঘূর্ণিঝড় নিয়ে সামান্যতমও বিচলিত হয় না। তারা তাকে শান্তভঙ্গিতে দেখে, যখন সে সিমেন্টের মেঝেতে একটা মৎস্যকন্যার মতো বসে বসে বিয়ারে চুমুকরত এবং আপনার নিশ্চিত মনে হবে যে, তারা তার জন্য দুঃখিতবোধ করে।
 
“বিষয়টা অনেকটা এমন যে, তুমি একটা লিফটে উঠেছ যেটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো আর তুমি সব অপরিচিত লোকে সঙ্গে ভেতরে আটকা পড়ে গেলে।” আমার বন্ধু আমাকে বলে।
  
ঘূর্ণিঝড় ব্যাতীত, অন্য কারও সঙ্গে আমার বন্ধুর কোনো পার্থক্য নেই। সে একটা রপ্তানিকারক কোম্পানিতে কাজ করে, বৈদেশিক বিনিয়োগের দিকটা দেখে। এটা খুব ভালো ফার্মগুলোর একটা না হলেও, মন্দও না একেবারে। সে একা একা একটা ছোট্ট ছিমছাম অ্যাপার্টমেন্টে থাকে এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর একটা নতুন বান্ধবী জোটায়। কেন যে সে ছয় মাস অন্তর (এবং সেটা সবসময়ই ছয় মাস) নতুন একজন জোটানোর ব্যাপারটাতে এতো জোর দেয় আমি কখনই বুঝব না। মেয়েগুলো সব দেখতে একইরকম, যেনো একে অন্যের নিখুঁত ক্লোন। আমি কখনই তাদের আলাদা করতে পারি না।
  
আমার বন্ধু পূর্ব ব্যবহৃত একটি চমৎকার গাড়ি এবং বালজাকের সংগৃহীত রচনাসমগ্রের মালিক, এছাড়াও তার আছে একটা কালো স্যুট, কালো টাই এবং এক জোড়া কালো জুতো যেগুলো কোনো শোকসভায় যাওয়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। যখনই কেউ মারা যায় আমি তাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি ওগুলা ধার নেওয়া যাবে কিনা, যদিও জুতাজোড়া আমার এক সাইজ বড় হয়।
  
“তোমাকে আবার বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত”, শেষবার তাকে ফোন করে আমি বলেছিলাম। “সামনে আরেকটা শোকসভা আছে”।
“যা লাগে নিয়ে যাও। তোমার নিশ্চয়ই তাড়া আছে”, সে বলল। “এক কাজ কর, তুমি এখনই চলে আস না কেন?”
আমি পৌঁছে দেখি, টেবিলের উপর স্যুট আর টাই সুন্দরভাবে ইস্ত্রি করে রাখা, জুতাজোড়া কালি করা আর ফ্রিজভর্তি বিদেশি বিয়ার। এই ধরনেরই একটা লোক সে।
  
“ওইদিন আমি চিড়িয়াখানায় একটা বিড়াল দেখলাম”, একটা বিয়ারের ক্যান খুলতে খুলতে সে বলল।
“বিড়াল?”
“হুঁ, দুই সপ্তাহ আগে। হোক্কায়িডোতে ছিলাম ব্যবসার কাজে, তখন হোটেলের কাছের একটা চিড়িয়াখানায় গেলাম। ‘বিড়াল’ লেখা সাইনবোর্ড লাগানো খাঁচায় একটা বিড়াল ঘুমাচ্ছিল।”
“কিরকম বিড়াল?”
“একদম সাধারণ একটা। বাদামি ডোরাকাটা, ছোট লেজ। আর অবিশ্বাস্য রকমের মোটা। ওটা খালি একপাশ হয়ে পড়ে শুয়েছিল, আর কিছু করছিল না।”
“মনে হয় হোক্কায়িডোতে বিড়াল অতো পাওয়া যায় না।”
“মজা নাও, না?” সে বলল, অবাক হয়ে। “হোক্কায়িডোতে অবশ্যই বিড়াল পাওয়া যায়, ওরা এতোটাও অন্যরকম না।”
“আচ্ছা ভালো, তাহলে বিষয়টা একটু অন্যভাবে দেখ, চিড়িয়াখানায় বিড়াল থাকতে পারবে না কেন?” আমি বললাম। “ওরাও তো প্রাণী, তাই না?”
“কুকুর-বিড়াল এগুলো চাইলেই পাওয়া যায় ধরণের প্রাণী। এদের দেখার জন্য কেউ পয়সা দিবে না।” সে বলল। “খালি আশেপাশে তাকাও, দেখো ওরা সব জায়গায় আছে। মানুষের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।”

