মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের ছবি আগলে ত্রিপুরার তপন

মাজেদুল নয়ন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ‍ভিডিও- দীপু মালাকার

সাব্রুমজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা, শরণার্থী ক্যাম্প, ইয়ুথ ক্যাম্প, ট্রেইনিং ক্যাম্পসহ কতোকিছু। বাজারের দোকানগুলোতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের  মানুষের ভিড়। ১৯৭১ এর উত্তাল সেই সময়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমায় আসেন দুই তরুণ ছাত্র।

সাব্রুম, দক্ষিণ ত্রিপুরা, ভারত: সাব্রুমজুড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা, শরণার্থী ক্যাম্প, ইয়ুথ ক্যাম্প, ট্রেইনিং ক্যাম্পসহ কতোকিছু। বাজারের দোকানগুলোতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের  মানুষের ভিড়। ১৯৭১ এর উত্তাল সেই সময়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমায় আসেন দুই তরুণ ছাত্র। মনসুর আর মোস্তফা কামাল। মাতৃভূমিকে রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দুই যুবক। চোখে মুখে প্রতিশোধের স্পৃহা স্পষ্ট। তখনো সাব্রুমের হরিণায় ক্যাম্প চালু হয়নি। তবে ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের ওপর নির্দেশ ছিল শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার ও আশ্রয় দেয়ার।

সাব্রুমের তরুণ কংগ্রেসকর্মী তপন দাস তখন ছিলেন এন্ট্রান্সের (উচ্চ মাধ্যমিক) ছাত্র। ক্যাম্প চালু হওয়ার আগে থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়মিত মিশতেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে, তাদের খোঁজ খবর নিতে যেতেন ক্যাম্পে। পরে হরিণা ক্যাম্প থেকে ইয়ুথ ক্যাম্প ও ট্রেইনিং ক্যাম্পের লোকদের তালিকাভুক্তির কিছু দায়িত্ব পান তিনি। সেখানেই পরিচয় হয় মনসুর আর মোস্তফার সঙ্গে। এক-দুই আড্ডাতেই ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়।
আজও মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু মনসুরের ছবি নিয়ে ঘোরেন তপন। ছবি: দীপু মালাকার
পরবর্তী সময়ে সাব্রুমের হরিণা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের কমান্ডার হন মনসুর। নিজে যুদ্ধে যেতেন, পরিকল্পনা করতেন, সহযোদ্ধাদের সাহস যোগাতেন। তার দৃঢ়চেতা ভাবকে স্যালুট দিতেন তপন। গেরিলা অপারেশনের আগের রাতে নিজের বাড়িতে তাদের আতিথেয়তা দিতেন তপন। তরুণ বয়সের সুখ-দুঃখ আর নানা টানাপোড়েনের গল্প করে সময় কাটতো বন্ধুদের। ফেনী নদীর ওপাড়ে নতুন একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েন তপনও।

তপনদের বাড়িতে প্রায়ই যেতেন দুই বন্ধু মনসুর আর মোস্তফা। তপনদের পরিবারের সবার সঙ্গে মিশতেন। তাদের বাড়িতে শিশুদের সঙ্গে খেলা করতেন দুই মুক্তিযোদ্ধা।
আবারও মনসুরের খোঁজ পাবেন বলে আশাবাদী তপন। ছবি: দীপু মালাকার
বছরের মাঝামাঝি সময় উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হয় তপনের। সেসব দিনে আগরতলা থেকে পরীক্ষার ফল নিয়ে আসতো অরিন বুক সোসাইটি। কিন্তু বেলা পেরিয়ে গেলেও রেজাল্টের গাড়ি আর আসছিল না। মন খারাপ করে হরিণা ক্যাম্পে বন্ধু মনসুরের কাছে ছুটে যান তিনি। সব শুনে তৎক্ষণাৎ ক্যাম্প থেকে একটি গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন মনসুর।

সেই গাড়িতে করে আগরতলা গিয়ে রেজাল্ট নেন তপন। পরীক্ষা পাসের খবর দিতে সবার আগে ছুটে যান মনসুরের কাছে। মনসুর খুশির খবর শুনে উদযাপনের জন্য দ্রুত মোরগ জবাই করতে বলেন। সবাই মিলে সেদিন খুব আনন্দ করেন।

আজও মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর ছবি নিয়ে ঘোরেন তপন। ছবি: দীপু মালাকারআরেক সন্ধ্যার ঘটনা। বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছিলেন মনসুরের ক্যাম্প অফিসে। এমন সময় দুটি চামড়ার ব্রিফকেস নিয়ে ক্যাম্প অফিসে হাজির হয় ছাত্রবয়সী দুই তরুণ।তারা মনসুরের তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে ক্যাম্প কমান্ডারের খোঁজ করছিল। তবে সেন্ট্রিরা ঢুকতে দিচ্ছিল না। বাকবিতণ্ডা শুনে তাঁবু থেকে বেরিয়ে দুই তরুণকে ভেতরে ডেকে নেন মনসুর। এদের একজন মুসলমান আরেকজন হিন্দু।

