ভাগীরথী নদীতে ট্রেনিং নিয়ে এসে অপারেশন জ্যাকপট

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম - বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে— পাকিস্তানিরা এটা মানতে নারাজ ছিল।

রাজশাহী: পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে— পাকিস্তানিরা এটা মানতে নারাজ ছিল। যুদ্ধ শুরুর প্রায় পাঁচমাস অতিবাহিত হওয়ার পরও তারা স্বীকার করতো না। আন্তর্জাতিক বিশ্বকে বলতো এটা তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। তখন সিদ্ধান্ত হয় আক্রমণ চালিয়ে দেশের নৌ ও সমুদ্রবন্দরগুলোকে অকেজো করে দেওয়ার। দায়িত্বটা পড়ে নৌমান্ডোদের ওপর। ১৫ আগস্টের সে পরিকল্পিত আক্রমণের নাম দেওয়া হয় অপারেশন জ্যাকপট। এ অপারেশনের পর আন্তর্জাতিক বিশ্ব সত্যি নড়েচড়ে বসে।

চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনটিতে অংশ নেন রাজশাহীর নৌকমান্ডো ফজলুর রহমান। দুর্ধর্ষ সে অপারেশনের রোমহর্ষক বিবরণ আজও গায়ে কাঁটা দেয়। 

তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি। ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর (ইউটিসি) এর ক্যাডেট ছিলেন তিনি। যেটা এখন বিএনসিসি নামে পরিচিত। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর তিন-চারজন ক্যাডেটকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানিরা। পরে তাদের আর খোঁজ মেলেনি।

এ ঘটনার পর আত্মগোপনে চলে যান ফজলু। ২০ জন সমবয়সীকে নিয়ে পদ্মানদী পার হয়ে ভারতের মুর্শিদাবাদের বাউনাবাদ চলে যান। ওঠেন এক কৃষকের বাড়িতে। বাংলাদেশ পারে শাহপুর সীমান্ত ফাঁড়ি। 

বাউনাবাদের নন্দীর ভিটা নামের একটি জায়গা ছিল। নন্দীর ভিটার শেখপাড়ায় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি  ট্রান্সজিট ক্যাম্প। সেখানে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো  নাম লেখানো যোদ্ধাদের। ট্রেনিংয়ের এক পর্যায়ে সাঁতার জানা ২০জনকে বাছাই করা হয়। প্রত্যেকের শিক্ষাগত দিকটিও রাখা হয় বিবেচনায়। 

১৩ মে ১৯৭১। বাছাইকৃত ২০জনকে নেওয়া হয় ভাগীরথী নদীর তীরে বিখ্যাত পলাশীর প্রান্তরের ক্যাম্প। জায়গাটির নাম মীরাবাজার। আর হিমালয় থেকে নেমে এসে গঙ্গা নদীর একটি শাখা পদ্মা নাম ধারণ করে ঢুকেছে বাংলাদেশে। আরেকটি ভারতের ভাগীরথী। সেই পয়েন্টে ফারাক্কা বাঁধ। মুক্তিযুদ্ধের নৌকমান্ডোদের ট্রেনিং দেওয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয় এই ভাগীরথী নদীকে।

এর আগে পাকিস্তান নৌকমান্ডো দল গঠনের উদ্যোগ নেন নেভিতে কর্মরত আটজন বাঙালি। এরা হলেন রহমতুল্লাহ দাদু, মীর মোশাররফ হোসেন, আহসান আলী মিয়া, রকিবউদ্দিন, বদরুল আলম, আবেদুর রহমান, আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী ও চট্টগ্রামের শেখ আমানুল্লাহ।

যুদ্ধ শুরুর সময় এই আটজন ফ্রান্সে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। একসময় তারা পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করে ওখান থেকে পালিয়ে লন্ডনে চলে যান। লন্ডন থেকে দিল্লিতে এসে রিপোর্ট করেন যে, তারা পাকিস্তানি নৌসেনা, পাকিস্তানের পক্ষত্যাগ করে বাংলাদেশের যোদ্ধাদের নিয়ে নৌমান্ডো দল গঠন করতে চান। তাদের উদ্যোগে ইন্ডিয়ান নেভাল অধিদপ্তরের সহযোগিতায় গঠিত হয় নৌকমান্ডো দল।


