অমরখানা: ৬নং সেক্টরের বড় এক যুদ্ধক্ষেত্র

ইকরাম-উদ দৌলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি ও ভিডিও শাকিল আহমেদ/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

৬ নম্বর সেক্টরের একটি বড় যুদ্ধক্ষেত্রের নাম অমরখানা। এখান দিয়ে বয়ে গেছে ভারতের চাউলহাটি থেকে নেমে আসা চাওয়াই নদী।

তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়: ৬ নম্বর সেক্টরের একটি বড় যুদ্ধক্ষেত্রের নাম অমরখানা। এখান দিয়ে বয়ে গেছে ভারতের চাউলহাটি থেকে নেমে আসা চাওয়াই নদী। এই নদীটি পঞ্চগড় জেলায় একটি বিভেদরেখা টেনে দিয়েছে। যার পশ্চিম-উত্তরে রয়েছে সদরের কিছু অংশ ও তেঁতুলিয়া। যুদ্ধের সময় এ অংশটি ছিল মুক্তাঞ্চল।

এ এলাকাটি অনেকটা ফানেলের মতো। যার নলের ভেতর সদরের একটি অংশ ও তেঁতুলিয়া। আর ফানেলের মুখে জেলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশ। ফানেলের মুখ ও নলের সংযোগ স্থলটিই হচ্ছে অমরখানা। এখান দিয়েই বয়ে গেছে চাওয়াই নদী। যার এপারে ছিল মুক্তিবাহিনী আর ওপারে পাকবাহিনীর শক্ত ঘাঁটি।
জেলার দুই অংশের মধ্যে বিভেদ রেখা টেনে দেওয়া চাওয়াই নদীর ওপর তখনও ব্রিজ ছিল। ব্রিজ থেকে একটু পশ্চিমে এগুলেই সদরের দশমাইল এলাকা।যেখান থেকে সোজা পুবে চলে গেছে একটি মাটির সড়ক। যা একেবারে ভারতের জলপাইগুড়ির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।চাওয়াই নদীর ওপর ব্রিজটিকে স্থানীয়রা অমরখানা ব্রিজই বলে। এপারে মুক্তিযোদ্ধারা আর ওপারে পাকসেনারা গড়েছিল শক্ত ডিফেন্স। নভেম্বর পর্যন্ত এখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ হতো।
চাওয়াই নদীর ওপর ব্রিজটিকে স্থানীয়রা অমরখানা ব্রিজই বলে। এপারে মুক্তিযোদ্ধারা আর ওপারে পাকসেনারা গড়েছিল শক্ত ডিফেন্স। নভেম্বর পর্যন্ত এখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ হতো।

অমরখানায়ই যুদ্ধ করেছেন রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ক্লাশ টেনের ছাত্র খায়রুল আলম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হন্তান্তর না করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর উত্তরবঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সাধারণ মানুষ।

ক্যাডেট কলেজ থেকে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয় বাড়ি চলে যেতে। কিন্তু বাড়ি কী করে যাবেন! কারণ মার্চের শেষের দিকে সৈয়দপুরে যুদ্ধ অনেকটা বাঙালি-বিহারীর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। তাই ঠাকুরগাঁয়ের হরিপুর থানার ডাঙ্গিপাড়ার বাড়িতে এ পথে যাওয়া মানেই বিপদ। তাই রাজশাহী থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের রায়গঞ্জ দিয়ে হরিপুরে আসেন খায়রুল আলম।

২৫ মার্চের পর তৎকালীন এমএনএ আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমান ইয়ুথ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন মালনে। ওখানে গেলে তিনি কম বয়স, পাড়লেখার কথা বলে বাড়ি চলে আসতে বলেন। এরই মধ্যে গঠন হলো জয়বাংলা ক্যাম্প। যে ক্যাম্পের কাজই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা।পঞ্চগড়ের এই সীমান্তের ওপারেই ভারতেই জলপাইগুড়ি।

পঞ্চগড়ের এই সীমান্তের ওপারেই ভারতেই জলপাইগুড়ি।

এপ্রিলের শুরুতেই বাঙালি আনসার, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস(ইপিআর), মুজাহিদ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা গঠন করলেন সেই জয়বাংলা ক্যাম্প। যার নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আকবর হোসেন। পরবর্তী সময়ে তার কাছে গেলেন ১৬ বছরের এ ক্যাডেট। তিনিও তাকে ফিরিয়ে দিলেন। তবে সেখানে একটি বিশেষ গাড়ি আসত। ওটাতে উঠে মে মাসের প্রথম দিকে একদিন হরিপুরের ওপারে ভারতের রায়গঞ্জ হয়ে চলে যান জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে ছিল ভারতের মূর্তি ক্যাম্প। যা পরবর্তী সময়ে হয় মুজিবক্যাম্প। এর পাশে চাবাগান ছিল। মুজিবক্যাম্পেই নেন মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা ট্রেনিং।

