নুসরাত হত্যার বিচার যেনো বিশ্বে দৃষ্টান্ত হয়: বাবা মুসা

সোলায়মান হাজারী ডালিম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

নুসরাতের বাবা মাওলানা একেএম মুসা মানিক, ইনসাটে নুসরাত জাহান রাফি। ছবি: বাংলানিউজ

walton

ফেনী: ফেনীর সোনাগাজী পৌর শহরের উত্তর চান্দিয়া গ্রামের মাওলানা ওমরের বাড়ি। বৃটিশ আমল থেকেই বাড়িটি সুপরিচিত। তবে বাড়িটি এখন আর আগের নামে পরিচত নয়; নুসরাতের বাড়ি বললেই সবাই চেনে। অথচ ১৫ দিন আগেও এমনটা ছিল না।

php glass

১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যুর পর পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি এ বাড়িটির দিকে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আসছেন নুসরাতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে। এছাড়া বাড়িটির চারপাশে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় আছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

সোমবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে নুসরাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির প্রবেশ মুখেই বসে আছেন চার পুলিশ সদস্য। আরেকটু এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে নুসরাতদের ঘরের সামনের উঠানে প্রচুর মানুষের ভিড়। কেউ সাংবাদিক, কেউ মানবাধিকার কর্মী, আবার কেউ সাধারণ মানুষ এখানে। নুসরাতের পরিবারকে দেখতে এসেছেন তারা।

বসার ঘরে গিয়ে দেখা গেলো নুসরাতের বৃদ্ধ দাদা শুয়ে আছেন। নুসরাতের মা ঘরেই আছেন। তিনি মেয়ের শোকে এতোটাই কাতর যে, কথা বলার শক্তিটুকুও নেই।

মিনিটখানেক পরে সামনে আসেন নুসরাতের বড়ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। বাড়ির পাশের মসজিদ থেকে মাত্র নামাজ পড়ে এলেন তিনি। বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে নোমান চলে যান সোনাগাজী আল হেলাল একাডেমির নিকটস্থ নুসরাতের কবরের পাশে। সেখানে কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দেখা গেলো, বাড়িতে যেমন, কবরের পাশের ভিড় তার চেয়ে দ্বিগুণ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন, আর নুসরাতের কবর জিয়ারত করছেন।

কবর জিয়ারত শেষে আবার বাড়ি গিয়ে দেখা হলো নুসরাতের বাবা মাওলানা একেএম মুসা মানিকের সঙ্গে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বাবা প্রায় নির্বাক। তবুও স্বল্প সময়ে নুসরাতের হত্যা মামলা, আসামিদের গ্রেফতার এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু কথা বলেন তিনি।নুসরাতের বাড়িতে শোক বইয়ে সই করছেন আগতরা, ছবি: বাংলানিউজমেয়ে হত্যার কেমন বিচার চান, এমন প্রশ্নের উত্তরে নুসরাতেরর বাবা বলেন, একমাত্র বুকের ধন হারিয়েছি। হাসপাতালের বেডে মেয়ের পোড়া শরীর এখনও চোখে ভাসছে। কানে বেজে উঠে অসহ্য যন্ত্রণায় মেয়ের চিৎকার। আমি আমার মেয়ের খুনিদের এমন বিচার চাই, তা যেনো সারা বিশ্বের বিচারের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। খুনিদের এ পরিণতি দেখে যেনো পৃথিবীর সব অপরাধী সাবধান হয়ে যায়। আর কোনো বাবার বুক যেনো খালি না হয়।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে মুসা মানিক বলেন, এ পর্যন্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কার্যক্রমে আমরা সন্তুষ্ট। তারা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পেরেছে। তাদের মুখে অপরাধ স্বীকার করাতে পেরেছে।

মামলার চার্জশিট নিয়ে তিনি বলেন, আমি চাই খুব দ্রুত চার্জশিট হোক। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসুক সব আসামির নাম। দ্রুত বিচার আইনে যেনো এ মামলার কার্যক্রম চলে, সে ব্যাপারেও তিনি অনুরোধ করেন।

মাওলানা মুসা মানিক বলেন, আমার মেয়ের মৃত্যুর পর এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করার জন্য দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি নির্দেশনা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। তার ফলশ্রুতিতেই খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে প্রায় সব আসামি। আমরা আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকে যেভাবে এ ব্যাপারে মনোযোগী, শেষ পর্যন্ত মনোযোগী থাকলে কোনো আসামিই রেহায় পাবে না। আসামিদের এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে।