ছেলে দুটি চট্টগ্রাম থেকে এসেছে জানিয়ে কমান্ডারের খোঁজ করছিল। মনসুর তখন নিজের পরিচয় দিয়ে ব্রিফকেস দুটো খোলেন। চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় কমান্ডার মনসুরের। দুটো ব্রিফকেসভর্তি টাকা! এই টাকা মুক্তিফৌজকে দেবে বলে নিয়ে এসেছে এই দুই ছাত্র। আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন মনসুর। চোখ ভিজে ওঠে তপনের। দেশের স্বাধীনতার জন্য এই দুই তরুণের এই গভীর আবেগ তাকে ও তপনকে বিস্মিত,বিমোহিত করে।

ছবি: দীপু মালাকার- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমএক সময় যুদ্ধ শেষ হয়। হানাদারমুক্ত হয় দেশ। দেশে ফিরে যান মনসুর আর মোস্তফা কামাল। যাওয়ার আগে বন্ধু তপনের কাছে রেখে যান পাসপোর্ট সাইজের ছবি। আজও মোস্তফা আর মনসুরের ছবি নিয়ে ঘোরেন তপন।

বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে দ্রুত বাসায় নিয়ে যান। নিজের কাছে যক্ষের ধনের মতো সযত্নে আগলে রাখা প্রিয় বন্ধুর ছবি নিয়ে আসেন দেখাতে। পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া তিনটে সাদাকালো ছবি। এতো-এতো দিন পর আজ বেশ রংচটা, মলিন। তবু ছবিগুলো পরম যত্নে আগলে রেখেছিলেন বলে এখনো ভালো অবস্থাতেই আছে। বন্ধু মনসুর আর মোস্তফার খোঁজ পাওয়ার জন্য মরিয়া তপন। খোঁজ পাওয়ার কোনো পথ জানা থাকলে জানাতে বললেন।
সাব্রুমজুড়ে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা, শরণার্থী ক্যাম্প, ইয়ুথ ক্যাম্প ও ট্রেইনিং ক্যাম্প। ছবি: দীপু মালাকারমনসুরের সঙ্গে তার শেষবার দেখা হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। তিনি তখন চট্টগ্রাম সেনানিবাসে লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মরত। তখন ছোট আরেকটি ছবি দেন। পরে আর দেখা হয়নি। আর মোস্তফার সঙ্গে যুদ্ধের পর কখনো আর দেখা হয়নি। তবে অনেক খুঁজেছেন দুই বন্ধুকে। এখনো খোঁজ করেন।

আবার মনসুরের খোঁজ পাবেন বলে আশাবাদী তপন। দু’বছর আগে কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে ট্রেনে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়। সেই ব্যক্তির কাছে কিছু তথ্য পেয়েছেন মনসুরের। আবারো বাংলাদেশে গিয়ে বন্ধুদের খোঁজ করবেন তপন।

যেদিন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা নিজ দেশে ফিরছিলেন তখন একই সঙ্গে তার বুকে ঢেউ তুলেছিল বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার আনন্দ আর বন্ধু-বিদায়ের বেদনা। ফেলে আসা সেইসব প্রাণোচ্ছ্বল দিনের স্মৃতি আজও কাঁদায় তপনকে।
বাংলানিউজের কাছে বর্ণনা দিচ্ছেন তপন দাসসহ মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধুরা। ছবি: দীপু মালাকার
যারা বর্ণনা করেছেন:
এই একান্ত বন্ধুত্বের কথা বর্ণনা করেছেন তপন দাস নিজেই।

তপন দাসের সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সাব্রুমের সুবোধ দাসের সন্তান স্থানীয় সাংবাদিক বন্দন দাস।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন হস্ত ও তাঁতশিল্প অধিদপ্তরের অধীন চাকুরি জীবন শেষে এখন অবসরে রয়েছেন তপন দাস। সাব্রুম বাজারেই বাড়ি। তার দুই ছেলে-মেয়ে পুনেতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

সহযোগিতায়:


আরও পড়ুন:
** আখাউড়ার যুদ্ধ ও ত্রিপুরার মানুষের বিরল ত্যাগ!
** ‘ভাই, মেরে লাশকো ভারতমে ভেজ দেনা!’
** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন


বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬
এমএন/জেএম

মিসৌরিতে পর্যটকবাহী নৌকা ডুবে ৮ জনের প্রাণহানি
উদ্বোধন হলো স্যামসাং মোবাইলের ওয়েবসাইট
তৌসিফ-তিশার ‘আকাশজোড়া মেঘ’
ত্রিপুরায় বিনিয়োগের আহ্বান মুখ্যমন্ত্রীর
কমছে না নিত্যপণ্যের দাম
আশাশুনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি গ্রেফতার
পত্নীতলায় এক ব্যক্তির গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট পারের অপেক্ষায় ৫ শতাধিক ট্রাক
পুতিনকে যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রণ জানালেন ট্রাম্প
খুলনায় যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার