ইন্দিরা গান্ধী নিজেই ছিলেন প্রেরণা

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ওই পাহাড় থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনী মর্টারের শেল ছুঁড়তো পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর। ছবি: কাশেম হারুন

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অক্টোবরের দিকে কলেরার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয় শরণার্থী শিবিরগুলোতে। সে সময় প্রচুর মানুষ মারা যায়।

ডালু, মেঘালয়: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অক্টোবরের দিকে কলেরার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয় শরণার্থী শিবিরগুলোতে। সে সময় প্রচুর মানুষ মারা যায়। যুদ্ধের পরিস্থিতিও তখন তুঙ্গে। মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা দিতে ভারত সে সময় অনেকটা প্রকাশ্যেই ভূমিকা নিতে শুরু করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী সে সময় বিভিন্ন শরণার্থী শিবির আর ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে অনুপ্রেরণা দিতেন।

শেরপুরের নালীতাবাড়ীর নাকুগাঁও এর ওপারেই ভারতের মেঘালয়ের ডালু। যেখানে স্থাপন করা হয়েছিলো মিত্রবাহিনীর ক্যাম্প। আর এর আশেপাশের এলাকাগুলোয় গড়ে তোলা হয়েছিল শরণার্থী শিবির। এসবের মধ্যে রেঙ্গিনপাড়া, বারাঙ্গীপাড়া, ডিমাপাড়া, আমপাতি ইত্যাদি ছিল উল্লেখযোগ্য।

রেঙ্গিনপাড়ার অশোক মারাকের বয়স তখন ১৭ বছর। তাদের এলাকাতেও গড়ে উঠেছিল শরণার্থী শিবির। অনেকেই তাদের বাড়িসহ স্থানীয় অন্য গারোদের বাড়িতেও আশ্রয় নিয়েছেন। বারমারীর সুজয়দের বাড়ীর ১৫-২০জন তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি শরণার্থী শিবিরে রেশন বিতরণের কাজ করতেন।

জুনের পর থেকেই শিবিরে মহামারী আকার ধারণ করেছিল কলেরা। অক্টোবরের দিকে তা আরো বেড়ে গিয়েছিল। ভারত সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায়ও কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না।ভারতের মেঘালয়ের ডালু এলাকা। এখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের শিবির ছিল। ছবি: কাশেম হারুন

এদিকে যুদ্ধের তীব্রতাও বাড়ছিল। পাকসেনারা একবার ডালুর খুব কাছে চলে এসে হামলা করায় বেশ কয়েকজন ভারতীয় সৈন্য মারা যায়। এতে ভারত ব্যাপক হারে অস্ত্র সরবরাহ শুরু করে দেয় ডালু ক্যাম্পে। সৈন্য সংখ্যাও বাড়ানো হয়।

ডালুর বর্তমানে যেখানে ইমিগ্রেশন রয়েছে, সেখানেই ‘ডালু বাজার’। এ বাজারেই রয়েছে কয়েকটি টিলা। যেগুলোর উপরেই বসানো হয়েছিল ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর কয়েকটি মর্টার। সেখান থেকে কভারিং ফায়ার দিতেন ভারতীয় আর্মির সদস্যরা। আর মুক্তিযোদ্ধারা নেমে যেতেন শেরপুরের পানিহাতা, তন্তর, নাকুগাঁও, বারমারীসহ বিভিন্ন এলাকায়। এপার থেকে ভারতীয় আর্মি আর ওপার থেকে পাকবাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি মর্টারের শেল বিনিময় হতো।

বর্ডারের কাছাকাছিই ছিল স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের বসবাস। অনেক সময় তাদের বাড়িতেও এসে পড়ত পাকসেনাদের গোলা। এতে অনেকে আহত, অনেকেই নিহত হতেন। অক্টোবরের দিকে পাকবাহিনী আক্রমণও বাড়িয়ে দেয়। ফলে যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে থাকে।

একদিকে যুদ্ধের তীব্রতা, অন্যদিকে শিবিরের দুর্বিষহ অবস্থা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও প্রচার পায়। এসময় অক্টোবরের প্রথম দিকেই একদিন ডালুতে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তখন তিনি ঘুরে ঘুরে শিবিরের পরিস্থিতি দেখেন। একই সঙ্গে দুর্দশাকবলিত বাঙালিদের সাহস যোগান। আহ্বান জানান প্রতিরোধ আরো তীব্র করে তোলার। শিবিরে যারা যুবক ছিলেন, তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। এজন্য ভারতের সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে বলেও ঘোষণা দেন শ্রীমতী ইন্দিরা। এতে অনেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধে অংশ নেন।

