সাইরেন বাজলেই পরিখায় ঢুকে যেতেন করিমগঞ্জবাসী

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

করিমগঞ্জে মেজর চমনলালের সমাধিসৌধ- ছবি: দীপু মালাকার

বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলাকে তিনদিক দিয়েই ঘিরে রেখেছে ভারতের আসামের বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ মহকুমা। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব গিয়ে পড়ে করিমগঞ্জেও।

করিমগঞ্জ, আসাম: বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলাকে তিনদিক দিয়েই ঘিরে রেখেছে ভারতের আসামের বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ মহকুমা। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব গিয়ে পড়ে করিমগঞ্জেও।

সরু নদী কুশিয়ারার উত্তরে জকিগঞ্জ। ২৫ মার্চের পর থেকেই দলে দলে বাংলাদেশিরা নদী পার হয়ে বা সুতারকান্দি স্থলসীমান্ত দিয়ে ভারতে পা রাখতে শুরু করে। দেশভাগের আগের বৃহত্তর সিলেটের অংশ ছিল করিমগঞ্জ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম-অধ্যুষিত করিমগঞ্জে বাংলাদেশি মুসলিমদের প্রচুর আত্মীয় স্বজন ছিলেন। তাদের বাসাবাড়িতেই আশ্রয় নেন শরণার্থীদের একটা বড় অংশ।

অন্যদিকে হিন্দু শরণার্থীদের বেশিরভাগেরই জায়গা হয় স্কুল কলেজগুলোর শরণার্থী ক্যাম্পে। সেখানে খালেদ চৌধুরী, কামালউদ্দিনের মতো তরুণরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে চাঁদা তুলতেন ক্যাম্পের জন্য।

এপ্রিলের শেষ দিকে জকিগঞ্জ দখল করে নেয় পাকিস্তানি হানাদারেরা। সেদিনই করিমগঞ্জ লক্ষ্য করে মর্টার শেল ছোড়ে হানাদারেরা। করিমগঞ্জের সীমান্ত এলাকার অনেকেই তখন নিজ বাড়ি ছেড়ে যতটা সম্ভব ভেতরের দিকে চলে যান।

শুধু করিমগঞ্জ নয়, আসামের শিলচর, কাট্টিছড়া, বদরপুরেও শরণার্থী ক্যাম্প হয়। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য তারাপদ চট্টোপাধ্যায় এসময় শরণার্থীদের জন্যে অনেক সাংগঠনিক কাজ করেন। প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্ধিরা গান্ধীর নির্দেশে কংগ্রেসের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়ান।
ক্যাপ্টেন চমনলাল শহীদ হন জকিগঞ্জে কুশিয়ারার পাড়ে। ছবি: দীপু মালাকার
রামকৃষ্ণনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য অনেক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ থেকে একটি শিল্পী গোষ্ঠী জুলাই মাসে রামকৃষ্ণনগর যায়। সেখানে স্থাণীয় শিল্পীদের সঙ্গে বিভিন্ন কনসার্টে গান গেয়ে যুদ্ধ পরিচালনা ও শরণার্থী ক্যম্পের জন্য চাঁদা তোলা হয়। বাংলাদেশি এই শিল্পীদলে রাবেয়া খাতুন নামে একজন ছিলেন। যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশ বেতারে গান গাইতেন।

করিমগঞ্জের খালেক চৌধুরী, করুণাশঙ্কর ভট্টাচার্য, সুজিত চৌধুরীদের চারণশিল্পী সংস্থাও শরণার্থীদের জন্য কনসার্ট করে চাঁদা তুলতো। তারা বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দিয়ে মানুষকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সমর্থন দিতে উদ্বুদ্ধ করতেন।

করিমগঞ্জের স্কুলশিক্ষক ও লেখক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘১৯৪৮ সালে আমার দাদারা করিমগঞ্জে চলে আসেন ভিটেমাটি ছেড়ে। আর আমরা ১৯৭১ এ বাংলাদেশিদের দেখে অনুভব করি বাস্তুহারা হওয়ার কি বেদনা। ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত চেহারাগুলোতে ছিল নিজের ভিটেতে ফিরে যাওয়ার আকুতি।’
ত্রিপুরা বিশ্বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামালউদ্দিন চৌধুরী। ছবি: দীপু মালাকার
শরণার্থীদের অনেকেই আসার সময় নিজেদের শেষ সম্বল স্বর্ণ বা দামি গয়না সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। এখানে এসে এসব জলের দামে বিক্রি করতে হতো। তখন ছিল শুধু বাঁচার জন্য সব বিলিয়ে দেয়া।

করিমগঞ্জের কয়েকটি শরণার্থী ক্যাম্পে কলেরা ও চোখওঠা মহামারি আকার ধারণ করে। তখন ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে স্বেচ্ছায় চিকিৎসা ও সেবা দেবার জন্য চিকিৎসক ও তরুণদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

করিমগঞ্জের সব স্কুলকলেজ এ সময় বন্ধ হয়ে যায়।  চন্দ্রোজিৎ ভট্টাচার্য চন্দন সেসময় করিমগঞ্জ স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। যুদ্ধের প্রথম একমাস তিনি স্কুল-ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন।
লেখক দিলীপ লস্কর। ছবি: দীপু মালাকার
তিনি বলেন, ‘শরণার্থীরা প্রথমে খুব অসহায় ছিলেন। স্থানীয় যুবকরা যা খাবার ব্যবস্থা করে দিতো তাই খেয়ে থাকতেন তারা। পরে ধীরে ধীরে খাবার ও বসবাসের ব্যবস্থা হয়।’