ভারতীয় আর্মির মেজর শর্মা, ক্যাপ্টেন দয়াল সিং, ক্যাপ্টেন বিধান ছিলেন তার ওস্তাদ। বিধানদের অরিজিনাল বাড়ি বরিশালে। তাদের নেতৃত্ব দিতেন ব্রিগেডিয়ার যোশী।ভারত থেকে নেমে আসা চাওয়াই নদী।

ভারত থেকে নেমে আসা চাওয়াই নদী।
৩০ দিনের গেরিলা ট্রেনিং শেষে জুনের ২০ তারিখে তাদের পাঠানো হয় জলপাইগুড়ি জেলার চাউলহাটি ক্যাম্পে। যার এপারেই পঞ্চগড়ের অমরখানা। তারা ছিলেন ব্রেভো কোম্পানির গেরিলা। ৯০ জন গেরিলার এই কোম্পানির প্রথমে কমাণ্ডার ছিলেন গোলাম রব্বানী, শেষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বর্তমান জিএম মাহবুব আলম।

চাওয়াই নদীর এপারে অমরখানায় পাকিস্তান আর্মি গেড়েছিল বেশ শক্ত এক ঘাঁটি। প্রথমে পাক আর্মি দশমাইলের দিকে এগিয়ে গেলেও সুবিধা করতে পারেনি। কেননা দশমাইলের দুই পাশেই ভারত। একারণে তারা ভয় পেয়ে অমরখানাতেই ব্যাপক শক্তি নিয়োজিত করে। যুদ্ধের পুরো সময়টায় তারা এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে না পারায় দশমাইল থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছিল মুক্তাঞ্চল।অমরখানায় শক্ত ঘাঁটি গেড়ে পঞ্চগড়ের ভেতরে হত্যাযজ্ঞ চালাত পাকসেনারা। এক্ষেত্রে শহরের করতোয়া নদীর পাড়ে ঠিক এই স্থানে সাধারণ বাঙ্গালীদের ধরে এনে হত্যা করা হতো।

অমরখানায় শক্ত ঘাঁটি গেড়ে পঞ্চগড়ের ভেতরে হত্যাযজ্ঞ চালাত পাকসেনারা। এক্ষেত্রে শহরের করতোয়া নদীর পাড়ে ঠিক এই স্থানে সাধারণ বাঙ্গালীদের ধরে এনে হত্যা করা হতো।
চাওয়াই নদীর এপারে দশমাইলের একটু সামনে মাগুরমারি শুরু থেকেই দখলে নিয়েছিলেন বাঙালি আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর সদস্যরা। এদের সঙ্গে মে মাসেই যুক্ত হন মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা। এরপর জুনে ভারতের বিএসএফ সদস্যরা ব্যাক আপ দেন।

খায়রুল আলম এখানে গেরিলা হামলা চালাতেন প্রতিরাতেই। এরই মাঝে সেক্টর গঠন হলে তাদের কিছুদিন ১১ নম্বর সেক্টরেও পাঠানো হয়। যদিও তিনি প্রথমে ৬ নম্বর সেক্টরেই যুদ্ধ করেন। ১১ নম্বর সেক্টরে কিছুদিন গেরিলা অপারেশন চালিয়ে তিনি আবার ৬ নম্বর সেক্টরে চলে আসেন। আগে ভারতীয় আর্মির নির্দেশনা চললেও ৬ নম্বর সেক্টর গঠনের পর সে দায়িত্ব পান উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার।মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন। যে রাস্তায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানেই জলপাইগুড়ি থেকে সরাসরি সাঁজোয়া যান, গোলা-বারুদ চলে আসত।

মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন। যে রাস্তায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানেই জলপাইগুড়ি থেকে সরাসরি সাঁজোয়া যান, গোলা-বারুদ চলে আসত।
খায়রুল আলম সেপ্টেম্বরে গাইবান্ধা সদরে বোমা হামলা চালানোর দায়িত্ব পান। সেখানে বেশ কিছুদিন থেকে আবার চাউলহাটি ক্যাম্পে চলে আসেন। যেখান থেকে প্রতিদিনই যুদ্ধ করতে হয়েছে অমরখানায়। ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর সহায়তায় ব্যাপক যুদ্ধের মাধ্যমে ২০ নভেম্বর অমরখানা দখল করে মুক্তিবাহিনী। এরপর ২১, ২২, ২৩ নভেম্বর যুদ্ধ করে ২৪ নভেম্বর জগদল ক্যাম্প দখলে নেন মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর সেখান থেকে পঞ্চগড়ে শহরের ভেতর প্রবেশ করেন তারা। সেখানে ২৬, ২৭ ও ২৮ নভেম্বর বেশ কিছু সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। এরই মাঝে পাকবাহিনী করতোয়া নদীর এপারে (বর্তমানে যেটা তেঁতুলিয়া মোড়) লোক ধরে এনে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। পরে যা বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাদের সহযোগিতা করে স্থানীয় রাজাকাররা। যাদের মধ্যে বিহারীরা ছিল দুর্ধর্ষ।মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন।
মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন।
২৯ নভেম্বর পঞ্চগড় স্বাধীন হয়। পাকিবাহিনী তখন দিনাজপুর হয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট এবং সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের দিকে পিছু হটতে শুরু করেছে।