কমান্ডো মানেই সুইসাইডাল স্কোয়াড। আত্মঘাতী হওয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকতে হতো তাদের। ভারতে তখন একজন পূর্ণাঙ্গ নেভাল কমান্ডো তৈরি হতে সময় লাগতো ১৮ বছর। কিন্তু বাংলাদেশের নৌকমান্ডোদের প্রশিক্ষত করার জন্য মাত্র তিনমাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ট্রেনিং ছিলো অনেক কষ্টের। ছবি: মানজারুল ইসলাম - বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ফজলুর রহমানরা মীরা বাজার ক্যাম্পে প্রথম দিন গিয়ে দেখেন দু’জন শিখ সেনা হান্ডিতে (বড় হাঁড়ি বিশেষ) চাল চাপিয়েছেন। আর একটি হান্ডিতে আস্ত মাসকলাই, দানা লবণ, আস্ত হলুদ, শুকনো মরিচ ফুটছে। পাশে ছিল মেহগনি গাছ। একটু করে কেরোসিন তেল দিয়ে ‍কাঁচা কাঠের আগুনে চলছিল রান্না। সেনারা আবার সবাই হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা। চুল, দাড়ি-গোঁফ লম্বা। বগলে লম্বা চুল ঝুলছে। তাদের জীবনে দেখা প্রথম শিখসেনা। দেখলে মনে হতো জংলি মানুষ। তখন মনে হয়, তারাও এরকম হয়ে যাবেন।

একটু পরে টিনের থালা আর মগ দেওয়া হয় তাদের হাতে। লাইন ধরে গিয়ে থালায় ভাত দেওয়া হয়। ভাত না বলে তাকে আধাসিদ্ধ চাল বলা যায়। পরে কিছু পানি আর আস্ত মাসকলাই। সেদ্ধ তেমন হয়নি। তাকে ডাল বলা যায় না।
রাজশাহীর বাঘার আজিজুল ‍আলম আর ফজলু রীতিমতো কান্নাকাটি শুরু করে দেন। ভাবেন জীবনে বোধহয় আর ফিরে যেতে পারবেন না প্রিয় দেশে। 

অবশ্য এ সমস্যা কেটে যায় তিন-চারদিন পর। জেনারেল ওসমানী ও ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান ওই ক্যাম্প ভিজিট করে একটি স্থিতাবস্থায় নিয়ে আসেন।

ট্রেনিংয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো সাঁতারকে। সারফেস সুইমিং। অক্সিজেন ছাড়া, শুধু মুখ-নাক বেরিয়ে থাকবে। যাকে বলে চিৎ সাঁতার। পায়ে রাবারের জুতা ফিঞ্জ (হাঁসের পায়ের পাতার মতো)। পরনে জাঙ্গিয়া। এটাই ছিল কস্টিউম।

কৌশল ছিল চোখে দেখা, নাক দিয়ে নিশ্বাস নেওয়া। মাঝে কাত হয়ে শুধু দেখতেন ঠিক যাচ্ছেন কিনা। প্রতিদিন সকালে প্যারেড পিটি হতো ১ ঘণ্টা। ভোর সাড়ে ৫টায় হুইসেল, আধাঘণ্টার মধ্যে রেডি। ৬টায় পিটি শুরু। সাতটায় শেষ। ক্যাম্পে ছিলো ৩শ জনের মতো। পরে ১৫ মিনিট বিছানা-তাঁবু গোছগাছ। সোয়া ৭টা থেকে পৌনে ৮টা পর্যন্ত নাস্তা। পৌনে ৮টায় জাতীয় সংগীত। ৮টা থেকে ট্রেনিং শুরু। সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পুরো ক্যাডেট দলকে ২ ভাগে ভাগ করা হতো। একভাগ পিটি-মল্লযুদ্ধ, একভাগ সাঁতারে। সাড়ে ১০টায় বিরতি আধাঘণ্টা। হাল্কা নাস্তা। দুই দলকে বিপরীত কাজ করতে হতো। দুপুর ১টার সময় বিরতি। হাতমুখ না ধুয়েই শুরু হতো খাওয়া।

বিকেল সাড়ে ৩টায় ফের হুইসেল। চা-বিস্কিট। ৪টায় আবার এক দলের প্রাকটিক্যাল ডেমোনেস্ট্রেশন, আর এক দলের খেলাধুলা। হকি, ফুটবল, ক্রিকেট। প্রাকটিক্যাল দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো কীভাবে অ্যাম্বুশ করা হয়, কীভাবে রেকি করা হয়, কীভাবে অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়-- এসব।  সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলতো এটা। খাওয়ার পর রাত ১০টার পর্যন্ত ছিল বিনোদন সময়। ভোর সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ঘুম। সপ্তাহে ২ দিন নাইট ডিউটি, ২ দিন কুকিং ডিউটি। মানে রান্নার কাজে সাহায্য করা।

এভাবে প্রায় তিনমাস ট্রেনিংয়ের পর ২ আগস্ট ক্যাম্প ত্যাগ করতে বলা হয় নৌকমান্ডোদের। ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন সমর কুমার দাস প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় কমান্ডার। প্রধান কমান্ডার ছিলেন কমোডর মার্টিস। সমর কুমার পরে দুর্ঘটনায় মারা যান শিলিগুড়িতে। নৌকমান্ডোদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দিতে এসে তিনি দুর্ঘটনায় পড়েন।ছবি: মানজারুল ইসলাম - বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

কমান্ডোদের হামলার প্রথম টার্গেট ছিল বাংলাদেশের ৬টি বন্দর। সে অনুযায়ী তারা ৬০ জন করে ৬টি গ্রুপে ভাগ হয়ে যান। চট্টগ্রাম বন্দরে ডিউটি পড়ে ফজলুর রহমানের। প্রথমে তাদের মিলিটারি গাড়িতে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় ছত্রীসেনাবাহী বিমানযোগে। ওখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নিউ ইয়ুথ ক্যাম্প নামে একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। শুধু ৬০ জন নেভাল কমান্ডোর জন্য। সেখানে ৩-৪ দিন অবস্থানের পর নেওয়া হয় হরিয়ানা ক্যাম্প। পাশেই কুমিল্লা সীমান্ত। সেখানে এক রাত যাপনের পর নেওয়া হয় ফংবাড়ি ক্যাম্পে। কুমিল্লার বিপরীতে। সীমান্ত থেকে ১ কিলোমিটার দূরে। এবার দেশে ঢোকার পালা। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভারতীয় নেভালের লোকজন প্রশিক্ষিত নৌকমান্ডোদের বিদায় জানান।

এখান থেকে আবার ২০ জন করে তিনভাগে ভাগ করা হয়। রাতে রওয়ানা দিয়ে কিছুদূর  যাওয়ার পরেই পড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড। সেময় ট্রাঙ্ক রোড বলা হতো। এ রোডে পাকিস্তানি সেনারা তখন অনবরত টহল দিচ্ছিল । এর মধ্য দিয়েই পার হতে হবে। পোটলায় সবকিছু  ভরে নিয়ে তিন চারজন করে ক্রলিং করে করে রাস্তা পার হন সবাই।

পার হওয়ার পর একজন গাইডের সঙ্গে সংকেত মিলিয়ে তার সঙ্গে শুরু হয় চলা। এভাবে ৫-৬ রাত হেঁটে শেল্টার ও গাইড বদলে ফেনীর সমিতি বাজার নামে একটি জায়গায় পৌঁছান। সেখানে নদীর ধারে খোলা মাঠে একটি স্কুল হয় থাকার জায়গা। হাঁটা হতো শুধু রাতে। ১৩ আগস্ট চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে শেখ আমানুল্লাহর বাড়িতে নেওয়া হয় কমান্ডোদের। কোনো আর্মস ছাড়া বাসযোগে পৌঁছান সবুজবাগ নামের বাড়িটিতে। কিন্তু ৬০ জনের ৪০ জন পৌঁছাতে পারেন। ২০ জনের একটি দল সময়মতো পারেনি। ৪০ জনের মধ্যে আবার ৭ জন অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাকি ৩৩ জন ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে কর্ণফুলী নদীর পাকিস্তান বাজার (এখন নাম বাংলাবাজার) গিয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে নৌকাযোগে নেওয়া হয় লক্ষার চরে এক কৃষকের খামারবাড়িতে। এদিন ‍আকাশবাণী কলকাতার খ চ্যানেলে গান বাজে ‘আমার পুতুল যাচ্ছে আজ শ্বশুরবাড়ি’। কমান্ডাররা জানতেন এ গানের অর্থ। মানে এ গান বাজলেই অপারেশনের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

আর ১৫ আগস্ট সকালে রেডিও কলকাতার খ চ্যানেল থেকে সকাল ৭টার খবরের পর একটি গান বাজে  ‘আমি তোমায় শুনিয়েছি যে কত গান।’ এ অপারেশনের টিম লিডার ছিলেন নৌ-কমান্ডো দল গঠনে আট উদ্যোক্তার একজন আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘আজই সন্ধ্যার পর অপারেশন।’