অধ্যক্ষ অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা মুক্তি পরিষদের ব্যাপারে জানতে চাইলে নুসরাতের বাবা বলেন, এ পরিষদে যারা ছিলেন, তারা সবাই অপরাধী। তাদের সবাইকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পাবে।

পরিবারের নিরাপত্তার ব্যাপারে তিনি বলেন, বিভিন্ন মহল থেকে আমাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। কিছু কিছু লোক আবার খুনিদের সঙ্গে সমঝোতার কথাও বলছে। আমরা চাই এ হত্যাকাণ্ডের মামলার রায় হওয়া পর্যন্ত যেনো আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়।

নুসরাতের বাবা বলেন, নুসরাতের স্বজন ও পরিবারের লোকজন নুসরাত ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন করেছে। এ সংগঠনটি সারাদেশের অসহায় নারীর পাশে দাঁড়াবে।

শেষ মাওলানা মুসা মানিক বলেন, সারাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের কাছে আমি আমার মেয়ের জন্য দেয়া চাই, মহান রাব্বুল আল আমিন যেনো আমার মেয়েকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেন।বাংলানিউজের সঙ্গে কথা বলছেন নুসরাতের বাবা মাওলানা একেএম মুসা মানিক, ছবি: বাংলানিউজ৬ এপ্রিল (শনিবার) সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় যায় নুসরাত। তখন তার সহপাঠী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে বলে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে যায় এক বোরকা পরিহিত ছাত্রী। সেখানে গেলে নুসরাতকে মুখোশধারী চার-পাঁচজন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় চারদিন সর্বাত্মক চিকিৎসা চললেও সবাইকে কাঁদিয়ে ১০ এপ্রিল না ফেরার দেশে চলে যায় নুসরাত।

এ ঘটনায় ৮ এপ্রিল রাতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন নুসরাতের বড়ভাই নোমান।

এ মামলায় এখন পর্যন্ত এজহারভুক্ত আটসহ ২০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। একইসঙ্গে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটজন। ১৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আদালতের নির্দেশে এখন মামলার তদন্ত করছে পিবিআই।

এদিকে, শ্লীলতাহানির অভিযোগ করতে থানায় যাওয়ার পর নুসরাতের ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দেওয়ায় ১৫ এপ্রিল সোনাগাজী থানার ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা হয়েছে। এ মামলাও তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।

হত্যা মামলায় কিলিং স্পটের যে পাঁচজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উম্মে সুলতানা পপি (শম্পা) জানায়, নুসরাতকে হত্যা করার জন্য পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে সে-ই ছাদে ডেকে নিয়ে গেছে। তার নাম পপি হলেও হত্যাকাণ্ডের দিন হত্যাকারীরা তার পরিচয় গোপন রেখে ‘শম্পা’ নামে ডাকেন। সেজন্য নুসরাতও তাকে ডেকে নেওয়া বোরকা পরিহিত ছাত্রীটির নাম ‘শম্পা’ বলে গিয়েছিল।

আর সিরাজ উদদৌলার ঘনিষ্ঠজন নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম জানায়, জাবেদ ও পপি (শম্পা) সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেয়। জাবেদ নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, আর পপি ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে। এসময় তাদের সঙ্গে আরও তিনজন ছিলেন।

শামীম তার জবানবন্দিতে জানায়, নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পর শামীম দৌড়ে নিচে নেমে উত্তর দিকের প্রাচীর টপকে বের হয়ে যায়। বাইরে গিয়েই মোবাইল ফোনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে বিষয়টি জানায় সে। প্রত্যুত্তরে রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি জানি। তোমরা চলে যাও।’

বাংলাদেশ সময়: ০৯৪৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৫, ২০১৯
এসএইচডি/টিএ

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: ফেনী নুসরাত হত্যা
উন্নত দেশ গড়তে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই:স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
’২২ শে এপ্রিলে’-এ মম
ভোমরা বন্দরে শ্রমিকদের কর্মবিরতি
বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের ইফতার মাহফিল
মাশরাফির নেতৃত্ব যোদ্ধার মতো: রোডস


ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে পথে ইফতার করলেন সিএমপি কমিশনার
ইতিকাফকারীর করণীয় ও বর্জনীয়
কঙ্গোতে নৌকা ডুবিতে ৩০ জনের প্রাণহানি, নিখোঁজ ২০০
রাবিতে পুকুর সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ
হলি আর্টিজান মামলায় ৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