ছয়টা বিয়ারের ক্যান আমরা শেষ করার পরে, আমি একটা বড় কাগজের প্যাকেটে স্যুট, টাই আর জুতার বাক্সটা ভরে নিলাম।
   
“বারবার তোমার সঙ্গে এরকম করার জন্য দুঃখিত”, আমি বললাম। “আমি জানি আমার নিজেরই একটা স্যুট কিনে নেওয়া উচিৎ, কিন্তু কেন জানি কাজটা ঠিক করা হয়ে উঠছে না। আমার মনে হয় যে, আমি যদি শোকসভা উপলক্ষে কাপড়চোপড় কিনি তাহলে আমি এটাই বলছি যে, কেউ মারা গেলে সেটা ঠিক আছে।”
“কোনো সমস্যা নেই”, সে বলল, “আমি তো এমনিতেও এগুলো ব্যবহার করছি না। আলমারিতে ঝুলিয়ে রাখার থেকে কেউ ব্যবহার করাটাই তো ভালো, তাই না?”
   
এটা সত্যি যে, যেই তিন বছর ধরে তার কাছে স্যুটটা আছে, এর মধ্যে বলতে গেলে সে ওটা পরেইনি।
“বিষয়টা অদ্ভুত, কিন্তু আমি স্যুটটা কেনার পর থেকে আমার পরিচিত একজন লোকও মারা যায়নি”, সে ব্যাখ্যা করে।
“এমনই হয়।”
“হুঁ, এমনই হয়”, সে বলে।
 
                               **
অন্যদিকে, আমার জন্যে ওটা ছিলোই শোকসভার বছর। বর্তমান বন্ধুরা এবং আগের বন্ধুরা একজনের পর একজন মারা যাচ্ছিল, যেমন অনাবৃষ্টির সময় ক্ষেতের পর ক্ষেত ভুট্টা শুকিয়ে যায়। আমার বয়স তখন আটাশ। আমার বন্ধুরাও সব ওইরকমই- সাতাশ, আটাশ, উনত্রিশ। মারা যাওয়ার জন্যে ঠিক সঠিক বয়স নয়।
একজন কবি একুশ বছর বয়সে মারা যেতে পারেন, একজন বিপ্লবী অথবা রকস্টার মারা যেতে পারেন চব্বিশ বছর বয়সে। কিন্তু তারপর আপনি ধরে নিতে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। মৃত লোকের বাঁকটা আপনি পার হয়ে গেছেন এবং সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে একটা ছয় লেনের হাইওয়ে ধরে আপনি সোজা ছুটছেন আপনার গন্তব্য পানে। আপনি নিজের চুল কেটে ফেলবেন; প্রত্যেক সকালে শেভ করবেন। আপনি এখন আর কবি নন, অথবা কোনো বিপ্লবী বা রকস্টার। মদ্যপ অবস্থায় আপনি আর ফোনবুথগুলোর ভেতর ঘুমিয়ে পড়বেন না অথবা সকাল চারটায় সময় বুথের দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসবেন না। তার বদলে আপনি আপনার বন্ধুর কোম্পানি থেকে জীবন বীমা কিনবেন, হোটেলের বারে পান করবেন, আর কর মওকুফের জন্য আপনার ডেন্টিস্টের বিল আটকে রাখবেন। আটাশ বছর বয়সে এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ঠিক এই সময়েই সেই অনাকাঙ্ক্ষিত গণহত্যা শুরু হলো। এটা অনেকটা বসন্তের কোনো অলস দিনে অতর্কিত হামলার মতো– যেনো কেউ একজন একটা বিমূর্ত পাহাড়ের চূড়ায় একটি বিমূর্ত মেশিনগান হাতে দাঁড়িয়ে আমাদের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। এক মুহূর্তে আমরা কাপড় পাল্টাচ্ছিলাম আর তার পরমুহূর্তেই সেগুলো আর গায়ে লাগছে না। জামার হাতাগুলো ভিতর-বাহির হয়ে গেছে, এবং আমাদের এক পা একজোড়া প্যান্টের ভেতর আর আরেক পা আরেক জোড়ায়। পরিপূর্ণ এক বিশৃঙ্খল অবস্থা।