সে অনুযায়ী সন্ধ্যার পরেই সমিতিবাজার থেকে স্বাধীনতাকামী কিছু ডাক্তার, ব্যবসায়ী অ্যাম্বুলেন্সের স্ট্রেচারে অস্ত্র সাজিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে চট্টগ্রামের কোনো একটি জায়গায় সবজির বস্তায় ভরে লক্ষার চরে পৌঁছে দেন। শিম, বরবটি আর মরিচের ১৩-১৪টি বস্তায় ভরে নেওয়া হয় লক্ষার চর। রাতে ভালো খাওয়া দাওয়া শেষে ৩৩ জন রাত ১টার কিছু আগে অপারেশনে যান। বলা হয়, একটি টার্গেটে তিনজন করে অগ্রসর হবে। 

যুদ্ধের একমাত্র অস্ত্র ছিলো লিমপেট মাইন (এক স্বয়ংক্রিয় মাইন)। তাপে চাপে যেকোনো মুহূর্তে এটা এক্সপ্লোড করতে পারে। কচ্ছপের মতো শেপ।  কচ্ছপ যখন শুঁড় বের করে, তেমন। তলায় ৫ হর্স পাওয়ারের ম্যাগনেট। ম্যাগনেট লাগানো থাকতো একেকটি ৫-৬শ ফুট লম্বা। তিনটি লোহার প্লেট থাকে জাহাজে। আউটসাইডের প্লেটটিতে অনেক সময় স্যাঁতলা পড়তো। তখন ডুব দিয়ে ধরলে আকর্ষণ করতো। নিজের সেফটির জন্য থাকতো দু’টি করে গ্রেনেড ও সেফটি ড্যাগার। এটা খুব মারাত্মক। ফলা ৬ ইঞ্চি, বাট ৪ ইঞ্চি। বাইরে পাওয়া যেতো না। ৬ ইঞ্চি চামড়ার খোলসে ঢাকা থাকতো। জালির মধ্যে থাকতো গ্রেনেড। মাইন হাতে। ৬-৭ কেজি ওজন হবে। সেফটি ড্যাগারের দুই ধারই ধারালো। একটু আঁচড় দিলেই কেটে যাবে। দুই ধারে পটাশিয়াম সায়ানাইড মাখানো। একটু চামড়া কাটলেই মারা যাবে। 

কোনোভাবে শত্রুপক্ষের কাছে ধরা পড়ামাত্র করতে হবে গ্রেনেড চার্জ। তারপর যদি ড্যাগার ব্যবহারের সুযোগ মেলে। উদ্দেশ্য যে কোনোভাবে বেঁচে ফেরা। তা নাহলে নিজেকে শেষ করে দেওয়া। পথে শত্রু আক্রমণ করার জন্য প্রতি তিনজনে একটি এসএমজি ছিল। ৯ এমএম বোরের এসএমজি। পানিতে নেওয়া হতো না। 

নদীতে নেমে জাহাজের কাছে নিরাপদে পৌঁছানোই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাহাজগুলো উড়িয়ে দিতে পারলে পোর্টগুলো অচল করে দেওয়া যাবে। বিদেশি জাহাজ ভিড়তে পারবে না। কোনো রসদ দেশে ঢুকতে পারবে না। তাই অপারেশন সফল করাই ছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ। 

কর্ণফুলী নদীর জেটির অপজিটের একটি জায়গাকে বেছে নেওয়া হয় নামার জন্য। একসঙ্গে টার্গেট কয়েকটি জাহাজ। স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পৌঁছাতে হবে টার্গেটে। একটি জাহাজের ইঞ্জিন রুম থাকে মাঝে, নাহলে কোনো এক পাশে। তিন গ্রুপ যদি তিন জায়গায় মাইন সেট করতে পারে তাহলে কোনো না কোনোভাবে তা ইঞ্জিনে আঘাত হানবে আর  আগুন ধরে যাবে। মাইনগুলো লাগানো হতো পানির তিন-চার ফুট নিচে। 

কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ১ কিলোমিটার স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে আড়াআড়িভাবে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু ফজলুর রহমানের গ্রুপের তিনজনের একজন ব্যর্থ হন। তিনি পৌঁছান মাঝ  বরাবর। পাকিস্তানি জাহাজটির নাম ছিল হরমুজ। মালবাহী জাহাজ। বাতি জ্বলছিলো তখন। পাকিস্তানি আর্মিরা ছিল পাহারায়। জাহাজটি বাঁধা ছিল পোর্টের বিপরীতে। জাহাজ যেহেতু একটু কাত হয়ে থাকে সেহেতু নিচে আড়াই তিন ফুট ছায়া পাওয়া যায়। পানির নিচে জাহাজের বডিতে সহজে আটকে যায় মাইন।

এসব লিম্পেট মাইন রাশিয়ার তৈরি। বাংলাদেশেই এটি তারা প্রথম প্রয়োগের জন্য সরবরাহ করে। মাইনগুলোতে কচ্ছপের শুঁড়ের মতো অংশে একটি সেফটি ডিভাইস দেওয়া থাকতো। সেখানে একটি টাইমার। ইচ্ছেমতো টাইম সেট করা যেতো সাড়ে ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। 

টাইমার সেট করলেও সেফটি ডিভাইসের সল্ট ব্লকটি গুরুত্বপূর্ণ। সেটা যত দ্রুত গলবে তত দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটবে। তবে এক ঘণ্টা টাইম সেট করলে ৪০ থেকে ৭০ মিনিটের আগে কোনোভাবেই গলতো না। সেভাবেই তৈরি ছিল। সেফটি ডিভাইসটি আবার রাবার ক্যাপ দিয়ে লাগানো। তাতে সেফটি পিন। পিনের নিচে একটি স্পিং দিয়ে ‍আটকানো। স্প্রিংটি রিলিজ হলে বিস্ফোরণ ঘটবে। 

ফজলুর রহমান যখন মাইনটি লাগিয়ে ফেলেন তখন নদীতে ভাটা। পানির নিচে দম ধরে মাইন লাগিয়ে ভুঁশ করে ভেসে উঠতেই উপর থেকে টের পায় পাকিস্তানি পাহারাদাররা। তখন তাৎক্ষণিক বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে শুশুকের মতো আবার ডুব দিয়ে আবার উঠে ডুবে দূরে চলে চান। যেন তারা ভাবে শুশুক।

এভাবে মাইন লাগিয়ে নদীর স্রোতে ভেসে তীরে গিয়ে জঙ্গল দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছান। এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর বিস্ফোরিত হয় মাইনটি। 

এভাবে একযোগে কয়েকটি বন্দরে জাহাজে মাইন বিস্ফোরণের পর পাকিস্তানিরা আর আড়াল করতে ব্যর্থ হয় যে,  দেশে যুদ্ধাবস্থা চলছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে সফল ও কার্যকর অপারেশনের একটি।

সহযোগিতায়:আইএফআইসি 

আরও পড়ুন
** আজও বেঁচে মুক্তিযোদ্ধাদের সুহৃদ হাসিনা পাগলী
** কোপ খেয়েও বধ্যভূমি থেকে বেঁচে ফেরেন চকবরকতের আবেদ​
** সীমান্তের রণাঙ্গনে ওয়্যারলেস নিয়ে যুদ্ধ
** পদ্মাপাড় লাগোয়া সীমান্তে মর্টার নিয়ে যুদ্ধ
** রাতে সীমান্ত পেরিয়ে কৌশল বাতলে দিতেন শিখ সেনারা
** বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন: সভার আড়ালে শপথগ্রহণ
** ‘পাকিস্তান বাগান’: একাত্তরের অরক্ষিত বধ্যভূমি
** জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল
** শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো ভৌতিক কলেরা মিথ
** পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
** মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার

বাংলাদেশ সময়: ০৭৫৪ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৬
এএ/জেএম

অনাস্থা ভোটে মোদীর জয়
স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে এসে দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যু
পাঁচবিবিতে সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্রের নিহত
মাদক নির্মূলে রাজধানীতে সাইকেল শোভাযাত্রা
রাজশাহী নগর জামায়াতের আমিরসহ গ্রেফতার ২
বরিশালে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি গ্রেফতার
মহাকবি কায়কোবাদের প্রয়াণ
ইতিহাসের এই দিনে

মহাকবি কায়কোবাদের প্রয়াণ

মতবিরোধে কুম্ভ, সুখবর পাবেন বৃষ
নরসিংদীতে এনা বাসের ধাক্কায় লেগুনার ৫ যাত্রী নিহত
বিদেশি টি-টোয়েন্টি লিগে মোস্তাফিজের ২ বছরের নিষেধাজ্ঞা