ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২২ জিলহজ ১৪৪১

জাতীয়

প্রতি বছর ঢলে ভাসছে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া পাড়ের মানুষ

164 | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ১২২৩ ঘণ্টা, জুলাই ১৪, ২০২০
প্রতি বছর ঢলে ভাসছে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া পাড়ের মানুষ

ফেনী: প্রতি বছরই ভারতের উজান থেকে ভেসে আসা পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফেনীর উত্তরাঞ্চলীয় ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বাসিন্দারা। 

মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে প্রতিবছরই দেখা দেয় ভাঙন। ঢলের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হতে হয় ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার লক্ষাধিক মানুষকে।

ফেনীর ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলাকে বন্যা থেকে রক্ষায় ২০১১ সালে নির্মিত হয়েছে ১শ' ২২ কিলোমিটার বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ। তবে সে বাঁধ স্থানীয়দের কোন উপকারেই আসছে না এবং বন্যা থেকে রক্ষা করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড গত বছরও প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ মেরামত করেও এ বছর বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে পারেনি। ঢলের ভাসছে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া পাড়ের মানুষ।  ছবি: বাংলানিউজউজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠসহ ভেসে যায় পুকুরের মাছও। এবছরও ৯টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়।  

টানা বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এদিকে ফুলগাজীর বন্যা কবলিত বিভিন্ন গ্রাম সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান। পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক বলেন, মহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে করে অনেক মৎস্য ঘের ও ঘরবাড়ি ডুবে যাওয়ায় মানুষজন অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের প্রাথমিকভাবে শুকনো খাদ্য দেওয়া হয়েছে। আজকেও তাদের ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে।  

তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা হবে। তাদের প্রত্যেককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার পৌঁছে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলা আমাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা মাঠে আছেন।

এলাকাবাসীর টেকসহ নির্মাণের দাবির ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, বর্ষাকালে পিক আওয়ারে ভারতের পাহাড়ি ঢলের পানি মহুরী নদী দিয়ে সাগরে ধাবিত হয়। ফলে পানির তীব্রতা অনেকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এ বাঁধগুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া এখানকার মাটি বালি মিশ্রিত। ফলে শুকনোকালে কঠিন থাকলেও, বর্ষা এলে সেটি নরম হয়ে ভেঙে যায়।

তিনি আরও বলেন, আশা করি পানি উন্নয়ন বোর্ড এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে আসবে।

ফুলগাজী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল আলীম জানান, মহুরী নদীর তিনটি শাখায় বিভক্ত হয়ে ফুলগাজী ও পরশুরামের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত ২ বছর এখানে ৭বারের মত বন্যা হয়েছে।

তিনি আও বলেন, গতবছর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম এখানে এসেছিলেন। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন নদী খনন করে স্থায়ীভাবে বাঁধ মেরামতের জন্য ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু গত একবছর ধরে সেটি করা হয়নি। এবারও প্রতিবারের ন্যায় ফুলগাজী উপজেলায় বন্যায় নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪টি স্থানে ও পরশুরামের একটি স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এতে পশ্চিমাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চল পুরো প্লাবিত হয়েছে। এতে করে আবাদি জমি, ফসলি জমি, বীজতলা, মাছের ঘের ভেসে গেছে।  

আবদুল আলিম বলেন, আসলে এখানে ত্রাণের প্রয়োজন নেই, দরকার স্থায়ীভাবে নদী খনন ও বাঁধ নির্মাণের।

তিনি বলেন, মুহুরী, সিলোনিয়া ও কহুয়া একসময় সত্যিকার অর্থে নদী ছিল। সেটা ক্রমেই সংকুচিত হতে হতে এখন নর্দমায় পরিণত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপের ধারণ ক্ষমতা এখন আর নেই। এগুলো পুনঃখনন না করলে বাঁধ দিয়ে আসলে ফুলগাজী ও পরশুরামবাসীর দুর্ভোগ লাঘব হবে না।

ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম জানান, মুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২ কিলোমিটার অংশেই ৭টি স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে সদর ইউনিয়নের ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, পুকুর প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ফুলগাজী-পরশুরাম সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। ঢলের ভাসছে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া পাড়ের মানুষ।  ছবি: বাংলানিউজ

পরশুরামের চিথলিয়া ইউনিয়নের দুটি অংশে মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ২টি স্থানে ভেঙে ৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন।  
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, বাঁধের ভাঙন কবলিত অংশগুলো মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে।

মুহুরী নদীর বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশে পানি কিছুটা কমলে বাঁধ মেরামতের কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন।  

তিনি আরও জানান, নতুন করে বাঁধের কোনো অংশে যেন ভাঙন না ধরে, পানি উন্নয়ন বোর্ড সে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্যেও একটি প্রকল্প হাতে রয়েছে।

এদিকে স্থায়ী সমাধানের জন্য এলাকাবাসী মুহুরী ও কহুয়া নদীর সংযোগস্থলে একটি স্লুইসগেট স্থাপন করার দাবি করছেন দীর্ঘদিন থেকে।

বাংলাদেশ সময়: ১২২৩ ঘণ্টা, জুলাই ১৪, ২০২০
এসএইচডি/জেআইএম

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

জাতীয় এর সর্বশেষ

Alexa