শরণার্থীদের মধ্যে সিলেট এমসি কলেজের অধ্যাপক বিজিত চৌধুরীর মতো অনেক শিক্ষিত লোকও ছিলেন। পরে তিনি রামকৃষ্ণনগরে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

রাকেশনগর মহাদেব কলেজের শিক্ষক ইমদাদুর রহমান। তখন ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি বলেন, ‘সেই বছর আমাদের আর কোনো পরীক্ষা হয়নি। স্কুল খুলেছিল যুদ্ধের পর। ক্লাস ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে।’
শিক্ষক বিশ্বজিৎ চৌধুরী। ছবি: দীপু মালাকার
রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাসংঘ শরণার্থী ক্যাম্পে অনেক সাহায্য করতো। বিদেশ থেকেও তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য সাহায্য আসতো। সিলেটের এমএনএ আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ গাজী, ন্যাপ নেতা পীর হাবিবুর রহমান এখানে সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। সেই সময়েই অগ্নিকন্যা হিসেবে পরিচিত ছিলেন মতিয়া চৌধুরী। তিনি আসামের বেশ কয়েকটি স্থানে বক্তৃতা করেন। যা সাধারণ মানুষকে খুব উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ত্রিপুরা বিশ্বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামালউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘সরকার থেকে সীমান্ত অঞ্চলের বাড়িগুলোতে পরিখা খননের জন্য বলা হয়েছিল। যদিও অনেকেই করেনি।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চন্দ্রোজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ছবি: দীপু মালাকার
যখন করিমগঞ্জে অবস্থান নেয়া ভারতীয় বাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ওপারের জকিগঞ্জের হানাদারদের গোলাগুলি শুরু হতো, এই এলাকার সবাই পরিখা বা খাটের নিচে শুয়ে পড়তো। সাইরেন বাজালেই এলাকার কেউ আর ঘরের বাইরে থাকতো না। এটাকে ‘কার্ফ্যু টাইম’ বলা হতো। আবার সাইরেন বাজলে বেরিয়ে আসতো সবাই।

অনেক সময় পুরো রাতজুড়েই গোলাগুলি চলতো। বাড়ির টিনের চালে, দেয়ালে এসে বুলেট পড়তো। সকালে সেগুলো নিয়ে বাচ্চারা খেলতো।

২০ নভেম্বর থেকেই করিমগঞ্জে যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু হয়। রাতভর ভারি অস্ত্র এনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ভারতীয় সেনার সংখ্যা বাড়ানো হয়।
রাকেশনগর মহাদেব কলেজের শিক্ষক ইমদাদুর রহমান। ছবি: দীপু মালাকার
২১ নভেম্বর মিত্রবাহিনী জকিগঞ্জে যৌথ হামলা চালায়। ক্যাপ্টেন চমনলাল শহীদ হন জকিগঞ্জে কুশিয়ারার পাড়ে। জকিগঞ্জ মুক্ত হলে কুশিয়ারার এই পাড়ে শরণার্থীরা এসে ভিড় করে। নিজেদের মুক্ত ভূখন্ড দেখে আনন্দে কাঁদতে থাকেন। যে যেভাবে পারে দেশে ঢুকতে থাকে। সেদিন করিমগঞ্জেও বের হয় বিজয় মিছিল।

যারা বর্ণনা করেছেন:
ত্রিপুরা বিশ্বিদ্যালয়ের শিক্ষক কামালউদ্দিন চৌধুরী, লেখক দিলীপ লস্কর, শিক্ষক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক চন্দ্রোজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রাকেশনগর মহাদেব কলেজের শিক্ষক ইমদাদুর রহমান।


সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন...
** শরণার্থী ক্যাম্পের স্বেচ্ছাসেবক অমর সিং
** মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের ছবি আগলে ত্রিপুরার তপন
** আখাউড়ার যুদ্ধ ও ত্রিপুরার মানুষের বিরল ত্যাগ!
** ‘ভাই, মেরে লাশকো ভারতমে ভেজ দেনা!’
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬
এমএন/জেএম/এসআরএস

বরিশালে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি গ্রেফতার
মহাকবি কায়কোবাদের প্রয়াণ
ইতিহাসের এই দিনে

মহাকবি কায়কোবাদের প্রয়াণ

মতবিরোধে কুম্ভ, সুখবর পাবেন বৃষ
নরসিংদীতে এনা বাসের ধাক্কায় লেগুনার ৫ যাত্রী নিহত
বিদেশি টি-টোয়েন্টি লিগে মোস্তাফিজের ২ বছরের নিষেধাজ্ঞা
চৌদ্দগ্রামে বজ্রপাতে নিহত ১
‘প্রতারক’ প্রেমিকের খোঁজে গুজরাটে বাংলাদেশি তরুণী
সবুজবাগে নারীকে হত্যার অভিযোগ, স্বামী আটক
‘সে শুধু আমার’
নির্বাচনে কে বিজয়ী হবে তা নির্ধারণ করবে জনগণ: লিটন