সে সময় সঞ্জয় রয়ের দাদু গোপাল রয় ছিলেন ডালুর স্থানীয় নেতা। তাদের বসবাস ডালুর দুর্গাবাড়ী গ্রামে। সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও সামাজিকভাবে গোপাল রয় নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকতেন। সে সময় তিনি ১শ জন সামাজিক নেতাকে একত্রিত করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান। এমনকি প্রতিদিনই সভা, সমাবেশ করতেন। এভাবেই তারা স্থানীয়দের সমর্থন আদায় করতে সফল হন। ফলে ডালু এলাকার গারো আদিবাসীরা ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন আদিবাসী, বাঙালিদের সহায়তায়।অশোক মারাক। ডালু শরণার্থী শিবিরে রেশন বিতরণের কাজ করতেন। ছবি: কাশেম হারুন

এপ্রিলের প্রথম দিকেই ব্যাপকহারে বাঙালিরা ঢুকে পড়ে ডালুসহ অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকায়। শিবির গড়ে ওঠার আগে গোপাল রয়রাই ছিলেন শরণার্থীদের ভরসা। তারা এলাকায় ঘুরে ঘুরে টাকা তুলতেন। কেউ টাকা দিতে না পারলে চাল-ডাল নিতেন। এভাবেই শরণার্থীদের খাবার ও পোশাকের যোগান দিতেন গোপাল রয়রা।

গোপাল রয় গত বছর মারা গেছেন। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গল্প দাদু গোপাল রয়ের কাছ থেকে শুনে-শুনেই বড় হয়েছেন সঞ্জয় রয়।
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, দাদু যখন যুদ্ধের গল্প বলতেন, তার চোখ জলে ভরে উঠতো। যুদ্ধের সময়ে মানুষের কষ্টের কথা মনে করে তিনিও কষ্ট পেতেন।

অশোক মারাক এখন ডালু বাজারে একটি মুদির দোকান চালান। বাঙালিদের দুর্বিষহ দুর্দশার কথা মনে হলে তার গা এখনো শিউরে ওঠে। বাংলানিউজকে বলেন:‘কী নিদারুণ কষ্ট যে করেছেন বাঙালিরা, তা চোখে না দেখলে কেউ বুঝবেন না।’

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ডালু ক্যাম্প ছিল ট্রানজিট পয়েন্টের একটি। শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরের মুক্তিযোদ্ধারা এ ক্যাম্প হয়েও রিক্রুটিং ক্যাম্পে নাম লেখাতেন। এরপর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য তারা ডালুর উত্তরে তোরা পাহাড়ে যেতেন। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আবার ডালু ক্যাম্পে ফিরে আসতেন। সেখান থেকেই ভারতীয় আর্মির লোকেরা তাদের বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা হামলা করতে পাঠাতেন। তবে ১১ নম্বর সেক্টর গঠন হলে তারা সেক্টর কমান্ডার মেজর তাহেরের নির্দেশনাতেই যুদ্ধ করেছেন।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন

** তিন ঘণ্টার আক্রমণেই বিজয়পুর ক্যাম্প ছাড়ে পাকবাহিনী
** লক্ষ্মীপূজার রাতে শুরু হয় তুমুল হামলা
** খাওয়া-ঘুম-মলত্যাগ সব একই তাঁবুতে
** ভারতে আতর আলীর আশ্রয়ে যুদ্ধশিশু ‘খুদেজা পাগলী’
** হিলির দুর্গ ভাঙ্গতে ভুল সমরকৌশল
** ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হয় বিহারীরা

** অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন


বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

যারা বর্ণনা করেছেন:
মেঘালয়ের তোরা জেলার ডালু থানার রেঙ্গিনপাড়া গ্রামের অশোক মারাক ও দুর্গাবাড়ী গ্রামের গোপাল রয়ের নাতী সঞ্জু রয়।

সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিসহ আটক ৪
হলি আর্টিজান মামলায় ২১ জনের নামে চার্জশিট
‘জিতলে আমি জার্মান, হারলে শরণার্থী’
বিদেশ যেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ ইমরান এইচ সরকার
গর্ভকালীন সময়ে যা খেতে নেই
কাপড় শুকাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে গৃহবধূর মৃত্যু
সেই ১২ শিক্ষার্থীর ৯ জন পাস করেছে
যশোরে অজ্ঞাত ২ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার
নওয়াজ অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ মেডিকেল টিমের
তামিমের আগে পুরো ইনিংস ব্যাট করার কীর্তি যাদের