ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, ১১ আগস্ট ২০২০, ২০ জিলহজ ১৪৪১

জাতীয়

হারিয়ে যেতে বসেছে পদ্মাবতীর ঐতিহ্যবাহী চামড়াশিল্প

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১৩১২ ঘণ্টা, জুলাই ১৪, ২০২০
হারিয়ে যেতে বসেছে পদ্মাবতীর ঐতিহ্যবাহী চামড়াশিল্প

বরিশাল: নিম্নমুখী দর ও টেনারি মালিকদের কাছে আটকে থাকা অর্থের কারণে বরিশালে চামড়ার বাজার মন্দা চলছে বেশ কয়েকবছর ধরে। আর এই মন্দার বাজারে হারিয়ে যেতে বসেছে বরিশাল নগরের পদ্মাবতী এলাকার ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসার শিল্পটি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কেউ ছেড়েছেন পদ্মাবতী, আবার কেউ পদ্মাবতী এলাকায় নিজ স্থানে থেকেই করেছেন ব্যবসার পরিবর্তন। শুধু ব্যবসায়ী নয়, চামড়া শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় যে শ্রমিকরা জড়িত ছিলেন, তাদের মধ্যেও অনেকেই ত্যাগ করেছেন পদ্মাবাতী।

আর যারাও বা এখনও রয়েছেন তারাও খুব একটা ভালো দিন কাটাচ্ছেন না।

প্রায় ৩৫ বছর ধরে বৃহত্তর ভোলা জেলার নবিপুর গ্রামের সন্তান ও বর্তমান বরিশাল নগরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ৫০ বছরের নূর ইসলাম আছেন চামড়া শিল্পের শ্রমিক হিসেবে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করণের কাজটি রপ্ত করছিলেন তিনি। চামড়ায় লেগে থাকা পশুর মাংস ছেঁটে ফেলা, চামড়া ধুয়ে লবন মাখানো, শুকানো এবং উপযুক্ত পর্যায়ে টেনারির উদ্দেশ্যে গাড়িতে তুলে দেওয়ার মতো সকল কাজ তিনি জানেন। তাই পদ্মাবতীতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বেশ ভালো দিন কেটেছে তার।

কিন্তু গেলো কয়েক বছর ধরে চামড়া ব্যবসায় অব্যাহত নিম্নমুখী দর ও ব্যবসায়ীক নানান সমস্যায় তিনিও বিপাকে পড়ে যান। উপার্জনের ওপর আঘাত পড়ায় দেখা দেয় সাংসারিক জীবনে টানা-পোড়ান। বিকল্প কোন কাজে দক্ষতা না থাকায় পেশাটা পাল্টাতে পারছেন না। আবার ১৫ বছরের নূর ইসলামের শরীরেও এখন আগের সেই শক্তি বল নেই, যে ভারি কাজ করে উপার্জন করবেন।

নূর ইসলামের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, কয়েক বছর আগেও চামড়ার দর যখন ভালো ছিল, তখন বাজারও জমজমাট ছিল। কাজ করতেও হিমশিম খেতে হতো শ্রমিকদের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন অফুরন্ত অবসর ভোগ করতে হয় শ্রমিকদের। তার ওপরে করোনা মহামারির গত ৪ মাসে নতুন সংকট দেখা দিয়েছে বেতন ভাতা বন্ধ থাকায়। বোনাস না মিললেও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন, যা দিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করেছেন, তবে সংসারে সীমাহীন টানাপোড়ন রয়েই গেছে।

নুর ইসলাম বলেন, বর্তমানে চামড়ার বাজার ভালো না। গরুর চামড়া প্রতি ফুট ১০০ থেকে ৫০ টাকা দেওয়াও কঠিন, আর ছাগলের চামড়া তো ফ্রি। তারপরও বর্তমানে চামড়ার আমদানিও খুব কম।

নুর ইসলাম জানান, যখন সুদিন ছিল তখন কোরবানিতে কমপক্ষে দেড়শ মানুষ কাজ করতো, তারপরও অনেকসময় শ্রমিকের চাহিদা এরও বেশি থাকতো। আর স্বাভাবিক সময়ে না হলেও নিয়মিত ২০ জন শ্রমিক থাকতোই কিন্তু এখন আছে দুইজন।

নুরুল ইসলামের সহকর্মী অপর শ্রমিক শাহীন জানালেন, বর্তমানে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করে যা বেতন পাচ্ছেন, তা ঘর ভাড়াই চলে যায়। গেলো চার মাসে সিটি মেয়রের ত্রাণ না পেলে পরিবারসহ খেতে হলে চুরি-ছিনতাই ছাড়া কোন গতি ছিল না।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি ঈদ-উল-আযহায় শ্রমিকদের পুরো বছরের সংসার চালানোর খরচ হয়ে যেত। তখন একজন শ্রমিক দিনে তিন বেলা খাবার এবং ৫ হাজার টাকা চুক্তিতে কাজ করতো। আর বছরের বাকি মাসগুলো ২০ হাজার টাকা চুক্তিতে কাজ করতেন শ্রমকিরা।  

কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজারে ধস নেমে আসায় জৌলুস কমতে থাকে পদ্মাবতীতে। অনেকেই চামড়ার গদি/দোকান বিক্রি করে দিয়েছেন। ব্যবসা বদলে পোশাকের ব্যবসা শুরু করেছেন। এমনটাই জানালেন বরিশাল চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুর রহমান শাহীন।  

তিনি বলেন, ট্যানারি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার বাজার ধ্বংস হয়ে গেছে। ব্যবসা বদলানো ছাড়া আমাদের আর কোন পথ খোলা নেই। ইতিমধ্যে অনেকেই তেমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমাদের ব্যবসায়ী সমিতির মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৪। বর্তমানে অধিকাংশরা ব্যবসার ধরণ বদলে ফেলায় সমিতিতে সদস্য নেই বললেই চলে। গদি চলে মাত্র দুটি।

শহিদুর রহমান শাহী  আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগেরই ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়ার টাকা আটকে আছে। প্রতিবছর কোরবানির আগে তাদের কাছ যান কেউ কিছু আনতে পারেন কেউবা খালি হাতে আসেন। তাই চামড়া কেনায় তেমন একটা আগ্রহ নেই স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। আর এবারে তো করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আসন্ন কোরবানিতে কোন চামড়া কিনবো না বলে অধিকাংশ ব্যবসায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছি।  

তিনি বলেন, চামড়ার টাকা দেওয়া তো দূরের কথা, চামড়ার পেছনে লবনের খরচ আর পরিবহন ব্যয় করাটাও আমাদের জন্য লোকসানের।  

বাংলাদেশ সময়: ১৩১২ঘণ্টা, জুলাই ১৪, ২০২০
এমএস/জেআইএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

জাতীয় এর সর্বশেষ

Alexa