ট্রল যেন সীমা না ছাড়ায়

শরীফুল ইসলাম অপু, অতিথি লেখক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ক্রিকেট বিশ্বকাপে কিছু ট্রলের নমুনা-ছবি: সংগৃহীত

walton

নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে টুর্নামেন্টের ‘হট ফেভারিট’ ভারত। বিশ্বকাপে এশিয়ার সর্বশেষ প্রতিনিধি হয়ে বিরাট কোহলিরা ছিল। গ্রুপ পর্বে সেরা হয়ে সেমিফাইনালে যাওয়া টিম ইন্ডিয়াই ছিল ‘বাজির ঘোড়া’। কিন্তু ‘ব্ল্যাক ক্যাপস’দের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মুখে ২৪০ রানের টার্গেট তাড়া করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপ! জাদেজা-ধোনির ব্যাটে নতুন ‘থ্রিলার’ ঘটার সম্ভাবনা জাগলেও কিউইরা ১৮ রানের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে।

এতেই বিশ্বজুড়ে ভারতীয় দলের মুণ্ডুপাত শুরু হয়। আইসিসি’কে নিয়ন্ত্রণ কিংবা বিশ্ব ক্রিকেটে প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগ রয়েছে ১৯৮৩ ও ২০১১ এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের প্রতি। সেই মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেই হয়তো এই মুণ্ডুপাত। যথারীতি বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও একই চিত্র, তবে অন্য অনেকের চেয়ে কিছুটা বেশি ‘দৃষ্টিকটু’ মনে হচ্ছে এই চিত্র। যেটিকে আধুনিক ভাষায় ‘ট্রল’ বা ‘ব্যঙ্গ’ আখ্যা দেওয়া হয়। 

ভারতের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির এভাবে বিদায়ে ক্রিকেট বোদ্ধাদের সমালোচনা করাটা স্বাভাবিক। বড় ম্যাচে এসে তাদের এমন আত্মসমর্পণ ক্রিকেটীয় চিন্তা ধারায় কাটাছেঁড়া করার সুযোগ অবশ্যই আছে। তবে এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযগের মাধ্যমে আমাদের দেশের ক্রিকেট-অনুরাগীদের বহিঃপ্রকাশ দেখতে বেশ অস্বস্তিকর লেগেছে।

স্বভাবতই খেলা বিনোদনের বড় একটি মাধ্যম; খেলার মধ্যে ক্রিকেট এদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। তাই এদেশের বড় একটি অংশ ক্রিকেট নিয়ে সরাসরি মন্তব্য অথবা মতামত প্রকাশ করে। এটির অধিকার সবারই রয়েছে। তাছাড়া পছন্দ-অপছন্দের প্রেক্ষাপটতো থাকেই, নিজের পছন্দের দলের চির প্রতিদ্বন্দ্বীর পরাজয়ে সমর্থকদের মনে অন্যরকম বিনোদন অনুভূত হয়—এটা যুগ যুগ ধরেই হয়ে আসছে।

ভারতের বিদায়ে আমিও বেশ বিনোদিত। এরকম মানে মানসিক বিনোদনে কারোরই বাঁধা নাই। বিভিন্ন কারণে ভারত-পাকিস্তান বিদ্বেষ রয়েছে আমাদের অনেকের মাঝে। আমাদের দেশের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কারও কারও কাছে বিবেচ্য হয় এতে, এছাড়া ধর্মীয় একটা বিভাজন ও সীমান্তের কর্মকাণ্ড তো প্রায়ই দৃশ্যমান। এসব কারণে হয়তো ভারতীয় ক্রিকেটের এমন পরাজয়ে আমাদের মাঝে উল্লাসের কারণ হতে পারে। পাকিস্তানের পরাজয়ের ক্ষেত্রেও প্রায় একই বিষয় লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে আমরা প্রায়ই বলি, খেলাধুলার সঙ্গে এসব বিষয় এক করা অপ্রাসঙ্গিক। কেউ এক করে বলে স্বীকারোক্তিও দেয়না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা ঠিকই এক করে ফেলি, শুধুই ক্রিকেটীয় পছন্দ-অপছন্দ থেকে এরকম ‘দৃষ্টিকটু উল্লাস’ করাটা অনুচিত ও অস্বস্তিকর।

এবার মূল বিষয়ে আসি। এই ট্রলগুলোতে ভারতীয় সমর্থকদের দায়ও রয়েছে অনেক। এছাড়াও তাদের সাবেক-বর্তমান কিছু খেলোয়াড়দের বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বেফাঁস মন্তব্যও হয়তো এদেশের মানুষদের মাথায় গেঁথে আছে। তবে দিন শেষে এই ট্রলের ফলাফল নিয়েও ভাবা উচিত আমাদের। কারণ, এটি আমাদের ক্রিকেটীয় কিছু ক্ষতি সাধন করছে। 

ক্রিকেট দল হিসেবে ভারত নিজেদের চেষ্টায়ই শক্তিশালী হিসেবে গড়ে উঠেছে—এটা মানতেই হবে। কর্পোরেট যুগে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ক্রিকেটের একটি বড় অর্থায়নের জোগান দিচ্ছে তারা। কেউ কেউ মনে করেন, এই অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে ছড়ি ঘুরাতে চায় তারা। কিন্তু এ কাজটাকে আমি তাদের দক্ষতা বলে মনে করি।

বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ক্রিকেটের এখন উঠতি সময়; তাই এই সময়ে পেশাদারিত্বের খাতিরে ভারতকে সমীহ করাটা বেশ প্রাসঙ্গিক বিষয়। যেহেতু ক্রিকেটের সঙ্গে খেলোয়াড়দের রোজগার সম্পৃক্ততা, সেহেতু আশপাশের সব দেশের ক্রিকেটের সঙ্গেই আমাদের এখন সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করা উচিত।

আইপিএলে সাকিব-মোস্তাফিজ ছাড়া আর কেউই নেই, এই সংখ্যা বাড়বে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। পাশাপাশি ইতিমধ্যে ভারতে খেলার আমন্ত্রণও এসেছে। কিছুটা ভালো সম্পর্কের ইঙ্গিত এসব। কিন্তু এই সময়ে টিম ইন্ডিয়ার পরাজয়ে আমাদের দেশের মানুষের এমন অপ্রাসঙ্গিক জয়োল্লাস—ভুল বার্তাও দিতে পারে, সে দেশের ক্রিকেটার ও ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের কাছে। 

সবাই কম-বেশি সোস্যাল মিডিয়া অনুসরণ করে, আর তাতে এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের নিয়ে তারা নেতিবাচক ধারণাই পোষণ করবে। এতে প্রভাব পড়বে আমাদের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের ওপর। কারও কারও দ্বিমত থাকতে পারে, তবে বাস্তবতা কিন্তু এরকমই। এসব কটূক্তিপূর্ণ পোস্ট ঠিকই আমাদের ক্রিকেটের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করছে। তাই সামনে তাকাতে হবে—‘চোখের টিনের চশমা’ সরিয়েই। 

অনেকের হয়তো মনে আছে, ফটোশপ করে তাসকিনের হাতে ধোনির মাথা কেটে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারও কারও ভাবনা—সেটির দাম কিন্তু তাসকিনকে দিতে হয়েছে; কিছুদিন ব্যান হয়ে। তাই কিছু বাস্তবতা আমাদের মাথায় রাখা উচিত। আর আমাদের ক্রিকেট এখন ঊর্ধ্বমুখী, তাই আমাদের আশপাশের কেউ চাইবে না, আমরা আরও উন্নতি করি। তবে আমরা যেন তাদের চাওয়ার সেই পথ আরও প্রসারিত না করে দেই, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। 

মানতে নারাজ হলেও মেনে নিতেই হবে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট এখন এশিয়ার ক্রিকেটকে পূর্ণ নেতৃত্ব দিচ্ছে। সে দৃষ্টিতে তাদের পরামর্শ বা সহযোগিতা নেওয়ার প্রত্যাশা করাকে দালালি ভাবা যায় না। সব ইস্যুকে সব জায়গায় এক করা পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে না।

আমি সব দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সুসম্পর্ক স্থাপনের প্রত্যাশা করি। ক্রিকেটীয় দিক থেকে এগিয়ে থাকায় ভারতের ক্ষেত্রে সেটিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলার চেষ্টা করেছি মাত্র। আমাদের ক্রিকেটের স্বার্থসিদ্ধি হওয়ার মানসে-ভাবনায় এসব বললাম। এখানে স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু করার কথা বলছি না একটি বারও। কে আমাদের ভালো চায়, আর কে চায় না। কে বন্ধু ভাবে, কে শত্রু ভাবে—এসব আলোচনা আপাতত একপাশে থাক, আমরা আমাদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাই।

শুভকামনা ও সম্মান রইলো এদেশের সব ক্রিকেট-অনুরাগীদের প্রতি।  

লেখক:
সার্টিফায়েড ক্রিকেট আম্পায়ার, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্রিকেট আম্পায়ার অ্যান্ড স্কোরার অ্যাসোসিয়েশনে, ফেনী জেলা

বাংলাদেশ সময়: ১৫৩৭ ঘণ্টা, জুলাই ১২, ২০১৯
এমএমইউ/এমএইচএম

ক্লিক করুন, আরো পড়ুন: আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৯
দলে অনুপ্রবেশকারীরাও বিএনপির মতো মিথ্যাচার করছে
আমিও একজন সংবাদকর্মী: তথ্যমন্ত্রী 
অনাবাদি জমি চাষে উদ্বুদ্ধকরণে কলমাকান্দায় কৃষক সমাবেশ
স্থিতিশীল সরকারে বাংলাদেশ উন্নয়নের মডেল: আইনমন্ত্রী
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা মূল চ্যালেঞ্জ: প্রতিমন্ত্রী


কালীগঞ্জে অটোরিকশার ধাক্কায় আহত বৃদ্ধের মৃত্যু
কুর্দি যোদ্ধাদের সরে যেতে রুশ-তুর্কি ঐক্যমত
ঢাকায় আসছেন ইয়োগা রানী ‘শ্বেওতা ওয়ার্পে’
বৃহস্পতিবার আজারবাইজান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা চেয়ারম্যানের মৃত্যু