পদ্মাপাড় লাগোয়া সীমান্তে মর্টার নিয়ে যুদ্ধ

আসিফ আজিজ, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

ছবি: মানজারুল ইসলাম- বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

দূরের লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত সময়ে আঘাত হানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো মর্টারশেল। এর সুবিধা ছিল ভারতীয় সীমান্তের নিরাপদ অবস্থানে থেকেও পাকিস্তানি সেনাদের উপর আক্রমণ করা যেতো।

রাজশাহী: দূরের লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত সময়ে আঘাত হানার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিলো মর্টারশেল। এর সুবিধা ছিল ভারতীয় সীমান্তের নিরাপদ অবস্থানে থেকেও পাকিস্তানি সেনাদের উপর আক্রমণ করা যেতো। যুদ্ধক্ষেত্রে ইপিআর কিংবা মুজাহিদ ট্রেনিংপ্রাপ্তদের বেছে নেওয়া হতো মর্টার স্পেশালিস্ট হিসেবে। কয়েকজনকে নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হতো মর্টার যোদ্ধাদের।
 
দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলা নিয়ে গঠিত ৭ নম্বর সেক্টরের অধীন রাজশাহীর গোদাগাড়ী। পদ্মা ও মহানন্দা ছুঁয়ে গেছে এ উপজেলাকে। গোদাগাড়ীর পশ্চিমে পোলাভাঙা, ওপারে ভারতের লালগোলা। উত্তর-পশ্চিমে গিয়ে পদ্মা ভাগ হয়ে গেছে মহানন্দায়। এই সীমান্তজুড়ে ভারতের খানোয়া, চরণসারা  দেবীনগর ও হাকিমপুর আর বাংলাদেশের ইসলামপুর, পোড়াদহ ও ফরিদপুর। কিছু অংশ পড়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মধ্যে।
 
লালগোলা ছিলো এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। পোলাডাঙা ক্যাম্প থেকে চলতো বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন। মুজাহিদ ট্রেনিংপ্রাপ্ত মনিউর রহমান মন্টু রাজশাহীতে যুদ্ধ করেন ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই। কিন্তু নিরাপত্তা, লোকবল কম থাকায় আরও সংগঠিত হতে রেলবাজার ঘাট দিয়ে ভারতের লালগোলা যান ইপিআর সদস্য ও ১০ জন মুজাহিদ-ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদল। প্রথমে সেখানে একটি ধানের গুদামে ছিল ক্যাম্প। পরে একটু দূরে ডাকবাংলোতেও ক্যাম্প হয়।
 
এখানে গঠিত হয় একটি মর্টার সেকশন। যার অধিনায়ক ছিলেন হাবিলদার কামাল। আর লালগোলা ডাকবাংলো ক্যাম্পের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী। মূলত তার নির্দেশেই শেষ পর্যন্ত অপারেশনে যেতেন যোদ্ধারা।
 
মর্টার নিক্ষেপের জন্য বিশেষ কিছু কৌশল ও দক্ষতার দরকার হতো। তবে সবাইকে এটা শেখানো হতো না। চারঘাট, গোদাগাড়ী, বাসুদেবপুর এলাকায় মর্টার সেকশনে প্রশিক্ষণ নেন নায়েক মোজাফ্ফর, মনিউর রহমান, সোনাদ্দি, হাবিলদার সুন্দর আলী, সিপাহি নাজমুল হোসেন ও তাইফুর রহমান।
 
মনিউর রহমান ব্যবহার করতেন থ্রি-ইঞ্চ মর্টার। মর্টার সেকশনে আবার একদল গোয়েন্দা কাজ করতেন। তাদের মাধ্যমে ঠিক করা হতো রেঞ্জ। মানে কত দূরের শত্রুঘাঁটিতে মারতে হবে। পরে কমান্ডাররা সব বিচার-বিশ্লেষণ করে বলে দিতেন কোথায়, কখন, কীভাবে, কে কে মর্টার নিয়ে আক্রমণে যাবেন।
 
মর্টারগুলো ৪ মাইল পর্যন্ত দূরত্বে আঘাত হানতে পারতো। এতে একটি ব্যারেল,বেসপ্লেট ও বোম থাকতো। অপারেশনে যাওয়ার আগে বহন করা হতো ভাগ ভাগ করে।একার পক্ষে বহন করা কঠিন হতো। তাই সংঘবদ্ধভাবেই মর্টার ব্যবহার করা হতো। ইপিআরের হাবিলদার কামাল মর্টার ট্রেনিং দেন পোলাভাঙা ক্যাম্পের যোদ্ধাদের।