কিন্তু এটাই হচ্ছে মৃত্যু। গমের ক্ষেত অথবা টুপির ভেতর, যেখান থেকেই বেরোক না কেন খরগোশ খরগোশই থাকে। একটা হট-ওভেন হট-ওভেনই আর চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়া হচ্ছে সে যা তাই- চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা কালো ধোঁয়া।
    
বাস্তব এবং অবাস্তবতার (অথবা অবাস্তবতা এবং বাস্তবতা) মধ্যকার বিভাজন রেখায় পা রাখা প্রথম ব্যক্তিটি ছিলো আমার কলেজের এক বন্ধু যে জুনিয়র হাইস্কুলে ইংলিশ পড়াত। তিন বছর হলো সে বিয়ে করেছে আর বাচ্চা হবে বলে ওর বউ শিকোকুতে নিজের বাবা-মায়ের বাসায় ফেরত গিয়েছিল।
  
জানুয়ারি মাসের কোনো অতিরিক্ত উষ্ণ রোববার মধ্যদুপুরে, সে একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোরে গিয়ে দুই ক্যান শেভিং ক্রিম এবং হাতির কান কেটে ফেলার মতো যথেষ্ট বড় একটা জার্মানির তৈরি ছুরি কিনল। সে বাসায় গিয়ে গোসলের জন্যে পানি ছাড়ল। ফ্রিজ থেকে কিছু বরফ নিলো সে, গলা দিয়ে এক বোতল স্কচ নামিয়ে দিলো, বাথটাবে উঠল আর দু’হাতের কবজি কেটে ফেলল। তার মা দু’দিন পর মরদেহ খুঁজে পায়। পুলিশ এসে অনেক ছবি তুলল। রক্তের চোটে গোসলের পানিটা দেখতে টমেটোর জুসের মতো লাগছিল। পুলিশ রায় দিলো ঘটনাটি আত্মহত্যা। যতো যাই হোক দরজা তালাবদ্ধ ছিলো আর চাকুটা তো নিহত ব্যক্তি নিজেই কিনেছেন। কিন্তু যে শেভিং ক্রিম ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা তার ছিলো না সেটি সে কিনল কেন? কেউ জানে না।

বাংলাদেশ সময়: ১১১৩ ঘণ্টা, জুন ৩০, ২০১৭
এসএনএস

আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দরের সম্ভাবনা বহু দূরে চলে গেছে 
রাস্তায় আন্দোলন করে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যাবে না
বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ এখন ভালো: গণপূর্তমন্ত্রী
মুক্তি পেল দণ্ডিত ১২১ শিশু
বড় ভাইকে গলা কেটে হত্যা, সৎভাই আটক


উন্মোচিত হলো নুমাইর আতিফ চৌধুরীর ‘বাবু বাংলাদেশ’
চুরির দায়ে বেনাপোল কাস্টমস হাউজের ৫ সদস্য বরখাস্ত 
বিএনপি জাতীয়তাবাদী শক্তির প্লাটফর্ম: গয়েশ্বর
রাজধানীতে র‍্যাবের অভিযানে আটক ২
ভয়াল ১২ নভেম্বর