সৈয়দপুরের বিহারী-বাঙালি সংঘর্ষের ঢেউ এসে পড়ে পঞ্চগড়েও। এখানে বাঙালি রাজাকারদের চেয়ে অবাঙালি বিহারী রাজাকারেরা যুদ্ধের শুরু থেকেই মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠে। তারা অত্যাচার, লুট, ধর্ষণ নিজেরাই করে। এদের মধ্যে রহমান বিহারী, চেররু মোহরী, মোজাম্মেল মোহরী ছিল কুখ্যাত রাজাকার।

দশমাইল গ্রামের মোহাম্মদ আফতাব উদ্দীন ২৫ মার্চের পরপরই ট্রেনিং নিতে গিয়েছিলেন মুজিবক্যাম্পে। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর ৪ দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ৩০ জনকে অমরখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাঙালি ইপিআর, আনসার, মুজাহিদদের সমন্বয়ে তারাই চাওয়াই নদীর এপারে ডিফেন্স গড়ে তোলেন। তাদের ডিফেন্স ছিল দশমাইল বিওপি (বর্ডার অবজারবেশন পোস্ট) থেকে একটু সামনে।

মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল আলম। মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল আলম।

জলপাইগুড়ির রাস্তা দিয়ে দশমাইল পর্যন্ত আসতো গোলাবারুদ আর ভারতীয় সেনাদের ট্রাক। আর বাংলাবান্ধা দিয়ে আসতো ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান। আফতাব ট্রেনিং করে আসার পর আর যুদ্ধ করতে পারেননি। তার কাছে একটা এসএমজি ছিল। ওটা সারাক্ষণ তার কাঁধেই থাকতো। আওয়ামী লীগ নেতা খবির মাস্টার ছিলেন তাদের সংগঠক। ট্রেনিং শেষে তার বাবা তাকে যুদ্ধের ময়দানে না পাঠানোর অনুরোধ করলে খবির মাস্টার তাকে দশমাইল বিওপিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার কাজ পাইয়ে দেন। এরপর যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত বাংকার খোঁড়া, গোলাবারুদ বহন করা, মর্টার বসানোর জায়গা তৈরি করে দেওয়া ইত্যাদি কাজই করতেন তিনি।

সহযোগিতায়:

 আরও পড়ুন:
** পাটগ্রামের ত্রিমুখী ডিফেন্স ছিল পাকসেনাদের কাছে ‘চীনের প্রাচীর’
** তেলডালার রসদে রৌমারীতে পূর্ণাঙ্গ রণ-প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
** বাবাজী বললেন, ‘এক ইঞ্চ আন্দার আন্দার বোম্বিং কারো’
** ভোগাই নদীর ওপাড় থেকে তেলিখালী, চেলাখালী

** আমীর ডাকাতের বাড়িতে থেকে চরাঞ্চলে গেরিলা আক্রমণ
** তোরা, তেলডালা থেকে মুজিব ক্যাম্প
** পাকবাহিনীর ওপর গারো-হাজংদের প্রতিশোধের আগুন

বাংলাদেশ সময়: ০৮০৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর, ২০১৬
ইইউডি/জেএম

যারা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন:
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দীন ও মোহাম্মদ খায়রুল আলম।

সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতিসহ আটক ৪
হলি আর্টিজান মামলায় ২১ জনের নামে চার্জশিট
‘জিতলে আমি জার্মান, হারলে শরণার্থী’
বিদেশ যেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ ইমরান এইচ সরকার
গর্ভকালীন সময়ে যা খেতে নেই
কাপড় শুকাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে গৃহবধূর মৃত্যু
সেই ১২ শিক্ষার্থীর ৯ জন পাস করেছে
যশোরে অজ্ঞাত ২ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার
নওয়াজ অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ মেডিকেল টিমের
তামিমের আগে পুরো ইনিংস ব্যাট করার কীর্তি যাদের