মর্টার চালানো শিখতে সময় লেগে যেতো প্রায় ২৫-২৬ দিন। এসব মর্টার প্রাথমিক অবস্থায় সরবরাহ করতো ইপিআর। গোলাও দিতো তারা। পরের দিকে ভারত থেকে আসতো যোগান।

মর্টারের সুবিধা হলো সীমান্তের ওপার থেকে টার্গেটে মারা যেতো। আবার একটু এগিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ঢুকে ঘাঁটি গেঁড়ে মারলেও দ্রুত আবার নিরাপদ স্থানে ফিরে আসা যেতো।

মনিউর রহমান ও তার সহযোদ্ধারা পোলাডাঙা ক্যাম্প থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় কয়েকটি বড় অপারেশনে অংশ নেন। যুদ্ধগুলোতে মর্টারের ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

পোলাডাঙা থেকে গোদাগাড়ীর রভয়া সেতু উড়িয়ে দেওয়ার অপারেশনে যান মনিউররা। তখন বর্ষাকাল। রাত ১টার দিকে পদ্মা নদী দিয়ে নৌকাযোগে নয়জন অংশ নেন। এই সেতু দিয়ে পাকিস্তানিরা চলাচল করতো। একই সঙ্গে অত্যাচার চালাতো এলাকার মানুষের ওপর। তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য মর্টার শেল মেরে সেতু উড়িয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা।

এ ঘটনার পাকিস্তানিরা নৌকাযোগে পদ্মা নদী পার হয়ে পোলাডাঙা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করতে ‍যায়। সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে পাকিস্তানিদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যান মুক্তিযোদ্ধারা। এসময় ওয়্যারলেসে ভারতীয় বাহিনীকে জানানো হয়। তারা ওপার থেকে মর্টার শেল ছুড়তে থাকেন। এক একটি মর্টার শেল পড়তে থাকে আর সেই সুযোগে পেছাতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। পাকিস্তানিরাও একে একে পেছাতে থাকে। এভাবে মিত্রবাহিনীর সহায়তায় নিরাপদ স্থানে ফেরেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ যুদ্ধে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

সহযোগিতায়:

আরও পড়ুন

** রাতে সীমান্ত পেরিয়ে কৌশল বাতলে দিতেন শিখ সেনারা
** বৈদ্যনাথতলার আম্রকানন: সভার আড়ালে শপথগ্রহণ
** ‘পাকিস্তান বাগান’: একাত্তরের অরক্ষিত বধ্যভূমি
** জকিগঞ্জ মুক্ত করতে জীবন দিলেন চমনলাল
** শরণার্থীদের মধ্যে তৈরি হলো ভৌতিক কলেরা মিথ
** পীরবাবা সেজে রেকি করে শিকারপুর-কাজিপুর সীমান্তে যুদ্ধ
** মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাল ছিলো সীমান্ত-নদী বেতনা
** সুন্দরবন সীমান্তঘেঁষে হরিনগর-কৈখালীর নৌযুদ্ধ
** দেয়ালে গুলির ক্ষত, এখনও আছে সেই শিয়ালের ভাগাড়
** পারিবারিক গণকবরের সীমান্তগ্রাম
** মল্লযুদ্ধেই মুক্ত সীমান্তগ্রাম মুক্তিনগর
** আস্তাকুঁড়ে পড়ে আছে যুদ্ধস্মৃতির ভক্সেল ভিভার
 

বাংলাদেশ সময়: ০৮০০ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১২, ২০১৬
জেএম/

পিলখানা ট্রাজেডির ৯ বছর
সাতক্ষীরায় দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে হেলপার নিহত
রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে মিনুর পাশে লিটন
বরিশালে আলু বোঝাই ট্রাক উল্টে খাদে
আশুলিয়ায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেফতার
সৈয়দপুরে আবাদি জমিতে গড়ে উঠছে ইটভাটা
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হ্যারিসনের জন্ম
প্রেমে ভুল বোঝাবুঝি মিথুনের, রাগ সামলান সিংহ
যতো ভালোবাসা গম্ভীরায়
ট্রেনের ছাদে ছুরিকাঘাতে যুবক নিহত




Alexa